15/10/2026
মাকে কি এখানে আনা যায় না?
Aurora - A Ray of Hope🍀🍀
Written By - Mr Suman Ganguly ( Founder member of Aurora Bengali Association) 🍀🍀🍀
ছোটবেলায় মনে হতো, সবাই মিলে একটু চেষ্টা করলেই দুর্গাপুজোটা আরও এক দিন বাড়িয়ে দেওয়া যায়। বড় হয়ে বুঝেছি, পুজোর দিন বাড়ানো যায় না। কিন্তু সেই দিন গুলোর জন্য মনের টানটুকু থেকে যায় - পৃথিবীর অন্য প্রান্তে চলে এলেও।
আমার কাছে পুজো শুরু হতো পাড়ার মাঠে প্রথম বাঁশটা পড়ার দিন থেকে।
স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা রেখেই ছুটতাম ক্লাবে। আজ কতটা প্যান্ডেল হলো, কোথায় কাপড় লাগল, কে কী কাজ করছে - সব দেখা চাই।আর দাদা-কাকুদের কাছে আমাদের প্রশ্নের কোনও শেষ ছিল না।
“প্যান্ডেল কবে শেষ হবে?”
“লাইট কবে লাগবে?”
“এবার ঠাকুর কত বড় হবে?”
“ঠাকুর আনতে কবে যাবে? আমরাও যেতে পারব তো?”
প্রায় রোজ একই প্রশ্ন করতাম। আসলে জানতে চাইতাম, এই আয়োজনের মধ্যে আমাদেরও একটু জায়গা হবে তো? কেউ যদি বলত, “এই দড়িটা একটু ধরে থাক,” মনে হতো, পুজোর খুব জরুরি একটা দায়িত্ব পেয়েছি। বন্ধুদের সঙ্গে কত পরিকল্পনা - কে কোন কাজ করবে, কে ঠাকুর আনতে যাবে, কে কত রাত পর্যন্ত মণ্ডপে থাকতে পারবে!
বাড়িতে চলত অন্য প্রস্তুতি। বাবাকে জানাতাম, কোন বন্ধু কী জামা কিনেছে। খুব যত্ন করে বিবরণ দিতাম, যাতে বাবা বুঝতে পারে, আমারও ঠিক ওই রকমটাই চাই। সঙ্গে চাই ক্যাপ ফাটানোর একটা খেলনা বন্দুক। সবাই মিলে মণ্ডপে ক্যাপ ফাটাব - আমারটা না থাকলে চলে?
বাবা বলত, “আচ্ছা, দেখা যাবে।”
তখন জানতাম না, আমার ছোট ছোট আবদার মেটাতে বাবাকে কত হিসেব করতে হয়। শুধু অপেক্ষা করতাম, কবে হাত ধরে দোকানে নিয়ে যাবে।
তারপর আসত মহালয়া।
ভোরে বাবা রেডিয়ো চালিয়ে দিত। আধোঘুমে সেই চেনা কণ্ঠ শুনেই বুকের মধ্যে কেমন একটা আনন্দ শুরু হতো। মা আসছেন। আর দু-এক দিন পরেই স্কুলেও ছুটি। সামনে কতগুলো দিন - শুধু বন্ধু, মণ্ডপ আর পুজো!
পুজোর আগে থেকে বাড়িতে মায়ের পিছনে ঘুরতাম। সারা দিন মণ্ডপে
থাকার অনুমতি চাই। সময়মতো খেতে আসব, বেশি দুষ্টুমি করব না - কত প্রতিশ্রুতি!
পঞ্চমী থেকে মণ্ডপটাই হয়ে উঠত আমাদের আরেকটা বাড়ি। সারাদিন খেলা, ছোটাছুটি, হাসাহাসি। তারই ফাঁকে কখনও প্রতিমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। মায়ের মুখটা দেখতাম। কেন এত ভালো লাগত, বোঝাতে পারতাম না। মনে মনে শুধু বলতাম, “তাড়াতাড়িচ লে যেয়ো না, কেমন?”
ষষ্ঠী, সপ্তমী কেমন করে যেন চলে যেত। অষ্টমীর রাত থেকে মনটা অস্থির হয়ে উঠত। এই তো সেদিন ঠাকুর এলেন। এখনই যাওয়ার সময় হয়ে গেছে?
অনেক আশা নিয়ে দাদা-কাকুদের জিজ্ঞেস করতাম, “আচ্ছা, এবার মাকে এক দিন বেশি রাখা যায় না?”
প্রশ্নটা সত্যিই করতাম। মনে হতো, সবাই রাজি হলে নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা হবে। মা নিজে থাকতে চাইলে তাঁকে কি যেতেই হবে?
যে পুজো শুরু হয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে খেলব বলে, নতুন জামা পরব বলে, তার মধ্যেই কখন মায়ের জন্য একটা গভীর টান জন্মে গিয়েছিল, বুঝিনি।
বুঝতে পারতাম নবমীতে।
বন্ধুরা পাশে আছে, খেলা হচ্ছে, আমিও আছি। তবু কিছুতেই পুরো মন বসছে না। বারবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছি। কাল এই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যাবে।
সেই রাতে বাড়ি ফিরে চুপচাপ শুয়ে পড়তাম। বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতাম। কাউকে বলতে পারতাম না, কী হয়েছে। কী বলব? কাল মা চলে যাবেন বলে আমার ঘুম আসছে না?
শুধু চাইতাম, রাতটা যেন শেষ না হয়।
ঘুম ভাঙত দশমীর ঢাকে। যে শব্দ শুনে কদিন আগে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিলাম, সেই শব্দ শুনেও আর উঠতে ইচ্ছে করত না। চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকতাম। যেন আমি না উঠলে দশমীও শুরু হবে না।
মণ্ডপে না পেয়ে বন্ধুরা বাড়িতে আসত। মা বলত, “অনেকবার ডেকেছি। উঠতেই চাইছে না।”
ওরা ঘরে ঢুকে দাঁড়াত। অন্য দিন হলে এতক্ষণে হইচই পড়ে যেত।সেদিন সবাই কেমন চুপচাপ। কেউ কিছু না বললেও বুঝতাম, ওদেরও একই কষ্ট।
শেষে একসঙ্গে মণ্ডপে যেতাম। এক কোণে কয়েকটা চেয়ারে পাশাপাশি বসে দেখতাম সিঁদুরখেলা। তারপর দাদা-কাকুরা ধীরে ধীরে মাকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করতেন।
কদিন আগেও যাঁদের রোজ জিজ্ঞেস করতাম, “ঠাকুর কবে আসবে?” - সেদিন তাঁদের আর কিছু জিজ্ঞেস করতাম না।
আজও সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। এত কান্না মিশে আছে, তবু আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। সেই নবমীর রাতে। সেই দশমীর সকালেও। বন্ধুদের পাশে চুপ করে বসে থাকার মধ্যেও যে কতটা আপন হয়ে থাকা ছিল!
তারপর বড় হলাম। পড়াশোনা, কাজ, দায়িত্ব।
একসময় এসেপৌঁছলাম মেলবোর্নে।
প্রথম যে বছর পুজোয় বাড়ি যাওয়া হলো না, মন কিছুতেই মানতে চাইছিল না। ওখানে পুজো হবে, মা-বাবা থাকবেন, বন্ধুরা মণ্ডপে যাবে - আর আমি এত দূরে?
অফিসে ছুটি চেয়েছিলাম। কারণ শুনে ম্যানেজার হেসে বলেছিলেন, “এক-দু বছর পর অভ্যেস হয়ে যাবে।” খুব রাগ হয়েছিল। ছুটি না পাওয়ার জন্য,
আর কথাটার জন্যও। পুজোয় বাড়ি না যাওয়ার অভ্যেস হয় নাকি?
আজ অনেক দিন মেলবোর্নে আছি। অনেকগুলো পুজো কেটে গেছে।বাড়ি যাওয়া হয়নি। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গেও পুজোয় দেখা হয়নি। কাজ করেছি, সংসার সামলেছি, এখানকার জীবনে অভ্যস্ত হয়েছি।
তবু পুজো এলে মনটা এখনও বাড়ি ফেরে।
আর আমাদের ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে ভাবি, ওদের স্মৃতিতে কী থাকবে? আমরা গল্প শোনাতে পারি, ছবি দেখাতে পারি। কিন্তু মণ্ডপে নিজের একটা কাজ পাওয়ার আনন্দ, পুজোয় বন্ধুদের সঙ্গে দিন কাটানোর অপেক্ষা, দশমীতে কাউকে কিছু না বলেও একে অন্যের মন খারাপ বুঝে নেওয়া - এসব ওরা অনুভব করবে কী করে?
ওদেরও তো নিজের একটা পুজো চাই।
সেই ভাবনা থেকেই প্রশ্নটা এল -
আমি বাড়ি যেতে পারলাম না… কিন্তু মাকে কি এখানে আনা যায়না?
এই মেলবোর্নে?
আমাদের শৈশব হুবহু ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েদের স্মৃতি তৈরি করার সুযোগ তো দিতে পারি। এমন একটা জায়গা, যেখানে ওরা বন্ধু বানাবে, ভাষা শুনবে, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবে। ছোট ছোট কাজে হাত লাগিয়ে একদিন বলবে, “এটা আমাদের পুজো।”
এই ইচ্ছেটাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা গড়ে তুলেছি Aurora Bengali Association
হয়তো কোনও দিন পুজো শেষ হওয়ার সময় ওদেরও মন খারাপ হবে।হয়তো কেউ এসে জিজ্ঞেস করবে, “মাকে আর একটা দিন রাখা যায়না?” সেদিন তার পাশে বসে বলতে পারব, “জানিস, ছোটবেলায় আমিও ঠিক এই কথাটাই বলতাম।” তারপর একদিন ওরাও বড় হবে।হয়তো ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। পুজোর সময় বাড়ির জন্য মন কেমন করবে।
আমরা চাই, তখন ওদেরও একটা গল্প বলার থাকুক - “আমাদের ছোটবেলায় একটা পুজো হতো। মেলবোর্নে। আমরা সবাই মিলে করতাম। খুব আপন একটা পুজো।”
Aurora - A Ray of Hope
আমাদের স্মৃতি থেকে আমাদের ছেলেমেয়েদের নতুন গল্প শুরু হওয়ার একটুকরো আশার আলো।