06/11/2026
ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়েও যে আমাকে এতোটা বায়োলজি জানতে হবে, আমি কল্পনাও করিনি কোনদিন।
হ্যা, আমার উপর অত্যাচার করতে করতে কুয়েট ছাত্রলীগ আমাকে বায়োলজি শিখিয়ে ফেলেছিলো। শিখিয়েছিলো, কতটা অত্যাচারে কতটা ক্রিয়েটিনিন বাড়ে, অথবা কতটা ক্রিয়েটিনিন বাড়লে আপনাকে ডায়ালাইসিস করতে হয়।
অথচ আমি ভালো পারতাম কেমিস্ট্রি।
বাবা ছিলেন দিনমজুর। দুই ভাই বোনের ছোট্ট সংসার। পড়াশোনা করেছি পাবনার মাদ্রাসায়। দাখিল আর আলিম পাশ করার পর আর সবার মতো রংবেরঙের কোচিং করার সামর্থ্য আমার ছিলো না।
তবে বাবা আমাকে কোচিং এ ভর্তি করতে না পারলেও রাজশাহী পর্যন্ত পাঠাতে পেরেছিলেন। ওখানে রুয়েটের ভাইদের কাছে থেকে ম্যাথ আর ফিজিক্সে সাহায্য নিতে শুরু করি। আমার এই চেষ্টা আল্লাহ পাক কবুল করলেন। এডমিশন দিয়ে ভর্তি হলাম খুলনা প্রকৌশল এবং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইপিই ডিপার্টমেন্টে।
ইউনিভার্সিটি লাইফ নিয়ে আর দশটা ছেলের মতো আমারও অনেক স্বপ্ন ছিলো।
এবং সেসব স্বপ্ন সত্যিও হয়েছিলো সত্যি বলতে।
শুরুতেই বঙ্গবন্ধু হলে সিট পেয়ে যাই। বন্ধুদের সাথে হলের দিন রাতগুলো সুন্দর কেটে যেতে থাকে। আমার অবস্থা তখন অনেকটা, "এই পথ যদি না শেষ হয়" টাইপের।
তবে পথটা শেষ হলো।
যখন শেষ হওয়ার কথা ছিলো, তার অনেক আগেই শেষ হলো। কুয়েটের রঙিন স্বপ্ন আর রঙিন থাকলো না, বরং থার্ড সেমিস্টারে ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন এসে আমার জীবনে লন্ডভন্ড করে দিলো।
সেকেন্ড ইয়ার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একইসাথে কঠিন এবং রঙিন একটা বছর।
প্রথম বর্ষের উড়াউড়ি শেষ করে সেকেন্ড ইয়ার থেকেই আমাদের বাস্তবতার জমিনে নেমে আসতে হয়। ঘিরে ধরে হাজার কনফিউশন। কোনদিকে যাবো? বিসিএস নাকি কর্পোরেট? স্কলারশিপ নাকি শিক্ষকতা?
এই কনফারেন্স দূর করার জন্য খুলনাতে একটা কোচিং ছিলো। যেখানে আমাদের ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ভাইয়েরা ক্যারিয়ার পরামর্শ দিতেন, কার কোনদিকে যাওয়া উচিত।
তো একদিন ঐ কোচিং থেকে আমাদের কিছু ভাইকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তখন দৌলতপুর থানার ওসি ছিলেন এম আনোয়ার হোসেন।
থানায় নিয়ে সেই ভাইদের উপর নির্যাতন করা হয় যে আর কে কে এই কোচিং এর সাথে জড়িত। উনারা হয়তো চাপে পড়ে কিছু নাম বলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে সেই লিস্ট দিয়ে দেওয়া হয় কুয়েট ছাত্রলীগের হাতে।
অথচ বেআইনি কিছু সন্দেহ করলে পুলিশ নিজেই গ্রেফতার করতে পারতো। বাট ছাত্রলীগের হাতে দিয়ে বরং তাদের নির্যাতনের লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
২০১৭ সাল। শাহবাগ এক বছর পার হয়েছে। শিবির ধরা তখন ছাত্রলীগের কাছে উৎসবের মতো একটা ব্যাপার। সো, পুলিশের সেই লিস্ট নিয়ে কুয়েটের হলে হলে নেই রাত্রে উৎসব শুরু হয়ে গেল।
তারিখ ১ মে, দিবাগত রাত। মানে ক্যালেন্ডারের পাতায় ২ মে হয়ে গেছে। শহর ঘুমিয়ে গেছে, বাট ঘুমায়নি কুয়েট। বরং প্রতিটা হলে লিস্ট ধরে ধরে "শিবির" জড়ো করা হচ্ছে গেস্ট রুমে।
আনুমানিক রাত বারোটা একটার দিকে আমাকে হুট করে ঘুম থেকে তোলা হয়। তখনই প্রথম জানতে পারি, আমিও "শিবির", লিস্টে আমারও নাম আছে, আমাকেও এখন গেস্ট রুমে যেতে হবে।
ঘুম থেকে উঠে দেখি ছাত্রলীগের পদাধারী বেশ কিছু নেতারা আমার রুমে। তাদের মধ্যে ছিলো মেকানিক্যাল ০৮ ব্যাচের শাফায়াত হোসেন নয়ন, তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি। ছিলো তরিকুল ইসলাম তিলকও। আরো অনেকেই ছিলো।
ঘুম থেকে ডেকে তুলে আমাকে নেওয়া হলো বঙ্গবন্ধু হলের গেস্ট রুমে।
বঙ্গবন্ধু হলের গেস্ট রুমে ঢুকে দেখি "আসামি" শুধু আমি নই, বরং আসামী আরো ৬-৭ জন। আমাদের নিয়ে এখন কী করা হবে, সেই প্রশ্নটা করার সময় আমরা কেউই পায়নি, কারণ ঢোকার সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় মার।
কিছু বুঝে উঠার আগেই পানির পাইপ, স্ট্যাম্প, বেল্ট আর জিআই পাইপের মুহুর্মুর্হু আঘাতে আমি লুটিয়ে পড়ি। মানুষ যে মানুষকে এভাবে মারতে পারে, আমি সেদিনের আগে জানতাম না। মাঝেমধ্যেই মনে হচ্ছিলো, এরা কোন মানুষ না। এরা হলো চাবি দেওয়া রোবট। যাদের তৈরিই করা হয়েছে নির্দয়ভাবে মানুষের উপর অত্যাচার করার জন্য। তাদের চোখে আমি এক ফোঁটাও মায়া দেখিনি।
কথাবার্তা শুনে যেটুকু বুঝেছিলাম, তাদেরকে আমাদের শরীরের সবখানে পেটানোর অনুমতি উপর থেকে দেওয়া হয়েছিলো। শুধু মাথায় মারতে না করা হয়েছিলো।
তবে বেশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা করার কারণেই কিনা, নাইম ভাইয়ের মাথাতেও ওরা আঘাত করে বসে। মাথায় রডেল বাড়ি খেয়ে নাইম ভাই আমার সামনেই অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঐ মুহূর্তে মনে হয়েছিলো, আমিও আজ আর বেঁচে ফিরতে পারবো না।
ভালো কেমিস্ট্রি পারার জন্য আফসোস হচ্ছিলো খুব। মজুরের ছেলে ভালো কেমিস্ট্রি না পারলে তো আর এই স্বপ্নের ভার্সিটিতে আসা লাগতো না আমার!!
এক পর্যায়ে মার খেয়ে আমরা সবাই ফ্লোরে শুয়ে পড়ি। প্রায় ২০ দিন আমি ঠিক মতো হাঁটতে পর্যন্ত পারিনি। অবশ্য পাশের লালন শাহ হলের লুৎফর ভাইয়ের কপাল ছিলো আরো খারাপ। সেদিন মার খেয়ে উনার কিডনি ড্যামেজ হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন তাকে ডায়ালাইসিস করাতে হয়েছিলো।
যাহোক, সকালে ঐ অবস্থায় পুলিশ আমাদের থানায় তুলে নিয়ে যায়। বাট আমাদের শারীরিক অবস্থা জেলে দেওয়ার মতো না হওয়ায় উনারা আমাদের ফুলতলা উপজেলা কমপ্লেক্সে ভর্তি করে দেন। আমার নামে কেস ফাইল হয়। ২০ দিনের মতো আমরা কারাগারে ছিলাম। এখনও পর্যন্ত সেই কেস আমার দুঃস্বপ্ন হয়ে আমার জীবনে উপস্থিত আছে। আজও আমাকে ঢাকা থেকে খুলনা যেতে হয়, হাজিরা দিতে।
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি আর হলে যাই নাই।
মাত্র ২০ দিন আগেই হলে বসে মনে হচ্ছিলো, এই পথ যেন না শেষ হয়।
সেই ক্যাম্পাস লাইফ আমার জন্য জাহান্নাম হয়ে গেল। এমনকি ক্লাস আর পরীক্ষা দিতেও ভয় লাগতো। ক্যাম্পাস ছাত্রছাত্রীদের কাছে মায়ের মতো। আমার কাছে ছিলো যমের মতো।
যে আমি প্রথম দুই সেমিস্টারে ক্লাস মিস দিই নাই, সেই আমাকে এবার বসতে হলো ক্যালকুলেটর নিয়ে। গুনে গুনে ৬০% ক্লাসই করতাম। পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। সমস্যা হলো, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা ক্লাস ভিত্তিক না। ল্যাব আর প্রোজেক্ট ভিত্তিক। হলে না থাকার কারণে এসবের কিছুই করা হয়ে উঠেনি। দৌলতপুর থানা আর কুয়েট ছাত্রলীগের এক রাতের হঠকারিতার ফল তাই আমাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে জীবনভর।
তবে এতো সাবধান থাকার পরেও আমার নির্যাতিত হওয়ার ছোটগল্পটা রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মতো হয়ে গেল।
শেষ হয়েও হইলো না শেষ।
২০১৯ এর ২৫ শে মার্চ।
মামলা তখনও আছে। আছে হাজিরা দেওয়ার খড়্গও। বাট ঐদিন ছিলো আমার ফেয়ারওয়েল। ঘড়ি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, আর কয়েক ঘন্টা, তারপরেই এই জাহান্নাম থেকে মুক্তি।
কিন্তু বিধাতার চাওয়া ছিলো অন্যকিছু।
ভার্সিটির শেষ দিনেও আমাকে অনুষ্ঠান থেকে তুলে নেওয়া হলো। শুরু হলো মাইর। যেন জাহান্নামের দ্বাররক্ষী কুয়েট ছাত্রলীগও আমাদের বিদায়ী সংবর্ধনা দিচ্ছে, মারের মাধ্যমে। আমাকে সহ তিনজনকে তুলে নেওয়া হয়।
নিয়ে যাওয়া হলো ফজলুল হক হলের একটা রুমে। সেদিনও সেখানে ছিলো তিলক। সাথে ছিলো ১৫ ব্যাচের ফয়সাল, আরো কয়েকজন জুনিয়র। স্ট্যাম্প আর বাঁশ দিয়ে অকল্পনীয় পরিমাণ মারধোর করা হয়। এবার যেহেতু আমরা মানুষ কম, তাই মারও ভাগে পড়েছিলো বেশি।
ফেয়ারওয়েলের পর মা বাবার কাছে না, আমাকে যেতে হলো হাসপাতালে। এবারও ২০ দিনের ধাক্কা।
এবার হাসপাতালে শিখলাম বায়োলজি।
অত্যাচারের কারণে ক্রিয়েটিনিন লেভেল হয়ে গেছিলো ৬.৫। ৭ হলেই ডায়ালাইসিস করতে হয়। স্বাভাবিক মানুষের থাকে .৯ থেকে ১.২ এর মধ্যে।
কুয়েটে এসেছিলাম ইঞ্জিনিয়ারিং শিখতে। কুয়েট আমাকে বায়োলজি পর্যন্ত শিখাই দিলো। কুয়েটের এই অবদান আমি ভুলি কী করে?
আমি ভুললেও আমার শরীর ভুললো না। কিছুই খাইতে পারতাম না। এবারও আমাকে গ্রেফতার করা হলো। ১০ দিন থাকতে হলো জেলে।
ফেয়ারওয়েলে সবার কত সুন্দর সুন্দর স্মৃতি থাকে।
আমার ফেয়ারওয়েল স্মৃতি হয়ে থাকলো হাসপাতালের বেডের সাথে হ্যান্ডকাফ দিয়ে বেঁধে রাখা আমার হাত।
ইউনিভার্সিটির টিচারদের কাছে থেকে বাঁধা আসেনি, আবার হেল্পও পাইনি। ক্লাসমেট অনেকেই মিশতে ভয় পেতো। অবশ্য কারণও ছিলো। আমার মতো ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর সাথে সম্পর্ক রেখে কেই বা বিপদে পড়তে চাইবে?
তবে এলাকার অবস্থা ছিলো ভয়াবহ। আমার নামে পুলিশি কেস হওয়ায় আর বাসায় পুলিশ যাওয়ার কারণে পাড়ার লোকজনও আমাকে ভয়ঙ্কর কেউ ভাবতে শুরু করে।
যদিও পরে এলাকার লোকজন ভুল বুঝতে পেরে অনেক আফসোস করেছে আমার জন্য।
তবে আল্লাহ আমাকে খারাপ রাখেননি। ঢাকায় বেসরকারি একটা প্রতিষ্ঠানে জব করছি। ব্যস্ততাতেই কেটে যায় সময়। খুব একটা সময় থাকে না হাতে। এর মধ্যে সুযোগ পেলে মানুষকে রক্ত দেই। সামাজিক কাজ বলতে,এইটুকুই।
শুধু কুয়েট লাইফের কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠে।
মনে পড়ে, স্ট্যাম্প, হ্যান্ডকাফ, গেস্টরুম আর ফেয়ারওয়েল।
আমি ঠিক থাকতে পারি না। কে ই বা পারবে?
ক্যারিয়ার আমার হয়েছে ঠিকই, বাট আমার স্বপ্নের ইউনিভার্সিটি জীবনটাকে আর কোথায় ফেরত পাবো আমি?
ফেরত আমি চাইও না। শুধু চাই, আমার উপর জুলুম করা প্রত্যেকের কঠিন শাস্তি হোক। যাতে আর কাউকে আমার মতো কুয়েটকে জাহান্নাম না মনে করতে হয়, যেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে বাংলাদেশের আর কোন ছেলেকে কিডনির বায়োলজি পড়তে না হয়!!
শাহীনুজ্জামান
কুয়েট।
ফুটনোট: ভিকটিমের উপরে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা ও নির্যাতনের সময়ে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ‘সোচ্চার’ এর পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। তবে নির্যাতনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ভিক্টিমের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।
সম্ভাব্যশাস্তি: বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমানিত হলে নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ৩২৫ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদন্ড ও জরিমানা হতে পারে।