03/18/2026
আজ ২৮ রমজান।
মানে—আজ মাগরিবের পর থেকেই শুরু হবে ২৯ রমজানের রাত।
রমজানের শেষ বিজোড় রাত।
হয়তো এটাই আপনার এই বছরের শেষ শবে কদর-তালাশের রাত।
হয়তো এটাই সেই রাত, যেখানে একটা সিজদা, একটা কান্না, একটা দোয়া—আপনার বহু বছরের অন্ধকার মুছে দিতে পারে।
হয়তো এটাই সেই রাত, যেটাকে আপনি পরে মনে করে বলবেন—সেদিনই আমি সত্যি বদলে গিয়েছিলাম।
অনেকে ২৭ রমজানের পর একটু ঢিলে হয়ে যায়।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তো বলেননি—শুধু ২৭-এই খুঁজো।
তিনি বলেছেন—
“তোমরা লাইলাতুল কদরকে শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে খোঁজো।”
(সহীহ আল-বুখারি: ২০১৭, সহীহ মুসলিম: ১১৬৯)
তাই আজকের রাতকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আজকের পোস্টে একসাথে দিলাম—
১০টি দোয়া
১০টি জিকির
আল্লাহর ১০টি সুন্দর নাম
আজ সারাদিনে এগুলো দেখে নিন।
যা পারেন মুখস্থ করুন।
যা পারেন লিখে রাখুন।
তারপর আজ রাতে সিজদায়, জিকিরে, কান্নায়, দোয়ায়—একটি একটি করে পড়ুন।
হয়তো আজকের রাতের জন্য এটাই হবে আপনার পূর্ণ গাইড।
---
আজ রাতের ১০টি দোয়া
১) শবে কদরের মূল দোয়া
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা‘ফু আন্না।
অর্থ:
হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসো, আমাকে ক্ষমা করো।
(তিরমিজি: ৩৫১৩)
এটাই আজ রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া।
২) সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَىٰ عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া‘দিকা মাসতাতা‘তু, আউযু বিকা মিন শাররি মা সানা‘তু, আবুউ লাকা বিনি‘মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবুউ বিযামবি, ফাগফিরলি ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয জুনুবা ইল্লা আন্তা।
অর্থ:
হে আল্লাহ, তুমি আমার রব, তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আমি তোমার বান্দা। আমি তোমার নিয়ামত স্বীকার করছি, আমার গুনাহও স্বীকার করছি। তাই আমাকে ক্ষমা করো।
(সহীহ আল-বুখারি: ৬৩০৬)
৩) দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দোয়া
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ:
রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া ক্বিনা আযাবান নার।
অর্থ:
হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দাও, আখিরাতেও কল্যাণ দাও, এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।
(সূরা বাকারা: ২০১)
৪) হিদায়াত ও তাকওয়ার দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَىٰ وَالتُّقَىٰ وَالْعَفَافَ وَالْغِنَىٰ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা, ওয়াত্তুকা, ওয়াল আফাফা, ওয়াল গিনা।
অর্থ:
হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা এবং অমুখাপেক্ষিতা চাই।
(সহীহ মুসলিম: ২৭২১)
৫) কবর ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয়ের দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন আযাবিল ক্ববর, ওয়া মিন আযাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।
অর্থ:
হে আল্লাহ, আমি তোমার আশ্রয় চাই কবরের আযাব থেকে, জাহান্নামের আযাব থেকে, জীবন-মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে।
(সহীহ আল-বুখারি: ১৩৭৭, সহীহ মুসলিম: ৫৮৮)
৬) আফিয়াহর দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফিয়াতা ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ।
অর্থ:
হে আল্লাহ, আমি দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা, সুস্থতা ও কল্যাণ চাই।
(ইবনে মাজাহ: ৩৮৭১)
৭) ঈমানের উপর অটল থাকার দোয়া
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَىٰ دِينِكَ
উচ্চারণ:
ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব, সাব্বিত ক্বালবি আলা দ্বীনিক।
অর্থ:
হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর অটল রাখো।
(তিরমিজি: ২১৪০)
৮) দোয়া ইউনুস
لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ:
লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনায যালিমিন।
অর্থ:
তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।
(সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৭)
৯) মা-বাবার জন্য দোয়া
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ:
রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।
অর্থ:
হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা আমাকে ছোটবেলায় লালন-পালন করেছেন।
(সূরা আল-ইসরা: ২৪)
১০) জান্নাতুল ফিরদাউসের দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْفِرْدَوْسَ الْأَعْلَىٰ مِنَ الْجَنَّةِ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল ফিরদাউসাল আ‘লা মিনাল জান্নাহ।
অর্থ:
হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে জান্নাতের সর্বোচ্চ ফিরদাউস চাই।
(সহীহ আল-বুখারি: ২৭৯০)
---
আজ রাতের ১০টি জিকির
১) أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।
২) سُبْحَانَ اللَّهِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহ
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র।
৩) الْحَمْدُ لِلَّهِ
উচ্চারণ: আলহামদুলিল্লাহ
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।
৪) اللَّهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার
অর্থ: আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।
৫) لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
৬) لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
উচ্চারণ: লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ
অর্থ: আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।
৭) سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁর।
৮) سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহিল আজিম
অর্থ: মহান আল্লাহ পবিত্র।
৯) حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
উচ্চারণ: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল
অর্থ: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।
১০) اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ
অর্থ: হে আল্লাহ, মুহাম্মদ ﷺ–এর উপর রহমত নাজিল করুন।
---
আজ রাতে আল্লাহর ১০টি নাম ধরে ডাকুন
১) ইয়া আফুউ
অর্থ: হে পরম ক্ষমাকারী
কখন ডাকবেন: গুনাহ মাফ চাইতে।
২) ইয়া গাফফার
অর্থ: হে বারবার ক্ষমাকারী
কখন ডাকবেন: বারবার একই ভুলের জন্য তওবা করতে।
৩) ইয়া রহমান
অর্থ: হে পরম দয়ালু
কখন ডাকবেন: রহমত ও নরম অন্তর চাইতে।
৪) ইয়া রহিম
অর্থ: হে অশেষ করুণাময়
কখন ডাকবেন: বিশেষ রহমত ও নৈকট্য চাইতে।
৫) ইয়া ওয়াহহাব
অর্থ: হে অবারিত দানকারী
কখন ডাকবেন: যা আপনার হাতে নেই, তা চাইতে।
৬) ইয়া রাযযাক
অর্থ: হে রিযিকদাতা
কখন ডাকবেন: হালাল ও বরকতময় রিযিক চাইতে।
৭) ইয়া শাফি
অর্থ: হে আরোগ্যদাতা
কখন ডাকবেন: শরীর, মন ও পরিবারের শিফা চাইতে।
৮) ইয়া হাদি
অর্থ: হে পথপ্রদর্শক
কখন ডাকবেন: হিদায়াত, সন্তানদের হিদায়াত, ঘরের হিদায়াত চাইতে।
৯) ইয়া কারীম
অর্থ: হে মহাদানশীল
কখন ডাকবেন: বড় আশা নিয়ে, লজ্জা না করে চাইতে।
১০) ইয়া মুজীব
অর্থ: হে দোয়া কবুলকারী
কখন ডাকবেন: যখন মনে হবে—আজ আমার ডাক তুমি ফিরিয়ে দিও না।
---
সব একসাথে না পারলেও একটা সহজ নিয়ম ধরুন।
দুই রাকাত নামাজ পড়ুন।
সিজদায় যান।
একটা দোয়া পড়ুন।
তারপর একটা জিকির করুন।
তারপর আল্লাহর একটা নাম ধরে ডাকুন।
যেমন—
ইয়া আফুউ — আমাকে মাফ করো।
ইয়া রহমান — আমাকে রহমতে ঢেকে নাও।
ইয়া মুজীব — আজ আমার দোয়া কবুল করো।
ইয়া রাযযাক — আমার জন্য হালাল রিযিক লিখে দাও।
ইয়া শাফি — আমার কষ্ট দূর করো।
এইভাবে রাতটাকে জীবন্ত করে তুলুন।
---
মনে রাখবেন
আজ রাত শুধু জেগে থাকলেই হবে না।
আজ রাতকে গুছিয়ে কাটাতে হবে।
কী পড়বেন—জানতে হবে।
কী চাইবেন—জানতে হবে।
কী নামে আল্লাহকে ডাকবেন—সেটাও ঠিক করতে হবে।
আজকের রাত হতে পারে আপনার এই রমজানের শেষ বিজোড় রাত।
এটাই হতে পারে আপনার শেষ কদর-তালাশের রাত।
---
শেষ কথা
আজ রাত আমি নষ্ট করবো না।
হয়তো আজ রাতই শবে কদর।
হয়তো আজ রাতেই আপনার বহু বছরের গুনাহ মুছে যাবে।
হয়তো আজ রাতেই আপনার চোখের পানি কবুল হবে।
হয়তো আজ রাতেই আল্লাহ আপনার ভাগ্যে নতুন কিছু লিখে দেবেন।
তাই আজ রাতের আগেই প্রস্তুত হন।
এই ১০টি দোয়া, ১০টি জিকির, ১০টি নাম সঙ্গে রাখুন।
রাতে সিজদায় যান।
কাঁদুন।
চান।
আল্লাহকে ডাকুন।
কারণ তাঁর দরজা এখনো খোলা আছে।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে আজ রাতের পূর্ণ বরকত নসিব করুন, আপনার সব গুনাহ মাফ করুন, এবং আপনাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।
— সংগৃহীত।