30/08/2023
শ্রী বলরাম জয়ন্তী ২০২৩
শ্রীবলরাম আবির্ভাব তিথি
কংসের কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের ছয়টি সন্তান পর পর জন্মগ্রহণ করল এবং তাদের প্রত্যেককেই কংস নির্দয়ভাবে তাদের চোখের সামনে হত্যা করল। কিন্তু সপ্তম সন্তান দৈবভাবে আবির্ভূত হয়েছিল, ভগবানের প্রথম প্রকাশ সঙ্কর্ষণ দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হলেন। দেবকীর গর্ভে বলরামের আবির্ভূত হওয়ার সাথে সাথে দেবকীকে অত্যন্ত জ্যোতির্ময় দেখাচ্ছিল। এ সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যোগমায়াকে ডাকলেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেন, “আমি আমার প্রকাশ, সকল অবতারের প্রথম অবতার সুন্দর শিশুরূপী বলরামকে দেবকীর গর্ভ থেকে রোহিনীর গর্ভে স্থানান্তর করতে চাই।”
বসুদেবের স্ত্রীগণের মধ্যে দেবকী এবং রোহিনী অন্যতম। ঐসময় কংস বসুদেব এবং দেবকীকে বন্দি করে রেখেছিল। রোহিনী বসুদেবের অন্তরঙ্গ বন্ধু নন্দ মহারাজের গৃহে গোকুলে বাস করত এবং ব্রজবাসীদের সুরক্ষায় ছিলেন। যোগমায়া এই শিশুটিকে রোহিনীর গর্ভে স্থানান্তর করল। শ্রাবণ মাসের পূর্ণ চন্দ্রালোকিত রাতে গোকুলে এই সুন্দর শিশুটির জন্ম হলো; তিনিই হলেন শ্রীবলরাম।
যখন আমরা বিষ্ণুতত্ত্বের কথা বলি। ভাগবত, ব্রহ্মসংহিতা, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে বর্ণনা করা হয়েছে-
কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্। -কৃষ্ণই স্বয়ং ভগবান।
গোবিন্দমাদি পুরুষং তমহং ভজামি। -গোবিন্দই আদি পুরুষ।
যখন কৃষ্ণ গোলক বৃন্দাবনে চিন্ময় লীলাবিলাস করতে চান, প্রথমে তিনি নিজেকে তাঁর বৈভব প্রকাশ বলদেব রূপে প্রকাশ করেন। বলদেব ভগবানের প্রকৃত প্রতিনিধি। তিনি কৃষ্ণের সেকবরূপে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণই। কীভাবে তিনি কৃষ্ণের সেবা করেন?
বলরাম ৫টি রসে কৃষ্ণের সেবা করেন
বলরাম অনন্য। বলরামের মতো আর কেউ নেই যিনি শ্রীকৃষ্ণের সাথে অন্তরঙ্গভাবে ৫টি রসে অংশগ্রহণ করেন। শান্ত রস হিসেবে বলরামই তাঁর শক্তির মাধ্যমে গোকুল বৃন্দাবনে সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে বিস্তার করেছেন।
গোলকধাম বলরামের শক্তিরই প্রকাশ। এটা এমন একটি স্থান যেখানে ভগাবনের প্রতি ভক্তিপ্লূত সেবা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত। বলরাম কৃষ্ণের মুকুট, বাঁশি, পাদুকা, পোশাক এবং কৃষ্ণের সমস্ত অলঙ্কারের মাধ্যমে তাঁর প্রকাশ ঘটান। শ্রীকৃষ্ণকে সেবা আর আনন্দ দেওয়ার জন্য তিনি এভাবে আবির্ভূত হন এবং তাঁর সুন্দর সুসজ্জিত রূপের প্রতি অন্য সকল জীবদের আকর্ষণ করার জন্য তাঁকে সহায়তা করেন বলরাম।
কৃষ্ণের সবই আকর্ষণীয়। সবার হৃদয়কে আকর্ষণ করে কৃষ্ণ সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান। তাই যখন বলরাম নিজেকে কৃষ্ণের সুন্দর মুকুট, সুন্দর বাঁশি, সুন্দর অলঙ্কার, সোনালী উজ্জ্বল রঙ্গিন ধুতি হিসেবে প্রকাশ করেন, তখন তিনি কৃষ্ণকে সজ্জিত করেন যাতে তিনি আরো বেশি আকর্ষণীয় এবং সকলের হৃদয় জয় করতে পারেন। এভাবেই বলরাম শান্ত রসে প্রকাশিত হন।
বলরাম সর্বদাই শ্রীকৃষ্ণকে আনন্দ দেওয়ার জন্য ভৃতের মনোভাব নিয়ে সেবা করেন।
সখ্য রসে, তিনি কৃষ্ণের বন্ধুরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। তাঁরা মল্লযুদ্ধ করেছেন একত্রে, একত্রে খেলা করেছেন, একত্রে নেচেছেন, একত্রে যুদ্ধ করেছেন। কেন? শুধু শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করার জন্য। শুধু ভগবানের সেবা করার জন্য। আবার, কৃষ্ণের জেষ্ঠ্য ভ্রাতা হিসেবে তিনি বাৎসল্য রসেও নিজেকে যুক্ত করেছেন। তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, “কৃষ্ণ অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি যাও, কৃষ্ণ, গোপাল আজ তোমার জন্মদিন; তুমি বাইরে যেতে এবং খেলতে পারবে না। তোমাকে অবশ্যই বাড়িতে থাকতে হবে।” যখন বনে কোনো বিপদ দেখা যাচ্ছিল, তখন তিনি পিতামাতার মতো শ্রীবলরামেরসুরক্ষায় ছিলেন।
মধুর রস, দাম্পত্য ভালোবাসায় বলরামকে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না। কেননা গোপীদের সাথে কৃষ্ণের নৃত্যরত অবস্থায় বলরাম দাদা হিসেবে সেখানে গেলে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তাই তিনি নিজেকে অনঙ্গমঞ্জরী হিসেবে প্রকাশ করেন।
বলরাম কতই না চতুর। কেননা রাধা-কৃষ্ণের মধুর রসই ভালোবাসার এই সম্পর্ক বিনিময়ের চরম বিন্দু।
যেহেতু রাধারাণীর সাথে কৃষ্ণের একান্ত সম্পর্ক ছিল; সেজন্য রাধারাণী বলরামকে ভয় পেতেন। আবার, বলরাম যেহেতু রাধারাণীর সাথে কৃষ্ণের প্রকৃত সম্পর্কের কথা জানতেন, তাই বলরামও রাধারাণীকে ভয় পেতেন। কিন্তু বলরাম সর্বদাই রাধা কৃষ্ণের মিলনে সাহায্য করতে চাইতেন। এজন্য তিনি রাধারাণীর অনুজ অনঙ্গমঞ্জরী হিসেবে প্রকাশিত হন। তিনি তাঁর সাথে একই গৃহে বাস করতেন। তিনি রাধারাণীর অত্যন্ত অন্তরঙ্গ বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি রাধারাণীর সাথে খেলা করতেন এবং কৃষ্ণের সাথে তার দেখা করার সুন্দর ব্যবস্থা করে দিতেন।
আর এভাবেই বলারম কৃষ্ণকে পাঁচটি রসে সেবা প্রদান করেন। এজন্যই ভগবান বলরাম অসাধারণ।
বলরাম সকল অবতারের উৎস
গোলক বৃন্দাবনে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কৃষ্ণ বলরামরূপে প্রকাশিত হন। বলরাম থেকে সঙ্কর্ষণ, অনিরুদ্ধ, প্রদ্যুম্ন এবং বাসুদেবের প্রকাশ হয়। এই চতুর্ব্যূহ থেকে বৈকুণ্ঠাধিপতি নারায়ণের প্রকাশ হয়। এই রূপ থেকে দ্বিতীয় বার প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ, বাসুদেব এবং সংকর্ষণের সৃষ্টি হলো।
এই সংকর্ষণ থেকে আদি শঙ্কর যিনি মূল শিব। বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভু । এই শিব সকল বৈষ্ণবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, বৈষ্ণব চূড়ামণি। কেননা তিনি মূল বলরামের প্রকাশ এবং সেই সঙ্কর্ষণ মহাবিষ্ণু হিসেবে প্রকাশিত হন। মহাবিষ্ণু থেকে ব্রহ্মা-সমূহের সৃষ্টি। প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে তিনি গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রবেশ করেন। তারপর তিনি প্রতিটি জীবের হৃদয়ে ক্ষীরদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রবেশ করেন। পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের অবতার- মৎসাবতার, বরাহবতার, নৃসিংহাবতার, রামাবতার। তারা সকলেই ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুর প্রকাশ। তাই এভাবে আমরা বুঝতে পারি যে, বররাম হলেন সকল অবতারের উৎস। তিনি সর্বদা মহাযোগীর মনোভাবে থাকেন। তিনি ভগবানের প্রতিনিধি। তাকে মূল গুরু বলে বিবেচনা করা হয়।
বলরামের লাঙ্গলে পৃথিবী কর্ষণ করে– গুরু আমাদের হৃদয় কর্ষণ করে
কেন বলরাম লাঙ্গল বহন করে? আমরা লাঙ্গল দিয়ে কি করি? বীজ জন্মানোর জন্য জমি তৈরি করি। আদিগুরুরূপে বলরাম তাঁর লাঙ্গল দিয়ে আমাদের হৃদয়রূপ ক্ষেত্রকে কর্ষণ করেন। তাঁর বাণীই লাঙ্গলরূপে আমাদের হৃদয়রূপ ভূমিকে উপযুক্ত করে যাতে কৃষ্ণভক্তিরূপ বীজ সেখানে অঙ্কুর গজাতে পারে এবং কৃষ্ণের বাঁশির প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে।
আমরা জানি যে, যখন জমির ময়লা শুকিয়ে যায়, তখন তা কর্ষণ করতে হয়। আর কর্ষণ করা পৃথিবীর জন্য খুব একটা আন্দদায়ক নয়। তবু জমি কর্ষণ করতে হয়। বার বার জমি কর্ষিত হয়, তাই গুরুর উদ্দেশ্য যতক্ষণ না পর্যন্ত হৃদয় কোমল হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত কর্ষণ চালিয়ে যাওয়া। সকল বাধা, মিথ্যা অহংকার, গর্ব, মোহ, কাম, ক্রোধ, লোভ অপসারিত হওয়ার জন্য বার বার কর্ষণ করতে হয়। ভালোবাসার বীজ যাতে জন্মাতে পারে, সেজন্য আমাদের হৃদয়কে কোমল করতে হয়। এজন্য বলরামের লাঙ্গল। তিনি গুরু হিসেবে আধ্যাত্মিক জীবনের সমস্ত বাধা অপসারিত করেন।
বলরাম সঙ্কর্ষণ, শেষনাগ হিসেবে আবির্ভূত হয়ে ভগবানের শয্যা হন। লক্ষ্মী দেবী তাঁর পদসেবা করছে এবং বলরাম
সর্বোৎকৃষ্ট গুরু সর্বোৎকৃষ্ট সেবক
বলা হয় যে, যিনি সর্বোৎকৃষ্ট সেবক, তিনিই সর্বোৎকৃষ্ট গুরু। গুরু নিজেকে গুরু মনে করেন না। গুরু নিজেকে সেবক হিসেবে দেখেন। এমনকি ভগবানও নিজেকে সেবক মনে করেন। কৃষ্ণ আনন্দময় । কী সেই আনন্দ? তার ভক্তদের আনন্দ দেওয়া । তাই আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে সেবক, কউেই গুরু নয়। কিন্তু কীভাবে সেবা করতে হয় তা-ই শিক্ষা দেয় বলরাম তত্ত্ব।
কৃষ্ণ এবং তাঁর ভক্তদের আনন্দের রহস্যময় পথ
শ্রীল প্রভুপাদ বলতেন, বল মানে শক্তি; পারমার্থিক শক্তি, দৈহিক নয়; আর রাম মানে যিনি আনন্দ আস্বাদন করেন। তাই শ্রী বলরামের কাছে আমাদের আধ্যাত্মিক পথের বাধা-বিঘ্ন দুর করার শক্তি, বৈষ্ণব, গুরু এবং শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের সেবা করার শক্তি প্রার্থনা করা উচিত।