24/07/2025
গল্পের নাম: বিভ্রান্তির বেড়াজাল
রোশনারা বেগম—চোখে মুখে সবসময় অভিযোগের ছায়া। যেন সারা দুনিয়া তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কারও সফলতা তাকে শান্তি দেয় না, নিজের ব্যর্থতা কখনোই নিজের বলে মনে করেন না। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি এমন এক অভিশাপ হয়ে উঠেছিলেন, যা শুধু তার নিজের নয়, তার পরিবারেরও স্বপ্ন ধ্বংস করে দিয়েছে।
মনোয়ার সাহেব, তার স্বামী, ছিলেন একজন নিরব, স্থিতিশীল মানুষ। সংসারের চাকা তিনি নিঃশব্দে ঘুরিয়ে যেতেন। ছেলেটি, নাহিয়ান, তার একমাত্র গর্ব—মেধাবী, ভদ্র, স্বপ্ন দেখা ছেলে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেন ছিল তার জীবনের প্রথম সাফল্যের সিঁড়ি।
কিন্তু সেই সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়েছিল রোশনারা, হাতে এক বোতল সন্দেহের বিষ।
দুই বছর পার হতে না হতেই এক সন্ধ্যায় ঘরের বাতাস ভারি হয়ে উঠল।
রোশনারা বললেন, "এই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে কী হবে? চাকরি নাই! ডিমান্ড নাই! তোকে আমি বলছিলাম, বায়োটেকনোলজি পড়, বিদেশে যায়গা আছে। তোর বাবা কিছু বোঝে না!"
নাহিয়ান তখন ভেতরে ভেতরে দ্বিধায় কুঁকড়ে গেল। এতদিনের ভালো লাগা, পরিশ্রম, লক্ষ্য—সব কেমন করে ভেঙে পড়তে লাগল। মা তো ভুল বলেন না! কিন্তু বাবা তো বলেন, ঠিক পথে আছি!
সেই দ্বন্দ্বে শেষমেশ নাহিয়ান বিষয় পরিবর্তনের চিন্তা করল। কিন্তু ততদিনে সময় চলে গেছে অনেক দূর। সেমিস্টার ড্রপ, মানসিক অস্থিরতা, একটানা চাপ তাকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিল।
মজার বিষয়, এক বছর পর রোশনারা নিজেই বললেন,
"আরে আমি তো বলি নাই বিষয় পাল্টাতে! তুই ভুল বুঝছিস। তোর বাবা-ই সব গণ্ডগোল করতেছে। ও চায় না আমি বা তুই সফল হই। সব ওর খেলা!"
নাহিয়ান চোখ তুলে তাকাল, স্তব্ধ। কিছু বলতে চাইল, কিন্তু বুকের ভেতর গুমোট কষ্টটা শব্দ হতে পারল না।
এটা শুধু ছেলের ক্ষেত্রেই নয়।
একবার বিউটি পার্লার ব্যবসা শুরু করলেন। দোকান সাজানো শেষ, গ্রাহক আসতে শুরু করেছে। হঠাৎ এক সকালে চোখ মুখ কুঁচকে বললেন,
"না, এই ব্যবসায় টাকা নাই। বুটিক খুলব!"
বুটিকে কাপড় কিনে আনলেন, আবার বললেন,
"এত ঝামেলা! বরং ফ্রোজেন ফুড করব। হেলদি আর চলতি পণ্য।"
সব ব্যবসায় একই গল্প—শুরু, মাঝপথে মত পরিবর্তন, এবং দোষ চাপানো অন্যের ঘাড়ে।
প্রতিবারই তিনি বলতেন,
"আমি তো বুঝছিলাম, কিন্তু অমুক শোনে নাই। আমার কপালেই সমস্যা। ওরা চায় না আমি কিছু করি। ওরা চায় আমি ব্যর্থ হই।"
মানুষ তাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী—সবাই তার নালিশ আর দোষারোপে ক্লান্ত।
একদিন নাহিয়ান, অনেক কষ্ট করে একটা ছোট চাকরি পেয়ে, মাকে ডেকে বলল—
"মা, তুমি যদি একবার নিজের ভুলগুলা মেনে নিতে শিখতে, তাহলে হয়তো আজ আমরা অন্য রকম একটা জীবন পেতাম। তুমি যদি একবার স্থির থাকতে পারতে, তাহলে আমি হয়তো একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার হতে পারতাম।"
রোশনারা চুপ। চোখের কোণে একটা ক্ষীণ জলরেখা, কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা গর্ব আর প্রতিরোধের ভঙ্গি।
"আমি তো সবসময় তোমার ভালো চেয়েছিলাম। কিন্তু এই বাড়ির কেউ চায় না আমি কিছু করি। তারা শুধু আমার স্বপ্ন ভেঙেছে।"
নাহিয়ান মাথা নিচু করে উঠে গেল। আর কিছু বলল না। এবার সে জানে, কিছু মানুষ কখনোই তাদের ভুলের আয়নায় নিজেকে দেখবে না। তারা কেবল চক্রের মতো ঘুরে ঘুরে দোষ ছুঁড়ে দেবে চারদিকে।