09/06/2026
শব্দ তাণ্ডব ও কিছু কথা
1. সমস্যার চিত্র
বিগত কয়েক বছর ধরেই আমরা দেখছি ‘শব্দ তাণ্ডব’। DJ বক্সের তীব্র আওয়াজে মেতে উঠছে যুবসমাজের একাংশ। যদিও মোট জনসংখ্যার মাত্র 5-10% এই কাজে যুক্ত, তাদের কারণে ভুগতে হচ্ছে বাকি 90% মানুষ ও প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীদেরকে।
মানুষ নিজেকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মনে করে। অথচ সেই শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে গিয়েই সে বারবার প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে, পরিবেশকে দূষিত করছে।
2. আনন্দ না অত্যাচার?
এই বিশেষ গোষ্ঠীর যুক্তি— “আমরা আনন্দ করার জন্য DJ বাজাই”। প্রশ্ন হল, কিসের আনন্দ?
যে আনন্দে প্রতিবেশীর ঘুম নষ্ট হয়, অসুস্থ মানুষের কষ্ট বাড়ে, বয়স্ক ও শিশুরা আতঙ্কিত হয়— সেটা কি আদৌ আনন্দ?
যে আনন্দে পাখিরা বাসা ছাড়ে, কুকুর-বিড়াল মৃত্যুর মুখে পড়ে, সেটা কি মানসিক সুস্থতার পরিচয়?
3. ‘পেশা’ বনাম ‘আইন’
অনেকে বলেন, “এই DJ বাজানোর সাথে অনেক মানুষের পেশা জড়িত। এটা বন্ধ হলে তাদের পরিবার চলবে কী করে?”
ভারতীয় Noise Pollution (Regulation and Control) Rules, 2000 অনুযায়ী, প্রকাশ্যে উচ্চশব্দের যন্ত্র ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ। বিশেষ করে রাত 10টার পর আবাসিক এলাকায় 45 dB-এর বেশি শব্দ করা যায় না।
আইনবিরোধী কোনো কাজ যদি কারও পেশা হয়, তাহলে কি সেটাকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখা যায়? কেউ যদি বলে “চোরাচালান আমার পেশা, এতে আমার সংসার চলে”— তাহলে কি আমরা তাকে ছাড় দেব? আইন সবার জন্য সমান।
4. ধর্মের নামে শব্দদূষণ
পুজো বা উৎসবের সময় DJ-বক্সের বিরোধিতা করলেই অনেকে বলেন, “আপনি ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলছেন”। না, আমি ধর্মের বিরুদ্ধে নই। আমি ধর্মকে ঢাল করে অনৈতিক কাজ করার বিরুদ্ধে।
ভেবে দেখুন, যদি উৎসবে DJ, নেশা, উগ্র বিনোদন বন্ধ করে দেওয়া হয়— তাহলে যুবসমাজের এই অংশটা কি আদৌ ধর্ম মানবে? তার মানে তারা ধর্ম নয়, শব্দ আর নেশাটাকেই ভালোবাসে।
ইতিহাস বলছে, ধর্মকে ব্যবহার করে এক শ্রেণির মানুষ বরাবর সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়েছে। আজও সেই ধারাই চলছে। অথচ উন্নত দেশগুলো ধর্মের নামে ভোট করে না। তারা প্রাধান্য দেয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে।
5. বিজ্ঞান, কুসংস্কার ও আমাদের দায়
কেউ কেউ বলেন, “বিজ্ঞান যেখানে শেষ, ধর্ম সেখান থেকে শুরু”। এটা ভুল। বিজ্ঞান প্রতিটি ঘটনার যুক্তি খোঁজে। আজ ব্যাখ্যা নেই মানে কালও থাকবে না— এমন নয়।
“অমুক বিজ্ঞানীও তো পুজো করেন”— এই যুক্তিও ধোপে টেকে না। ব্যক্তিগত বিশ্বাস আর বিজ্ঞান এক জিনিস নয়। বংশ পরম্পরায় বয়ে চলা কুসংস্কারই আমাদের পিছিয়ে রাখছে। এই কুসংস্কারই মানুষকে বিশ্বাস করায় যে, মানুষই ভগবানের ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ করে।
সংকটে কোনো ধর্ম নেই, সংকটে আছে পৃথিবী। প্রতি মুহূর্তে দূষিত হচ্ছে প্রকৃতি। এই লড়াই শুধু সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়— এই লড়াই রাষ্ট্র, মুখোশধারী নেতা আর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেও।
উপসংহার
ধর্মের বেড়াজাল একদিনে ভাঙবে না। কারণ এই তো কুসংস্কার কে সরাতে গেলে চাই প্রকৃত শিক্ষা। বর্তমানে কোন সরকার চায় না মানুষ শিক্ষিত হোক । কিন্তু চেষ্টা জারি থাকবে। তেমনি চেষ্টা থাকবে শব্দ তাণ্ডবের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার।
পৃথিবীর আর কোনো প্রাণী বিনোদনের নামে নিজের বাসস্থান ধ্বংস করে না। বিজ্ঞান আমাদের জীবন সুন্দর করেছে, আবার বিজ্ঞানের অপব্যবহারেই আমরা পৃথিবী ধ্বংস করছি।
ক্ষণিকের আনন্দের জন্য যদি বয়স্ক, শিশু বা অন্য প্রাণীর কথা না ভাবি, তাহলে আমরা ‘সর্বশ্রেষ্ঠ জীব’— এই দাবি করার অধিকারটাই হারিয়ে ফেলি।