01/11/2025
স্যার !গ্যাসের সূর্যমুখী ওষুধ লিখে দেবেন। মাথার পিছনে দাঁড়িয়ে কোন এক ভদ্রমহিলা এই কথাটা বারবার বলছেন। চেয়ারের পিছনেই দাঁড়িয়ে আছেন, চাইলেই ঘুরে দেখতে পারি কে বলছেন এবং কেনই বা বলছেন? কিন্তু ঘুরতে ইচ্ছে করছে না।সামনে বসা মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক,গায়ের রং শ্যামবর্ণ , মাথার অধিকাংশ স্থান ফাঁকা,চারিপাশ জুড়ে অল্প বিস্তর চুল বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ; শেষ ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরে স্টেশনে নামলে যেমন হাতেগোনা কয়েকজন লোক,চেনা ভিখারিনী স্টেশন চত্বরে এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে ঠিক সেরকমই। ভদ্রলোকের গলায় তুলসির মালা, বাড়ি মেদিনীপুর,প্রত্যন্ত গ্রামে।তার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দে মেদিনীপুরের মাটির গন্ধ লেগে আছে ,যে মাটিতে ফোটে অঘ্রানে টুকটুকে হলুদ সর্ষে ফুল।
ভদ্রলোক নিশ্চয় উঠেছেন কাকভোরে, বাড়ি থেকে প্রস্তুত হয়ে স্বামী স্ত্রী দুজনে বের হয়েছেন, স্টেশন পৌঁছে হয়তো পরিচিত দোকানে সাইকেল রেখে আপ ডাউন রিটার্ন টিকিট কেটেছেন। রোগি বা রোগিনীর মুখ দেখে কত অবান্তর কথা সব মনে পড়ে ।
—বলুন কি সমস্যা? কেমন আছেন?
“ডাক্তার বাবু গ্যাস তো কুমছে না । পেটের ব্যথাটা দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে।”
—আচ্ছা ,যে রিপোর্ট টা করতে দিয়েছিলাম সেটা করেছেন?
“হ্যাঁ” কড়মড় শব্দে গোলাপি প্লাস্টিক থেকে বেরিয়ে এল একটা রিপোর্ট ।
—এটা তো সেই গলার ভিতরে পাইপ ঢুকিয়ে পরীক্ষার রিপোর্ট। তো এতদিন পর এলেন?
“ স্যার মাঝে পুজোর জন্যে সব বন্ধ ,আউটডোর বন্ধ থাকবে ভেবে আসিনি“
—আপনার রিপোর্টে একটু সমস্যা আছে বুঝলেন
"কি সমস্যা ডাক্তারবাবু ? ভয়ের কিছু? "
—আপনার পাকস্থলীতে ঘা ধরা পড়েছে। এটাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে গ্যাস্ট্রিক আলসার।
"বছর পাঁচেক আগে আমার পেটে ঘা হয়েছিলো, আমি একজন গ্যাসের ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। সেরেও গেছিল।
ইশ! আবার হয়ে গেল... " ( তার প্রচ্ছন্ন হাসিমাখা মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হল )
—আচ্ছা শুনুন এত চিন্তার কিছু নেই, আপনাকে একটা ওষুধ দিচ্ছি, এটা দিনে দুবার করে খাবেন ;টানা দুসপ্তাহ।
—আর খাবার দাবারের বিষয়ে যা যা বললাম একটু মাথায় রাখবেন,কেমন ।
ভদ্রলোকের স্ত্রী আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন । ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝিলাম ইনিই সেই নেপথ্যচারিণী,কিয়ৎক্ষন আগেই যার উচ্চারিত শব্দমালা আমার কর্ণকুহরে সজোরে আঘাত করিতেছিল " ডাক্তারবাবু আগে ওকে চা খেতে মানা করে দিন।কাজে যাওয়ার আগে বড় গ্লাসে করে হাঁড়ি হাঁড়ি চা খায়। আমি মানা করলেও শোনে না"
আমার ইচ্ছা করছিল ভদ্রলোককে বলতে ,দেখুন মশাই আপনি একসাথে দুটো ভুল করেছেন ,প্রথমত ,হাঁড়ি হাঁড়ি চা খাওয়া ঠিক না মানে আমি খাই ঠিক আছে ,কিন্তু আপনি কেন খাবেন?। দ্বিতীয়ত ,বউয়ের কথা অমান্য করা একেবারেই ঠিক নয় ,তবে দ্বিতীয় অপরাধটা বেশি গুরুতর। কিন্তু 'সব জায়গায় তো আর সব কথা বলে ফেলা যায় না 'তাই অগত্যা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম —
—হ্যাঁ, চা কফি কিন্তু কমিয়ে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত চা কফি গ্যাস্ট্রিক আলসারের সমস্যা বাড়িয়ে ফেলতে পারে।আমার কথায় ভদ্রমহিলা মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
ওষুধটা খেয়ে সপ্তাহ দুই পরে আসুন।ডিরেকশন প্যাকেটের উপরেই দেওয়া আছে, দুপুরে যেগুলো খাওয়ার সেগুলোর উপর সূর্য আঁকা থাকে আর রাত্রের ওষুধের উপর চাঁদের ছবি আছে।
"হ্যাঁ ডাক্তারবাবু আমি ওটার কথাই বলছিলাম, ওই সূর্যমুখী ওষুধ।"
একটু আগেই ভদ্রমহিলার মুখে সূর্যমুখী সূর্যমুখী শুনে আমি যারপরনাই বিরক্ত হচ্ছিলাম এখন বুঝলাম এই সূর্যমুখি আদতে কোন ফুল নয় ,কিংবা বঙ্কিমের সূর্যমুখীও নয় ,আসলে সূর্যের ছবি আঁকা গ্যাস্ট্রিক আলসারের ওষুধ।
ভদ্রমহিলা প্রস্থান করলেন কিন্তু তার মুখে হেলিকোব্যাক্টর পাইলরি ইরাডিকেশন কিটের এই সহজ সরল বিবরণ ,আমার কানে লেগে রইল দীর্ঘক্ষণ। এই আবেশ সূর্যমুখী ফুলের মত স্নিগ্ধ যার রেণু সমস্ত দিন জুড়ে আঙুলের ডগায় লেগে থাকে ।
© Dr. Abu Talha Purkait