23/10/2026
দুর্গাপূজার সেবাকর্ম: জীবন্ত ঈশ্বরের আরাধনা ও কিছু উপলব্ধি
এবারের দুর্গাপূজায় মা সারদা সেবাশ্রম, কলকাতার পক্ষ থেকে চারটি জেলার কয়েকটি প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক গ্রামে সেবাকর্ম করার সুযোগ হয়েছিল। কোথাও শিশুদের হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়া হয়েছে, কোথাও গ্রামের মায়েদের হাতে নতুন শাড়ি। আপাতদৃষ্টিতে কাজগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু এই কয়েকটি দিনের অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার ভাবিয়েছে, আমরা আসলে সেবা করতে গিয়ে কী শিখছি?
দুর্গাপূজা এলেই আমাদের কত আয়োজন! নতুন পোশাক, প্যান্ডেল, প্রতিমা দর্শন, রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া—সব মিলিয়ে এক বিরাট উৎসব। কিন্তু এই উৎসবের বাইরে এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের কাছে একটি নতুন জামা কিংবা একটি নতুন শাড়িই পূজার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে উঠতে পারে।
পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরে মা সারদা সেবাশ্রম পরিচালিত সারদা সরস্বতী পাঠশালার শিশুদের হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়ার সময় তাদের মুখের আনন্দ দেখেছি। পুরুলিয়ার মজিরামডি গ্রামে ১০৩ জন শিশুর হাতে বিদ্যালয়ের নামাঙ্কিত নতুন টি-শার্ট তুলে দেওয়া হয়েছিল। হুগলির তালপুরে ৫০ জন মায়ের হাতে নতুন শাড়ি তুলে দেওয়া হয়েছে। আবার পূর্ব বর্ধমানের পুতুন্ডা রামকৃষ্ণ আশ্রমে ১০০ জন মায়ের হাতে নতুন শাড়ি তুলে দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
এই মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, আমরা হয়তো খুব সামান্য কিছু করেছি। কিন্তু সেই সামান্য জিনিসটুকু কারও কাছে কতখানি আনন্দের হতে পারে, তা দূরে বসে অনুমান করা যায় না।
আমরা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে কত অর্থ ব্যয় করি, কত অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি, কত সহজেই নতুন কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করি। অথচ একটি শিশু নতুন জামা পেয়ে যখন আনন্দে হাসে, তখন মনে হয়, সুখের হিসাবটা বোধহয় আমরা বড় জটিল করে ফেলেছি।
কিন্তু সেবাকর্মের একটি অন্য দিকও রয়েছে।
যখন আমরা কারও হাতে কিছু তুলে দিই, তখন অজান্তেই নিজেদের মনে একটি ধারণা জন্মাতে পারে—আমরা দিচ্ছি, আর অন্যেরা গ্রহণ করছেন। আমরা সাহায্য করছি, আর তাঁরা সাহায্য পাচ্ছেন। এই ভাবনার মধ্যেই কোথাও একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
অথচ সত্যিই কি আমরা কেবল দিতেই যাই?
একটি শিশুর হাসি আমাদের কী দেয়? একজন মায়ের আন্তরিক আশীর্বাদ আমাদের কী শেখায়? যাঁদের জীবনে আমাদের তুলনায় অনেক কম সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে আমরা যে আনন্দ, ভালোবাসা ও জীবনের শিক্ষা নিয়ে ফিরে আসি, তার হিসাব কি কখনও রাখি?
এবারের সেবাকর্মে একটি বিষয় বারবার মনে হয়েছে—মানুষের পাশে দাঁড়ানো যতটা জরুরি, মানুষকে সম্মান করতে শেখাও ঠিক ততটাই জরুরি।
কারও অভাব রয়েছে বলেই তিনি আমাদের করুণার পাত্র নন। তাঁর আর্থিক সামর্থ্য কম বলেই তাঁর আনন্দের অধিকার কমে যায় না। একটি নতুন শাড়ি পরার আনন্দ, পূজার দিন নতুন পোশাক পরে বাইরে যাওয়ার আনন্দ কিংবা পছন্দের খাবার খাওয়ার আনন্দ—এসবে তো মায়ের সকল সন্তানদেরই অধিকার ।
দুর্গাপূজার সময় শহরের মানুষ যখন নতুন পোশাক পরে ঠাকুর দেখতে বের হন, তখন প্রত্যন্ত গ্রামের একটি শিশুর নতুন জামা পরে আনন্দ করার ইচ্ছাকে আমরা কীভাবে ছোট করে দেখতে পারি?
আমরা যদি সত্যিই মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই, তবে তাঁদের প্রয়োজনের পাশাপাশি তাঁদের ইচ্ছাকেও বুঝতে হবে।
মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতে শেখা যতটা কঠিন, মানুষকে নিজের সমান মর্যাদায় দেখতে শেখা বোধহয় তার চেয়েও কঠিন। কারণ ঈশ্বরের পূজা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, অথচ মানুষের প্রতি আমাদের ব্যবহারেই সেই পূজার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।
একটি সেবামূলক কাজের সাফল্য কি কেবল কতজনকে পোশাক দেওয়া হল, কত টাকা ব্যয় হল কিংবা কতগুলি ছবি প্রকাশিত হল—তার ওপর নির্ভর করে? নাকি সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হল, আমাদের কাজের ফলে কতজন মানুষের মুখে হাসি ফুটল এবং আমরা নিজেরা কতখানি মানবিক হতে পারলাম?
আমার মনে হয়, দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে পাওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
আমরা চাই, দুর্গাপূজার আনন্দ প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছেও পৌঁছে যাক। আমরা চাই, শিশুরা নতুন পোশাক পরে আনন্দ করুক, মায়েরা নতুন শাড়ি পেয়ে পূজার আনন্দে সামিল হোন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই, এই কাজ করতে গিয়ে আমাদের নিজেদের মন যেন আরও উদার হয়।
কারণ সেবা কেবল অন্যের জীবনে কিছু দেওয়ার নাম নয়। সেবা নিজের ভেতরের সংকীর্ণতাকে চিনে নেওয়ারও একটি সুযোগ।
আমরা যখন অন্যের অভাব দেখি, তখন নিজেদের প্রাচুর্যকে নতুন করে চিনতে পারি। যখন একটি শিশুর হাসিতে আনন্দ খুঁজে পাই, তখন বুঝতে পারি জীবনের সমস্ত আনন্দ কেনাকাটার তালিকায় লেখা থাকে না। আর যখন একজন মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে আসি, তখন উপলব্ধি করি, কিছু প্রাপ্তির কোনও আর্থিক মূল্য হয় না।
মা সারদা সেবাশ্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে আমার উপলব্ধি, এই কাজ আমাদের একার নয়। যাঁরা অর্থ দিয়ে, সময় দিয়ে, শ্রম দিয়ে পাশে থাকেন, তাঁদের প্রত্যেকের সহযোগিতায়ই এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়। তাই এই সেবার মধ্যে ব্যক্তিগত কৃতিত্বের চেয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মূল্য অনেক বেশি।
তবু নিজের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে দিতে চাই—আমরা কি সত্যিই সেবার আদর্শকে জীবনে ধারণ করতে পারছি? নাকি মানুষের জন্য কিছু করতে গিয়ে কখনও কখনও নিজেদের ভালো মানুষ বলে ভাবতেই বেশি ভালোবাসি?
এই প্রশ্নের উত্তর অন্যের কাছে খুঁজে লাভ নেই। উত্তরটা প্রত্যেককে নিজের মধ্যে খুঁজতে হবে।
দুর্গাপূজায় আমরা মায়ের আরাধনা করি। মায়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সকলের মঙ্গল করেন। কিন্তু সেই প্রার্থনার অর্থ তখনই গভীর হয়ে ওঠে, যখন অন্যের মঙ্গলের জন্য আমরাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু করতে এগিয়ে আসি।
আমি জানি, আমাদের সামর্থ্য সীমিত। আমরা সকলের অভাব দূর করতে পারব না, সকলের জীবনে আনন্দ এনে দিতে পারব না। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা যেন আমাদের থামিয়ে না দেয়। একজন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সামর্থ্য থাকলে, অন্তত সেই কাজটুকু আমরা করতে পারি।
জগন্মাতার কাছে আমার একটাই প্রার্থনা—আমরা যেন কেবল উৎসবের কয়েকটি দিনেই মানুষের কথা না ভাবি। সারা বছর তাঁদের পাশে থাকার মানসিকতা যেন আমাদের মধ্যে জাগ্রত থাকে।
আমাদের সেবা যেন কখনও দয়ার প্রদর্শনী না হয়ে ওঠে। তা যেন হয়ে ওঠে ভালোবাসার প্রকাশ, শ্রদ্ধার নিবেদন এবং মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার আন্তরিক প্রচেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা—আমরা কতজন মানুষকে কিছু দিতে পেরেছি, তার চেয়েও বড় কথা, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আমরা নিজেরা কতখানি মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি।
শ্রী মা সকলের মঙ্গল করুন।
সৌরভ
মা সারদা সেবাশ্রম, কলকাতা