Mrittika-The Eco Warrior

Mrittika-The Eco Warrior Mrittika is a not for profit organisation,registered under W.

B Society Registration Act,1961.Mrittika is working as an ecological warrior since its inception in 2007.Our vision is to make people aware about the contamination of nature by external forces. B Society Registration Act,1961.Mrittika is working as an ecological warrior since its inception in 2007.Our vision is to make people aware about the contamination of nature by external forces.We are educat

ing people specially the youth through implementation about ecology and its various aspects. Our main activity involves converting and supporting farmers in doing organic cultivation through training and farm consultancy,as this is the only means to secure our food supply,our health and the earth's health. There are other few aspects which we deal with namely enriched composting, organic kitchen gardening,terrace gardening,vertical gardening, rain water harvesting to attain the goal of ecological conservation and to combt the adverse effects of climate change. We organise nature study camp for youths.Our nature study camp is training programme on trees,shrubs,weeds,climbers,birds,butterflies,insects,animals. We do provide special emphasize on water literacy programme to meet the objective of water conservation.

19/06/2026

হিরন্ময় গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন

কুকীর্তির পরেই জ্ঞানচক্ষু খোলে। সবুজ বিপ্লবের নামে ভারতীয় কৃষির বারোটা বাজিয়ে স্বামীনাথন আমাদের উপদেশ দিচ্ছেন! ভাস্কর সাভে তাঁকে চিঠি দিয়ে বারংবার সচেতন করেছেন, স্বামীনাথন প্রাপ্তিস্বীকার করা ছাড়া প্রায় কোনো চিঠির‌ই জবাব দেননি। (ফটো দেখুন)।
১৯৬৫ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ধানজমিতে পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়েছে প্রায় পাঁচশো শতাংশ; তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ইনসেক্টিসাইটের ব্যবহার‌ও। ইনসেক্টিসাইটজনিত রোগবিমার, আর দূষণ। দেশি জাতের ধানকে অনুৎপাদক বলে খারিজ করে দিল সরকার। কর্পোরেট প্রথমেই তো মাথাটি খায়, তারপর সারা শরীর; অতঃপর চোখ ওল্টানো, চমৎকার, ধরা যাক ইঁদুর এবার! কর্পোরেটের লক্ষ্যে তখন সাধারণ চাষি, দেশি শস্য চাষ করে লাভ নেই, তুঙ্গ প্রচারে কৃষক মজেছে, চাষিও এমনি এমনি চেটেপুটে খেয়ে যেতে যেতে কর্পোরেট প্রদেয় ইনসেক্টিসাইটের শিশি গলায় ঢেলে নিলো।

সবুজ বিপ্লবের প্রথম শহীদ ড. আর. এইচ. রিচারিয়া।
তাইচুং নেটিভ, আইআরএইট ধান, দেশজুড়ে অবাধে চাষ করার পরিকল্পনা হচ্ছে, কটক সেন্ট্রাল রাইস রিসার্চ ইন্সটিট্যুটের ডিরেক্টর রিচারিয়া, একটি নির্দোষ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন সেই সময় : এইসমস্ত ধান, যেগুলি গোটা দেশজুড়ে চাষ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেগুলির কোনও কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট নেই কেন?
কোয়ারেন্টাইন, মানে, বিদেশি কোনও উদ্ভিদ বা প্রাণীর ভ্যরাইটি আমার দেশের বাতাবরণে কতটা সংবেদনশীল, রোগ পোকার বিরুদ্ধে কতটা লড়াকু, দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন জায়গায় তাদের রেখে পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা। যদি সন্তোষজনক ফলাফল মিলে, যদি এ দেশের বাতাবরণে খাপ খেয়ে যায়, তবেই তাকে অবাধে চাষের জন্যে ছাড়পত্র দেওয়া যায়। — এটাই তো বৈজ্ঞানিক সুলভ স্বাভাবিক প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন তো দুমুখো তরবারি, প্রশ্নকর্তাকেই কাটে; প্রশ্ন করলেই ভারতীয় আমলাতন্ত্র, কর্পোরেটের স্বার্থরক্ষাকারী সরকার আর কর্পোরেট আপনার অস্তিত্ব সিল করে দেবে।
একদিন এক সুন্দর সকালে তিনি অফিসে গিয়ে দেখেন তাঁর চেম্বারটির দরজায় সিল। তাঁর চাকরি চলে গেছে।
সব প্রশ্নের উত্তর হয় না, তাঁর একজন ছাত্রকে বলেছিলেন সবুজ বিপ্লবের ভারতীয় জনক স্বামীনাথন, সবুজ বিপ্লবের তুঙ্গ মুহূর্ত তখন। ছাত্রটি প্রশ্ন করেন, স্যার আপনিই তো বলেছিলেন যে, পাঞ্জাবে কৃষির মূল শক্তি তার শস্যের এই জেনেটিক ডাইভার্সিটি। তাহলে আপনিই এখন এমন একটা পদ্ধতি কেন চালু করছেন যাতে এই জেনেটিক ডাইভার্সিটিটা নষ্ট হয়ে যায়? স্বামীনাথন, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব অধ্যাপক, তাঁর ছাত্রটিকে বলেন, সব প্রশ্নের উত্তর চেয়ো না।
সারা ভারতের কৃষক, আত্মহত্যা দিয়ে, এই প্রশ্নটাই তো স্বামীনাথনকে করতে চেয়েছিলেন; কোনো উত্তর দিয়ে যাননি সবুজ বিপ্লবের পিতা!

ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইন্সটিট্যুট, ফিলিপিন্স, ড. রিচারিয়াকে প্রস্তাব পাঠায়, আসুন, আমরা একযোগে কাজ করি। আমাদের ধানের ভ্যারাইটির সংগ্রহ বিনিময় করি। রিচারিয়া পত্রপাঠ তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্টভাষায় বললেন, আমার সংগ্রহ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা প্রথম আমিই করব। আপনাদের দেবো কেন? আমি আপনাদের সাথে জার্মপ্লাজম বিনিময় করতে আগ্রহী নই।
তিনি জানতেন, ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইন্সটিট্যুটের সংগ্রহটি ভারতে আনলে তা বিপুলমাত্রায় রোগ ও পোকায় আক্রান্ত হবে। সংক্রমণে তাঁর সংগৃহীত ভ্যরাইটিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ড. রিচারিয়া রাজি না হলে কী হবে, প্রস্তাবটি টুক করে লুফে নিলেন সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজারি কমিটি টু দ্য ক্যাবিনেট-এর প্রধান এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন গোপন বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সবুজ বিপ্লবী স্বামীনাথন। তিনি ফিলিপিন্সবাবুদের দেখিয়ে দিলেন, কোথায় কোথায় ওই সমস্ত ধানগুলো পাওয়া যায়। আমাদের দেশের জিনসম্পদ চালান হয়ে গেল। চালান করে দেওয়ার জন্য স্বামীনাথন হলেন ইন্টারনেশন্যাল রাইস রিসার্চ ইন্সটিট্যুটের ডিরেক্টর। ভারতের একজন সরকারি বৈজ্ঞানিক যিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গোপন তথ্য জানেন, তিনি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে বিসর্জন দিয়ে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের টাকায় পরিচালিত ইন্টারনেশন্যাল রাইস রিসার্চ ইন্সটিট্যুটে ডিরেটকটরি করতে চলে গেলেন! সরকার পর্যন্ত কোনো বাধা দিলনা।
ইনিই আমাদের দেশের সবুজ বিপ্লবী। উচ্চফলনশীল সারখোর ইনসেক্টিসাইটখোর কৃষির জনক!
আর একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী ড. রিচারিয়া বলছেন, ভারতে এমন দেশীয় জাতের ধান‌ও আছে, যা, আইআরএইট-এর থেকে বেশি ফলন দিতে পারে।
এটা হজম করে নেওয়া কি সহজ বৈজ্ঞানিক (?) স্বামীনাথনের পক্ষে?
জিন সাম্রাজ্যবাদ তাহলে স্বামীনাথন হাতে ধরেই ভারতে প্রতিষ্ঠা করলেন।
সবুজ বিপ্লবের নামে আমাদের দেশ থেকে বহু দুর্মূল্য ভ্যরাইটিকে লুপ্ত করার পথটিও সুপ্রশস্ত করলেন।
আমাদের দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে ভীষণভাবে পরমুখাপেক্ষীও করে দিয়ে গেলেন।
দেশের এত অনাহার এত অপুষ্টির জন্য প্রধান দায়ী আমাদের দেশের পশ্চাৎপদ কৃষিপ্রযুক্তি — এরকম একটা প্রচলিত ধারণাকেও প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেলেন।
হে মহান সবুজ বিপ্লবী, সবুজ বিপ্লবের ছয় দশক পরেও গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারতের অবস্থান এত লজ্জাজনক কেন?
এই প্রশ্নের জবাব আপনার প্রেতাত্মাকেও দিয়ে যেতে হবে।

15/06/2026

শিবেশ দাস লিখেছেন
বর্ষাকাল, কৃষিজীবনে এক ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ন সময়। মাটি এ সময় সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে । সে নিজে প্রবল সক্রিয়তা দিয়ে নির্জীবতাকে ঝেড়েফেলে উঠে দাঁড়াতে চায়। কেননা, বাড়তি ফলনের নেশায় বিভ্রান্ত মানুষেরা সারা বছর চাষ যোগ্য জমিকে রাসায়নিক সার,বিষ আর নানা রকম অত্যাচারি যন্ত্রপাতির প্রয়োগে নির্জীব করে ফেলে। এই উঠে দাঁড়াবার লড়াইয়ে মাটির অনেক বন্ধু আছে । তাদের কথা হয়ত আমরা জানি I

১৮৮১ সালে ডারউইন সাহেব তার শেষ বিজ্ঞান গ্রন্থে এক অনালোচিত জীব কে নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তাহল "প্রকৃতির লাঙল"...কেঁচো।

আমাদের দেশীয় কেঁচোই জমির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। খনিজ পুষ্টি যা সে বর্জের মাধ্যমে দেয় তার চেয়েও বেশি যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সে করে তা হল জমির কর্ষন । এই কর্ষন এটু অন্যভাবে হয় । বিশেষ করে বর্ষার মরসূমে কেঁচো প্রতিদিন বহুবার মাথা দিয়ে ঠেলে উপরে ওঠে। তৎক্ষণাৎ তৈরী একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে উঠে দ্রুত বর্জ্য নিষ্কাশন করে আর অক্সিজেন নিয়ে আবার অপর একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করে মাটির নীচে নেমে যায় । দিনভর গড়পরতা সে বার দশেক এমন ওঠানামা করে। সুড়ঙ্গ তৈরি করার সময় তার শরীর থেকে যে শ্লেষ্মা নির্গত হয় যা সুড়ঙ্গের দেয়াল কে ঘন আর শক্ত করে ধ্বসে যেতে দেয়না । এই কাজগুলি ব্যয়বহুল, বিশেষ ভাবে তৈরী I গ্রামের মানুষদের কথায় "বাবুকেঁচো"দের পক্ষে সম্ভব নয় ।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রজাতির কেঁচো আছে। বিভিন্ন রকম আবহাওয়া আর মাটির সাথে খাপখাওয়াতেই তাদের সৃষ্টি। রাসায়নিক সার আর বিষে জর্জরিত মাটিতে কেঁচোর বসবাস সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক উপায়ে সুরক্ষিত ১ বিঘা জমিতে অবস্হার রকম ভেদে এক থেকে দেড় লক্ষ কেঁচো থাকে। বর্ষার তিনটে মাস তারা বিরামহীন ভাবে চাষের কাজ করে চলে। প্রতিদিন যদি একটি কেঁচো ১০বার ওঠা নামা করে তবে ২০ টি সুড়ঙ্গ তৈরী হয়। এই ভাবে প্রতিবিঘে জমিতে কোটি কোটি সুড়ঙ্গ তৈরী হয়। অনেক কৃষিবিজ্ঞানী এতে "শূন্যচাষ পদ্ধতির" কথাও বলেন ।যদিও এই অসাধারণ সহায়তার কথা আমরা নজরেই আনিনা !

রাসায়নিক সার আর বিষের আক্রমনে প্রতি বর্গ মিটারে কেঁচোর সংখ্যা মাত্র ৩০শের কাছাকাছি পৌঁছেগেছে, যেখানে প্রতি বর্গ মিটারে স্বাভাবিক অবস্হায় থাকা উচিত কমপক্ষে ৪৫০ টি।

11/06/2026

শিবেশ দাস লিখেছেন
আমরা বহু ক্ষেত্রে জি বি পন্থ ইউনিভার্সিটি অফ এগ্রিকালচার এন্ড টেকনোলজির অধ্যাপক এম জি জ্যাকসনের উল্লেখ করি, কেননা সবুজ বিপ্লবকে এদেশে রূপায়ণ করার কাজে তিনি সামিল থাকলেও পরবর্তী কালে সম্পূর্ণ ভাবে সবুজ বিপ্লবের পথ থেকে সরে এসে পুরোধা প্রাকৃতিক কৃষির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহি দেশীয় কৃষির তৎকালীন পদ্ধতির মিশ্রিতরূপ উত্তরাখণ্ডে "মিরতলা"র খামারে প্রয়োগের মাধ্যমে চাষবাসের ভবিষ্যৎ দিশা দেখানোর উদ্যোগ নেন।

এম জি জ্যাকসন তাঁর "দি ইকোলজিকাল ভিলেজ" গ্রন্থের "প্রকৃতি যেভাবে চাষ করে" পর্বে উল্লেখ করেছেন যে, - ষাট বছরেরও বেশি আগে স্যার অ্যালবার্ট হাওয়ার্ড একটি বিষয়ে বলেছিলেন যাকে তিনি "প্রকৃতির চাষ" (১৯৪০) বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল; আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য আমাদের যথাসম্ভব মূল, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র মেনে চলা উচিত যেখানে আমরা চাষ করি। তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন চারটি প্রধান বিষয়ের প্রতি যা তিনি এই ধরনের ব্যবস্থায় কার্যকরী বলে মনে করেন, উদাহরণ হিসেবে একটি বনের কথাও বলেন। এগুলি ছিল, তাঁর নিজের ভাষায় ১ . মিশ্র ফসলের নিয়ম, ২ . মাটির সর্বদা রোদ, বৃষ্টি এবং বাতাসের প্রত্যক্ষ ক্রিয়া থেকে সুরক্ষিত থাকা ; ৩ . বন যেমন নিজের সার নিজেই দেয়; ৪ . ফসল এবং গবাদি পশু নিজেরাই নিজেদের দেখাশোনা করে।

আমরা কোশির নিম্ন প্রবাহে ও দুধকোশির উচ্চ প্রবাহে যে কৃষির উদাহরণ পেয়েছি তাতে, "শুধু বীজটুকু বুনে দিলেই হলো। প্রয়োজন নেই কর্ষণের, প্রয়োজন নেই কোনো যত্নের।".............. "তখনও মানুষ উঁচু আলপাইন বন থেকে ঢাল বেয়ে নেমে আসা উর্বর মাটিতে জন্মানো ঘাসের দানা সংগ্রহ করেছে।"....যাতে স্যার আলবার্ট হাওয়ার্ড কথিত প্রাকৃতিক কৃষির ছবিটি স্পষ্ট।

25/05/2026

শিবেশ দাস লিখেছেন

আমাদের ছোটবেলার খেলাঘরে, বিশেষ করে মাটির হাঁড়িপাতিলের রান্নাবাটির খেলায়, বেগুন ছিল এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। গ্রামের উঠোন, পুকুরপাড় কিংবা পথের ধারে জন্মানো ছোট ছোট কাঁটাওয়ালা গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা ক্ষুদ্র ফলগুলোই হয়ে উঠত কল্পনার রান্নার উপকরণ। আমাদের শিশুমনের কাছে সেগুলো ছিল সত্যিকারের বেগুনের বিকল্প। এই গাছটিকেই বহু অঞ্চলে “গোষ্ঠ বেগুন”, “ব্যাকুড়” কিংবা “বৃহতী” নামে ডাকা হয়। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে এমন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকলেও আধুনিক কালে আমরা একে প্রায় ভুলে গেছি। গোষ্ঠ বেগুনের গাছটির গঠন লক্ষ করলে বেগুন পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সহজেই বোঝা যায়। পাতাগুলি কিছুটা মুখবাঁকা, আকারে ছোট, কিন্তু গায়ে ঘন কাঁটা। ফলগুলি কাবুলি মটরের মতো ছোট, কাঁচা অবস্থায় সবুজ বা গাঢ় বেগুনি-কালো, আর পাকলে হালকা কমলা রঙ ধারণ করে। অনাবাদী জমি, রাস্তার ধারে, পতিত ক্ষেত কিংবা ঝোপঝাড়ের ফাঁকে এটি সহজেই জন্মায়। সাধারণ মানুষ একে আগাছা বলে অবহেলা করলেও প্রকৃতির দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত অভিযোজিত ও শক্তিশালী উদ্ভিদ।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এই উদ্ভিদটির পরিচয় “প্রসহা” বা “বৃহতী” নামে পাওয়া যায়। এটি বহুল পরিচিত একটি ভেষজ উদ্ভিদ। উদ্ভিদতত্ত্ব অনুযায়ী এটি Solanaceae পরিবারের অন্তর্গত। এই পরিবারে পৃথিবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ও ঔষধি উদ্ভিদ অন্তর্ভুক্ত। বৃহতী মূলত Solanum গণের অন্তর্ভুক্ত, যে গণে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। কোথাও এই উদ্ভিদ বর্ষজীবী, কোথাও বহুবর্ষজীবী; কোথাও ছোট ঝোপ, আবার কোথাও প্রায় বৃক্ষের আকৃতিও ধারণ করে। লোকঔষধ ও আয়ুর্বেদে বৃহতীর নানা অংশ মূল, পাতা, ফল ও বীজ বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। শ্বাসকষ্ট, কাশি, জ্বর, মূত্রসংক্রান্ত সমস্যা, প্রদাহ কিংবা বাতজনিত কষ্টে এর প্রয়োগের উল্লেখ বহু প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যায় বৃহতী ছিল “দশমূল” গোষ্ঠীরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। অর্থাৎ এটি কেবল একটি আগাছা নয়, বরং বহু শতাব্দী ধরে মানুষের চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত এক মূল্যবান উদ্ভিদ। পুরনো পুঁথি ও আচরণবিধিতে বৃহতী ও বেগুন খাওয়া সম্পর্কে কিছু নিষেধাজ্ঞার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন,দ্বিতীয়া তিথিতে বৃহতী খাওয়া নিষেধ এবং ত্রয়োদশীতে বেগুন খাওয়া বারণ। এই ধরনের বিধিনিষেধ ছিল অনেক সময় ঋতুচক্র, হজমশক্তি বা খাদ্যের গুণাগুণ সম্পর্কিত লোকজ অভিজ্ঞতারও প্রতিফলন। আজ এসব বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু এগুলোর ভেতরে প্রাচীন সমাজের খাদ্যসংস্কৃতি ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের ছাপ লুকিয়ে আছে। আজ বৃহতীকে আমরা খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে দেখি না, কিন্তু অতীতে সম্ভবত তা ছিল গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। দুর্ভিক্ষ, অভাব বা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সময়ে মানুষ বহু বুনো উদ্ভিদকেই খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করত। বৃহতীর ক্ষুদ্র ফল হয়তো সরাসরি রান্নায় ব্যবহৃত হতো না সবসময়, কিন্তু তার উপস্থিতি ছিল মানুষের খাদ্য ও ভেষজ জ্ঞানের ভাণ্ডারে নিশ্চিতভাবেই। কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষের খাদ্যতালিকা একসময় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ছিল, যা আধুনিক একফসলি কৃষির যুগে ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। এই বৃহতীর গোষ্ঠী থেকেই মানুষের অন্যতম তিনটি প্রধান সবজি ফসলের উদ্ভব হয়েছে, আলু, বেগুন এবং টমাটো। পৃথিবীর খাদ্য ইতিহাসে এই তিনটি উদ্ভিদের গুরুত্ব অপরিসীম। আলু আজ বহু দেশের প্রধান খাদ্য, বেগুন দক্ষিণ এশীয় রান্নার এক অপরিহার্য অংশ, আর টমাটো বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংস্কৃতির রং ও স্বাদ বদলে দিয়েছে। অথচ তাদের পূর্বপুরুষদের অনেকেই একসময় মানুষের চোখে ছিল নিছক বুনো গাছ। ইতিহাসের অন্ধকারে ঢাকা এই পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের খাদ্য, উদ্ভিদ ও সভ্যতার ইতিহাস আসলে গভীরভাবে পরস্পর জড়িত।

22/05/2026

শিবেশ দাস লিখেছেন

পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থার এক নীরব কিন্তু অপরিহার্য স্তম্ভ হল মৌমাছি। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের মোট খাদ্যশস্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে প্রাণী-নির্ভর পরাগায়নের উপর নির্ভরশীল, আর সেই কাজে মৌমাছিই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। ফল, শাকসবজি, তেলবীজ, বাদাম, মসলা কিংবা পশুখাদ্যের বহু উদ্ভিদ মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়িত হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা Food and Agriculture Organization–এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে, কিন্তু গত কয়েক দশকে তাদের সংখ্যা দ্রুত কমছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু অঞ্চলে বাণিজ্যিক মৌপালনের উপনিবেশে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বার্ষিক ক্ষতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই হ্রাসের ফলে কৃষিজ উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব পড়ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মৌমাছির এই বিপর্যয়ের পেছনে প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, একফসলি কৃষি ব্যবস্থা, বনভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূষণ। বিশেষ করে “নিওনিকোটিনয়েড” জাতীয় রাসায়নিক কীটনাশক মৌমাছির স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের দিকনির্ণয় ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলে তারা চাক থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ অমেরুদণ্ডী পরাগবাহীর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফুল ফোটার সময় ও মৌমাছির সক্রিয়তার সময়ের মধ্যে অসামঞ্জস্যও তৈরি হচ্ছে। একদিকে ফুল ফুটছে আগেভাগে, অন্যদিকে মৌমাছির আবির্ভাব হচ্ছে পরে, ফলে পরাগায়নের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়ছে। এর ফল শুধু কৃষিক্ষেত্রে নয়, সমগ্র জীববৈচিত্র্যের উপরও পড়ছে, কারণ বহু বুনো উদ্ভিদও মৌমাছির উপর নির্ভরশীল। বিশ্ব অর্থনীতিতেও মৌমাছির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুসারে, পরাগায়ন পরিষেবার আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ২৩৫ থেকে ৫৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য। আপেল, বাদাম, কফি, কোকো, সূর্যমুখী কিংবা সরিষার মতো ফসলের উৎপাদন মৌমাছি ছাড়া ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারতীয় উপমহাদেশেও সরিষা, লিচু, আম, তরমুজ, শসা ও বিভিন্ন ডালজাতীয় ফসলের ফলন বৃদ্ধিতে মৌমাছির ভূমিকা অপরিসীম।

তাই শুধুমাত্র মধু উৎপাদনের জন্য নয়, ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার জন্যও মৌমাছিকে রক্ষা করা একান্ত জরুরি। প্রাকৃতিক দেশীয় কৃষি, বহুবিধ ফসল চাষ, রাসায়নিকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বন ও ফুলগাছ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ মৌপালন সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।

18/05/2026

প্রতিদিন ২৩টি পারমাণবিক বোমার সমান তাপ ছড়াবে এই এআই ডেটা সেন্টার!

---

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ মরুভূমি অঞ্চল হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। কারণ সেখানে তৈরি হতে চলেছে এমন এক বিশাল এআই ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস, যাকে ঘিরে এখন প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং বিদ্যুৎ সংকট— তিনটিই একসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। “স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট” নামে পরিচিত এই প্রস্তাবিত এআই অবকাঠামো প্রকল্পকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়েছে একটি দাবি— এই ডেটা সেন্টার প্রতিদিন এমন পরিমাণ তাপ পরিবেশে ছড়াতে পারে, যা “২৩টি পারমাণবিক বোমা”-র শক্তির সমান। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়া, প্রযুক্তি মহল এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।

(প্রতিবেদনটি বড় আছে তাই সময় নিয়ে পড়তে হবে)

প্রকল্পটির অবস্থান উটাহের বক্স এল্ডার কাউন্টি এবং হ্যানসেল ভ্যালি অঞ্চলে। জায়গাটি মূলত মরুভূমি ঘেরা এক বিশাল অববাহিকা এলাকা, যেখানে জনসংখ্যা কম এবং বিপুল ফাঁকা জমি রয়েছে। বর্তমানে এআই শিল্প যেভাবে দ্রুত গতিতে বৃহৎ ডেটা সেন্টার তৈরি করছে, তাতে এমন দূরবর্তী অঞ্চলগুলোকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে। কারণ এই ধরনের ক্যাম্পাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় হাজার হাজার একর জমি, বিশাল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শিল্পস্তরের শীতলীকরণ অবকাঠামো।

এই স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পুরো ক্যাম্পাস প্রায় ৪০ হাজার একর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তুলনা হিসেবে অনেক প্রযুক্তি বিশ্লেষক বলছেন, এর আয়তন নিউ ইয়র্কের ম্যানহ্যাটনের থেকেও বড় হতে পারে। আবার কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অবকাঠামোর বিস্তার প্রায় ২০০০ ওয়ালমার্ট সুপারসেন্টারের সমান। যদিও এই তুলনাগুলি মূলত প্রকল্পের বিশালতা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, তবুও এতে সহজেই বোঝা যায় যে এটি সাধারণ ডেটা সেন্টার নয়, বরং একটি শিল্পনগরীর সমতুল্য প্রযুক্তি অবকাঠামো।

বর্তমানে জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির বিস্ফোরক বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার শিল্প একেবারে নতুন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আগে সাধারণ ইন্টারনেট সার্ভার মূলত ওয়েবসাইট চালানো, ক্লাউড স্টোরেজ বা ভিডিও স্ট্রিমিং পরিষেবার জন্য ব্যবহার হত। কিন্তু এখন ChatGPT, Gemini, Claude বা Midjourney-এর মতো এআই মডেল চালানোর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে হাজার হাজার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন GPU ক্লাস্টার। এই ধরনের এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে এবং প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যবহারকারীর অনুরোধের উত্তর দিতে বিপুল কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন হয়।

একটি বৃহৎ ভাষা মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় কয়েক হাজার GPU একসঙ্গে সপ্তাহের পর সপ্তাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। প্রতিটি GPU কয়েকশ ওয়াট থেকে এক কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ করতে পারে। যখন হাজার হাজার GPU একসঙ্গে সমান্তরাল প্রক্রিয়াকরণে কাজ করে, তখন পুরো ব্যবস্থার বিদ্যুৎ চাহিদা ছোট একটি শহরের সমান হয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা, ডেটা স্টোরেজ, স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শীতলীকরণ প্রযুক্তি।

স্ট্র্যাটোস প্রজেক্টের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হল এর সম্ভাব্য বিদ্যুৎ চাহিদা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি পূর্ণ ক্ষমতায় চালু হলে প্রায় ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা প্রয়োজন। উটাহ রাজ্যের বর্তমান সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৪ থেকে ৫ গিগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করে। অর্থাৎ, একটি মাত্র এআই ক্যাম্পাস গোটা রাজ্যের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবহারের থেকেও বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে— এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বহু শক্তি বিশেষজ্ঞ।

সাধারণ মানুষের কাছে ডেটা সেন্টার মানে হয়তো কয়েকটি কম্পিউটার রাখা ঘর। কিন্তু বাস্তবে হাইপারস্কেল এআই ক্যাম্পাস অনেকটা শিল্পাঞ্চল বা ছোট শহরের মতো। বিশাল গুদামঘরের ভিতরে সারি সারি হাজার হাজার সার্ভার র্যাক বসানো থাকে। প্রতিটি র্যাক থেকে নিরন্তর তাপ বের হতে থাকে। কারণ বিদ্যুতের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত তাপশক্তিতে পরিণত হয়। CPU এবং GPU যত বেশি কাজ করে, তত বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো ব্যবস্থা বিকল হয়ে যেতে পারে।

এই কারণেই শীতলীকরণ ব্যবস্থা এআই ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির একটি। বিশাল বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, শিল্পস্তরের কুলিং টাওয়ার, তরল শীতলীকরণ পাইপলাইন এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্যই মোট বিদ্যুৎ খরচের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয়। অর্থাৎ এআই অবকাঠামো যত বাড়ছে, তাপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনও তত দ্রুত বাড়ছে।

ঠিক এই তাপ উৎপাদন নিয়েই আলোচনায় আসেন উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ডক্টর রব ডেভিস। তিনি এই প্রকল্পের সম্ভাব্য তাপমাত্রাগত চাপ নিয়ে একটি হিসাব প্রকাশ করেন। তাঁর অনুমান অনুযায়ী, পুরো ডেটা সেন্টার চালু হলে মোট তাপশক্তি নির্গমন প্রায় ১৬ গিগাওয়াট সমতুল্য পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর একটি বড় অংশ “বর্জ্য তাপ” হিসেবে আশেপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়বে।

এই হিসাব বোঝাতে গিয়ে তিনি হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার শক্তির সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রতিদিন পরিবেশে যে পরিমাণ তাপ ছড়াবে, তা “প্রায় ২৩টি পারমাণবিক বোমা”-র শক্তির সমতুল্য হতে পারে। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ ভুলভাবে ধরে নেন, এই ডেটা সেন্টার হয়তো পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো বিপদ তৈরি করবে বা তেজস্ক্রিয়তা ছড়াবে। কিন্তু বাস্তব বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা।

এখানে “পারমাণবিক বোমা” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে শুধুমাত্র শক্তির পরিমাণ বোঝানোর জন্য। হিরোশিমার বোমা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিপুল শক্তি মুক্তি দিয়েছিল। অন্যদিকে একটি ডেটা সেন্টার ধীরে ধীরে ২৪ ঘণ্টা ধরে তাপ উৎপন্ন করে। অর্থাৎ মোট শক্তির পরিমাণ কিছু ক্ষেত্রে তুলনীয় হলেও শক্তি নির্গমনের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনও বিস্ফোরণ নেই, তেজস্ক্রিয়তা নেই, ধ্বংসাত্মক শকওয়েভ নেই, কিংবা মাশরুম মেঘও নেই।

তবুও এই তুলনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। কারণ বহু বিজ্ঞানীর মতে, “২৩টি পারমাণবিক বোমা” শব্দবন্ধ সাধারণ মানুষের মনে ভয় তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। অনেক সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট প্রসঙ্গ না বুঝেই এই বক্তব্য প্রচার করতে শুরু করে। ফলে অনেকেই ধরে নেন, এআই অবকাঠামো সরাসরি পারমাণবিক বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে চলেছে। বাস্তবে এটি মূলত শিল্পস্তরের তাপ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়।

বর্তমানে আধুনিক এআই ডেটা সেন্টারগুলি প্রচলিত ক্লাউড সার্ভারের তুলনায় অনেক বেশি ঘন কম্পিউটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে। কয়েক বছর আগেও একটি সাধারণ সার্ভার র্যাক হয়তো ৫ থেকে ১০ কিলোওয়াট তাপ উৎপন্ন করত। কিন্তু আধুনিক এআই GPU র্যাক অনেক ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ১২০ কিলোওয়াট পর্যন্ত তাপ উৎপন্ন করতে পারে। অর্থাৎ একই জায়গায় তাপের ঘনত্ব কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এখন “ডেটা সেন্টার হিট আইল্যান্ড এফেক্ট” নিয়েও আলোচনা শুরু করেছেন। শহরে কংক্রিট এবং শিল্প কার্যকলাপ যেভাবে স্থানীয় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, তেমনি বিশাল এআই ক্যাম্পাসও আশেপাশের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট তাপচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে এখন শিল্প অবকাঠামোর তাপমাত্রাগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

এআই শিল্প বর্তমানে যেভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারগুলি বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি বড় অংশ দখল করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণেও এআই-নির্ভর বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই মডেল প্রশিক্ষণ এবং বাস্তবসময়ের এআই পরিষেবা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

এই কারণেই স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট এখন শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয়; এটি এআই যুগের শক্তি সংকটের প্রতীক হিসেবেও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।

স্ট্র্যাটোস প্রজেক্টকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা শুধুমাত্র বিদ্যুৎ খরচ নয়, বরং এই বিপুল পরিমাণ তাপ এবং অবকাঠামো স্থানীয় পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েই। উটাহের হ্যানসেল ভ্যালি অঞ্চল মূলত একটি মরুভূমি ঘেরা অববাহিকা এলাকা। ভূগোলবিদদের ভাষায় এটিকে “বোল-শেপড বেসিন” বলা হয়। অর্থাৎ চারদিক তুলনামূলক উঁচু এবং মাঝের অংশ নিচু। এই ধরনের অঞ্চলে তাপ অনেক সময় সহজে বাইরে বেরোতে পারে না। ফলে বিশাল শিল্পাঞ্চল বা বৃহৎ তাপ উৎপাদনকারী অবকাঠামো তৈরি হলে স্থানীয় আবহাওয়ায় পরিবর্তন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পরিবেশবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই ধরনের গিগাওয়াট-স্তরের ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস আশেপাশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে রাতের দিকে সমস্যা আরও বেশি হতে পারে। সাধারণত মরুভূমি এলাকায় দিনের বেলা তাপমাত্রা বেশি হলেও রাতে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। কিন্তু যদি কোনও বিশাল শিল্প অবকাঠামো সারাক্ষণ তাপ নির্গত করতে থাকে, তাহলে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকতে পারে। একে বলা হয় “নাইট-টাইম ওয়ার্মিং এফেক্ট”।

এই ধরনের তাপমাত্রা পরিবর্তন স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মরুভূমি অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীরা অত্যন্ত নির্দিষ্ট পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকে। রাতের তাপমাত্রা হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বহু ছোট প্রাণী, সরীসৃপ এবং মরুভূমির উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু পরিবেশ বিজ্ঞানী সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের তাপ নির্গমন স্থানীয় পরিবেশকে আরও শুষ্ক করে তুলতে পারে এবং মরুকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

উটাহ অঞ্চলের আরেকটি বড় পরিবেশগত সংকট হল গ্রেট সল্ট লেকের দ্রুত সংকোচন। গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত জল ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে এই বিশাল হ্রদের জলস্তর ক্রমশ কমে গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, যদি একই অঞ্চলে আরও বৃহৎ শিল্প অবকাঠামো গড়ে ওঠে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি ও জল ব্যবহার শুরু হয়, তাহলে পুরো এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য আরও নষ্ট হতে পারে।

সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে জল ব্যবহার নিয়ে। সাধারণ মানুষের ধারণা, ডেটা সেন্টার মানে শুধুমাত্র কম্পিউটার আর বিদ্যুৎ। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের হাইপারস্কেল এআই ক্যাম্পাস পরিচালনা করতে বিপুল পরিমাণ জলের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ অধিকাংশ বৃহৎ ডেটা সেন্টারে তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য কুলিং টাওয়ার এবং শিল্পস্তরের জলভিত্তিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। গরম সার্ভার থেকে উৎপন্ন তাপ কমাতে ক্রমাগত ঠান্ডা জল প্রবাহিত করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বৃহৎ ডেটা সেন্টার প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার জল ব্যবহার করতে পারে। যদিও স্ট্র্যাটোস প্রজেক্টের নির্মাতারা দাবি করেছেন, তারা সাধারণ পানীয় জল ব্যবহার করবে না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে নোনতা ভূগর্ভস্থ জল এবং বিকল্প শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বায়ুভিত্তিক শীতলীকরণ প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে পরিবেশবিদদের অনেকেই এই আশ্বাসে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। কারণ মরুভূমি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিপুল পরিমাণ জল তোলা শুরু হলে আশেপাশের পরিবেশ, কৃষি এবং স্থানীয় জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া নোনতা জল ব্যবহার করলেও সেই জলকে শিল্প ব্যবস্থার উপযোগী করে তুলতে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়।

এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। প্রায় ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গেলে শুধুমাত্র কয়েকটি ট্রান্সমিশন লাইন যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন হতে পারে আলাদা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড সংযোগ এবং বিশাল পরিকাঠামো। শক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এআই শিল্পের জন্য আলাদা বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতেই হতে পারে।

এই কারণেই বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে আবার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তির মতো নবীকরণযোগ্য শক্তি সবসময় স্থির বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে না। কিন্তু এআই ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ফলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এখন বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে শুরু করেছে।

মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজন এবং অন্যান্য বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থা ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে নতুন ডেটা সেন্টার তৈরির দৌড়ে নেমেছে। বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই-এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পর থেকে GPU এবং বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছে। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, একটি বৃহৎ এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে কয়েক লক্ষ পরিবারের এক বছরের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান শক্তি প্রয়োজন হতে পারে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার কি বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করবে? কারণ আগামী দিনে শুধু প্রযুক্তি সংস্থাই নয়, ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মোবাইল পরিষেবাও এআই নির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা এবং আকার— দুটিই দ্রুত বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, আগামী দশকে এআই শিল্প বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এমন চাপ তৈরি করতে পারে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। কিছু বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র ডেটা সেন্টার শিল্পই বহু দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করতে পারে। ফলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র, নতুন গ্রিড ব্যবস্থা এবং নতুন শক্তি নীতি তৈরি করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

তবে এই পুরো বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। বহু বিজ্ঞানীর মতে, “২৩টি পারমাণবিক বোমা” তুলনাটি বাস্তব পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করে তুলেছে। কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই “পারমাণবিক বোমা” শব্দ শুনলে বিস্ফোরণ, ধ্বংস এবং তেজস্ক্রিয়তার কথা ভাবেন। বাস্তবে এখানে বিষয়টি শুধুমাত্র শক্তির পরিমাণ বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এই ধরনের ভাষা সাধারণ মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।

তবুও এই বিতর্ক একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে— এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র সফটওয়্যার বা কম্পিউটারের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিদ্যুৎ, জল, পরিবেশ, আবহাওয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতির মতো বিশাল ক্ষেত্র। স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

13/05/2026

বিস্কুট
বিস্কুট উৎপাদনে এক সময় মাখন বা ডালডা (বনস্পতি) ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ড ব্যাপকভাবে পাম তেল ব্যবহার করে থাকে। এর কারণ এই তেলের দাম ডালডা বা অন্যান্য ভোজ্য তেলের দামের তুলনায় অনেক কম। এটি উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীল থাকে এবং বিস্কুটের 'শেলফ লাইফ' বা স্থায়িত্ব বাড়ায়। সেই সঙ্গে বিস্কুটকে বাড়তি মচমচে ভাব দেয়। তবে খাদ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই তেলের ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ এর উচ্চমাত্রার স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি স্বাস্থ্য সচেতন মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাঁদের মতে নিয়মিত পাম তেল সমৃদ্ধ বিস্কুট খাওয়া শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
পাম তেল সরাসরি বিষ না হলেও এতে প্রায় ৫০% স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। এর ফলে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (LDL) বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিস্কুট তৈরির সময় পাম তেলকে অনেক সময় 'হাইড্রো জেনারেটেড' করা হয়, যা থেকে ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাট তৈরি হতে পারে। এই ফ্যাট শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ইদানিং অধিকাংশ বিস্কুটই খেতে মিষ্টি। এর কারণ ময়দা ও পাম তেলের সাথে থাকে প্রচুর চিনি বা মিষ্টিজাতীয় কোনো পদার্থ। এই ধরনের মিশ্রণে তৈরি বিস্কুট পরিমিত পরিমাণে খেলে তাৎক্ষণিক কোনো বিপদ নেই। তবে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে খেলে দীর্ঘমেয়াদে হার্টের সমস্যা ও ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সবচাইতে নিরাপদ হলো ঘরে মাখন বা অলিভ অয়েল দিয়ে বানানো বিস্কুট। কেনা বিস্কুট খেতে হলে দিনে ১-২টা খান।
বাজারে কিছু বিস্কুট পাওয়া যায় যেগুলি মাখন, অলিভ অয়েল বা রাইস ব্রান অয়েল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। এগুলি শরীরের পক্ষে কম ক্ষতিকর। তাই বিস্কুট কেনার আগে প্যাকেটের গায়ে লেখা উপাদানগুলির মধ্যে কোন তেল ব্যবহার করা হয়েছে দেখে নিন। মাখন ব্যবহার করে তৈরি বিস্কুটগুলি সাধারণত কুকিজ নামে পরিচিত।
©কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

12/05/2026

দেবব্রত চক্রবর্তী লিখেছেন

তেল কম খান / এত দিনে চোখ খুলছে?

১৯৯০ সাল অবধি ভারত ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে স্ব-নির্ভর ছিল। সরিষা তিল বাদাম নারিকেল এই ছিল আমাদের ভোজ্য তেল। তেল এদেশেই ছোট বড় উৎপাদক'রা বানাতেন আর তেলের খোল চলে যেত পশুখাদ্য আর চাষের জমিতে। ভোজ্য তেল আমদানিতে আমাদের ১ ডলার ও ব্যয় হোতনা।

তার পর থেকে বিদেশি মুদ্রা খরচ করে আমদানি শুল্ক কমিয়ে আমদানি করা শুরু হোল চুড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর পাম তেল, সোয়াবিন এবং সানফ্লাওয়ার। দেশের চাষি তৈলবীজ উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে থাকলো -আজ আমরা আমাদের প্রয়োজনের 57% ভোজ্যতেল অন্যদেশ থেকে ডলার খরচ করে আমদানি করি।

বিশ্বব্যাপী সস্তার পাম তেলের বিপুল চাহিদার ফলে সাফ হতে থাকলো বোর্নিও'র আদিম অরন্য, আমাদের সমস্ত ভাজাভুজি,পাঁউরুটি, বিস্কুট চ্যানাচুর মায় পাড়ার মাসিমার দোকানের আলুর চপ থেকে সাবান লিপস্টিকে ব্যবহৃত হতে থাকলো অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পাম তেল।

১৯৯০ সালের পুর্বে ভারতবাসী 'পাম অয়েল ' কি জানতোনা, আর আজ আমরা ১০ মিলিওন মেট্রিক টন পাম তেল ব্যবহার করি। কেবল মাত্র ২০২৩-২০২৪ আর্থিক বছরে আমরা 15.66 million tonnes আমদানি করেছি,যার আর্থিক মুল্য $15 billion.

উনি বলছেন ১০% তেল কম খান আর এদিকে ৩১শে মে ২০২৫ সালে ভোজ্য তেলের ওপর আমদানি শুল্ক ২৭.৫% থেকে কমিয়ে ১৬.৫% এ নিয়ে এসেছেন যাতে আরো তেল আমদানি হয়, দেশের তৈলবীজ উৎপাদক রা আগ্রহ হারায়, আরো ডলার ব্যয় হয়,সরকার কম রেভেনিউ পায় আর বিকানির ভুজিয়াওয়ালা হলদিরাম সমেত হাজারো ভুজিয়াওয়ালাদের প্রোডাকশন কস্ট কম থাকে।

যদি সত্যিই উনি কমিটেড হন তাহলে দেশের তৈলবীজ উৎপাদক চাষিদের MSP বাড়ান, আমদানি শুল্ক প্ল্যানফুলি ২বছর তিন বছরে ডাবল এমনকি ট্রিপল করুন, যাতে পাম তেল, সোয়াবিন সানফ্লাওয়ার আমদানি কমে। ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার ভোজ্য তেল আমদানির বিল ফরেন রিসার্ভ থেকে না বেরোয় -এবং ভারত আবার ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে ১৯৯০ সালের পুর্বে - মানে স্বনির্ভরতায় ফিরে যায়। ভারতে ১৪০০০ ছোট বড় অয়েল মিল আছে যাদের ৮৫% তাদের ক্যাপাসিটির মাত্র ৩০% ব্যবহার করে - কারন পলিসি হচ্ছে ডলার ব্যয় করে ভোজ্য তেল আমদানি করা। অন্য দেশের ওপর নির্ভরতা যে কোন সময়ে ফুড ইনিসিকিউরিটি সৃষ্টি করতে পারে।

09/05/2026

সুব্রত ঘোষ লিখেছেন

প্রতি বছর পুজোর আগে টিভি খুললেই দেখি — বনেদি বাড়ির ঝাড়বাতি, ঢাক, বংশের ইতিহাস ইত্যাদির গল্প। বলিউডের সিনেমাতেও কলকাতা মানেই বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো একটা আলাদা জায়গা পেয়ে গেছে — যেন এই বৈভবই বাংলার সংস্কৃতির একমাত্র প্রতিনিধি। ক্যামেরা জুম করে ঠাকুর দালানের ডোরিক থামের গায়ে, পদ্ম খিলানে, পঙ্খ বা ফুলকারির কাজে। খড়খড়ি ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আবেগাপ্লুত উপস্থাপিকা নহবত খানা দেখাতে এগিয়ে যান। নিচে নাটমন্দিরে দাঁড়িয়ে ভ্লগাররা ওড়ায় ড্রোণ।

কিন্তু একটা প্রশ্ন কেউ করে না।
এই বাড়িগুলোর বনেদ গড়ে তোলার মূলধন কোথা থেকে এলো?

উনিশ শতকের বাংলায় যে পরিবারগুলো ব্রিটিশ শাসনের ছায়ায় বেড়ে উঠেছে — জমিদারি, নীলের ব্যবসা, কোম্পানির দালালি — তাদের সম্পদের শিকড় আছে অনেক গভীরে। অনেক ক্ষেত্রেই সেই ঝাড়বাতির পেছনে আছে নীলচাষীর পিঠে পড়া চাবুক, রায়তের কেড়ে নেওয়া জমি, প্রজার জোর করে আদায় করা খাজনা। সেই শ্রম, সেই কষ্ট, সেই রক্ত — সব জমাট বেঁধে গেছে বনেদিয়ানার ঝাড়বাতিতে, ডোরিক থামে আর পুজোর থালায়। যারা সেই শ্রম দিয়েছিল তারা কবে মরে গেছে। কিন্তু তাদের শ্রমের ভূত এখনো বেঁচে আছে — প্রতি বছর পুজোর আলো জ্বলে উঠলেই তাদের দেখা যায়।

মার্ক্স এই ঘটনার একটা নাম দিয়েছিলেন — মৃত শ্রম। ডেড লেবার।

কল্পনা করুন একটি কারখানা। ভোরবেলা একজন নতুন শ্রমিক ঢুকছেন। মেশিনগুলো স্থির, অপেক্ষমাণ। সুইচ টিপতেই শব্দ শুরু হয়। চাকা ঘোরে। কিন্তু অল্প সময়েই বোঝা যায় — তিনি মেশিন চালাচ্ছেন না। মেশিনই তাকে চালাচ্ছে। তার হাতের গতি, তার শ্বাসের ছন্দ, তার বিশ্রামের সময় — সব নির্ধারিত হচ্ছে যন্ত্রের নিয়মে।

এই যন্ত্র কে বানিয়েছিল? অনেক আগে, অনেক শ্রমিক। তাদের শ্রম জমাট বেঁধে যন্ত্র হয়ে গেছে। তাঁরা আর নেই। কিন্তু তাঁদের শ্রমের ভূত এখনও আছে — যন্ত্রের ভেতরে, কাঠামোর ভেতরে। এবং সেই ভূত আজকের জীবন্ত শ্রমিককে শাসন করছে।

ক্যাপিটাল-এ মার্ক্স লিখেছিলেন — মৃত শ্রম, ভ্যাম্পায়ারের মতো, জীবন্ত শ্রম শুষে বেঁচে থাকাই তার কাজ। আর যত বেশি শোষণ করে, তত বেশি বাঁচে।

বনেদি বাড়ির পুজোয় ঝাড়বাতির দিকে তাকালে কী দেখি? সোনালি আলো, কারুকাজ, পুরনো বৈভব। কিন্তু সেই বৈভব কীভাবে তৈরি হয়েছিল — সেটা দেখা যায় না। পণ্য তার জন্মের ইতিহাস মুছে ফেলে। শুধু থাকে চাকচিক্য।

মার্ক্স এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়াকে বলেছিলেন পণ্য-পূজা। মানুষের শ্রম যখন বস্তুর মধ্যে ঢুকে যায়, তখন সেই বস্তু নিজেই একটা রহস্যময় সত্তা হয়ে ওঠে — যেন তার মূল্য সে নিজেই তৈরি করেছে, কোনো মানুষের ঘাম ছাড়াই। ঝাড়বাতি জ্বলে। নীলচাষী মরে যায়। দুটোর মধ্যে সংযোগ কেউ খোঁজে না।

শিল্প বিপ্লবের আগে একজন তাঁতি বা কামার নিজেই নিজের যন্ত্রের মালিক ছিলেন, নিজের গতিতে কাজ করতেন। কিন্তু বড় কারখানা আর স্টিম ইঞ্জিন আসার পরে পরিস্থিতি বদলে গেল। বিশাল যন্ত্রের সামনে মানুষ হয়ে পড়ল তার একটা ছোট অংশ। আগে মানুষ যন্ত্র চালাত, এখন যন্ত্র মানুষকে চালাতে শুরু করল।

বোলপুরে ভাড়া বাড়িতে একা থাকতাম যখন, কাজ করতেন একজন। সন্তোষদা। সপ্তাহে দু-তিনদিন আসতেন। এক বালতি কাপড় কাচার জন্য নিতেন কুড়ি টাকা। সেটা ছিল তার বাড়তি রোজগার। আঠারো বছর আগের কথা।

তারপর একদিন ওয়াশিং মেশিন কিনলাম। সুবিধার জন্য। খরচ কমবে ভেবে। কিন্তু সেই মুহূর্ত থেকে তার কুড়ি টাকাটা বন্ধ হয়ে গেল। আমি কাউকে ছাড়াইনি। কোনো ঝগড়া হয়নি। শুধু একটা যন্ত্র এলো এবং একটা মানুষের রোজগারের একটা অংশ চলে গেল।

সেই যন্ত্রের ভেতরেও আছে কারখানার শ্রমিকের শ্রম, ইঞ্জিনিয়ারের শ্রম, ডিজাইনারের শ্রম। তারা কেউ আর সেই মুহূর্তে নেই। কিন্তু তাদের জমাট শ্রম প্রতিদিন আমার বাড়িতে কাজ করছে — এবং একজন জীবন্ত মানুষের কাজ কেড়ে নেয়।

এটাই মৃত শ্রমের ভূতের মতো ক্ষমতা।

বীরভূমের মাঠে এখন ধান কাটার মরসুমে হার্ভেস্টার আসে। একটা মেশিন এক দিনে যা কাজ করে, একশো শ্রমিক সপ্তাহভর খেটে সেটা করতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে। মেশিনের ভেতরে আছে অন্য কারখানার অন্য শ্রমিকদের জমাট শ্রম। সেই মৃত শ্রম এসে এই মাঠের জীবন্ত শ্রমিকদের সরিয়ে দিচ্ছে। তারা কোথায় যাবেন? শহরে। সেখানে আবার অন্য মৃত শ্রম অপেক্ষা করছে।

কিন্তু এই বাস্তুচ্যুতিকে কেউ সমস্যা বলে না। বলা হয় — "প্রযুক্তির অগ্রগতি।" "উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।" যে শ্রমিক কাজ হারালেন, তাকে বলা হয় — "নতুন দক্ষতা শেখো।" অর্থাৎ মৃত শ্রমের আঘাতের দায় চাপানো হয় জীবন্ত শ্রমিকের ঘাড়ে।

দাদু জমি রেখে গেছেন। তিনি নেই। কিন্তু তাঁর শ্রম আছে — মাটির ভেতরে জমাট হয়ে। সেই মৃত শ্রম আজও কিছুটা হলেও ধরে রেখেছে। গ্রামের ঘোষেদের ছেলে হেসে খেলে দিন কাটায় — পূর্বপুরুষের জমাট শ্রম এত বেশি যে সে নিজে না খাটলেও চলে। আর জিতেন দুলে আমাদের মাঠে খেটেছেন, সেও খাটছে, তার ছেলেও খাটবে — কারণ তাদের মৃত শ্রম জমাট বাঁধেনি, সব খরচ হয়ে গেছে বেঁচে থাকতে।

এদের জন্মের দোষ কী ছিল?

কিন্তু ভ্যাম্পায়ার শুধু রক্ত চোষে না। শিকার যাতে পালাতে না পারে — সেটাও নিশ্চিত করে।

পুঁজিবাদী কাঠামোয় শ্রমিকের শরীর সবসময় "পণ্য" — এই সত্যটা সবচেয়ে নগ্নভাবে দেখা গিয়েছিল ১৭৮১ সালে। ঘানা থেকে ৪৪২ জন মানুষকে শিকলে বেঁধে জ্যামাইকার দিকে রওনা হয়েছিল জং জাহাজ। মাঝ আটলান্টিকে পানীয় জলের অভাব দেখা দিল। ক্যাপ্টেন লিউক কলিংউড তখন একটা হিসাব কষলেন — মানবিক নয়, আইনি।

সেই আমলের বিমা আইনে দুটো আলাদা নিয়ম ছিল। দাস যদি অসুস্থ হয়ে জাহাজের ভেতরে মারা যায় — সেটা মালিকের ক্ষতি, বিমা কোম্পানি কিছু দেবে না। কিন্তু যদি জাহাজ বিপদে পড়ে এবং "পণ্য বাঁচাতে পণ্য ফেলতে হয়" — সেটা বিমাযোগ্য ক্ষতি, প্রতিটি মরদেহের বদলে ৩০ পাউন্ড পাওয়া যাবে। অর্থাৎ দাসরা জলে মারা গেলে টাকা মেলে, জাহাজে মারা গেলে মেলে না।

কলিংউড সিদ্ধান্ত নিলেন — অসুস্থ হওয়ার আগেই ফেলে দাও।

সেকালে দাসদের পায়ে পরানো হতো "লেগ বোল্ট" — লোহার দণ্ডে দুজনকে জোড়ায় জোড়ায় বেঁধে রাখা হতো। একজনকে জলে ফেলা মানে অন্যজনও ডুববে — শিকল ছেঁড়ার উপায় নেই, চাবি থাকত ক্যাপ্টেনের কাছে। ২৯ নভেম্বর থেকে শুরু হলো। একজন একজন করে সমুদ্রে তলিয়ে গেল মোট ১৩২ জন।

আদালতে মামলা উঠল। বিচারপতি লর্ড ম্যানসফিল্ড রায় দিলেন — এই ঘটনা ঘোড়া বা অন্য পণ্য নষ্ট হওয়ার চেয়ে আলাদা কিছু নয়।

আদালত ভুল বলেনি। কারণ আইনটাই সেভাবে লেখা হয়েছিল। ওই মানুষগুলো আইনের চোখে মানুষ ছিল না — ছিল বিমা করা সম্পত্তি। কাঠামো আগেই ঠিক করে দিয়েছিল কে মানুষ, কে পণ্য।

আটলান্টিকের জাহাজে ছিল শ্রমিকদের পায়ে শিকল। আনন্দপুরের কারখানা বাইরে থেকে তালা দিয়ে রেখেছিল ম্যানেজার।

২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ভোররাতে কলকাতার আনন্দপুরের একটি মোমো কারখানায় আগুন লাগে। তদন্তে উঠে আসে — অগ্নিকাণ্ডের রাতে কারখানার দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। ভেতরে থাকা শ্রমিকরা বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও পারেননি। কেউ কেউ পরিবারকে ফোন করে নিজের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। কারখানাটি ছিল অনুমোদনহীন — প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল কমপক্ষে আট।

দুটো ঘটনার মাঝে দুশো বছরের ব্যবধান। কাঠামোটা একটাই।

জং জাহাজে আইন আগেই ঠিক করে দিয়েছিল শ্রমিকের জীবনের দাম। আনন্দপুরে রাষ্ট্র আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল — অনুমোদনহীন কারখানা চলবে, শ্রম আইন মানা হবে না, মুনাফা আসবে। মৃত পুঁজির লোভ, পুরনো কাঠামোর ফাঁকি — সব জমাট বেঁধে ওই দরজার তালায় পরিণত হয়েছিল। শ্রমিকের জীবন সেখানেও "পণ্য" — লোকসান হলে ছেঁটে ফেলা যায়, পুড়ে গেলেও ক্ষতি নেই।

কিন্তু মার্ক্সের মৃত শ্রম শুধু যন্ত্রে বা তালায় থাকে না। কখনো কখনো সে শরীরেও ঢুকে পড়ে।

মহারাষ্ট্রের বিড় জেলা। খরাপ্রবণ, ধূসর। প্রতি বছর দশেরার পরে এখানকার হাজার হাজার পরিবার পাড়ি দেয় পশ্চিম মহারাষ্ট্রের আখের ক্ষেতে। স্বামী-স্ত্রী জোড়া শ্রমিক হিসেবে কাজ পায়। মরসুমের শুরুতে দেওয়া হয় অগ্রিম টাকা — যাকে বলে "উচল"। সেই টাকা হাতে নেওয়া মানে ফাঁদে পড়া। এখন থেকে শরীর আর নিজের নয়।

একজন নারীর পিরিয়ড হলে দু-তিনদিন কাজ কামাই হয়। কামাই মানেই জরিমানা। ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়। তখন কন্ট্রাক্টররা বোঝায় — জরায়ু বাদ দাও। পিরিয়ড হবে না। কাজ থামবে না।

স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিক সুযোগ বুঝে বলে — জরায়ুতে পচন ধরেছে, ক্যান্সার হতে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় অস্ত্রোপচার। সেই টাকাও অনেক সময় দেয় কন্ট্রাক্টর নিজে — কারণ তারা জানে একবার জরায়ু গেলে ওই নারী আরও কয়েক বছর বাধাহীনভাবে খাটবে।

বিড় জেলায় এভাবে ১৩ থেকে ১৪ হাজার নারীর জরায়ু কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকের বয়স ২৫-এর নিচে।

মৃত শ্রম জীবন্ত শ্রমকে শাসন করে। বিড়ে সেটা আর রূপক নয়। চিনিকলের মৃত পুঁজি — যন্ত্র, চুক্তি, ঋণের কাঠামো — একজন জীবন্ত নারীর শরীরের ভেতরে ঢুকে তার জরায়ু পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। ভূত আর বাইরে নেই। সে ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

সম্প্রতি দেখা গেছে একটি কারখানায় শ্রমিক কাজ করছেন — মাথায় ক্যামেরা বাঁধা। সেই ক্যামেরা রেকর্ড করছে তাঁর প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি দক্ষতা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত। এই ডেটা দিয়ে AI শিখছে। এবং সেই AI একদিন এই শ্রমিকের কাজটাই করবে — তাঁকে ছাড়া।

শ্রমিক নিজেই নিজের ভূত তৈরি করছেন।

জং জাহাজে শ্রমিকের শরীর ছিল বিমার পণ্য। আনন্দপুরে শ্রমিকের জীবন ছিল মুনাফার বাধা। বিড়ে শ্রমিকের জরায়ু ছিল উৎপাদনের অন্তরায়। আর এই কারখানায় শ্রমিকের দক্ষতা হলো ডেটা — যা একবার সংগ্রহ হয়ে গেলে তাকে আর দরকার পড়বে না।

প্রতিবার একই প্রক্রিয়া। শ্রমিকের শরীর থেকে যা নেওয়ার নিয়ে নাও, তারপর ছুঁড়ে ফেলো।

এই সিরিজে এতদিন দেখেছি — শরীরে থাকে জৈবিক ভূত। সে থাকে DNA-তে, microbiome-এ পূর্বপুরুষের স্মৃতিতে। মার্ক্স দেখালেন শরীরে থাকে সামাজিক ভূতও। অতীতের শ্রম, পুঁজির কাঠামো, মৃত মানুষের তৈরি নিয়ম — সেগুলো জীবন্ত মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করে।

ভূত এখন শ্মশানে থাকে না। সে থাকে কারখানায়, অ্যালগরিদমে, চুক্তির কাগজে, বন্ধ দরজার তালায়।

জৈবিক ভূত আমরা বেছে নিইনি। সামাজিক ভূতও আমরা বেছে নিইনি। কিন্তু একটা পার্থক্য আছে। জৈবিক ভূত বদলাতে লাগে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সামাজিক ভূত তখনই বদলানো যায় যদি তাকে দেখা যায়। যদি তার নাম দেওয়া যায়। যদি বোঝা যায় সে কোথা থেকে এসেছে।

বিড়ের সেই ২৫ বছরের নারী জানেন না মার্ক্সের নাম। কিন্তু তার শরীরেই লেখা আছে মার্ক্সের বলা সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্যটা।

আনন্দপুরের সেই শ্রমিক জানতেন না এই তালার পেছনে কোন তত্ত্ব কাজ করছে। কিন্তু তিনি দরজা ঠেলেছিলেন। বাঁচতে চেয়েছিলেন।

হয়তো এই কারণেই মৃত শ্রমকে মার্ক্স ভ্যাম্পায়ারের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
ভ্যাম্পায়ার শুধু রক্ত খায় না। সে অমরও হয় — এক শরীর থেকে আরেক শরীরে সরে গিয়ে।

জং জাহাজ ডুবে গেছে। নীলকুঠি ভেঙে পড়েছে। অনেক বনেদি বাড়ির দেওয়ালে এখন স্যাঁতসেঁতে দাগ। কিন্তু ভূতগুলো মরে যায়নি। তারা শুধু শরীর বদলেছে।

যে রাষ্ট্রের এই হিসাব রাখার কথা ছিল — সেও নিজেও এই কাঠামোর অংশ হয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভোট নেয়, বাজেট বানায়, সংসদে বক্তৃতা দেয়। কিন্তু অনুমোদনহীন কারখানা চলতে দেয়। শ্রম আইন কাগজেই লেখা থাকে। বিড়ের ক্লিনিক বন্ধ হয় না। কারণ মৃত পুঁজির সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা পুরনো বোঝাপড়া আছে — ভূতকে বাঁচিয়ে রাখো, নিজে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকো। গণতন্ত্র এই ভূতকে হত্যা করে না। সে শুধু তার নাম বদলে দেয়। বলে — উন্নয়ন। বিনিয়োগ। কর্মসংস্থান।

আইনের খাতায় এই ঋণের কোনো হিসাব নেই। কারণ যারা পাওনাদার, তারা মরে গেছে। যারা বেঁচে আছে, তারা জানে না দাবি করতে হয়। আর যারা বকেয়া রেখেছে — তারা প্রতি বছর পুজোয় ঝাড়বাতি জ্বালায়।

Address

Kolkata
700041

Telephone

+919477236962

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Mrittika-The Eco Warrior posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Organization

Send a message to Mrittika-The Eco Warrior:

Share