18/05/2026
প্রতিদিন ২৩টি পারমাণবিক বোমার সমান তাপ ছড়াবে এই এআই ডেটা সেন্টার!
---
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ মরুভূমি অঞ্চল হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। কারণ সেখানে তৈরি হতে চলেছে এমন এক বিশাল এআই ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস, যাকে ঘিরে এখন প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং বিদ্যুৎ সংকট— তিনটিই একসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। “স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট” নামে পরিচিত এই প্রস্তাবিত এআই অবকাঠামো প্রকল্পকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়েছে একটি দাবি— এই ডেটা সেন্টার প্রতিদিন এমন পরিমাণ তাপ পরিবেশে ছড়াতে পারে, যা “২৩টি পারমাণবিক বোমা”-র শক্তির সমান। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়া, প্রযুক্তি মহল এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।
(প্রতিবেদনটি বড় আছে তাই সময় নিয়ে পড়তে হবে)
প্রকল্পটির অবস্থান উটাহের বক্স এল্ডার কাউন্টি এবং হ্যানসেল ভ্যালি অঞ্চলে। জায়গাটি মূলত মরুভূমি ঘেরা এক বিশাল অববাহিকা এলাকা, যেখানে জনসংখ্যা কম এবং বিপুল ফাঁকা জমি রয়েছে। বর্তমানে এআই শিল্প যেভাবে দ্রুত গতিতে বৃহৎ ডেটা সেন্টার তৈরি করছে, তাতে এমন দূরবর্তী অঞ্চলগুলোকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে। কারণ এই ধরনের ক্যাম্পাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় হাজার হাজার একর জমি, বিশাল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শিল্পস্তরের শীতলীকরণ অবকাঠামো।
এই স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পুরো ক্যাম্পাস প্রায় ৪০ হাজার একর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তুলনা হিসেবে অনেক প্রযুক্তি বিশ্লেষক বলছেন, এর আয়তন নিউ ইয়র্কের ম্যানহ্যাটনের থেকেও বড় হতে পারে। আবার কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অবকাঠামোর বিস্তার প্রায় ২০০০ ওয়ালমার্ট সুপারসেন্টারের সমান। যদিও এই তুলনাগুলি মূলত প্রকল্পের বিশালতা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, তবুও এতে সহজেই বোঝা যায় যে এটি সাধারণ ডেটা সেন্টার নয়, বরং একটি শিল্পনগরীর সমতুল্য প্রযুক্তি অবকাঠামো।
বর্তমানে জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির বিস্ফোরক বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার শিল্প একেবারে নতুন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আগে সাধারণ ইন্টারনেট সার্ভার মূলত ওয়েবসাইট চালানো, ক্লাউড স্টোরেজ বা ভিডিও স্ট্রিমিং পরিষেবার জন্য ব্যবহার হত। কিন্তু এখন ChatGPT, Gemini, Claude বা Midjourney-এর মতো এআই মডেল চালানোর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে হাজার হাজার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন GPU ক্লাস্টার। এই ধরনের এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে এবং প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যবহারকারীর অনুরোধের উত্তর দিতে বিপুল কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন হয়।
একটি বৃহৎ ভাষা মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় কয়েক হাজার GPU একসঙ্গে সপ্তাহের পর সপ্তাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। প্রতিটি GPU কয়েকশ ওয়াট থেকে এক কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ করতে পারে। যখন হাজার হাজার GPU একসঙ্গে সমান্তরাল প্রক্রিয়াকরণে কাজ করে, তখন পুরো ব্যবস্থার বিদ্যুৎ চাহিদা ছোট একটি শহরের সমান হয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা, ডেটা স্টোরেজ, স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শীতলীকরণ প্রযুক্তি।
স্ট্র্যাটোস প্রজেক্টের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হল এর সম্ভাব্য বিদ্যুৎ চাহিদা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি পূর্ণ ক্ষমতায় চালু হলে প্রায় ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা প্রয়োজন। উটাহ রাজ্যের বর্তমান সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৪ থেকে ৫ গিগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করে। অর্থাৎ, একটি মাত্র এআই ক্যাম্পাস গোটা রাজ্যের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবহারের থেকেও বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে— এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বহু শক্তি বিশেষজ্ঞ।
সাধারণ মানুষের কাছে ডেটা সেন্টার মানে হয়তো কয়েকটি কম্পিউটার রাখা ঘর। কিন্তু বাস্তবে হাইপারস্কেল এআই ক্যাম্পাস অনেকটা শিল্পাঞ্চল বা ছোট শহরের মতো। বিশাল গুদামঘরের ভিতরে সারি সারি হাজার হাজার সার্ভার র্যাক বসানো থাকে। প্রতিটি র্যাক থেকে নিরন্তর তাপ বের হতে থাকে। কারণ বিদ্যুতের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত তাপশক্তিতে পরিণত হয়। CPU এবং GPU যত বেশি কাজ করে, তত বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো ব্যবস্থা বিকল হয়ে যেতে পারে।
এই কারণেই শীতলীকরণ ব্যবস্থা এআই ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির একটি। বিশাল বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, শিল্পস্তরের কুলিং টাওয়ার, তরল শীতলীকরণ পাইপলাইন এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্যই মোট বিদ্যুৎ খরচের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয়। অর্থাৎ এআই অবকাঠামো যত বাড়ছে, তাপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনও তত দ্রুত বাড়ছে।
ঠিক এই তাপ উৎপাদন নিয়েই আলোচনায় আসেন উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ডক্টর রব ডেভিস। তিনি এই প্রকল্পের সম্ভাব্য তাপমাত্রাগত চাপ নিয়ে একটি হিসাব প্রকাশ করেন। তাঁর অনুমান অনুযায়ী, পুরো ডেটা সেন্টার চালু হলে মোট তাপশক্তি নির্গমন প্রায় ১৬ গিগাওয়াট সমতুল্য পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর একটি বড় অংশ “বর্জ্য তাপ” হিসেবে আশেপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়বে।
এই হিসাব বোঝাতে গিয়ে তিনি হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার শক্তির সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রতিদিন পরিবেশে যে পরিমাণ তাপ ছড়াবে, তা “প্রায় ২৩টি পারমাণবিক বোমা”-র শক্তির সমতুল্য হতে পারে। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ ভুলভাবে ধরে নেন, এই ডেটা সেন্টার হয়তো পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো বিপদ তৈরি করবে বা তেজস্ক্রিয়তা ছড়াবে। কিন্তু বাস্তব বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা।
এখানে “পারমাণবিক বোমা” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে শুধুমাত্র শক্তির পরিমাণ বোঝানোর জন্য। হিরোশিমার বোমা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিপুল শক্তি মুক্তি দিয়েছিল। অন্যদিকে একটি ডেটা সেন্টার ধীরে ধীরে ২৪ ঘণ্টা ধরে তাপ উৎপন্ন করে। অর্থাৎ মোট শক্তির পরিমাণ কিছু ক্ষেত্রে তুলনীয় হলেও শক্তি নির্গমনের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনও বিস্ফোরণ নেই, তেজস্ক্রিয়তা নেই, ধ্বংসাত্মক শকওয়েভ নেই, কিংবা মাশরুম মেঘও নেই।
তবুও এই তুলনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। কারণ বহু বিজ্ঞানীর মতে, “২৩টি পারমাণবিক বোমা” শব্দবন্ধ সাধারণ মানুষের মনে ভয় তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। অনেক সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট প্রসঙ্গ না বুঝেই এই বক্তব্য প্রচার করতে শুরু করে। ফলে অনেকেই ধরে নেন, এআই অবকাঠামো সরাসরি পারমাণবিক বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে চলেছে। বাস্তবে এটি মূলত শিল্পস্তরের তাপ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়।
বর্তমানে আধুনিক এআই ডেটা সেন্টারগুলি প্রচলিত ক্লাউড সার্ভারের তুলনায় অনেক বেশি ঘন কম্পিউটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে। কয়েক বছর আগেও একটি সাধারণ সার্ভার র্যাক হয়তো ৫ থেকে ১০ কিলোওয়াট তাপ উৎপন্ন করত। কিন্তু আধুনিক এআই GPU র্যাক অনেক ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ১২০ কিলোওয়াট পর্যন্ত তাপ উৎপন্ন করতে পারে। অর্থাৎ একই জায়গায় তাপের ঘনত্ব কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এখন “ডেটা সেন্টার হিট আইল্যান্ড এফেক্ট” নিয়েও আলোচনা শুরু করেছেন। শহরে কংক্রিট এবং শিল্প কার্যকলাপ যেভাবে স্থানীয় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, তেমনি বিশাল এআই ক্যাম্পাসও আশেপাশের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট তাপচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে এখন শিল্প অবকাঠামোর তাপমাত্রাগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এআই শিল্প বর্তমানে যেভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারগুলি বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি বড় অংশ দখল করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণেও এআই-নির্ভর বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই মডেল প্রশিক্ষণ এবং বাস্তবসময়ের এআই পরিষেবা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই কারণেই স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট এখন শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয়; এটি এআই যুগের শক্তি সংকটের প্রতীক হিসেবেও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।
স্ট্র্যাটোস প্রজেক্টকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা শুধুমাত্র বিদ্যুৎ খরচ নয়, বরং এই বিপুল পরিমাণ তাপ এবং অবকাঠামো স্থানীয় পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েই। উটাহের হ্যানসেল ভ্যালি অঞ্চল মূলত একটি মরুভূমি ঘেরা অববাহিকা এলাকা। ভূগোলবিদদের ভাষায় এটিকে “বোল-শেপড বেসিন” বলা হয়। অর্থাৎ চারদিক তুলনামূলক উঁচু এবং মাঝের অংশ নিচু। এই ধরনের অঞ্চলে তাপ অনেক সময় সহজে বাইরে বেরোতে পারে না। ফলে বিশাল শিল্পাঞ্চল বা বৃহৎ তাপ উৎপাদনকারী অবকাঠামো তৈরি হলে স্থানীয় আবহাওয়ায় পরিবর্তন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পরিবেশবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই ধরনের গিগাওয়াট-স্তরের ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস আশেপাশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে রাতের দিকে সমস্যা আরও বেশি হতে পারে। সাধারণত মরুভূমি এলাকায় দিনের বেলা তাপমাত্রা বেশি হলেও রাতে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। কিন্তু যদি কোনও বিশাল শিল্প অবকাঠামো সারাক্ষণ তাপ নির্গত করতে থাকে, তাহলে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকতে পারে। একে বলা হয় “নাইট-টাইম ওয়ার্মিং এফেক্ট”।
এই ধরনের তাপমাত্রা পরিবর্তন স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মরুভূমি অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীরা অত্যন্ত নির্দিষ্ট পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকে। রাতের তাপমাত্রা হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বহু ছোট প্রাণী, সরীসৃপ এবং মরুভূমির উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু পরিবেশ বিজ্ঞানী সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের তাপ নির্গমন স্থানীয় পরিবেশকে আরও শুষ্ক করে তুলতে পারে এবং মরুকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
উটাহ অঞ্চলের আরেকটি বড় পরিবেশগত সংকট হল গ্রেট সল্ট লেকের দ্রুত সংকোচন। গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত জল ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে এই বিশাল হ্রদের জলস্তর ক্রমশ কমে গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, যদি একই অঞ্চলে আরও বৃহৎ শিল্প অবকাঠামো গড়ে ওঠে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি ও জল ব্যবহার শুরু হয়, তাহলে পুরো এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য আরও নষ্ট হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে জল ব্যবহার নিয়ে। সাধারণ মানুষের ধারণা, ডেটা সেন্টার মানে শুধুমাত্র কম্পিউটার আর বিদ্যুৎ। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের হাইপারস্কেল এআই ক্যাম্পাস পরিচালনা করতে বিপুল পরিমাণ জলের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ অধিকাংশ বৃহৎ ডেটা সেন্টারে তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য কুলিং টাওয়ার এবং শিল্পস্তরের জলভিত্তিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। গরম সার্ভার থেকে উৎপন্ন তাপ কমাতে ক্রমাগত ঠান্ডা জল প্রবাহিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বৃহৎ ডেটা সেন্টার প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার জল ব্যবহার করতে পারে। যদিও স্ট্র্যাটোস প্রজেক্টের নির্মাতারা দাবি করেছেন, তারা সাধারণ পানীয় জল ব্যবহার করবে না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে নোনতা ভূগর্ভস্থ জল এবং বিকল্প শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বায়ুভিত্তিক শীতলীকরণ প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে পরিবেশবিদদের অনেকেই এই আশ্বাসে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। কারণ মরুভূমি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিপুল পরিমাণ জল তোলা শুরু হলে আশেপাশের পরিবেশ, কৃষি এবং স্থানীয় জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া নোনতা জল ব্যবহার করলেও সেই জলকে শিল্প ব্যবস্থার উপযোগী করে তুলতে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়।
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। প্রায় ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গেলে শুধুমাত্র কয়েকটি ট্রান্সমিশন লাইন যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন হতে পারে আলাদা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড সংযোগ এবং বিশাল পরিকাঠামো। শক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এআই শিল্পের জন্য আলাদা বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতেই হতে পারে।
এই কারণেই বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে আবার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তির মতো নবীকরণযোগ্য শক্তি সবসময় স্থির বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে না। কিন্তু এআই ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ফলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এখন বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে শুরু করেছে।
মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজন এবং অন্যান্য বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থা ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে নতুন ডেটা সেন্টার তৈরির দৌড়ে নেমেছে। বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই-এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পর থেকে GPU এবং বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছে। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, একটি বৃহৎ এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে কয়েক লক্ষ পরিবারের এক বছরের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান শক্তি প্রয়োজন হতে পারে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার কি বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করবে? কারণ আগামী দিনে শুধু প্রযুক্তি সংস্থাই নয়, ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মোবাইল পরিষেবাও এআই নির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা এবং আকার— দুটিই দ্রুত বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, আগামী দশকে এআই শিল্প বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এমন চাপ তৈরি করতে পারে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। কিছু বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র ডেটা সেন্টার শিল্পই বহু দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করতে পারে। ফলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র, নতুন গ্রিড ব্যবস্থা এবং নতুন শক্তি নীতি তৈরি করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
তবে এই পুরো বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। বহু বিজ্ঞানীর মতে, “২৩টি পারমাণবিক বোমা” তুলনাটি বাস্তব পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করে তুলেছে। কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই “পারমাণবিক বোমা” শব্দ শুনলে বিস্ফোরণ, ধ্বংস এবং তেজস্ক্রিয়তার কথা ভাবেন। বাস্তবে এখানে বিষয়টি শুধুমাত্র শক্তির পরিমাণ বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এই ধরনের ভাষা সাধারণ মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
তবুও এই বিতর্ক একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে— এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র সফটওয়্যার বা কম্পিউটারের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিদ্যুৎ, জল, পরিবেশ, আবহাওয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতির মতো বিশাল ক্ষেত্র। স্ট্র্যাটোস প্রজেক্ট সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।