28/09/2026
Nilanjan মিশ্র লিখেছেন
এই অভিযোগ সারা বিশ্বজুড়ে। মৌপালনে এক নাম্বার দেশ স্লোভেনিয়া। সেখানে মৌপালকরা নিজেরাই বলছেন কৃত্রিম বাক্সে পালিত Honeybee-র সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে তাতে মৌপালকরাই বিপদে পড়ে গেছে। আর দেশের বুনো একাকী মৌমাছিরা খাবার পাচ্ছে না। এ এক বিষম সমস্যা উপস্থিত হয়েছে কারণ কৃত্রিম বাক্সে মৌমাছির সংখ্যা ক্রমশ বাড়লেও ফুলের সংখ্যা অসীম নয়৷ তারা বলছেন, "আমাদের দেশের অন্যান্য মৌমাছিদের কথা ভুলে গেলে হবে না। তাদের দেখভাল করার কেউ নেই আলাদা করে। তাদের বাঁচার জন্যও ফুলের দরকার। অতিরিক্ত মৌপালন ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলছে এমনকি মৌপালকরাই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।"
ডেভিড বেকহ্যাম লকডাউনে মৌমাছি পালন শুরু করেন এবং এখন নিজের মধু উৎপাদন করেন; কৃত্রিম বাক্সে পালিত মধুমৌমাছি কীভাবে বুনো পরাগায়নকারীদের প্রভাবিত করতে পারে, ব্যাখ্যা করলেন বিশেষজ্ঞ
কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় মৌমাছি পালন শুরু করা ফুটবল আইকন ডেভিড বেকহ্যাম এখন কটসওয়োল্ডসে তাঁর বাড়িতে নিজস্ব মধু উৎপাদন করেন- এমনটি জানিয়েছে দ্য স্ট্যান্ডার্ড। তাঁর এই শখ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন বিশেষজ্ঞরা বুনো পরাগায়নকারীদের (wild pollinators) ওপর কৃত্রিমভাবে লালিত মৌমাছিদের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন।
বন্যপ্রাণী চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার বার্তি গ্রেগরি পরামর্শ দিয়েছেন যে, মৌমাছিকে সাহায্য করতে চাইলে, বাক্সে ভরা মধুমৌমাছি পালন না করে প্রচুর দেশীয় বুনো ফুলের গাছ লাগানো উচিত। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে শহরগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মৌচাক থাকতে পারে, যা খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিতে পারে। যেসব এলাকায় পর্যাপ্ত ফুল নেই, সেখানে কৃত্রিম মৌচাক কীভাবে বুনো মৌমাছিকে প্রভাবিত করে সেই উদ্বেগকেই সামনে এনেছে তাঁর এই বক্তব্য আর বলাই বাহুল্য যে হারে দেশের অরণ্য ধ্বংস হচ্ছে তাতে ফুলের অভাব ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। তারই মধ্যে আছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফুল আগে বা পরে ফোটার সমস্যা৷ যার কারণে মৌমাছিরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সূক্ষ্ম আলোচনাটি প্রকাশ করে যে পরিবেশ সংরক্ষণের সদিচ্ছাপ্রসূত উদ্যোগের পেছনেও অনেক সময় অপ্রত্যাশিত পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। তাই মৌমাছি পালন নাকি বুনো ফুল চাষ, কোনটি বেছে নেওয়া উচিত, তা নির্ধারণের আগে স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ বোঝা জরুরি।
লকডাউনে ডেভিড বেকহ্যামের মৌমাছি পালনে আগ্রহ
দ্য স্ট্যান্ডার্ড-এর তথ্য অনুসারে, কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় ডেভিড বেকহ্যাম মৌমাছি পালন শুরু করেন এবং কটসওয়োল্ডসের খামারে মৌপালন ক্রমশ বাড়িয়ে তোলেন, যেখানে তিনি এখন নিজেই মধু উৎপাদন করেন।
স্টেসি সলোমন, রড স্টুয়ার্ট এবং এড শেরানের মতো অন্যান্য সেলিব্রিটিরাও মৌমাছি পালনের সাথে যুক্ত রয়েছেন। এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহ মৌমাছি এবং মধু উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের মনোযোগ বৃদ্ধি করেছে।
মধুমৌমাছি হলো সারা বিশ্বের অন্তত ২০,০০০+ প্রজাতির মৌমাছির মধ্যে একটি অংশ মাত্র। বাম্বলবি এবং নিঃসঙ্গ মৌমাছি (সলিটারি বি)-সহ বুনো মৌমাছিরা ফুলের মধ্যে পরাগরেণু স্থানান্তরের মাধ্যমে উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এদের বাসা বাঁধার ধরন এবং খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা আলাদা।
কৃত্রিম মৌচাক নিয়ে বার্টি গ্রেগরির উদ্বেগ
Secrets of the Bees নামক অসামান্য ও খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্রের উপস্থাপক ও বর্ণনাকারী বার্টি গ্রেগরি প্রশ্ন তুলেছেন যে, মৌমাছি পালন কি বুনো পরাগায়নকারীদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে সবসময় সেরা উপায়?
দ্য স্ট্যান্ডার্ড-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে গ্রেগরি মানুষকে মৌমাছির কৃত্রিম বাক্স কেনার বদলে বুনো ফুলের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, শহরে মৌচাকের সংখ্যা অতিরিক্ত বেশি হতে পারে, যা বুনো মৌমাছিরা যে খাদ্য উৎসের ওপর নির্ভর করে, তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
গ্রেগরি কৃত্রিম মৌমাছি কেনাকে বুনো পাখি বাঁচানোর উদ্দেশ্যে মুরগি কেনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য সামগ্রিক মৌমাছি পালনের প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, ডেভিড বেকহ্যামের মৌচাক বুনো মৌমাছির ক্ষতি করেছে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট দাবি এটি নয়।
খাদ্য নিয়ে মধুমৌমাছি ও বুনো মৌমাছির মধ্যে প্রতিযোগিতা
মধুমৌমাছিরা তাদের দলের খাদ্যের জন্য নেকটার (মধু নির্যাস) ও পরাগ সংগ্রহ করে, অন্যদিকে বুনো মৌমাছিরাও একই প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভর করে। যখন একটি ছোট এলাকায় বিপুল সংখ্যক মৌমাছি খাবার খোঁজে, তখন খাবারের জন্য অন্যান্য পরাগায়নকারীদের সাথে তাদের প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
১৯টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে এই প্রতিযোগিতার প্রমাণগুলো মিশ্র; মৌমাছির প্রজাতি, বাসস্থান এবং গবেষকদের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে ফলাফল ভিন্ন হয়। ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বৈচিত্র্যহীন এলাকায় মৌচাক যোগ করার ফলে বাম্বলবির সংখ্যা কমে গিয়েছিল, তবে আধা-প্রাকৃতিক ঘাসজমির বৈচিত্র্যময় অঞ্চলে এমন প্রভাব দেখা যায়নি।
প্রতিযোগিতার মাত্রা নির্ভর করে মৌচাকের সংখ্যা, ফুলের প্রাপ্যতা এবং কাছাকাছি বসবাসকারী প্রজাতির ওপর। প্রচুর ফুল থাকা এলাকাগুলো কৃত্রিম মৌমাছি এবং বুনো মৌমাছি উভয়কেই টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু খাদ্যের জোগান কম হলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়।
২০১৬ সালে বেসিক অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ইকোলজি-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কৃত্রিম বাক্সে পালিত মধুমৌমাছি এবং বুনো বাম্বলবির মধ্যে প্রতিযোগিতা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা দেখেন, ফুলসমৃদ্ধ বাসস্থান কম থাকা এলাকাগুলোতে কৃত্রিম বাক্সে পালিত মধুমৌমাছির কারণে বাম্বলবির ঘনত্ব কমে যেতে পারে।
মৌচাকের ঘনত্বের প্রভাব নিয়ে গবেষণা
জার্মানির মিউনিখে ফুল পরিদর্শনের ওপর পরিচালিত ২০২১ সালের একটি গবেষণায় (যা ইকোলজিয়া-তে প্রকাশিত) দেখা গেছে, মৌমাছির ঘনত্ব বেশি হলে ফুলে বুনো মৌমাছির চেয়ে পোষা মৌমাছির আনাগোনা বেশি দেখা যায়। একাধিক প্রজাতির ফুলের ক্ষেত্রে খাবারের তীব্র প্রতিযোগিতার প্রমাণ মিলেছে।
২০১৮ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত দক্ষিণ ফ্রান্সের ওপর আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ কৃত্রিম মৌমাছি পালন বুনো মৌমাছির সংখ্যা হ্রাস এবং তাদের নেকটার সংগ্রহের সাফল্যের হার কমিয়ে দেওয়ার সাথে সম্পর্কিত। এর প্রভাব মৌচাকের আশপাশের কয়েক শত মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
এই ফলাফলগুলো ইঙ্গিত দেয় যে নির্দিষ্ট পরিবেশে অতিরিক্ত কৃত্রিম মৌচাক বুনো মৌমাছির ক্ষতি করতে পারে। তবে তা স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
কেন বুনো ফুল রোপণ মৌমাছিদের সাহায্য করতে পারে?
বিভিন্ন ধরণের পরাগায়নকারীদের খাদ্যের ব্যবস্থা করতে গ্রেগরি বুনো ফুলের গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
বুনো ফুল প্রচুর নেকটার এবং পরাগ তৈরি করে। বিভিন্ন ঋতুতে ফোটে এমন বৈচিত্র্যময় ফুল গাছ লাগালে সারা বছর তাদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত হয়।
তবে ফুল গাছ লাগানো পরাগায়নকারী সংরক্ষণের একটি অংশ মাত্র। মৌমাছিদের উপযুক্ত বাসস্থানেরও প্রয়োজন হয়; কীটনাশক, আবাসস্থল ধ্বংস এবং রোগবালাই বুনো মৌমাছির সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। তাই ফুলসমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি এবং তাদের বাসস্থানের সুরক্ষা বুনো মৌমাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
মৌমাছি সংরক্ষণ সম্পর্কে ডেভিড বেকহ্যামের শখ আমাদের কী শেখায়?
ডেভিড বেকহ্যামের মধুমৌমাছি পালনের শখ মধু উৎপাদন এবং পরাগায়নকারী সংরক্ষণের মধ্যকার সম্পর্কের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মৌমাছি কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আর বুনো মৌমাছি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ও উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিতে অপরিহার্য।
গ্রেগরির মন্তব্য মনে করিয়ে দেয় যে কৃত্রিম বাক্সে মৌমাছি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বুনো পরাগায়নকারীদের কথাও মাথায় রাখা উচিত। স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি বুনো ফুল রোপণ করা, প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং স্থানীয় পরাগায়নকারীদের টিকিয়ে রাখাই বিভিন্ন প্রজাতির মৌমাছি সংরক্ষণের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়।
মূল রিপোর্ট: টাইমস অফ ইন্ডিয়া
পোস্টার সম্পর্কে কিছু কথা: পোস্টারটা যারা বানিয়েছেন তারা সম্ভবত বেকহ্যামের পরিচিতির কথা ভেবে এমন বানিয়েছেন যাতে বেকহ্যামের নামটা দেখলে লোকে বিষয়টা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে। তবে বেকহ্যাম একা এ বিষয়ে দায়ী এমন একেবারেই নয়। কাজ করলে ভুল হতে পারে। সেই ভুল শুধরে নেওয়াই আমাদের কাজ। বেকহ্যাম যে ফুটবল ছাড়ার পর মৌমাছি পালন করেন তা জেনেছি আগে, তার মৌপালন নিয়ে তথ্যচিত্র দেখে। এর একটা ভালো দিক তার অনুরাগীরা মৌমাছিদের বিষয়ে জানবেন কিন্তু সমস্যা হল মৌমাছি মানে Honeybee নয়৷ মৌমাছি অজস্র অনেক। আমরা এই করে আমাদের হাজার হাজার ধান গম সবজি তৈলবীজ মিলেট এর জাত হারিয়েছি৷ এখন হারাতে বসেছি দেশিয় মৌমাছিদের নানা জাত। আমরা যদি একটু হুজুগ গিমিক চটক থেকে বেরিয়ে এসে ঠান্ডামাথায় ভাবি কী কী করা উচিত তাতেই সবার মঙ্গল৷ পোলট্রির মুরগি পুষলে যেমন পাখি সংরক্ষণ হয় না, মানুষের বানানো কৃত্রিম বাক্সে মৌমাছি পুষে মৌমাছি সংরক্ষণ হয়না। ঠিক যেমন ধান চাষ আর সংরক্ষণ এক নয়। মানুষের বানানো কৃত্রিম বাক্সে মৌমাছি রাখাকে সংরক্ষণ বললে চিড়িয়াখানায় মানুষের বানানো খাঁচায় রাখা পশুপাখি দেখিয়েও তাকে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ বলা উচিত ছিল। আমরা জানি ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়। মৌমাছিরা আমাদের তৈরী কৃত্রিম বাক্সে থাকবে বলে জন্মায়নি। তারা ক্রিটেসিয়াস যুগে এখানে এসেছিল যখন আমাদের কোনও চিহ্ন এ বিশ্বে ছিল না। ডায়নোসররা ছিলো!
শুধু মৌমাছি তো নয় আরও লক্ষ কোটি প্রাণী উদ্ভিদ ভালো নেই। হুজুগ সামলে চলতে হবে!