21/10/2026
বুক চিতিয়ে বইয়ের স্টল
এবারের বইয়ের স্টল অন্যবারের চেয়ে আলাদা। আলাদা অভিজ্ঞতায়৷ আমরা প্রতিবছরের মতো এই বছরেও বই স্টল দেওয়া হবে ঠিক হয় এবং সেই স্টল দেওয়া হয় ১৭ তারিখ থেকে ২১ তারিখ অব্দি। এই চারদিনের স্টলকে ঘীরে আমাদের নানান কর্মসূচি থাকে। আমাদের বাৎসরিক পত্রিকা '' প্রতীতি '' - বেরোয়৷ সদস্যরা ও এলাকার মানুষজনরা লেখেন। গার্ডেনরীচ ও তার সংলগ্ন স্কুল - কলেজের পড়ুয়াদের বিষয় নির্দিষ্ট করে প্রবন্ধ লিখতে বলা হয় ও কিছু লেখা নির্বাচন করে পত্রিকায় বেরোয়। স্টলে সেই পড়ুয়াদের ডাকি ও তাদের কথা শুনি৷ পত্রিকার লেখা নিয়ে কিছু আলোচনা হয় ও মতান্তর হলে সাদরে গ্রহণ করি। বইয়ের ঝাঁপি নিয়ে বসি। কেউ বই পড়তে আসে, কেউ বই কিনতে আসে। কেউ বইয়ের খোঁজ করে, বলে এনে দিতে। রায়া দেবনাথ মেমোরিয়াল সোসাইটির উদ্যোগে ছাত্রছাত্রীদের হাতে শিক্ষাসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়৷ তারা স্টল জুড়ে আলো করে থাকে। কখনও কেউ এসে কবিতা পাঠ করে, কেউ গান গায়।
কিন্তু এবারে এক বাড়তি ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ১৮ তারিখ সন্ধ্যেবেলা আমাদের বইয়ের স্টল আটকে কিছু বাইক জমা হয়ে, উত্তেজনা তৈরী করে। প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন বিজেপি কর্মী জড়ো হয়ে নিজেদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিৎকার করে কথা বলতে থাকে। আমরা লক্ষ্য করতে থাকি, মনে দৃঢ় এই ভাবনা নিয়ে যে স্টলে অযথা বাইরে থেকে এসে হামলা করতে দেব না, রুখে দাঁড়াবো। কিচ্ছুক্ষণ পরে তারা চলে যেতে গিয়েও ফিরে এসে চড়াও হয়৷ ঝামেলাবাজদের মধ্যে কিছু অচেনা মুখ থাকে আবার থাকে কিছু চেনা মুখ। ঝামেলাবাজ বিজেপির উল্টোদিকে প্রয়াসের কর্মীরা রুখে দাঁড়ায়। দু' পক্ষের গলার আওয়াজ চড়তে থাকে ও তর্কাতর্কি করতে শুরু করে। স্টলে থাকা বাচ্চারা কেউ শিক্ষাসামগ্রী নিতে এসেছে, কারুর হয়তো কবিতা বলার কথা, তারা ভয়ে পেয়ে যায় আগ্রাসন দেখে।
সেদিন অর্থাৎ ১৮ তারিখ ওরা প্রয়াসের স্টলে এগিয়ে আসতে পারে নি, চলে গেছিল। ওরা প্রয়াসের স্টলের প্রতিবাদের মুখে পড়ে পিছু হটেছিল। তারপর থেকে এক এক করে খবর আসতে থাকে অন্যান্য বামপন্থী স্টলগুলোতে এক এক করে ভাঙতে থাকে। প্রয়াসের মতো অজস্র সামাজিক সা়ংস্কৃতিক নাগরিক সংগঠন উৎসবের দিনগুলোতে বইয়ের স্টল দেয়। এটা এই বাংলার মানুষের গর্বের সংস্কৃতি। রাজনীতি থেকে সাহিত্য - নানান ধরনের বই থাকে। এই ছবি চিরন্তন এটা কোনো এক - দু বছরের কথা নয় বহুবছরের ধারা। কিন্তু বইয়ের স্টলের ওপরে হামলা এত বছরে এই প্রথমবার। যা শাশ্বত তা রদ করা যায়না। গার্ডেনরীচেও গোটা এলাকাজুড়ে নানান সংগঠনের বইয়ের স্টল দেত তবে এরকম আগ্রাসী রূপ এই এলাকাও প্রথম প্রত্যক্ষ করলো। বই যা আমাদের সভ্যতার বুনিয়াদ, তাকে নষ্ট করা - সভ্যতার উল্টোদিকের চলন। এই আক্রমণকে সর্বোতভাবেই ধিক্কার জানাই। শুধু একবার নয়, এই আগ্রাসনের উল্টোদিকে আমাদের যতবার দাঁড়াতে হবে আমরা ততবার রুখে দাঁড়াবো। তাই আমরা পরেরদিন থেকে আরও জোরের সাথে স্টল বসাই। মনে ভাবি, “ যত হামলা করো সব সামলে নেব ”। তবে বাকিগুলো আমাদের স্টল চলেছে হই হই করে কোনো উৎপাত ছাড়া। আমাদের কোনো কর্মসূচির ঘাটতি হয় নি। গতকাল রাতে যখন মাইকে স্টল শেষের বক্তব্য রাখা হচ্ছে তখন এক কর্মীই কথাটা বলে। এইবারের স্টলের নাম দেওয়া উচিৎ, বুক চিতিয়ে বইয়ের স্টল। পশ্চিমবঙ্গের সংষ্কৃতি নষ্ট করতে যারা উঠে পড়ে লেগেছে, তারা বুঝবে পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষেরা সব অন্যায় সহ্য করবে না, তারা রুখে দাঁড়াবে৷
এই কথায় এ' বছরের মতো বইস্টল শেষ হলেও আমাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মসূচি চলতে থাকবে। আপনাদের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।