11/07/2024
তারক নাথ নাগ -এর কলমে
'আজ আমি এখানে যা লিখতে চলেছি সেটা অন্তত একবার ভালো করে পড়বেন। আর যদি মনে হয় শেয়ার করার মতো তাহলে শেয়ার করে এই ছেলেটির মতো হাজার হাজার ছেলেকে অনুপ্রাণিত হতে সাহায্য করবেন।
যে ছেলেটির ছবি দেখছেন তার নাম Sumit Nag। ঝাড়খন্ড রাজ্যের প্রত্যন্ত এক গ্রাম বামনী তে বাড়ি। পরিবারের অভাব অনটনের কারণে তার বাবা উত্তরপ্রদেশ এর গাজিয়াবাদ এ ট্রাক ড্রাইভার এর কাজ করেন। তাই ছোট বেলা থেকে সুমিত এর গাজিয়াবাদে বেড়ে ওঠা। অভাব দারিদ্রতা যেন পরিবারের নিত্য সঙ্গী। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই সুমিত ছিল অত্যন্ত মেধাবী | তাই কোনো অভাব, দারিদ্রতা সুমিত কে থামাতে পারে নি। গাজিয়াবাদেরই কোনো এক সরকারি বিদ্যালয়ে স্কুল এর শিক্ষক শিক্ষিকাদের সহযোগিতা আর নিজের অদম্য জেদ তাকে ভালো নম্বর এর সাথে উচ্চমাধ্যমিক পাস্ করতে সাহায্য করে 2018 সালে। আজ সে সমস্ত প্রতিকূলতা কে জয় করে সুদূর অস্ট্রেলিয়াতে গবেষণার জন্য যাচ্ছে। তার সম্পর্কে কয়েকটা কথা আজ না বললেই নয়।
সুমিত কে যদিও বা আমি খুব ছোট বেলা থেকেই চিনতাম, কিন্তু আমার সঙ্গে তার ভালো ভাবে কথা শুরু হয় তার উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর। আমাকে সে জানায় সে পড়তে চায়। আমার পক্ষে কোনো কোচিং সেন্টার এ ভর্তি করা সম্ভব ছিল না তাই আমি তাকে বলি যে তার সমস্ত বই পত্রের ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারি এবং সে নিজেই বাড়িতে IIT এর জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। সেই মতো আমি ওকে বইপত্র সব কিনে দি। সে নিজে বাড়িতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। পুরো এক বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পরে সে পরীক্ষা দিলেও ভালো rank করতে পারে নি। আমার কাছে সে পরামর্শ চায় কি করবে, কিভাবে সে এগোবে। তার কাছে পড়াশোনার জন্য প্রয়োজন ছিল দুটি জিনিস। একটি হলো ভালো পড়াশোনা হয় এমন একটা কলেজ, আর কম খরচে যেখানে পড়াশোনা করা যায়। আমি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে পড়াশোনা করেছি ছোট বেলা থেকে তাই আমি পশ্চিমবঙ্গে কোথায় কোথায় কম খরচে ভালো পড়াশোনা করা যায়, সে সম্পর্কে আমার সম্যক ধারণা ছিল কিন্তু গাজিয়াবাদে পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো ধারণা ছিল না। তাই আমি তাকে নিজে থেকে বেলুড় এবং নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন এর পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ থেকে শুরু করে পরীক্ষা দেওয়ানো এবং গাজিয়াবাদে থেকে কলকাতা যাতায়াতের সব ব্যবস্থা করি। গাজিয়াবাদ থেকে সে কলকাতা এসে পরীক্ষা দেয় কিন্তু সেখানেও সে চান্স পায় না।
অগত্যা তাকে এক রাশ নিরাশা নিয়ে গাজিয়াবাদে ফিরে যেতে হয়। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে সব সময় এটা চলতো যে সুমিত এর মধ্যে কিছু একটা কোয়ালিটি আছে যেটা তাকে অনেক বড় জায়গাতে প্রতিষ্টিত করবে। তাই আমি নিজে তার জন্য IISER এ 5 year integrated BS-MS এর জন্য ফর্ম ফিলাপ করে দি। IISER এর পরীক্ষাতে সে পাশ করে এবং সেকেন্ড কাউন্সিলিং এ সে এ সিলেক্টেড হয়। এবার ওর মুখে হাসি ফোটে। কিন্তু ভর্তি হতে যে অনেক টাকা লাগবে (প্রায় সাতান্ন হাজার টাকা। এতো টাকা জোগাড় কি করে হবে, ভর্তি হবার পর 4 বছর ধরে semester এর খরচ, খাওয়া খরচ , এসব কিভাবে ব্যবস্থা হবে সে নিয়ে সে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ে। কিন্তু IISER এর মতো এতো ভালো সুযোগ তো হাত ছাড়া করা যায় না । তাই আমি নিজে whatsapp এ গ্রূপ বানিয়ে সমস্ত আমার বন্ধুদের কে জানালাম। সবাই তাদের সাধ্য মতো সাহায্য করলো এবং দু দিনে মোটামুটি 35/40 হাজার (exactly মনে পড়ছে না কত টাকা) টাকা জোগাড় হলো। ও যে স্কুল এ পড়তো সেখানের শিক্ষক শিক্ষিকা রা সাহায্য করলেন, অবশেষে তাকে ভর্তি করানো গেলো IISER ভোপাল এ । একটা বড় ধাপ পেরোল। এর পর বাকি রইলো মাসিক খাওয়া খরচ আর পরবর্তী সেমেস্টার গুলোতে admission এর খরচ। জানিনা কেন ওকে IISER এ সব ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য আমার কি রকম একটা নেশার মতো হয়ে গেছিলো সেই সময়, ভাবতাম এতো ভালো একটা ছেলে শুধু মাত্র টাকার অভাবে পড়তে পারবে না, এটা কোনো ভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। আমি নিজেও যে একই পথের পথিক। আজ আমি দেশের খুব সম্মানীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পেলেও আমিও ঠিক একই রকম ভাবে অনেকের সাহায্য নিয়ে নিজেকে দাঁড় করিয়েছি। আজ না হয় থাক সে কথা, পরে কখনো বলবো , ফিরে আসি সুমিত এর গল্পে।
তার মাসিক খাবার খরচ জোগাড় করার জন্য আমার কলেজ সিনিয়ার Nayan De দার সঙ্গে যোগাযোগ করি। নয়ন দা আমাকে সৃজন সুজন ( ) এর সন্ধান দেয় এবং বলে যে তারা হয়তো সুমিত কে এই ব্যাপারে সাহায্য করবে। আমি তৎক্ষণাৎ সৃজন সুজন এর Abhijit Sengupta কাকুর সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং ওনারা সুমিত এর মাসিক খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব নেয়। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত পুরো পাঁচ বছর ধরে সৃজন সুজন, সুমিত কে সাহায্য করে আসছে।
সুমিত এর মেধা এবং পরিশ্রম কে পর্যালোচনা করে IISER bhopal এর একজন দুজন ফ্যাকাল্টি তার বাকি সেমেস্টার এর সমস্ত খরচ বহন করে। তখন থেকে সুমিত কে র পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি।
সুমিত 2022 সালে কানাডার মন্ট্রিল শহরের এক স্বনামধন্য গবেষণাগারে খুব ভালো ফেলোশিপ নিয়ে তিন মাসের জন্য গবেষণার সুযোগ পায়। সেখানের প্রফেসর তার কাজে এতটাই খুশি হয় যে তাকে একটা apple এর ম্যাকবুক গিফট করে।
দেখতে দেখতে 5 টা বছর পেরিয়ে যায়। ছেড়ে তার যে এবার বিদেশ যাওয়ার পালা। সে ভারত-অস্ট্রেলিয়া এর যৌথ উদ্যেগে খুবই সম্মানীয় MAITRI স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া তে পিএইচডি করতে যাবে। তার প্রতি আমার অনেক খানি শুভকামনা। জীবনে আরো বড় হও।। উচ্চ থেকে উচ্চতম জায়গাতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত কর।
সুমিত এর জন্য একটাই পরামর্শ, জীবনে যত বড় জায়গাতেই যায় না কেন, যখনই দেখবে তোমার মতো কেউ অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, তাকে তোমার সাধ্য মতো চেষ্টা করো, তাহলেই সেটা হবে তুমি যে সাহায্য পেয়ে আজ এতো বড় হতে চলেছো তার প্রতিদান।
সব শেষে এটা না বললেই নয়, এই লড়াই শুধু সুমিত এর একার নয়, এই লড়াই সেই সমস্ত ছেলে মেয়েদের যারা বুকের মাঝে অগ্নি শিক্ষা নিয়ে জ্বলতে চায়, কিন্তু সামান্য একটু তেলের অভাবে একটা সময় নিরুপায় হয়ে নিভে যায় আর শেষ হয়ে যায় তাদের জীবনের আলোকিত হবার আপ্রাণ চেষ্টা। আমি আজ সুমিত এর জন্য কয়েক বিন্দু তেলের ব্যবস্থা করে সুমিত এর মতো একটা প্রদীপ কে নিভে যেতে দি নি।
আজ ওর এই সাফল্যে ও যতটা খুশি , তার থেকে আমি অনেক অনেক গুণ খুশি।
ভালো থেকো আর এভাবেই এগিয়ে যাও।'