07/10/2024
সহজিয়া পরিবার অনেকের মাথাব্যাথার কারণ হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি। সে হোক। আমাদের তাতে কিছু করার নেই। আমরা ভালোবাসা ছড়াবার চেষ্টা করে যাব, করেই যাব। হিংসা ঘৃণা দ্বেষের দুনিয়া কয়েকজন মানুষ ভালোবাসা নিয়ে বেঁচেছিল— এই পরিচয়টাই যেন থেকে যায়। যেমন সাহানাজ আর ইমরোজ। সহজিয়া পরিবারের দুই স্তম্ভ। তাদের দুজনের স্বপ্ন কীভাবে যেন একাকার হয়ে গেছে সহজিয়ার বাকি সকলের স্বপ্নের সঙ্গে। তারা আঁকড়ে ধরেছে সহজিয়াকে, সহজিয়াও আঁকড়ে ধরেছে তাদের। এই যে যৌথ বাঁচা এর অনুভূতি থেকে যারা বঞ্চিত, তারা তাদের মনের ক্ষুদ্রতা দিয়ে মাপতে পারবে না সহজিয়াকে। এ দুর্ভাগ্য তাদের এবং তাদেরই। এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে, ইমরোজ দৌড়াচ্ছে খানাকুলের প্রান্ত সীমায়। সেখানে বন্যা বিধ্বস্ত এলাকায় পুজোর আগে ছোট ছোট শিশুদের হাতে নতুন পোষাক তুলে দেবে প্রান্তজন-সহজিয়া-সহজপাঠ পরিবার। আমাদের সহজপাঠ স্কুল, বেলিয়াখালি, উত্তর ২৪ পরগণাতেও এই আয়োজন হবে পুজোর আগে। নীচে ইমরোজ নাওয়াজ রেজা এবারের #সহজিয়া #পুজো_সংখ্যা_২০২৪-এ তাদের দুজনের লেখা নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছে। পড়ার অনুরোধ থাকল।
*সহজিয়া ও আমাদের ঘর*
*ইমরোজ নাওয়াজ রেজা*
সাহানাজের সাথে আমার বন্ধুত্ব সম্ভবত ৪০০ বছরের। শুরুর ৩৭৫ বছরের ঘটনাক্রম তেমন মনে না থাকলেও, গত ২৫ বছরের চলায়, এক অন্য জীবন বোধ তৈরী হয়, সম্ভবত দু-জনের ক্ষেত্রেই।
সাহানাজ সম্ভবত নিজের এক ঘর তৈরি করতে চেয়েছেন ক্রমশ— আর দুজন মিলেই ঘরের দরজা জানালাগুলো খুলে দিতে চেয়েছি। আজ দুজনেই আরো অসংখ্য মানুষের সাথে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি। আমাদের মাস্টারমশাইরা যেখানে এসে দাঁড়ান, আমাদের বন্ধুরা যেখানে এসে দাঁড়ান, আমাদের সন্তানরা যেখানে তুলি বুলিয়ে শ্লোগান এঁকে দেন— সেই রাস্তায়। সেও আমাদের ঘর।
এই আবহে "সহজিয়া" আমাদের দিয়ে প্রায় অসাধ্য এক কাজ করান। সাহানাজের মনোবিদ্যা বিষয়ক লেখা আর আমার অপটু একটি পলিটিক্যাল স্যাটায়ার এক মলাটে নিয়ে আসেন। ৪০০ বছরে এমন ঘটনা আমাদের এই প্রথম ঘটলো।
"অভিভাবকত্বের সাত-সতেরো" লেখাতে সাহানাজ মিশিয়ে দেন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে মনোবিদ হিসেবে তাঁর অর্জন। তিনি লেখেন— "ছোট থেকে আমরা সবাই বড় হই যে পরিবেশের মধ্যে; সে পরিবেশে মিশে থাকে কেবল আত্মীয়-স্বজন নয়, মানুষ নয়; পশু-পাখি-ভোরের আলো-রাতের তারা সবাই। প্রত্যেকেই বড় হই এদের সকলের সঙ্গে জড়িয়ে জড়িয়ে। প্রত্যেক সম্পর্কেরই একটা আলাদা নাম আছে। উষ্ণতা আছে, গভীরতা আছে।" তখন এই বড় হওয়াটা আজকের ইঁদুরদৌড়ের বড় হওয়ার বাইরে এক বৃহত্তর বড় হওয়াকে আবাহন করে। "সন্তান-ধারণ করলেই কি অভিভাবক হওয়া যায়"? প্রশ্ন তোলেন তিনি, তারপর নিজেই কাউন্সিলিং-এর ধাঁচে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন পাঠককে সঙ্গে নিয়ে।
অন্যদিকে, আমার লেখা পলিটিক্যাল স্যাটায়ারটির জন্য সবার আগে ধন্যবাদ প্রাপ্য আমার বন্ধু অভিনেতা দীপায়নের। আমাকে সে ক্রমাগত তাতায়। আমার শুরুর দিকে লেখা দু-একটা গুরুগম্ভীর নাটক প্রায় বাতিল করে সে স্যাটায়ারের দিকে ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে যায়। এদিকে স্যাটায়ার আমার স্বভাবজাত নয়। শেষ-মেশ একদিন তবু লেখা হয় "রাজতন্ত্র"! গণতন্ত্র কীভাবে পালটে গিয়ে একসময় রাজতন্ত্র হয়ে যায়, আর সেখান থেকে কীভাবে আবার গণতন্ত্র ফিরে আসতে পারে— তারই কিছু ভাবনা-চিন্তা মাথায় ঘুরছিল লেখার সময়। লিখতে লিখতে নাটকের চরিত্রদের মতো আমিও একসময় আবিষ্কার করি, রাজার চেয়ার বেদম ভারী— অথচ কিছুক্ষণ আগে সে চেয়ারকে আমরাই এনে বসিয়েছিলাম। নাটক একসময় শেষ হয়— কিন্তু দ্রোহকাল নয়।
সেই প্রেক্ষিতেই "সহজিয়া" পুজো সংখ্যার সম্পাদকীয় থেকে লেখা ধার করে বলি—
"আপনাদের সবার মতোই সহজিয়ারও খুব কষ্ট হচ্ছে, রাগ হচ্ছে, ঘৃণা হচ্ছে। সকলের সাথে সহজিয়াও রাত জাগছে রাস্তায়। জেগে থাকাটা জরুরি।"
এবারের পুজো সংখ্যাটি তাই নানা কারণে আমাদের কাছে বড় আদরের, বড় ঐশ্বর্যের।
আমার মত দু-একজন অর্বাচীনের লেখা বাদ দিয়ে যদি পড়তে চান তাহলে অনেক মণি-মুক্তো খুঁজে পাবেন।
পড়ুন ও পড়ান। মতামত জানান। সমালোচনা করুন।