10/05/2026
মাধ্যমিকের রেজাল্ট- শিক্ষা ব্যাবস্থার মৃতদেহ
৯৯.৭১ শতাংশ পাশ। খবরের কাগজের প্রথম পাতায় জ্বলজ্বল করা এই সংখ্যাটা আসলে সুন্দর মোড়কে মোড়া মৃতদেহ।একটা গোটা সমাজ দাঁড়িয়ে সেই মৃতদেহের পুজো করছে। আনন্দবাজারের খবরটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, মেধার নামে বাংলায় আসলে কী বীভৎস এক শূন্যতার চাষ হচ্ছে।
চার লক্ষ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী গণিতে ৫০ নম্বর ছুঁতে পারেনি। একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এই তথ্যটা আমাকে আতঙ্কিত করে। কারণ অঙ্ক কেবল পাঠ্যবইয়ের কয়েকটা অধ্যায় নয়; অঙ্ক হলো মানুষের যুক্তিবোধ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং চিন্তার মেরুদণ্ড। যে প্রজন্মের অর্ধেকের বেশি ছেলেমেয়ে অঙ্কে ২৫ থেকে ৩৪ নম্বরের গণ্ডিতে পড়ে থাকে, তাদের আসলে নিজস্ব কোনো চিন্তাশক্তিই আর অবশিষ্ট নেই। তারা কোনো সমস্যার গভীরে যেতে পারে না, তারা শুধু মুখস্থ করে আর ভুলে যায়।
একটা সমাজ নিজের পাপকে ঢাকার জন্য মিথ্যার পর মিথ্যা সাজায়। বাংলার শিক্ষাব্যবস্থাও আজ সেই মিথ্যার কারখানায় পরিণত হয়েছে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেলের কোনো বালাই নেই। স্কুলগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। আর তার ওপর খাতা দেখার সময় পরীক্ষকদের ওপর অলিখিত নির্দেশ—'অকৃতকার্যের সংখ্যা কমাতে হবে, ৫ পেলেও টেনেহিঁচড়ে পাশ করিয়ে দাও।'
এটা কোনো দয়া নয়; এটা হলো একটা জাতিকে সুপরিকল্পিতভাবে বোকা বানিয়ে রাখার প্রাতিষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র।
আর এই শূন্যস্থানটা নিখুঁতভাবে ভরাট করছে সরকারি অনুদানের ট্যাব এবং স্মার্টফোন। যে বয়সে এদের যুক্তিবিন্যাস আর ক্রিটিক্যাল থিংকিং শেখার কথা, সে বয়সে ফেসবুক রিলস আর ইউটিউবের সস্তা বিনোদন এদের মগজকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিচ্ছে। 'নিবিড় পাঠ' বা গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু শেখার শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতাই এদের আর নেই। এই ডিজিটাল মাদক খাইয়ে একটা গোটা প্রজন্মকে বুঁদ করে রাখা হচ্ছে, যাতে তারা কখনো মাথা তুলে প্রশ্ন করতে না শেখে।
আমরা আসলে একটা আজ্ঞাবহ, মেধাহীন এবং মেরুদণ্ডহীন প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছি। এরা কোনোমতে একটা বৃত্তিমূলক ডিগ্রি জোগাড় করবে, সস্তা শ্রমিকের কাজ করবে, কিন্তু আধুনিক পৃথিবীর জটিল চ্যালেঞ্জ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এরা প্রতিযোগিতার ধারেকাছেও টিকতে পারবে না।
বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার এই পচন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি নির্লজ্জ, সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক হত্যা। আর আমরা সবাই এর নীরব দর্শক।
(C) Biplab Pal