10/06/2026
একটা শিক্ষানগরী বানাতে পারবেন? যে শিক্ষানগরীতে শুধু শিক্ষার চাষ হবে।
একই রকমভাবে আরও একটা চিকিৎসা-নগরী? যেখানে চিকিৎসার উৎকর্ষ সাধনের জন্য গবেষণা হবে।
মানে, কেন এত কথা বলছি?
ধরুন, নিয়ম-টা হল শিক্ষক-রা
শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া অন্য কোন পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না।
শিক্ষক শুধু মাত্র
শিক্ষামূলক প্রফেশনের সাথে যুক্ত থাকবেন।
ধরুন একজন শিক্ষক
বই লিখতে পারবেন। ছাপাতে পারবেন।
টিউশন বা কোচিং করাতে পারবেন।
স্কুল খুলতেও পারবেন সেই শিক্ষানগরী-তে।
সেই স্কুলে আরও শিক্ষক ( বেকার যুবক, যুবতী) তৈরী করে, তাদের নিয়োগ দিতে পারবেন।
কিন্তু শিক্ষক, পাট-এর ব্যবসা করতে পারবেন না। দিনভর শেয়ার মার্কেট-এ ডুবে থাকতে পারবেন না।
এখনকার নিয়ম হল, শিক্ষক এক্সপার্ট-ইমপোর্ট ব্যবসা করতে পারবেন। সুদের ব্যবসা করতে পারবেন, ইঁট-বালি-সিমেন্ট-এর ব্যবসা করতে পারবেন, জুয়া খেলতে পারবেন,
কিন্তু সমাজের হাওয়া হল, শিক্ষক টিউশন পড়াতে পারবেন না। ব্যপারটি আপনাদের আজব মনে হয় না?
নিয়ম-টা তো এমন হতে পারত যে, শিক্ষক তার অফিস আওয়ার-এর বাইরেও যদি এক্সট্রা কাজ করতে চান, এক্সট্রা ইনকাম করতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই শিক্ষামূলক কাজের সাথে যুক্ত থেকেই তা করতে হবে। তিনি যেন জুয়ার কারবারি না হয়ে ওঠেন।
এদিকে নাকি দেশে ডাক্তার কম। বিশেষত গ্রামের দিকে। সরকারি হাসপাতাল-ই একমাত্র ভরসা।
বাকীটা হাতুড়ে ব্যবস্থা।
এখন ডাক্তার যদি জমি-র দালালী করেন,
লোকজন মেনে নেব।
মাছের ভেড়ি করলেও মেনে নেবে।
আমার এক পরিচিত ডাক্তার (কোলকাতা-তেই), জুতোর ব্যবসা করেন।
তাতে কারুর আপত্তি নেই।
হাসপাতালে ডিউটি-র বাইরে,
সে আর ডাক্তারি নিয়ে চর্চা করেন না। চর্চা করেন পশুর চামড়ার কোয়ালিটি নিয়ে৷
প্রাইভেট প্র্যাকটিস করলে, ডাক্তার হিসাবে তার কোয়ালিটি উন্নততর-ই হত, অন্তত অবনমন হত না।
নেতা ও জনগণ মিলে,
প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা-টাকে জনমানসে,
"চুরির ন্যায় অপরাধ" - এরকম একটা ধারণা তৈরী করে দেওয়া হয়েছে।
এত লঘু আত্ম-উপলব্ধি নিয়েই দেশ-টা চলবে?
মানুষের বক্তব্য -
হাসপাতালে ফাঁকি মেরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছে। আচ্ছা একটা কথা ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন।
২জন বা ৩ জন ডাক্তার মিলে
যখন হাসপাতাল গুলো চালু রেখেছেন ডাক্তারবাবুরা, ( ৭ দিন, ২৪ ঘন্টা। ৯:০০-৪:০০ এর অফিস নয়), তখন ফাঁকি মারা সম্ভব?
সাপ কেটেছে, বিষ খেয়েছে, গলায় দড়ি দিয়েছে--- হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, ডাক্তার দেখেনি! - এমন হয়েছে?
বড় হাসপাতালে রেফার করতে গেলেও, ডাক্তার-কে সেখানে উপস্থিত থেকেই তা করতে হয়।
পাবলিক নিজে কিছু ধারণা পোষণ করেন। আর বাকী-টা নেতারা ধোঁয়া দিয়ে, হাততালি কুড়োচ্ছেন।
ডাক্তারদের কাজ করার পরিবেশ-টা আর কত বিষাক্ত করবেন? ডাক্তার-রা আর স্বাধীন চিত্তে চিকিৎসা করতে পারছেন না৷ সবসময়ই চাপা ভয়। একদম দমবন্ধ করা পরিবেশ।
পাবলিক, পাবলিকের বুদ্ধি অনুযায়ী কাজ করবে, ভাঙচুর করবে।
আপনারা যারা সমাজের সব অংশের দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন আপনারা অন্তত
সক্ষমতা আর অক্ষমতার সাথে,
মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা'র মেলবন্ধনের দায়িত্ব-টা নেবেন তো।।
নচেৎ ডাক্তার-রা বাঁচবে কি করে?
অন-ডিউটি মেডিসিন ডাক্তার যদি
এপেনডিক্স অপারেশনের পেশেন্ট-কে অন্য হাসপাতালে রেফার না করতে পারবেন,
তাহলে কি তারপক্ষে এপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করা সম্ভব?
রেফার করা যাবে না, ফতোয়া দিয়ে দিলেন পাবলিকের সামনে,
খোঁজ নিয়েছেন কি সেই হাসপাতালে সার্জেন ডাক্তার আছেন কি না? থাকলেও একজন সার্জেন কি ৭ দিন ন ২৪ ঘন্টা অন-ডিউটি থাকতে পারবেন?
খোঁজ নিয়েছেন কি, হাসপাতালে অজ্ঞান করার ডাক্তার আছে কি না?
খোঁজ নিয়েছেন কি, হাসপাতালে ব্লাড-ব্যাংক আছে কি না?
না, আপনি কিছুই খোঁজ না নিয়েই ফতোয়া দিয়েছেন, রেফার করা যাবে না।
তাহলে?
মানুষগুলো হাসপাতালেই মারা যাবে?
পৃথিবীর কোন দেশে, এই নিয়ম আছে যে,
খারাপ রোগীকে উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করা যাবে না?
বরং এই নিয়ম আছে,
"একজন ডাক্তার যেন কখনই দিনে একটানা ৬ ঘন্টার বেশী ডিউটি করবেন না!"
কিন্তু এদেশে? টানা 36 ঘন্টা, 48 ঘন্টা বা কোথাও কোথাও 96 ঘন্টা ডিউটি না দিলে, হাসপাতাল বন্ধ থাকবে।
দৈনিক ৮ ঘন্টা করে ডিউটি চার্ট করলেই দেখবেন, 4 জন ডাক্তারের পরে আরও ৬ জন ডাক্তার না থাকলে, সপ্তাহে ৭ দিন ডিউটি-চার্ট বানানোই যাচ্ছে না।
বাকী ৩ দিন হাসপাতাল তালাবদ্ধ রাখবেন?
নাইট ডিউটি-র পর কোন ডাক্তার ডে-অফ পান না।
কারণ সে যদি ডে-অফ নেয়, তবে সেইদিন ডিউটি করার মত কেউ থাকছে না।
ডাক্তার-রা চালিয়ে দেয়।
হাসপাতাল ৯ টা 4 টের অফিস নয়।
সন্ধ্যা, মধ্যরাত সবসময়ই ডিউটি রানিং রাখতে হয়।
ডাক্তার-রা একটা সুবিধা নেয়।
টানা ২ দিন বা ৩ দিন হাসপাতাল সামলে দিয়ে, বাকী 4 দিন প্র্যাকটিস করে। সেটাই ভারসাম্য। তাতেই হাসপাতাল ৭ দিন সচল থাকে।
৮ ঘন্টা ডিউটি, নাইট অফ, ডাক্তারের পাওনা ছুটি - সব যদি ডাক্তার-রা তাদের প্রাপ্য ছুটির দাবী করে, হাসপাতাল গুলো সত্যিই ডিউটি করার কেউ থাকবে না।
তাই পাবলিক উসকানো বন্ধ করুন।
একটা শিক্ষা-নগর বা চিকিৎসা-নগর বানিয়ে দেখুন।
এমন এনেক শহর আছে, যেখানে গোটা শহর-টাই তৈরী হয়েছে, একটা বিশ্ববিদ্যালয়-কে ঘিরে।
শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্যই সেই শহরের সবকিছু। ক্লাব, পার্ক, খেলার মাঠ, রেষ্টুরেন্ট, জিম সেন্টার, বাজার, চাষাবাদ, কোচিং সেন্টার, গবেষণাগার, পশুখামার, রিয়েল-এষ্টেট।
আর সেখানে জানেন তো?
পলিটিসিয়ান-রা নাক গলায় না,
পাড়ার ক্লাব সেখানে বাড়ী করার চাঁদা চায় না,
শিক্ষক সেখানে এক্সট্রা টাইমে,
ক্লাবে আড্ডা দেয় অংক নিয়ে।
আলোচনা হয় কেমিষ্ট্রি নিয়ে, দর্শন নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে।
সেখানে বাস সার্ভিস আছে শিক্ষকদের আর ছাত্রদের হোষ্টেল বা কোয়ার্টারে পৌঁছে দিতে৷
এমনি এমনি একটা দেশ, সামনে এগোয় না!
এমনি এমনি দেশের মানুষের চিন্তা-ভাবনা আরও উচ্চস্তরে পৌঁছে যেতে পারে না।
নিয়ম-টা এমন না-হোক, যে শিক্ষক টিউশন পড়াতে পারবেন না।
বরং টিউশনি বাদ দিয়ে অন্যান্য অশিক্ষা-মূলক পেশায় যেন সে না যায়!
সে যেন সারাদিন শিক্ষা-চর্চার ভিতরে-ই থাকে।
মাংস বিক্রি-র ব্যবসাতে না যায়।
একটা কথা সবাই জানে,
"যে শিক্ষক স্কুলে ভালো ক্লাস নেন, তার কাছেই সকলে এক্সট্রা ভাবে পড়তে যায়। খাজা টিচারের কাছে কেউ যায় না।"
ডাক্তারদেরও তাই। যে খাজা- সে হাসপাতালেও খাজা, প্রাইভেট-এও। যে কাজ জানে, সে সব জায়গাতেই কাজ করে।
আর ইয়ে,
মেডিক্যাল কলেজ-এর প্রফেসর-এর মাইনে যে, ছাত্রছাত্রীদের স্টাইপেন্ড-এর চাইতেও কম,
সেটাও একটু ভাবনা-চিন্তা করুন প্লীজ।
প্রফেসর-রা যদি রুগী দেখতেই ব্যস্ত থাকেন,
ছাত্রদের পড়াশোনা, গবেষণা, খাতা দেখা, গাইড করা,
এই কাজ গুলো-তে প্রফেসর-দের ক্লান্তি আসবে না?
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ডাক্তার, খাঁজা হবে নাকি বিশ্বমানের হবে, তা নির্ভর করে, প্রফেসর কত-টা ক্লান্তিহীন বা চাপ-হীন ভাবে ছাত্রদের পড়াতে পারছেন, কতটা গবেষণা করতে পারছেন, তার উপর।
মেডিক্যাল প্রফেসরের মাইনে যা,
তাতে সে একটা নিজের-বাড়ীও বানাতে পারবে না৷
ভাববেন না? সে Extra income এর জন্য ছুটবে না?
তার সেই অতিরিক্ত সময়ের অতিরিক্ত খাটুনি খেটে, ইনকাম-টাকে চুরির সমতুল পর্যায়ে ফেলবেন না। তিনি ডাক্তারি-টাই করছেন।
আপনারা সরকারি কর্মচারীদের সবদিক দিয়ে বাঁধছেন,
হাসপাতালের লিফট-এর ভিতরে,
পাবলিক এসে পানের পিক ফেলে দিয়ে যায়,
সেই অভ্যাস বন্ধ করার জন্য,
কিছু ভাবতে পারছেন কি?
পাবলিক-কে শুধু তোল্লাই দিলেই হবে?