26/03/2025
‘আমি তো সাইকেল নিয়ে সোজা থানায়। ঢুকেই পুলিশকাকুদের বললাম, ওই অসভ্য লোকটার কথা। এমন হলে তো সবার আগে থানায় যেতে হয়!’
বলছিল, জ্যোতিকা। নারী দিবস উপলক্ষে মহকুমা জুড়ে চলছে জবালার গণ-স্বাক্ষর অভিযান। স্বাক্ষরপত্রে রয়েছে নারীদের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান। অনেকেই সই করে যাচ্ছেন। লিখে যাচ্ছেন দু’কলম। চারপাশে মহিলাদের ভিড়। গ্রাম থেকে শহরতলী থেকে দলে এসেছেন মহিলারা। কেউ কিশোরী, কেউ বা প্রৌঢ়া। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন মেয়েকে। ভিড় থেকে সামান্য দূরে একটা গাছের নিচে জ্যোতিকার সঙ্গে কথা হচ্ছিল।
জ্যোতিকার (নাম পরিবর্তিত) বয়স বছর তেরো। প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি। বাবা দিনমজুর। মা ধাড্ডা-জরির কাজ করেন। আর আছে দুটি কচি ভাইবোন। ঘরে প্রচণ্ড অভাব থাকা সত্বেও জ্যোতিকার বাবা কিন্তু মাথা নোয়াননি। হাজার জটিলতার মধ্যেও মেয়েকে ইস্কুলে ভর্তি করেছিলেন। তাঁর অনেক আশা―মেয়ে ডাক্তার হবে। এলাকার মানুষদের চিকিৎসা করবে। জ্যোতিকা তাই রোজ সকালে-বিকেলে সাইকেলে মাইল দশেক যাতায়াত করে। গ্রাম থেকে সদরের ইস্কুলে। সাইকেলটা এক প্রতিবেশীর থেকে ধার করে এনেছেন বাবা।
‘স্কুল থেকে বেরিয়ে সাইকেলের লক খুলছি, এমন সময় কে গায়ে হাত দিল। তাকিয়ে দেখি, একজন অচেনা লোক। বলল, নাকি আমার বাবাকে চেনে। আমরা খুব গরিব–তাও নাকি জানে। আমার কিন্তু লোকটাকে ভালো লাগেনি একদম।’ বলছিল জ্যোতিকা। আমরা, জবালার দিদিমণিরা জ্যোতিকাকে চিনি অনেকদিন থেকে। ওর পড়াশোনার বিষয়ে সামান্য সহায়তা করার সূত্রে। আমাদের বুকটা কেঁপে উঠল।
‘তারপর লোকটা বলে কিনা―আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে বম্বে নিয়ে যাব। সেখানে ভালো কাজ আছে। বলে হাত ধরে টানতে থাকে। আমি তখন যা বোঝার বুঝে গেছি। লোকটা বদমাশ। তাই জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিয়েছি। সাইকেলে চেপে বসে চোঁ-চাঁ দৌড়।’
সাইকেল নিয়ে সোজা থানায় পৌঁছে যায় জ্যোতিকা। ওর মনে ভয়ডর নেই। বছর চারেক আগে অবশ্য ছবিটা অন্যরকম ছিল। গ্রামের মহিলারা থানায় যেতে ভয় পেতেন। থানায় গেলেই নাকি গুজব রটবে। চরিত্র নিয়ে। কেউ দেখতে পেলেই নাকি রটবে খবর, শুরু হয়ে যাবে ফিসফাস। ফলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে সেটা ধামাচাপা পড়ে যেত খুব তাড়াতাড়ি। আমরা বুঝেছিলাম, অপরাধ চক্রকে আটকাতে হলে পুলিশের সহযোগিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুরু হল, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝানো। মায়েদের বোঝানো। মেয়েদের বোঝানো। চলেছে নানা প্রশিক্ষণ। এক্সপোজার ভিজিট। থানা শুধুমাত্র অপরাধীদের জায়গা নয়, অভিযোগ জানাতেও যে অবাধে থানায় পৌঁছনো যায়―এই ভাবনাটুকুই ওঁদের মধ্যে বুনে দেওয়ার চেষ্টা করেছি আমরা। অনেক ঢাল উপুড়ের পর খেলা ঘুরছে। গ্রামের মহিলারা এখন থানায় অনেক সহজ। অনেকটাই অকপট। আইনরক্ষকদের থেকে সহযোগিতা না পেলে অবশ্য এটা সম্ভব হতো না।
জ্যোতিকার কথা শুনতেই শুনতেই দেখলাম, পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন একজন পুলিশকর্মী। মেয়েটার চোখ ঝিলিক দিয়ে ওঠে। ‘এই তো আমাদের পুলিশকাকু’। তাঁর কাছে জানতে পারলাম, জ্যোতিকার কথা শুনে পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করে। ফলে একটা বিরাট অপরাধ চক্রকে ধরা সম্ভব হয়েছে। এরপর পুলিশকর্মীটি এগিয়ে যান স্বাক্ষরপত্রের কাছে। অল্প কিছু লিখে একটা সই করলেন। কৌতুহূলী হয়ে এগিয়ে যাই আমরা। দেখলাম, লেখা আছে দুটো শব্দ―পাশে আছি। সামান্য দুটো শব্দ অনেকখানি জোর বাড়িয়ে দিল আমাদের। জ্যোতিকারও।
একদিনে পাল্টায় না সবটুকু। সময় লাগে। লেগে থাকতে হয়। ধীরে ধীরে বদলায় মন আর চোখ। ভেঙে যায় অচলায়তন। আমরা কেবল স্বপ্ন দেখতে পারি। স্বপ্নের পথে একঝাঁক কিশোরীকে এগিয়ে দিতে পারি। কারণ আমাদের স্বপ্নটুকুই সম্বল।