01/08/2026
https://www.facebook.com/share/1DD6KCDQEv/
যে দুটি সূরার জোড়া খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না
কুরআনের সূরাগুলো এলোমেলোভাবে সাজানো নেই। একটু গভীরে তাকালে দেখা যায় সূরাগুলো চলছে জোড়ায় জোড়ায়। পাশাপাশি দুটি সূরা, রচনাশৈলীতে সাদৃশ্যপূর্ণ, বিষয়বস্তুতে একে অপরের পরিপূরক।
শুরু থেকে গুনে দেখুন। বাকারা আর আলে ইমরান—একটি জোড়া। নিসা আর মায়েদা—একটি জোড়া। আন'আম আর আ'রাফ—জোড়া। আনফাল আর তাওবা—জোড়া। ইউনুস আর হুদ—রচনাশৈলীর দিক থেকে এতোটাই সাদৃশ্যপূর্ণ যে জোড়া হিসেবে চিনতে ভুল হয় না।
কিন্তু এরপরই ছন্দটা ভেঙে যায়।
সূরা নাম্বার ১২ ইউসুফ। এর কোনো জোড়া নেই। আগের সূরার সাথে মিলছে না, পরের সূরার সাথেও না। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, একা দাঁড়িয়ে আছে।
আচ্ছা, হয়তো ব্যতিক্রম। সামনে এগোই। রা'দ আর ইবরাহীম—জোড়া। হিজর আর নাহল—জোড়া। ইসরা আর কাহাফ—জোড়া। তারপর আসে অদ্ভুত এক জোড়া: মারইয়াম (১৯) আর আম্বিয়া (২১)। গঠন, বিষয়বস্তু, সঙ্গতি—সব দিক থেকে এই দুটি সূরা পরস্পরের সাথে মিলে যায়।
কিন্তু দাঁড়ান। ১৯ আর ২১ যদি জোড়া হয়, তাহলে মাঝখানের ২০ নাম্বার সূরাটা গেলো কোথায়?
সূরা ত্বহা। এটিও কারো সাথে মিলছে না। এরপর হাজ আর মু'মিনুন আবার জোড়াবদ্ধ, নূরের জোড়া দূরের আহযাব। কিন্তু এই পুরো বিন্যাসে দুটি সূরা রয়ে গেলো জোড়াহীন। সূরা ইউসুফ, আর সূরা ত্বহা।
কেনো?
এখানেই কুরআনের বিন্যাসের সৌন্দর্য ধরা পড়ে। ইউসুফ আর ত্বহা আসলে জোড়াহীন নয়। তারা একে অপরের জোড়া—দূর থেকে।
লক্ষ্য করুন। দুটি সূরাতেই রয়েছে একজন নবীর দীর্ঘ, ধারাবাহিক ঘটনা। সূরা ইউসুফে ইউসুফ (আঃ)-এর জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা, সূরা ত্বহায় মূসা (আঃ)-এর ঘটনার দীর্ঘ বিবরণ। কুরআনে এভাবে একটানা, গল্পের মতো করে নবীজীবনী খুব কম জায়গাতেই এসেছে।
কিন্তু আসল সংযোগটা আরো গভীরে।
ভেবে দেখুন—বনী ইসরাইল তো মিশরীয় জাতি না। তাহলে তারা মিশরে গেলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে সূরা ইউসুফ। ইউসুফ (আঃ)-এর কারণেই ইয়াকুব (আঃ)-এর পরিবার মিশরে এসেছিলো। বনী ইসরাইল কীভাবে মিশরে প্রবেশ করলো সূরা ইউসুফ বর্ণনা দিলো সেই ঘটনার।
আর সূরা ত্বহা? মূসা (আঃ)-এর নেতৃত্বে বনী ইসরাইল কীভাবে মিশর থেকে বের হয়ে এলো সেই ঘটনা বর্ণিত হলো এই সূরায়।
একটি সূরা বলছে প্রবেশের গল্প, আরেকটি বলছে প্রস্থানের গল্প। একই জাতির ইতিহাসের দুই প্রান্ত—ধরে রেখেছে দুটি "জোড়াহীন" সূরা। ১২ নাম্বার সূরা দিয়ে তারা মিশরে ঢুকলো, ২০ নাম্বার সূরা দিয়ে বেরিয়ে এলো। মাঝখানে আট সূরার ব্যবধান, তবু দুটি সূরা যেনো দূর থেকে হাত ধরে আছে।
যে দুটি সূরাকে মনে হচ্ছিলো বিন্যাসের বাইরে পড়ে গেছে, তারা আসলে বিন্যাসেরই আরেকটি স্তরের প্রমাণ। কাছের সূরাগুলো জোড়া বাঁধে পাশাপাশি বসে, আর এই দুটি সূরা জোড়া বেঁধেছে ইতিহাসের সুতো দিয়ে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। এর মানে এই নয় যে কুরআনের সবগুলো সূরাই জোড়াবদ্ধ। কখনো আপনি পাবেন তিনটি সূরার গ্রুপ, কখনো দুটি সূরার গ্রুপ। কখনো জোড়ার পরে বিচ্ছিন্ন একটি সূরা, তারপরে আরেকটি জোড়ার পরে আবার বিচ্ছিন্ন একটি সূরা—এরকমও ঘটে। আর সেগুলো একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়। এভাবেই সূরাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রবাহিত হয়েছে। এখানে আমরা থেমেছি সূরা নাম্বার ২৪ পর্যন্ত; ২৫ থেকে পরের সূরাগুলোর বিন্যাস আরেক আলোচনার বিষয়।
এটা কি কাকতালীয় হতে পারে? তেইশ বছর ধরে, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নাযিল হওয়া সূরাগুলো—চূড়ান্ত বিন্যাসে এসে এমন নিখুঁত নকশায় বসে যাওয়া কোনো মানুষের পরিকল্পনায় সম্ভব না। এই কিতাবের বিন্যাসও সেই সত্তারই হাতে, যিনি এর প্রতিটি শব্দ নাযিল করেছেন।
সংক্ষেপে মনে রাখুন: কুরআনের সূরাগুলো চলে জোড়ায় জোড়ায়—বাকারা-আলে ইমরান থেকে হাজ-মু'মিনুন পর্যন্ত। শুধু দুটি সূরার পাশে কোনো জোড়া নেই: ইউসুফ (১২) আর ত্বহা (২০)। কিন্তু তারা জোড়াহীন নয়—ইউসুফ বলছে বনী ইসরাইল কীভাবে মিশরে ঢুকলো, ত্বহা বলছে কীভাবে বের হলো। এক জাতির ইতিহাসের প্রবেশদ্বার আর প্রস্থানদ্বার—দুটি সূরা দূর থেকে একে অপরের জোড়া।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর কিতাবের উপর গভীর চিন্তাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন, এবং কুরআন অধ্যয়নে ব্যয় করা প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
—নোমান আলী খান