23/08/2024
২০০৫ সাল থেকে আমরা নারী পীড়নের শৃঙ্খল মুক্তির সাধনায় আইন প্রবর্তনের বিভিন্ন দিক গুলির প্রচার করে থাকি ও ব্যক্তিগত আলোচনা করি ও পরামর্শ দিয়ে থাকি। শিশু-বিবাহ থেকে বেরিয়ে আসার পথ এবং উপায় নিয়ে, পাচার, যৌন নির্যাতন, গার্হস্থ্য হিংসা ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি থেকে রক্ষা করার জন্য নানাবিধ কাজ করছি। আমাদের কর্মক্ষেত্র মূলত গ্রাম ভিত্তিক; সেই কারণে আমরা অনেক গবেষণা করেছি এবং নারীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের হিংসা বা অপরাধের কারণগুলি অনুসন্ধানের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প করেছি।
আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক গবেষণার কাজের সাথে একাত্ম হয়ে এবং অন্যান্য দেশের এনজিওগুলির সাথে আমাদের যোগাযোগের মাধ্যমে, আমরা ধর্ষণ সম্পর্কে কিছু মিথ (ভ্রান্ত ধারণা) তালিকা ভুক্ত করছি।
আর জি কর হাসপাতালের সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার কারণে আমাদের এই পোস্টটা খুবই প্রাসঙ্গিক ও সমসাময়িক -
কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এক প্রশিক্ষণরত ডাক্তারের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সরকারী হাসপাতালের কর্মকর্তারা এবং কলকাতা পুলিশ এই অপরাধটিকে প্রথমে আত্মহত্যা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল যা সারা দেশের মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বপন করে যে এই অপরাধটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ভারতের ধর্ষণ মিথ, (ভ্রান্ত চলতি ধারণা), যেমনটি অন্যান্য দেশেও, ধর্ষণ, ধর্ষণ ভুক্তভোগী, এবং ধর্ষকদের সম্পর্কে ব্যাপকভাবে প্রচলিত মিথ্যা বিশ্বাস এবং গোঁড়ামির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এই মিথগুলি একদিকে প্রায়ই ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করে এবং যৌন হিংসাকে স্বীকৃতি দেয় সেই কারণে ন্যায় বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
আজও যৌন হিংসা সম্পর্কে সব সমাজ একটি নীরবতা ও কলঙ্কের আরোপ বজায় রেখে চলেছে।
পুলিশ সাধারণভাবে নারী বিদ্বেষী। এবং প্রবণতা বিপদজনক। তাই পুলিশের কাছে অভিযোগ হলেও অপরাধীরা ভয় পায় না।
নানা ধরনের যৌন হয়রানি যেমন অনুসরণ করা, তাকিয়ে থাকা, ছবি তোলা, স্পর্শ করা ইত্যাদি অত্যন্ত ব্যাপক এবং জনবহুল ভারতের দৈনন্দিন জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে – তাই ধর্ষণ শুধু একটি পরবর্তী ধাপ।
ভারতে নারী বিদ্বেষ ব্যাপক এবং জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে নারীদের কম গুরুত্বপূর্ণ, কম মূল্যবান মনে করা হয়।
বেশিরভাগ ভারতীয় নারীকে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে হয়, অনেক হাঁটতে হয়, এমন জায়গায় বাস ও কাজ করতে হয় যেখানে তারা যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে।
পরিচারিকারা প্রায়ই যৌন হিংসার শিকার হন, কারণ তারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল।
ভারতে বেশি দরিদ্র নারী থাকায় হিংসার ঘটনাও বহুল।
হিংসা, ধর্ষণ এবং পরবর্তী হত্যাকাণ্ড ঘটে কারণ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও জাতি (কাস্ট) গোষ্ঠীগুলি জানে যে তারা সহজেই পার পেতে পারে। যেরকম হাথরাসের ঘটনাটি, ঠাকুর সম্প্রদায়ের পুরুষেরা দলিত মহিলাকে ধর্ষণ করে এবং পুরো রাজ্য প্রশাসন, পুলিশ থেকে বিচার ব্যবস্থা পর্যন্ত, অভিযুক্তদের রক্ষা করতে ছুটে যায়।
কিছু ক্ষেত্রে, দোষীদের প্রশংসা করা হয় যেমনটি বিলকিস বানোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
পার্ক স্ট্রিট ঘটনা ২০১২: ক্ষমতার করিডোর থেকে একে ‘সাজানো ঘটনা’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল।
কামদুনী গণধর্ষণ ২০১৩: ধর্ষণ বিরোধী মেয়ে দের ‘চোরের মা-এর বড় গলা’ বলা হয়েছিল।
নদিয়া হান্সখালি ধর্ষণ-হত্যা-২০২২: শীর্ষ প্রশাসক প্রশ্ন তুলছিলেন ‘ধর্ষণ হয়েছে, নাকি সে গর্ভবতী ছিল, নাকি এটা প্রেমের সম্পর্ক?’
আর জি কর হাসপাতালের প্রশিক্ষণরত ডাক্তারকে ধর্ষণের ঘটনা ২০২৪: প্রাথমিক ভাবে একে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তারপর জনসাধারণের প্রতিবাদের পরে একে ধর্ষণ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়, হঠাৎ করে কর্তৃপক্ষ দ্বারা অপরাধের স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে।
ভারত এবং উন্নত দেশগুলির কিছু সাধারণ ধর্ষণ মিথ – অত্যাচারিত মহিলাদের ওপর একপেশে বিদ্বেষ আমাদের সমাজের একটি নিষ্ঠুর মনোভাবের নিষ্করুণ চিত্র।
১-যদি কোনও নারী মদ্যপান বা মাদক গ্রহণ করে এবং ধর্ষিতা হয়, তবে তার তা প্রাপ্য। এই সম্পর্ক সে নিজেই চেয়েছে।
২-ভাল মেয়েরা ধর্ষিত হয় না।
৩-নারীরা ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ তোলে কারণ তারা মনোযোগ বা প্রতিশোধ চায় – বা কারো সাথে যৌন সম্পর্ক করার পরে তারা তা নিয়ে অনুশোচনা করে।
৪-সাধারণত: পুলিশের বিশ্বাস যে ধর্ষণের অভিযোগ প্রায়ই মিথ্যা হয়।
৫-প্রশাসন মনে করে ধর্ষণের শিকারদের বিশ্বাস করা যায় না কারণ তাদের ট্রমা ঘটনাকে সৎভাবে বর্ণনা করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
৬-যদি সে চিৎকার না করে, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে বা প্রতিরোধ না করে, তবে তা ধর্ষণ নয়।
৭-যদি সে 'না' না বলে তবে তা ধর্ষণ নয়। আবার না মানে হ্যাঁ।
৮-অজানা ব্যক্তি থেকেই বিপদ।
৯-যদি ধর্ষিতা ধর্ষকের স্ত্রী বা প্রেমিকা হয় তবে তা ধর্ষণ নয়।
১০-শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ধরণের পুরুষরাই ধর্ষণ করে।
১১-যদি নারীরা খোলামেলা পোশাক পরেন বা ফ্লার্ট করেন, তবে তারা ধর্ষণের জন্য 'নিজেই দায়ী। ১২যদি একজন পুরুষ উত্তেজিত হয়ে যায়, তবে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না – তাকে যৌন সম্পর্ক করতেই হবে।
১৩-যদি নারীরা ধর্ষিত হতে না চায়, তবে তাদের রাতে একা বাইরে যাওয়া উচিত নয়।
১৪-ধর্ষণের ভুক্তভোগী এবং বেঁচে থাকা নারীদের একটি নির্দিষ্টভাবে আচরণ করা উচিত।
উপরোক্ত প্রতিটি মিথই নারীর প্রতি সামাজিক হুঙ্কার যা অবশ্যই মধ্যযুগীয় বর্বরতার প্রতিধ্বনি।