01/09/2026
অসমের কলিয়াবরে লোপ পাচ্ছে উদ্ভিদের প্রজাতি। ২০১০-১১ সালে আটটি বনাঞ্চলে পাওয়া যায় মোট ৪১টি প্রজাতির ফার্ন ও ফার্ন-জাতীয় উদ্ভিদ। ২০২২-২৩ সালে একই এলাকাগুলিতে ফের সমীক্ষা চালিয়ে পাওয়া যায় ৩৯টি প্রজাতি। দুটি প্রজাতি লুপ্ত। এভাবে হারিয়ে ১২ বছরে হারিয়ে গিয়েছে একাধিক ফার্ন। হারিয়ে গিয়েছে রাজ ঢেকীয়া গাছ। যার দেখা মিলত আটটি জঙ্গলেই।
এমনটাই বলছে একটি গবেষণা। যা নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে পরিবেশবিদ মহলে। কলিয়াবর কলেজের দুই উদ্ভিদবিদ বশিষ্ঠ কলিতা এবং চিরঞ্জীব বেজবরুয়ার একটি গবেষণাপত্র ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ ‘জার্নাল অব বায়োরিসোর্সেস’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। লাওখোয়া বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য, ডিজু ভ্যালি, বাগসার ও দেওসুরচাং সংরক্ষিত বন, বুড়াপাহাড়, চিকনি পাহাড়, হাতিমুড়া এবং ত্রিশূলধারী পাহাড়—এই আট জায়গায় প্রায় ১২ বছরের ব্যবধানে দু’বার সমীক্ষা চালিয়েছেন তাঁরা।
শুধু রাজ ঢেকীয়ার মতো গাছই হারিয়ে যায়নি। কমেছে বনরীয়া ঢেকীয়া বা কপৌ ঢেকীয়া গাছের সংখ্যাও। ২০১০-১১ সালে যা ছিল সহজলভ্য, সেই লতানো ফার্নই ২০২২-২৩ সালে দুর্লভ। অফিওগ্লসাম রেটিকুলাটাম-ও-এর মতো গাছ একাধিক পুরনো এলাকা থেকে হারিয়েছে। ইকুইসেটাম ডিফিউসাম-এর মতো ফার্ন হারিয়ে গেছে লাওখোয়া থেকে।
গবেষণায় উঠে এসেছে বৃষ্টিপাতের বড় পরিবর্তন। নাগাঁওয়ে ২০১০ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি ছিল। অথচ ২০১৬ সালে ঘাটতি ৩২ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৩৭ শতাংশ, ২০২০ সালে ৪৯ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৪৮ শতাংশে পৌঁছয়। গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ঘাটতি ছিল ৫৪ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৫৮ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৫-র মধ্যে ওই চার মাসের গড় বৃষ্টি ছিল প্রায় ১,১৯২ মিলিমিটার। ২০১৬ থেকে ২০২৩-এ তা নেমে আসে প্রায় ৬২১ মিলিমিটারে।
২০২৬-এর বৃষ্টিপাতের ছবিটা পরিবেশবিদদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে বললেই কম বলা হয়। ১ জুন থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত অসমে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। নাগাঁওয়ে ঘাটতি পৌঁছেছিল প্রায় ৬০ শতাংশে। অথচ কম সামগ্রিক বৃষ্টির মধ্যেই অল্প সময়ে প্রবল বর্ষণে বন্যা হয়েছে। অগস্টের প্রথম সপ্তাহেও নাগাঁওয়ের কলিয়াবর ও সামাগুরি রাজস্ব চক্রের ২১টি গ্রাম জলমগ্ন ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন ২,৭৬৪ জন। জলের তলায় ছিল প্রায় ৫৯৬ হেক্টর কৃষিজমি, যার মধ্যে কলিয়াবরেই প্রায় ২৩ হেক্টর। অর্থাৎ শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বৃষ্টির চরিত্রও বদলাচ্ছে।
শুধু তাই নয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রায় ৬,৯৫০ কোটি টাকার কলিয়াবর-নুমালিগড় জাতীয় সড়ক প্রকল্পের সূচনা হয়েছে। প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের মধ্যে কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও ব্যাঘ্রপ্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩৪.৫ কিলোমিটার এলিভেটেড করিডর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কাজিরাঙার জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেই প্রকল্পটি তৈরি হবে।
ফলে কলিয়াবরের সামনে এখন ছবিটা আরও জটিল। একদিকে দীর্ঘমেয়াদে কমছে আর্দ্রতা-নির্ভর একাধিক পরিচিত ফার্নের বিস্তার। অন্যদিকে কখনও বৃষ্টির ঘাটতি, কখনও অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি ও বন্যা। তার সঙ্গে আগ্রাসী উদ্ভিদের বিস্তার এবং বন কেটে কয়েক হাজার কোটি টাকার নতুন পরিকাঠামো প্রকল্প।
জলবায়ুর বদল, জমির ব্যবহার এবং পরিকাঠামোর চাপ যদি একই সঙ্গে বাড়তে থাকে, তাহলে কলিয়াবরের গোটা উদ্ভিদজগতটাই একদিন ‘নেই’ হয়ে যাবে। এমনটাই বলছেন পরিবেশবিদরা।
তথ্যসূত্র: জার্নাল অব বায়োরিসোর্সেস, কলিয়াবর কলেজ, ভারতীয় আবহাওয়া দফতর, অসম রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো, অসম সরকারের পরিবেশ ও বন দফতর, ইন্ডিয়া টুডে, ইন্ডিয়া টুডে নর্থ-ইস্ট।