11/08/2026
রথ টানলে দুর্গা আসে.. বাংলার এই বহুল প্রচলিত প্রবাদের সঙ্গে কিছুটা মিল রেখেই আমাদের বিএফ ব্লকেও গত কয়েক বছর ধরে একটি সুন্দর রীতি তৈরি হয়েছে। রথযাত্রার পবিত্র দিনে, শ্রী প্রভু জগন্নাথ দেবের নাম স্মরণ করে সকাল সকাল স্নান সেরে আমরা কুমারটুলির উদ্দেশে রওনা দিই। সেখানেই আমাদের মা দুর্গার প্রতিমার বায়না হয়। আর ঠিক আট দিন পরে, উল্টো রথের দিন, অনুষ্ঠিত হয় আমাদের খুঁটি পুজো। বলতে পারেন, সেদিন থেকেই আমাদের দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা।
এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকাল সকাল মোটরগাড়িতে রওনা দিলাম আমরা পাঁচজন - শ্রী চন্দন দে, শ্রী সুব্রত রায়, শ্রী অমল রায়, শ্রী সুখেন্দু বিশ্বাস এবং আমি। কুমারটুলিতে গিয়ে একের পর এক প্রতিমা দেখা, শিল্পীদের সঙ্গে গল্প, দরদাম, আলোচনা.. সবশেষে আমাদের এ বছরের প্রতিমার বায়না সম্পন্ন হল।
রথযাত্রার দিন যেমন প্রতিমার বায়না দেওয়া আমাদের এক বিশেষ রীতি, ঠিক তেমনই গত কয়েক বছর ধরে প্রতিমা বায়না দিতে গেলে লালুভুলুর দোকানে যাওয়াটাও একরকম রীতিতে পরিণত হয়েছে। কুমারটুলি ঘাটের পাশেই ছোট্ট সেই দোকান অনেকেই নিশ্চয়ই চেনেন। সেখানে ঘুগনি, পাউরুটি, হাঁসের ডিম আর গরম চা না খেলে যেন ঠাকুর বায়নাই সম্পূর্ণ হয় না। যারা লিকার চা ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য আবার দার্জিলিং চায়েরও ব্যবস্থা আছে।
মজার ব্যাপার হলো, বছরের অন্য কোনো দিন আমরা কেউই প্রায় ওই দোকানে যাই না। কিন্তু রথের দিন এলেই যেন অলিখিত নিয়মে সেখানে হাজির হই। ঘুগনি খেলে যে অম্বল হয় না, তা নয়.. বরং বেশ ভালোই হয়! কিন্তু সেই অম্বলের ভয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই আমরা প্রতি বছর একই উৎসাহে খাওয়াদাওয়া করি। সব রীতির পেছনে কোথাও না কোথাও আনন্দ লুকিয়ে থাকে..আমাদের এই ছোট্ট রীতিটাও তারই প্রমাণ।
তবে এ বছর একটা ছোট্ট আক্ষেপ রয়ে গেল। প্রতি বছর লালুভুলুর দোকানের পর আমরা চিত্তরঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে গিয়ে রসগোল্লা খাই। এ বছর অনেকের তাড়া থাকায় সেই পর্বটা আর হয়ে ওঠেনি। মনটা একটু খারাপ হয়েছে বটে। আশা করি আগামী বছর সেই অপূর্ণতাও পূরণ হবে।
যাওয়া-আসার পথে গল্প, আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা…সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টা কখন কেটে গেল, টেরই পাইনি। আর প্রত্যেক বছরের মতো এ বছরও আমি রাস্তা ভুল করেছি! এর জন্য অবশ্য দায়ী আমার অজ্ঞতা আর গুগল ম্যাপের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস। উত্তর কলকাতার গলি-ঘুঁজির কাছে গুগল ম্যাপও মাঝে মাঝে আত্মসমর্পণ করে!
ঠিক সেই সময় শ্রী চন্দন দে আমাদের একপ্রকার উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। কোন গলি দিয়ে গেলে সুবিধা, কোথায় বাঁক নিতে হবে, কোন রাস্তা কোথায় গিয়ে মিশেছে..সব যেন তাঁর নখদর্পণে। উত্তর কলকাতার প্রতি তাঁর এই অসাধারণ পরিচিতি দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। যেটা আমার নেই, সেটাই যখন অন্য কারও মধ্যে দেখি, তখন অবাক তো হবই!
এ বছরের প্রতিমাও আমাদের বহু বছরের ঐতিহ্য মেনেই একচালা, সাবেকি এবং বাগবাজার ঘরানার মুখের হবে। তবে এবারের পুজো আমাদের দশম বর্ষে পদার্পণ করছে। তাই প্রতিমার সাজে থাকছে কিছু বিশেষ আকর্ষণ। সবটা এখনই বলে দিলে আর চমক কোথায়? সেটুকু আপাতত থাক।
সব মিলিয়ে, এ বছরের পুজোর প্রস্তুতির প্রথম অধ্যায়টি অত্যন্ত আনন্দ, হাসি আর সুন্দর স্মৃতির মধ্য দিয়েই শুরু হলো।