04/09/2026
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার জন্ম সম্পর্কে নিজেই বলেছেন,তার জন্ম সাধারণ মানুষের মতো নয় এবং তার মৃত্যুও সাধারণ মানুষের মতো নয়। তিনি বলেছেন,মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায়; কিন্তু আমি জন্মরহিত হয়েও আবির্ভূত হই এবং অবিনশ্বর হয়েও অন্তর্ধান করে থাকি। আবির্ভূত হওয়া এবং অন্তর্হিত হওয়া- দুটিই আমার অলৌকিক লীলা।
শ্রীকৃষ্ণের অন্যসব লীলার মতো তার জন্মলীলাতেও সুগভীর আধ্যাত্ম তত্ত্ব আছে, যা অনুশীলন করলে প্রত্যেকের মধ্যেই ভগবানের জন্ম সম্ভব। বাহ্য জন্ম যেমন সত্য, তার চেয়েও অধিকতর সত্য আধ্যাত্ম জন্ম। সাধক ভক্তের হৃদয়ে ভগবানের আধ্যাত্ম জন্ম হয়।
দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির রোহিণী নক্ষত্রে বাসুদেব-দেবকীর কোলে কংসের কারাগারে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীকৃষ্ণ। অষ্টমী তিথিতে দেবকীর অষ্টম গর্ভে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে এই জন্মতিথির নাম জন্মাষ্টমী তিথি। শ্রীকৃষ্ণ কংসের কারাগারে যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন তখন দুরাচারী কংসের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সবাই।
বাসুদেব জীবাত্মা বা প্রাণ। বাসু মানে প্রাণ, দেব মানে অধিপতি। দশ প্রাণের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হচ্ছে প্রাণ- তাকে বলা হচ্ছে বাসুদেব। দেবকী দৈব প্রকৃতি- দৈবী শক্তি। প্রাণের সঙ্গে দৈবী শক্তির মিলন যদি সাধনায় ঘটে তখন সাধক চিত্তে ভগবানের আবির্ভাব ঘটে। বাসুদেব ও দেবকী শ্রেষ্ঠ সাধক ও সাধনার শক্তি। এ দুয়ের মিলনে ভগবানের জন্ম সম্ভব।
ভগবান জন্ম নিলেন কংসের কারাগারে। কম্+স=কংস। 'কম্' মানে কামনা বাসনা। কারাগার থাকে রুদ্ধ, হলো উন্মুক্ত। অর্থাৎ কামনা বাসনা যুক্ত দেহরুপ কারাগারের রুদ্ধ দুয়ার একমাত্র প্রাণকৃষ্ণের কৃপায় খুলে যায়। অন্য কোনো ভাবে নয়। জন্ম হল কংসের কারাগারে। কামনার কারাগার হল কংসের কারাগার। হাজার কামনার পিঞ্জর এই দেহ। এই কংস কারাগার মথুরায় অবস্থিত। মথ্ ধাতু থেকে মথুরা শব্দের উৎপত্তি। মথ্ মানে মন্থন করা। কামক্রোধাদি রিপুসমূহ অবিরত এই দেহকে মন্থন করে চলছে। অতএব এই দেহ মথুরা। এর অধিপতি কংস। সে কামনার অধিপতি।
শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ভাদ্র মাসে। এই মাস মঙ্গলকর হয়েছিল ভগবানের আবির্ভাবে বা মঙ্গলকর মাসে মঙ্গলময়ের আবির্ভাব। ভাদ্রমাস হলো, ভদ্র+ষ্ণ=ভাদ্র। অর্থাৎ ভাদ্র মাস শুভ বা মঙ্গলের মাস।
আমরা জানি, আবির্ভাব কৃষ্ণপক্ষে অষ্টমী তিথিতে। কৃষ্ণপক্ষে চন্দ্রের শক্তি ক্ষয় বা ক্ষীণ হয় এবং শুক্লপক্ষে এর শক্তি বৃদ্ধি পায়। অন্তর্জগতে চন্দ্র হচ্ছে 'মন'। অর্থাৎ মনই চন্দ্র। অষ্টমী তিথিতে চন্দ্রের তথা মনের ক্ষয় হতে হতে অর্ধেকে গিয়ে পৌঁছায়। মনের চঞ্চলতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সাধনার মোক্ষম সময়। মন যখন বহির্জগতের কামনা বাসনা মুক্ত হয়, তখনই তা অন্তর্মুখি হলে, অপুর্ব জ্যোতি দর্শন করা যায়। তখন চিত্তে ভগবদ আবির্ভাব সম্ভব। মাটি, জল, তেজ, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার, এই অষ্টতত্ত্বই আমাদের জীব প্রকৃতি। শ্রীকৃষ্ণ ত্রিগুনাতীত বিশ্ব প্রতিভূ। অষ্ট প্রকৃতির উর্ধ্বে তিনি। তাই কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে তাঁর জন্ম।
শ্রীকৃষ্ণের জন্ম রোহিণী নক্ষত্রে। রুহ্+ইন্ করে রোহিণী শব্দের উৎপত্তি। রুহ অর্থ উৎপত্তি হওয়া। মন অনবরতই উৎপন্ন করে থাকে। উৎপত্তির মধ্যে শ্রেষ্ঠ উৎপত্তি ভগবদুৎপত্তি। উৎপত্তি করে বলে মনরূপী চন্দ্র রোহিণী বেশি সঙ্গ করে।