15/03/2026
' বরেণ্য' ২০২৬ সম্মান।
লিখেছে মধুমিতা দত্ত।
----------------------
পর্যটক নিয়ে ঘাটশিলার পাহাড়, জঙ্গল পেরিয়ে ছুটে চলে তাঁর অটো। এরই সঙ্গে ছুটে চলে তাঁর স্বপ্ন। ওই যে জঙ্গল, পাহাড়ের কোণে কোণে জনজাতি মানুষের বাস, তাঁদের সন্তানরা যাতে শিক্ষার মুখ দেখে। তারা যেন ভাল থাকে।
আদতে ঝাড়গ্রামের মানুষ অনুপ খাটুয়া ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজের ছাত্র ছিলেন। আর্থিক কারণে পড়াশোনা শেষ করা হয়নি। গত শতকের আটের দশকে রুজির টানে ঝাড়গ্রাম থেকে ঘাটশিলায় চলে আসা। পশ্চিমবঙ্গের সীমানা ঘেঁষা ঝাড়খণ্ডের (তৎকালীন বিহার) ঘাটশিলায় প্রথমে কিছু ব্যবসা করা। তারপর নয়ের দশক থেকে চালাতে শুরু করেন অটো।পর্যটকদের কাছে তিনি প্রিয় অনুপ দা। যিনি এই অটো চালানোর সঙ্গে সঙ্গে ওইসব শিশু-কিশোরদের ভাল থাকার পথ বাতলে দিতে চান। যেসব পর্যটক অনুপবাবুর অটোতে ঘোরেন, তাঁদেরই তিনি এদের কথা বলেন। সাহায্য আসেও তাঁদের থেকে। সে সব সাহায্যের হিসেব নিকেশ লেখা থাকে জাবদা খাতায়। বাসাডেরা, মিরগীটাঁড়, আমবেড়া, ঠিকরি, কেনডাঙ্গা - পাহাড়ের কোণে কোণে থাকা এই সব অঞ্চলে অনুপবাবু পৌঁছে যান সেখানের শিশু, কিশোরদের ভাল থাকার রসদ নিয়ে।
মার্চ মাসের ১৪ তারিখ 'এসো কিছু করি' তার এই বছরের 'বরেণ্য' সম্মানে সম্মানিত করল ঘাটশিলার অনুপবাবুকে। বুরুডি লেক পেরিয়ে ধারাগিরির পথে বাসাডেরা। দলমা পাহাড়ের কোলে সেইখানে বাস সুমিত্রা শবর, অহল্যা শবরদের। ওদের মতো এক ঝাঁক কচিকাঁচা অনুপবাবুকে দেখেই ঘিরে ধরল। পাহাড়ের ঢালে সেই
বিকেলের আলোয় বাসাডেরার ওই শিশু কিশোরদের সামনে 'বরেণ্য' সম্মানে দিতে গিয়ে 'এসো কিছু করি'র সম্পাদক সৌরভ বিশ্বাস যখন অনুপবাবুকে মানপত্রটি পড়ে শোনাচ্ছে, মানুষটির তখন চোখ ভরা জল। একে একে 'এসো কিছু করি'র সদস্য অঙ্কনা চক্রবর্তী অনুপবাবুকে পরিয়ে দেয় শাল। তনুময় দে (অর্ক) দেয় স্মারক। অনুপবাবু তখন আবেগ চেপে রাখতে পারছেন না। কিছু না পাওয়া এক ঝাঁক শিশু, কিশোরের দিকে তাকিয়ে শুধু বলে যাচ্ছিলেন, "ওদের জন্যই আমার সব চেষ্টা।" বাসাডেরায় মধ্য স্কুল অর্থাৎ ক্লাস এইট পর্যন্ত স্কুল আছে। এর পর পড়তে গেলে পাহাড়, জঙ্গল পেরিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরে ঘাটশিলা যেতে হয়। এই এইট পর্যন্ত যেতে যেতেই অনেক ড্রপ আউট। কিছুটা শিক্ষার মুখ যাতে ওরা দেখে তারজন্য অনুপবাবুর প্রাণপন চেষ্টা। রুখাশুখা মালভূমির মানুষগুলোর জীবন চলে অল্পসল্প চাষ আর জঙ্গলের কাঠ বেচে। কেউ বা গরু চড়ায়। আর কেউ কেউ পর্যটকদের গাইড হয়। অভাব প্রত্যেকের শরীরে স্পষ্ট।
আগেই অনুপবাবু জানিয়েছিলেন, এইদিন ওই সব কচিকাঁচাদের কিছু টিফিনের ব্যবস্থা যেন 'এসো কিছু করি' করে। সেই টিফিন পেয়ে বাচ্চাদের উজ্জ্বল চোখ ভুলবো কেমন করে?
সব কিছুর শেষে পাহাড়ের গায়ে শাল পিয়ালের বনের ভেতর যখন দিনের শেষ আলো মুছে যাচ্ছে, ফিরতে ফিরতে অনুপবাবুর কথা তখন কানে বাজছে, "সকলে মিলে চেষ্টা করলে অনেক কিছু করা যায়।"
হ্যাঁ, এই লক্ষ্য নিয়েই তো গড়ে উঠেছিল 'এসো কিছু করি'।