13/04/2026
ভয়ে ভয়ে থাকি। 'দায় আমাদেরও' নাটকের জন্য ৫৪ টি টিকিট কেটেছিলাম। ভাষা ও চেতনা সমিতি- থেকে।
বাপের অভ্যাস পেয়েছি। বাবাও ভালো যাত্রা সিনেমা দেখাতে টিকিট কেটে গোরুর গাড়ি চাপিয়ে যাত্রা দেখাতে নিয়ে যেত। ১১ বছর বয়সে এভাবেই দেখেছিলাম, তুরুপের তাস। উৎপল দত্তের লেখা। সিআইএ-র চক্রান্ত নিয়ে। এটা ছয় কিলোমিটার দূরে। আমাদের জুনিয়র হাইস্কুলে তখন বাবা সম্পাদক । বাবা সব শিক্ষকদের নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রধান শিক্ষক কার্তিক নন্দী জিজ্ঞাসা করলেন, বুঝেছিস কিছু?
যা বুঝেছিলাম। বললাম। বর্ণালী ব্যানার্জি অনাদি চক্রবর্তী শেখর গাঙ্গুলি গৌতম সাধু খাঁ নিরঞ্জন সেনগুপ্ত তুখোড় সব অভিনেতা। জসমিন্দার সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শেখর গাঙ্গুলি। তাঁকে ছুরি মারা হয়েছে অকস্মাৎ। পড়ে যাচ্ছেন।
ওইভাবে পড়ে যাওয়ার অভিনয় আর কারও দেখিনি। একটু পড়ে গেলেন। আধ অবস্থায় ওঠার চেষ্টা করলেন। তারপর পড়ে গেলেন।
তখন গ্রামের রাজদূত অগ্রদূত-দের লেখা নাটকে অভিনয় করি। নকল করার চেষ্টা করলাম। হয় নি। হবেও না। তুরুপের তাস-এ
বর্ণালী ব্যানার্জি একজন মাদকাসক্ত তরুণ
সিআইএ-র জালে কীভাবে জড়াচ্ছেন সেই নিয়ে যাত্রা। এইসব অসাধারণ অভিনেতা অভিনেত্রীরা যাত্রার জগতে থাকায় প্রবল জনপ্রিয়তা পেলেও এলিট নাট্যসাহিত্যের জগতে ইতিহাসে তাঁদের কথা লেখা হল না। শেখর গাঙ্গুলি বর্ণালী ব্যানার্জি ছন্দা চ্যাটার্জিরা উৎপল দত্তের পিএলটি দলের লোক।
লোকনাট্য গণবাণী সত্যম্বর অপেরা নাটকে অভিনয় করতেন। ছন্দা চ্যাটার্জি তো জীবন্ত কিংবদন্তি। ২ টাকা আর ৫ টাকা টিকিটের যুগে টিকিট ১০ /১৫।
লায়লা মজনু পালায় সব জায়গায় প্যান্ডেল খুলে দিতে হতো। মানুষের ভিড়েঋ
তার আগে ছয় বছর বয়সে বাবা ১৪ কিলোমিটার দূরে মাঘ মাসের তীব্র ঠাণ্ডায় নিয়ে গিয়েছিলেন আহ্লাদিপুরে তরুণ অপেরার 'মাওসেতুঙ' পালা দেখাতে। শান্তি গোপাল মাও সেতুঙ
একটা গল্প আজও মনে আছে।
চারজন কমিউনিস্ট চিয়াং কাইশেকের বাহিনীর অত্যাচারে বিচ্ছিন্ন। খাবার নেই। অনশন চলছে। একটা চামড়ার বেল্ট ছিল। সেটাকে সেদ্ধ করা হয়েছে।
একজন একজন করে খেতে যাচ্ছেন।
গিয়ে ফিরে আসছেন।
একা কেন খাবো?
একটু খেয়ে তো কিছু হবে না।
একজন অন্তত পুরোটা খেলে কদিন বাঁচবে।
তিনজন ফিরে এলেন খাবার না ছুঁয়ে।
চতুর্থ জন নেতা।
গিয়ে দেখলেন পুরোটাই আছে।
তিনি খাবারটা নিয়ে এসে বললেন, আমাদের কেউ মারতে পারবে না ।
আমরাই জিতবো।
হাততালির পর হাততালি।
কাল ৫০ টি টিকিট ছাত্রদের জন্য কেনা হয়েছিল।
দেখি লোক পাই না। পরীক্ষা চলছে কলেজে কলেজে।
টিকিট কেটে লোক পাই না।
টেনশন।
১০ টাকা হলে বর্ধমান থেকে এসে হাওড়ায় নেমে একাডেমিতে নাটক দেখে রাত দেড়টায় হোস্টেল ফিরেছি লাস্ট ট্রেনে। আট আনার বিফ রোল গিলে। এক বন্ধু চারটে রোল মৌলালি থেকে কিনে হাজির প্রায় শনি/রবিবার করেছি।
ডিসেম্বরে নান্দীকার উৎসবের জন্য টাকা জমিয়েছি। অন্তত সাতদিন দেখতাম এইভাবে এসে।
কলেজের নেতাগিরি আছে, তাই থাকা হতো না।
না হলে পাঁচ টাকার বিনিময়ে মৌলালি যুব কেন্দ্রে থাকা যেতো।
কিন্তু খাওয়া যাতায়াত মিলে দিনে ১৫ টাকার ধাক্কা।
তাই বর্ধমান ফিরে যাওয়াই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত।
৮ টাকায় হয়ে যেত।
একাডেমিতে শেষ তিন বা চারটি রো-র টিকিট ছিল পাঁচ টাকা। সেখানেই দেখতাম।
এখন দোতলায় একশো বা দুশো।
খাল পাড়ে কিছু ছেলে মেয়ে নাটক করে। তাঁদের বললাম। ২০ জনের তালিকা করেছি।
দুপুরে আনতে গিয়েছি। ছোট রাও ধরল, বড় স্যার নিয়ে যাবে না?
ওদের দেখলেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। চার বছর বয়স থেকেই বাবা যেখানে আম্মো সেখানে।
কত মার খেয়েছি। আবার যাত্রা সিনেমা নাটক দেখেছি।।
মাধ্যমিক পরীক্ষার একদিন আগে সারারাত সিনেমা দেখেছি বাবার সঙ্গে গায়ে ম্যালেরিয়ার ১০২ জ্বর নিয়ে শ্যামসুন্দর কলেজ মাঠে।। গণদেবতা-দেখার জন্য।
বাবা বলেছিল, মুখ চাদর ঢাকা দিয়ে থাকবি। কেউ যেন চিনতে না পারে। আলাদা ঢুকবি।
তোর বড় ভাই জানতে পারলে খুব মুশকিলে পড়ে যাবো দুজন।
বড়ভাইকে ভয় ছিল। আর এইসব বিষয়ে,অল্প, মাকে।
বাবা এই নাটক যাত্রা দেখায় আর রাজনৈতিক তর্কে ইয়ার দোস্ত।
কুচোকাচা ২০ জন।
ছয় থেকে আট। বাদ দিই কী করে? নিই বা কী করে?
আকাদেমির বিদগ্ধ দর্শক তো খেপে লাল হয়ে যাবেন!!
ম্যাটাডোর ভাড়া করে নিয়ে গিয়ে বাইরে দাঁড় করিয়ে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ছুটলাম।
সে তখন মঞ্চে পার্ট বোঝাচ্ছে। দেখলাম অন্যের দীর্ঘ সংলাপ মুখস্থ।
শেষ হলো।
বললাম, ভাই ক্ষমা করে দাও। কিছু ছোট এনে ফেলেছি।
বিপ্লবের সঙ্গে আমার যত ঝগড়া তত ভাব।
কী বলে? গাল দেবে?
কী করবো বাকি ২০ জন নিয়ে?
এই রোদে কোথায় ঘোরাবো?
২.৪০ বাজে।
বিপ্লব বলল, দেখবে। ছোটরা নাটক দেখবে, এইতো।
এদিকে এসে দেখি বাচ্চাদের দেখতে ভিড়।
এরা এই সিরিয়াস নাটকে?
জার্মানির হিটলারের আমলের আইনমন্ত্রী ও বিখ্যাত বিচারপতির বিচার নিয়ে নাটক। কোর্ট রুম সংলাপ অনেক। দেবশঙ্কর হালদার, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, সুপ্রিয় দত্ত, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় বুদ্ধদেব দাস । সঙ্গে দুরন্ত টিমওয়ার্ক। এই নাটক দেখে তো অর্ক মুখার্জির ফ্যান হয়ে গিয়েছি আমি।
আকাদেমিতে মোবাইল বাজলে কেউ কাশলে এত লোক বকে তাতে মোবাইল আওয়াজ কম খারাপ মনে হয়।
এদিকে আরও আটজন বন্ধু এসেছেন। চারটি ৫০০ টাকার টিকিট কাটা ছিল। আরও কাটতে ছুটলাম।
হলে বলা হল একজন বড় একজন ছোট এইভাবে বসবে । বন্ধুদের কেউ ছাড়ে? নিয়ম ভঙ্গ।
গিয়ে দেখি ছোটদের দল পাশাপাশি। কয়েকজন বড় অবশ্য সামলে নিয়েছে।
আমার তো নাটক দেখা মাথায় উঠল। চাপা উদ্বেগ। গেল সব!
কিন্তু কেউ বিরক্ত করেনি।
নাটক দেখে মহাখুশি।
কেউ কিছু বুঝেছে। কেউ অনেকটা।
মোট ৬৬ জন টিকিট কেটে দেখলাম।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় জন ছাত্র ছিলেন। আর কিছু কলেজের নাটক করা ছেলে মেয়ে।
বের হয়ে যেতে হল নিউ ওয়েভ-এর জীবনানন্দ সভা ঘরে অনুষ্ঠান উদ্বোধনে।
৬২ টি ডিম রোল খেয়ে সবাই বাড়ি ফেরার পথে। চারজন খাননি।
৮২ বছরের মহিলা থেকে ৬ বছরের শিশু।
নাটক শেষে দেখি নাটক পাগল মানুষ বিশিষ্ট আইনজীবী একরামুল বারি।।। দুপুরে চেম্বার। আসতে পারেননি। যদিও এই নাটক প্রথম দিন প্রথম শো একসঙ্গে দেখেছি। একরামুল ভাই দেখিয়েছেন।
সন্ধ্যায় দেখলেন, বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ।
আমি দেখেছি। ভাই দেখেননি।
তাই দেখলেন।
আমার আরেকবার ইচ্ছে থাকলেও হল না।
আলমগীর ভাই শাজাহান ভাই শাহ নওয়াজ ভাই এসেছিলেন। গল্পগুজব হল।
রাখি এখন। ফোন আসছে ভাইয়ের।
একরামুল ভাইয়ের।
অনেকে জানেন কি না জানি না, শেখর গাঙ্গুলি সহ নানা অভিনেতার গলায় তাঁদের সংলাপ হুবহু বলতে পারেন একরামুল বারি ভাই।