12/06/2026
প্রাচীন ভারতীয় মূল্যবোধ বনাম পশ্চিমী অনুকরণ:
হর্নিট স্কুল হোক বা সুরেন্দ্রনাথ কলেজ — বিলাসবহুল ঘর থেকে টাকার বান্ডিল আর কন্ডোমের প্যাকেট উদ্ধার হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এটা একটা প্যাটার্ন। একটা সংক্রমণ। যার উৎস হল তথাকথিত ‘যাদবপুর কালচার’। হ্যাঁ, যাদবপুর। নামটা নিতেই একদল রে রে করে উঠবে। বলবে ‘জেনারালাইজ করবেন না’। কিন্তু তেতো সত্যিটা হল, গত দুই দশকে এই একটা ক্যাম্পাস থেকেই ‘মদ খাও, গাঁজা টানো, অবাধ যৌনতাই স্বাধীনতা’ — এই বিষবৃক্ষের চারা গোটা রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়েছে। এটা আর ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ নেই, এটা এখন ‘ক্যাম্পাস পলিটিক্স’। ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন জিততে হলে আপনাকে ‘প্রগতিশীল’ হতে হবে, আর ‘প্রগতিশীল’ হওয়ার শর্টকাট হল নেশা আর যৌনতাকে ‘বিপ্লব’ বলে চালানো।
এই কালচারের সবচেয়ে বড় শিকার কারা? জেন-জি। গ্রাম থেকে উঠে আসা প্রথম জেনারেশনের কলেজ পড়ুয়া। যে ছেলেটা বাবার ঘাম-রক্তের টাকায় শহরে পড়তে এসেছে, তাকে প্রথম দিনেই বোঝানো হয় — ‘ব্রো, সেকেলে মানসিকতা ছাড়। বিয়ে, পরিবার, সংযম — এগুলো RSS-এর প্রোপাগান্ডা। আসল মজা হল লিভ-ইন, হুক-আপ, পলিএমরি’। ফল কী হচ্ছে? বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে প্রথম বর্ষেই বহু ছাত্র ড্রপ-আউট হচ্ছে ড্রাগ, ডিপ্রেশন আর সম্পর্কের জটিলতায়। NCRB-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ১৮-৩০ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এর দায় কে নেবে? যে অধ্যাপকরা ক্লাসে ‘ব্রেক দ্য ট্যাবু’ পড়ান, তারা? যে ছাত্রনেতারা ফ্রেশার্সে বিয়ারের ক্যান তুলে দেন, তারা?
এখনই সময় এই ‘যাদবপুর মডেল’-কে ‘ছাত্র কালচার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া রুখে দেওয়ার। কারণ এটা সংস্কৃতি না, এটা অপসংস্কৃতি। এটা স্বাধীনতা না, এটা স্বেচ্ছাচারিতা। সংস্কৃতি মানে নালন্দা, যেখানে রাত দুটো পর্যন্ত মোমের আলোয় শাস্ত্রচর্চা হত। সংস্কৃতি মানে তক্ষশীলা, যেখানে চাণক্য অর্থশাস্ত্র লিখতেন আর চন্দ্রগুপ্ত যুদ্ধবিদ্যা শিখতেন। সংস্কৃতি মানে কাশী, যেখানে ঘাটে বসে ব্যাকরণ আর জ্যোতিষের তর্ক চলত। আমাদের অনুকরণ করতে হবে সেই সংস্কৃতিকে। আমাদের আইকন হবে শঙ্করাচার্য, যিনি ৮ বছর বয়সে বেদ মুখস্থ করেছিলেন, ১৬ বছরে ভাষ্য লিখেছিলেন। আমাদের আইকন হবে নিবেদিতা, যিনি ভোগের জীবন ছেড়ে ভারতের সেবায় প্রাণ দিলেন। মদ-গাঁজা-যৌনতা খেয়ে বিপ্লব হয় না, বিপ্লব হয় ত্যাগে, তপস্যায়, চরিত্রে।
আমাদের বলা হয়, ‘সনাতন ধর্ম আঁকড়ে থাকলেই আমরা পিছিয়ে যাব’। এই মিথ্যাটা এবার ভাঙতে হবে। কারণ ইতিহাস বলছে ঠিক উল্টো কথা। বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কোথায়? তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, বল্লভী, নাদিয়া — সব ভারতে। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সাল থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গোটা এশিয়ার ছাত্ররা ভারতে পড়তে আসত। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং লিখেছেন, নালন্দায় ১০,০০০ ছাত্র আর ১,৫১০-এর বেশি আচার্য ছিলেন। লক্ষাধিক পুঁথির লাইব্রেরি ছিল ‘ধর্মগঞ্জ’ নামে, যা তিনটি বহুতলে ভাগ করা ছিল — রত্নসাগর, রত্নদধি, রত্নরঞ্জক। বিষয় কী পড়ানো হত? বেদ, হেতুবিদ্যা, শব্দবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, যোগশাস্ত্র, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রাজনীতি, যুদ্ধবিদ্যা। এই ছিল ‘সনাতনী’ শিক্ষাব্যবস্থা। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ তখন জন্মায়নি।
কিন্তু আমরা পিছোলাম কখন? বখতিয়ার খিলজি নালন্দা পোড়ানোর পরেও না। আসল সর্বনাশ শুরু হল ১৮৩৫ সালে, টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলের হাত ধরে। ২রা ফেব্রুয়ারি, ১৮৩৫ — ম্যাকলে মিনিট। সেখানে স্পষ্ট লেখা হল — ‘We must do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern; a class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect’। অর্থাৎ এমন একটা ভারতীয় শ্রেণি তৈরি করতে হবে যারা গায়ের রঙে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতামত, নীতি, বুদ্ধিতে পুরো সাহেব। তার আগে ধরমপাল-এর "The Beautiful Tree" বইয়ে ব্রিটিশ কালেক্টরদের সার্ভে রিপোর্ট বলছে, ১৮০০ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে গ্রামে গ্রামে গুরুকুল ছিল, সাক্ষরতার হার ছিল ৯৭%। শূদ্ররাও সংস্কৃত, জ্যোতিষ, আয়ুর্বেদ পড়ত। ম্যাকলে সেই সিস্টেমটাকে ‘সেকেলে’ বলে গলা টিপে মারল। চালু করল কেরানি তৈরির কারখানা। ইতিহাস বইয়ে পড়ানো হল — ‘আর্যরা বাইরে থেকে এসেছিল’, ‘ভারত চিরকাল কুসংস্কারাচ্ছন্ন’। নিজের ভাষা, নিজের বিজ্ঞান, নিজের চিকিৎসা — সব ‘সিউডো সায়েন্স’। ফলে আমরা নিজেরাই নিজেদের ঘৃণা করতে শিখলাম। আজকের ‘যাদবপুর কালচার’, আজকের ‘লিভ-ইনই আধুনিকতা’ — এগুলো সেই ম্যাকলে প্রজেক্টেরই ফসল। ২০০ বছর ধরে আমাদের মগজ ধোলাই করে বোঝানো হয়েছে — পশ্চিমী যা কিছু, তাই উন্নত। আর ভারতীয় যা কিছু, তাই গোঁড়ামি।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার কথা বলবেন? সুশ্রুত সংহিতা দেখুন। ২৬০০ বছর আগে সুশ্রুত ৩০০ রকম অস্ত্রোপচার পদ্ধতি লিখে গেছেন। প্লাস্টিক সার্জারি, ছানি কাটানো, সিজারিয়ান, কিডনি স্টোন বের করা, প্রস্থেটিক লিম্ব বানানো — সব আছে। তাঁর শিষ্যদের আগে লাউ, কুমড়ো, মৃত পশুর ওপর হাত পাকাতে হত। চরক সংহিতায় ১০,০০০ হার্বাল ফর্মুলা আছে। ‘চরক শপথ’ আজও বিশ্বের মেডিকেল এথিক্সের ভিত্তি। হিপোক্রেটিক ওথ তার অনেক পরে এসেছে। আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য — ‘দিনচর্যা’, ‘ঋতুচর্যা’, ‘আহার-বিহার’ — ছিল মূল কথা। রোগ হওয়ার আগেই আটকাও। আর আজ আমরা কী করছি? পিৎজা-বার্গার খেয়ে ডায়াবেটিস বাঁধিয়ে তারপর ইনসুলিন নিচ্ছি। এটাই কি আধুনিকতা?
এবার আসি খাজুরাহো প্রসঙ্গে। ‘প্রগতিশীল’ মহল খাজুরাহোকে ব্যবহার করে বলে — ‘দেখো, প্রাচীন ভারতে কত মুক্ত যৌনতা ছিল’। ডাহা মিথ্যা। খাজুরাহো কোনো ‘সেক্স মন্দির’ না। ১০০০ বছর আগে চান্দেল রাজারা ৮৫টি মন্দির বানিয়েছিলেন, তার মধ্যে মাত্র ২৫টি টিকে আছে। এই মন্দিরের দেওয়ালের ১০%-এরও কম ভাস্কর্য মৈথুনরত। বাকি ৯০%? দেব-দেবী, যুদ্ধ, নৃত্য, সংগীত, গার্হস্থ্য জীবন, রাজসভা। তাহলে ১০% দেখিয়ে গোটা সভ্যতাকে ‘কামুক’ বলা কোন ধরনের অসততা? আসল দর্শনটা কী? মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে কাম আছে, ভেতরে গর্ভগৃহে ঈশ্বর। অর্থাৎ কাম হল জীবনের প্রথম ধাপ। তাকে অস্বীকার কোরো না, কিন্তু তাতেই আটকে থেকো না। কাম থেকে প্রেম, প্রেম থেকে ভক্তি, ভক্তি থেকে মোক্ষ — এটাই যাত্রা। খাজুরাহো আমাদের শেখায় ‘সেক্স’ না, শেখায় ‘সাবলিমেশন’। ভোগকে কীভাবে যোগে রূপান্তরিত করতে হয়। আজকের ‘হুক-আপ কালচার’ কি সেটা শেখায়? না। ওরা শেখায় ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’।
আমাদের পূর্বপুরুষরা কত আধুনিক ছিলেন, তার প্রমাণ খাজুরাহোর নগর পরিকল্পনায়। মন্দিরগুলো বাস্তুশাস্ত্র মেনে তৈরি। সূর্যের প্রথম আলো গর্ভগৃহে পড়ে। পাথরে পাথরে জোড়া লাগানো, কোনো সিমেন্ট নেই, তবু ১০০০ বছর দাঁড়িয়ে আছে ভূমিকম্প, বন্যা সহ্য করে। ভাস্কর্যের ডিটেইলিং দেখো — নারীর চুলের বেণী, গয়নার নকশা, কাপড়ের ভাঁজ — যেন জীবন্ত। এরোপ্লেন আবিষ্কারের হাজার বছর আগে মন্দিরের গায়ে ‘বিমান’ খোদাই করা আছে। এটা কি পিছিয়ে থাকা সভ্যতার লক্ষণ? যারা খাজুরাহো বানাতে পারে, তারা ‘অসভ্য’? নাকি যারা সেই ঐতিহ্য ভুলে পাবে মদ খেয়ে মাতলামি করাকে ‘কালচার’ বলছে, তারা অসভ্য?
তাই ন্যারেটিভটা পরিষ্কার করতে হবে। প্রথমত, যাদবপুরের একটা অংশের উচ্ছৃঙ্খলতা গোটা বাংলার ছাত্রসমাজের পরিচয় না। IIT খড়গপুরের ছাত্ররা রকেট বানাচ্ছে, প্রেসিডেন্সির ছাত্ররা UPSC তে ভালো ফল করছে, মেডিকেলের ছেলেমেয়েরা গ্রামে গিয়ে স্বাস্থ্য শিবির করছে।প্রকৃত বাংলা একেই বলা হয়। এদের সামনে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রগতি মানে পশ্চিমের নকল না। প্রগতি মানে নিজের শিকড়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বজয় করা। ইসরায়েল যেমন হিব্রু আর তোরাহ ছাড়েনি, জাপান যেমন কিমোনো আর সামুরাই স্পিরিট ছাড়েনি, আমাদেরও তেমনি গীতা আর গায়ত্রী ছাড়লে চলবে না। তৃতীয়ত, যৌনতা ট্যাবু না, কিন্তু লাগামছাড়া ভোগও না। কাম, অর্থ, ধর্ম, মোক্ষ — চারটে একসাথে চলবে। বিবাহ প্রথা, যৌথ পরিবার, গুরু-শিষ্য পরম্পরা — এগুলোই আমাদের ‘সোশ্যাল ইমিউনিটি’।শেষ কথা, আমাদের নতুন প্রজন্মকে বেছে নিতে হবে — তারা কি ‘বিয়ার বং’ হতে চায়, নাকি ‘ভারতীয়’ হতে চায়? তারা কি ‘হুক-আপ’ জেনারেশন হবে, নাকি ‘স্টার্ট-আপ’ জেনারেশন হবে? তারা কি ডিপ্রেশনের ওষুধ খাবে, নাকি গীতার শ্লোক আওড়াবে? উত্তরটা যদি ‘ভারতীয়’ হয়, তাহলে এখনই লড়াই শুরু করতে হবে। ক্লাসরুমে, ক্যান্টিনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় — সর্বত্র। চিৎকার করে বলতে হবে — ‘আমাদের আদর্শ সুশ্রুত, চরক, আর্যভট্ট, চাণক্য, বিবেকানন্দ। আমাদের আদর্শ কোনো নেশাখোর, চরিত্রহীন তথাকথিত বিপ্লবী না’। কারণ সভ্যতা বাঁচে আদর্শে, ভোগে না। আর ভারতীয় সভ্যতা ৫০০০ বছর ধরে বেঁচে আছে, আগামী ৫০০০ বছরও বাঁচবে — যদি আমরা জেগে উঠি।
যাদবপুর মানে শুধু মিছিল, মদ আর অবাধ যৌনতা না — এই অর্ধসত্যটাই সবচেয়ে বড় মিথ্যা। মিডিয়ার ক্যামেরা আর রাজনীতির মাইক সবসময় ক্যাম্পাসের ওই ৫% ছেলেমেয়ের দিকে ঘোরে যারা ‘আজাদি’ স্লোগানকে ‘উচ্ছৃঙ্খলতা’র লাইসেন্স বানিয়েছে। অথচ যাদবপুরের ল্যাবে রাত ৩টে পর্যন্ত যে মেয়েটা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর কোড লিখছে, যে ছেলেটা ISRO-র জন্য লো-কস্ট স্যাটেলাইট মডেল বানিয়ে NASA-র কনফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করছে, যে টিমটা গ্রামের জন্য আর্সেনিক ফিল্টার আবিষ্কার করে পেটেন্ট পাচ্ছে — তাদের খবর কাগজের ভিতরের পাতাতেও জায়গা পায় না। NIRF র্যাঙ্কিং-এ যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ টানা ৫ বছর প্রথম ১০-এ। সিভিল সার্ভিস, GATE, CAT — সব পরীক্ষায় যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা প্রথম সারিতে। কিন্তু ‘প্রগতিশীল’ তকমা বেচতে সুবিধা হয় কাদের দিয়ে? তাদের দিয়ে, যারা ক্যাম্পাসকে ‘ফ্রি সেক্স জোন’ বানানোর স্বপ্ন দেখে। ফলে মেধা চাপা পড়ে যায়, আর ‘ভোগই বিপ্লব’ — এই ন্যারেটিভটা হেডলাইন হয়। এটা পরিকল্পিত। কারণ মেধাবী, দেশপ্রেমিক ছাত্রসমাজ জেগে উঠলে অনেকের রাজনীতির দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।
এই ন্যারেটিভ-সন্ত্রাসের আসল উদ্দেশ্য হল পরিবার প্রথাটাকে ধ্বংস করা। কারণ পরিবারই হল ভারতীয় সভ্যতার শেষ বাঙ্কার। পরিবার ভাঙতে পারলেই ব্যক্তি রাষ্ট্র আর বাজারের দাসে পরিণত হবে। আর পরিবার ভাঙার সবচেয়ে মসৃণ অস্ত্র হল ‘লিভ-ইন রিলেশনশিপ’। শুনতে খুব আধুনিক, খুব ‘চয়েস’। বলা হয় — ‘দুটো অ্যাডাল্ট মানুষ নিজেদের ইচ্ছায় থাকবে, ক্ষতি কী?’ ক্ষতিটা বোঝা যায় যখন সম্পর্ক ভাঙে। বিবাহ একটা সামাজিক, ধর্মীয় ও আইনি চুক্তি। সেখানে স্ত্রীর ভরণপোষণ, সন্তানের অধিকার, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বৃদ্ধ বয়সের দায়িত্ব — সব আইন দিয়ে বাঁধা। Hindu Marriage Act, 1955 থেকে Domestic Violence Act, 2005 — মেয়েদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু লিভ-ইন? সুপ্রিম কোর্ট ‘ইন্দ্রা শর্মা বনাম ভি কে ভি শর্মা’ মামলায় স্পষ্ট বলেছে — লিভ-ইন মানেই বিবাহের সমান অধিকার না। ‘পার্টনার’ হঠাৎ একদিন ‘আমি তোমাকে চিনি না’ বলে বেরিয়ে গেলে মেয়েটির কাছে কোনো আইনি রক্ষাকবচ নেই। ‘ভরণপোষণ’ চাইতে গেলে প্রমাণ করতে হবে যে সম্পর্কটা ‘নেচার অফ ম্যারেজ’-এর মতো ছিল। কত বছর, কতটা নির্ভরশীলতা, সামাজিক স্বীকৃতি — এইসব জটিল শর্ত।
তার চেয়েও ভয়ঙ্কর হল সন্তানের ভবিষ্যৎ। লিভ-ইন থেকে জন্ম নেওয়া শিশুর পিতৃপরিচয় নিয়ে মামলা লড়তে লড়তে জীবন কেটে যায়। DNA টেস্ট, আদালত, উকিল — শিশুটা বড় হয় ‘অবৈধ’ তকমা নিয়ে। UNICEF-এর ‘State of the World’s Children’ রিপোর্ট বলছে, সিঙ্গেল প্যারেন্টের ঘরে বড় হওয়া শিশুদের অপুষ্টি, স্কুলছুট, শিশুশ্রম, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা কয়েক গুণ বেশি। আমেরিকার স্বাস্থ্য দফতরের সমীক্ষা অনুযায়ী, পিতৃহীন ঘরের মেয়েদের টিনএজ প্রেগন্যান্সি আর ছেলেদের ক্রাইমে জড়ানোর হার কয়েক গুণ বেশি। এটা কি ‘প্রগতি’? নাকি একটা গোটা প্রজন্মকে মানসিক ও সামাজিক অনাথ বানানোর প্রজেক্ট? বিবাহ প্রথা হাজার বছরের সামাজিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একটা ইনস্টিটিউশন। তার বিকল্প হিসেবে ‘লিভ-ইন’ নামক যে খেলনা বাজারে ছাড়া হয়েছে, সেটা টেকে না। ভেঙে যায়। আর ভাঙার শব্দটা সবচেয়ে জোরে বাজে মেয়েদের জীবনেই।
লিভ-ইনের আড়ালে চলছে বিশাল ‘লিগ্যাল-এক্সপ্লয়টেশন ইন্ডাস্ট্রি’। ডিভোর্স উকিল, কাউন্সেলর, মেন্টাল হেলথ ক্লিনিক, ডেটিং অ্যাপ — সবাই জানে সম্পর্ক ভাঙলেই ব্যবসা বাড়বে। তাই ‘কমিটমেন্ট ইজ ওভাররেটেড’, ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ান্স’ — এই ডোপামিন-ডোজগুলো সারাদিন গেলানো হয়। আপনাকে বলা হয় না যে ব্রেক-আপের পর অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্টের স্ক্রিপশন অনেক বেড়ে যায়। আপনাকে বলা হয় না যে ক্যাজুয়াল সেক্সের পর ‘পোস্ট-কয়টাল ডিসফোরিয়া’ নামক হতাশা একটা মেডিকেল টার্ম। আপনাকে শুধু বলা হয় ‘এনজয়’। কারণ আপনার দুঃখ, আপনার একাকিত্ব, আপনার শূন্যতা — এগুলোই হল মডার্ন ক্যাপিটালিজমের কাঁচামাল। পরিবার থাকলে আপনি কম খরচ করেন, কম ওষুধ খান, কম থেরাপিতে যান। তাই পরিবার শত্রু।
অথচ আমাদের শাস্ত্র, আমাদের বিজ্ঞান, আমাদের সমাজ — সবাই একসাথে বলছে যে পরিবার মানেই শক্তি। চরক সংহিতায় ‘গর্ভসংস্কার’-এর কথা আছে — মানে সন্তান পেটে আসার আগে থেকেই মা-বাবার মানসিক প্রস্তুতি, আচরণ, খাদ্যাভ্যাস ঠিক করতে হবে। কারণ শিশু শুধু জিন নেয় না, সংস্কারও নেয়। যৌথ পরিবারে শিশু শুধু মা-বাবাকে দেখে না, ঠাকুমার গল্প, দাদুর নীতিকথা, পিসির স্নেহ, কাকার শাসন — সব পায়। হার্ভার্ড গ্র্যান্ট স্টাডি ৮০ বছর ধরে মানুষকে ফলো করে দেখিয়েছে — জীবনের শেষে সুখী তারাই, যাদের ‘ওয়ার্ম রিলেশনশিপ’ ছিল। টাকা, খ্যাতি, আইকিউ না — সম্পর্কই আসল। আর সেই সম্পর্কের প্রথম পাঠশালা হল পরিবার। লিভ-ইন সেই পাঠশালা ভেঙে দিয়ে ‘কোচিং সেন্টার’ বানাতে চায় — যেখানে আজ আছি, কাল নেই।
আর এই যে বলা হচ্ছে ‘পরিবার তন্ত্র ধ্বংস না করলে প্রগতি হবে না’ — এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধাপ্পা। তথ্য দেখুন। UN-এর World Happiness Report টানা ৭ বছর ধরে বলছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশ ফিনল্যান্ড। তারপর ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে। এদের কমন কী? শক্তিশালী পরিবার ও কমিউনিটি বন্ডিং। ফিনল্যান্ডে ৭০%-এর বেশি শিশু মা-বাবা দুজনের সাথেই থাকে। ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’ আছে, কিন্তু ‘ভাঙা পরিবার’ নেই। ওদের কাছে ‘ফ্যামিলি ডিনার’ একটা রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি। ডেনমার্কে ‘হুগা’ নামে একটা কনসেপ্ট আছে — মানে পরিবারের সাথে সময় কাটানো, একসাথে রান্না করা, গল্প করা। এটাই ওদের সুখের চাবিকাঠি। ইসরায়েলকে দেখুন। চারদিকে যুদ্ধ, মরুভূমি, জল নেই। তবু স্টার্ট-আপ নেশনে বিশ্বে এক নম্বর। কেন? কারণ ওদের ‘শাব্বাত’ আছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা — গোটা দেশের ফোন সাইলেন্ট, দোকান বন্ধ, পরিবারের সবাই এক টেবিলে। তোরাহ বলছে ‘Honour thy father and thy mother’। ওরা সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। জাপানকে দেখে শিখুন । টেকনোলজিতে বিশ্বগুরু। আবার সবচেয়ে কম ডিভোর্স রেট। কেন? কারণ ওখানে ‘Ie’ সিস্টেম — পরিবারই সমাজের মূল একক। দাদু-ঠাকুমা, বাবা-মা, সন্তান — তিন পুরুষ এক ছাদের নিচে। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া — যারা ৫০ বছরে গরিব থেকে ধনী হয়েছে — তাদের সরকারি পলিসিই হল ‘ফ্যামিলি ফার্স্ট’। HDB ফ্ল্যাটে বিবাহিতরা অগ্রাধিকার পায়, বয়স্ক বাবা-মাকে সাথে রাখলে ট্যাক্সে ছাড়। আর আমেরিকা? যেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ‘সেক্সুয়াল রেভোলিউশন’-এর নামে পরিবার ভাঙা শুরু হল, সেখানে আজ কী অবস্থা? ৪০% শিশু বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জন্মায়। ওপিওয়েড মহামারীতে বছরে ৮০,০০০ মানুষ মরে। ‘মিনিস্ট্রি অফ লোনলিনেস’ খুলতে হয়েছে। এটাই কি প্রগতি? তথ্য চিৎকার করে বলছে — পরিবার ভাঙলে দেশ ভাঙে। পরিবার টিকলে দেশ টেকে। তাই ‘পরিবার তন্ত্র ধ্বংস করো’ — এটা প্রগতির ফর্মুলা না, এটা সভ্যতা ধ্বংসের ব্লু-প্রিন্ট। পশ্চিমের যে দেশগুলো আজও টিকে আছে, সুখী আছে, শক্তিশালী আছে — তারা পরিবার ছাড়েনি। আর যারা ছেড়েছে, তারা ডেমোগ্রাফিক ও আধ্যাত্মিক আত্মহত্যার দিকে এগোচ্ছে। আমাদের বেছে নিতে হবে — আমরা ফিনল্যান্ড-ইসরায়েল-জাপানের রাস্তায় হাঁটব, নাকি ভাঙা আমেরিকার নকল করব?
তাই লড়াইটা স্পষ্ট। একদিকে নালন্দার ভারত, চরক-সুশ্রুতের ভারত, যৌথ পরিবারের ভারত, যেখানে মেধা আর মূল্যবোধ একসাথে হাঁটে। অন্যদিকে একটা আমদানি করা, কৃত্রিম, ভোগবাদী খাঁচা, যেখানে ‘স্বাধীনতা’র নামে আপনাকে ক্রেতা বানানো হয়, আর ‘আধুনিকতা’র নামে আপনার শিকড় কাটা হয়। যাদবপুরের যে মেধাবী ছাত্ররা সিলিকন ভ্যালি কাঁপাচ্ছে, তাদের সামনে আনতে হবে। আর যারা ক্যাম্পাসকে নেশা আর যৌনতার আখড়া বানাতে চায়, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। কারণ সংস্কৃতি মানে মদ খেয়ে বিপ্লব না, সংস্কৃতি মানে সরস্বতী পুজোর আগের রাতে টানা জেগে আলপনা দেওয়া। এটাই প্রগতি। বাকিটা প্রোপাগান্ডা।
সন্দীপ মুখোপাধ্যায় ।