20/06/2026
🌹কিংবদন্তি শিল্পী ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের শুভ জন্মদিনে তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই 🌹🙏🌹🙏
(১৬ জুন ১৯২০)
🌹স্মরণশরতে হেমন্ত
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায়
লেখক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেওয়াজে বিশ্বাসী ছিলেন না। রেকর্ডিং-এ সময় নিতেন নামমাত্র। শখ ছিল সাদা ফিয়েট গাড়ির,
আর এর-তার উপকার করে বেড়ানো। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একবার বাল্যবন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে একটা বই-ই লিখে ফেলেছিলেন ‘হেমন্তর কী মন্তর’। প্রবীণ বয়েসেও কবি ঠাওরে উঠতে পারেননি, বন্ধুটির জাদুটা ঠিক কোথায়; গলায়, চেহারায়, মনে না হৃদয়ে? ওঁর জীবন সায়াহ্নে হেমন্তবাবুকে দিন-দিন দেখে আমাকেও যে এই ধন্ধে পড়তে হয়নি, তা নয়।
সুভাষদাকে বলতে উনি বললেন, “তুমি জানো, কী সমস্যায় আমাকে ফেললে হেমন্ত এক সময়? বলতে লাগল, ‘না, সুভাষ তোমার অবস্থার একটা বিহিত করতে হবে। এমন টাকা টানাটানির মধ্যে থাকা চলবে না।’ কথাবার্তায় বুঝলাম আমাকে ও বড়লোক করেই ছাড়বে। তখন ওকে থামানোর জন্য বললাম, ‘রোসো, রোসো, বাপু। এই তো দিব্যি চলে যাচ্ছে, তুমি আবার এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন?’ তখন হেমন্ত কী বলল জানো? বলল, ‘তোমার অবস্থার ভাল দেখতে আমার ভাল লাগবে।’ এই হচ্ছে হেমন্ত।”
এই হেমন্তকে সব সময়ে চোখে পড়ে না। হাতা গোটানো সাদা ফুলশার্ট, ধুতি আর চপ্পলে নিপাট ভদ্র ইমেজ আর প্রবল খ্যাতির পিছনে হারিয়ে থাকা অপূর্ব ভালমানুষটি যথেষ্ট আলোয় আসেন না সব সময়। শুধু কি সুভাষদা, দুনিয়ার কত লোকেরই যে উপচিকীর্ষা মাথায় নিয়ে থুম হয়ে বসে থাকতেন টেবিলের এক পাশে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবার না। কে কখন আসবে, কার কী দরকার, কাকে কী দিতে হবে, এই সব ভাঁজছেন আর দিয়েও যাচ্ছেন।
একদিন একটা বইয়ের কাজে কথা রেকর্ড করছি হেমন্তদার। হঠাৎ মাঝে থেমে একটু চুপ করে রইলেন। তার পর বসার ঘরের এক ধারে বসে কাকে একটা বললেন, “অজিতের শরীরটা ভাল যাচ্ছে না ক’দিন। আসছেও না। একটা খবর করো তো।” বলেই সাক্ষাৎকারের যেখানে কথা ছেড়েছিলেন সেখান থেকেই ধরে নিলেন। যেন মাঝখানে ওটা একটা চায়ের অর্ডার করলেন মাত্র। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, তা হলে এই সব গানবাজনার কথার তলে তলে বন্ধু অজিত চট্টোপাধ্যায়ের অসুখের ভাবনাটাও চলাচল করছিল! ©JALSA
ব্যাপারটা প্রকট হল আরও কয়েক মাস পর যখন বই হচ্ছে। প্রকাশককে বললেন, “আমার এ বাড়িতে ছবিটবি কিসুই নেই। আমার কোনও রেকর্ডই নেই, বাজানোর যন্তরটাও বেকল। আমার স-ব ছবি অজিতের কাছে। ও-ই দেবে। তবে হ্যাঁ, ওকে কিছু টাকা দেবেন। এত কাল যত্ন করে রেখেছে।”হেমন্তদা নিজে যত্ন করে জিনিসপত্তর আগলাবার মধ্যে বড় একটা কোনও দিনই ছিলেন না। শেষ দিকে অসুখবিসুখে জেরবার হচ্ছিলেন যখন, তখন চিন্তায় পড়তেন গলাটা বাঁচানো নিয়ে। একদিন বললেন, “আমার গলার কিছু খারাপ দেখি না। সমস্যা হচ্ছে দম নিয়ে।”
এরকম আরেকটা আগলাবার জিনিস ওঁর ছিল। ওঁর সৎ, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। খুব শ্লাঘার সঙ্গে একবার বলেছিলেন, “যখন বম্বে ছাড়লাম, তখন আমার বাজারে পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা দেনা, শেষের দিকের ক’টা ছবি না লেগে যা হল। আমি কিন্তু গেয়ে গেয়ে পাই-পয়সা অবধি মিটিয়ে দিয়েছি।”
শেষ দিন অবধি নিজের ধুতি শার্টের স্টাইল স্টেটমেন্টটা যে আগলে ছিলেন এটা কারও অজানা নয়। যেটা কম জানা তা হল, সাদা পোশাকের মতো সাদা ফিয়েট গাড়ির উপর নির্ভরতা। যেখানেই যান, যে কাজেই যান, নিজের ফিয়েটে করেই চলবেন, ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় পৌঁছবেন। সময়ের মাহাত্ম্য এত ছিল ওঁর কাছে যে গান রেকর্ড করার সময়ও অজস্র টেক-এর মধ্যে কখনও যেতেন না। বড়জোর দুটো কি তিনটে টেক। ব্যস!
এইচএমভি স্টুডিয়োয় ওঁর এরকম একটা টেক-এর পর জিজ্ঞেস করায় বললেন, “দ্যাখো, দুটো-তিনটের মধ্যে কাজটা দিতে না পারলে সারা দিনেও দিতে পারব না।”
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নাগাড়ে রিহার্সাল করারও পক্ষপাতী ছিলেন না। ওঁর এক প্রিয় শিল্পী হৈমন্তী শুক্ল যখন রবিশঙ্কর ও আলি আকবর খানের সুরে বাংলা গান রেকর্ড করার জন্য তৈরি হচ্ছেন, তখন হেমন্তদা হেসে মৃদু ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘তোমার পণ্ডিতজির পাল্লায় পড়লে তো, দ্যাখো কত রিহার্সাল, রিহার্সাল আর রিহার্সাল করান। বুঝবে ঠ্যালা!’
অল্প সময়ের মধ্যে নিজের সেরাটা বার করার এক অনায়াস দক্ষতা ছিল হেমন্তদা’র। পৃথিবীতে ওঁর এক সেরা ভক্ত চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদারের কাছে এর এক নিপুণ বৃত্তান্ত শুনেছি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো তরুণবাবুও মনে করেন, হেমন্তবাবু মানুষটার কোনও তুলনা হয় না। তবে তাঁর সব ছবিতে হেমন্তবাবুকেই যে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে চাইতেন তার কারণ ছবিতে সুর করার এমন এক সরল জনমোহিনী রকম ছিল হেমন্তর, যার কোনও বিকল্প নেই। তাই ‘পলাতক’-এর মতো পল্লিসুরাশ্রয়ী গানের ছবিতেও উনি পরিচালক চেয়েছিলেন হেমন্তবাবুকে।
তাতে গাঁইগুঁই করেছিলেন হেমন্তদাই। বলেছিলেন তিনি তো সেভাবে পল্লিগানের চর্চা করেন না, তাই ওই কাজে হাত দিতে ইতস্তত বোধ করছেন। বলা বাহুল্য, তরুণবাবু সে ওজর-আপত্তিতে কান দেননি। হেমন্তবাবু তখন এক নতুন ছেলেকে গীতিকার হিসেবে বেছে নেন। মুকুল দত্ত। আর গান সুর করা শুরু হবে যখন, তখন ঘাড়ের ব্যথায় হেমন্তবাবু ভরতি হলেন বম্বের নর্থকোট হসপিটালে।
সেই অবস্থাতেই এক আজব কাণ্ড চলল হাসপাতালে। মুকুল তাঁর লিরিক লিখে লিখে পাতা দিচ্ছেন হেমন্তকে আর সুরকার ওই শোওয়া অবস্থায় একটু ভেবে নিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সুর করে যাচ্ছেন কথায়। আর সেভাবেই ফলতে লাগল
‘জীবনপুরের পথিক রে ভাই
কোনও দেশে সাকিন নাই
কোথাও আমার মনের খবর পেলাম না’
এবং অন্য সব চিরমধুর গীতাঞ্জলি।
এই অল্প সময়ে সেরা সুর ফেঁদে ফেলার পিছনে কাজ করত হেমন্তদা’র ওই বিরল গোত্রের আত্মবিশ্বাস।
©JALSA