09/07/2026
স্বামী বিবেকানন্দকে যে অপমান এবং রোগ যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছিল (পড়ুন পুরোটা )
প্রথমেই স্মরণে রাখা প্রয়োজন নিষ্ঠুর সমকাল সন্ন্যাসী বিবেকানন্দকে অত সহজে ছেড়ে দেয়নি। আঘাতে, অপমানে, সন্দেহে এবং অবিশ্বাসে তিঁনি বারে বারে জর্জরিত হয়েছেন। নীলকণ্ঠের মতো সেই বিষ তিঁনি ধারণ করলেও, তার মনের কোথাও তা অস্বস্তিকর দাগ রেখে যায়নি, এ কথা জোর করে বলা চলে না।
কখনও উচ্চশ্রেণীর ছাত্ররা লিখিত অভিযোগ করছে তিঁনি পড়াতে পারেন না। আবার আরো এক মহাপুরুষ নির্দেশ দিচ্ছেন নরেন কে আর পড়াতে না আসতে।
কখনও বলা হচ্ছে, বখাটে ছোড়াটা গুরুজনদের তাচ্ছিল্য করে মনের সুখে তামাক খাচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে চাকরি না পাওয়ায় বৈরাগ্য।স্বভাবসন্ন্যাসী তিঁনি অবশ্যই নন, সর্ব অর্থে অভাবসন্ন্যাসী।
কখনও বিদেশের মাটিতে স্বদেশের মানুষ ঘরের ছেলেকে সাহায্য না করে কুৎসা প্রচার করছে ---বাউন্ডুলে ডেপো ছোকরা, সে আবার ইংরেজি শিখল কবে?
১৮৯৭সালের ২০ই মে স্বামী ব্রহ্মণন্দ কে আলমোড়া থেকে বিবেকানন্দ যা লেখেন তা তা আমাদের চোখ খুলে দেয়।বুঝতে পারা যায় এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে গেলে কী ধরণের মানসিকতা প্রয়োজন।
স্বামীজী তার প্রিয় গুরুভ্রাতা কে লিখছেন,, তুমি ভয় পাও কেন?এই তো বাতি জ্বললো,এখনো সারারাত্রি গাওনা আছে।আজকাল মেজাজটাও বড় খিটখিটে নাই,জ্বর ভাবগুলো সব ওই লিভার -আমি বেশ দেখছি।আচ্ছা ওকেও দুরস্ত বানাচ্ছি।ভয় কি?
দুমাস পর স্বামী অখন্ডানন্দ কে স্বামীজী আবার লিখছেন, "আমিও,'ফের লেগে যা'আরম্ভ করেছি।শরীর তো যাবেই, কুঁড়েমিতে কেন যায়?
একটি অতি দুঃখজনক চিত্র প্রমথনাথ বসু তুলে ধরেছেন "ঢাকা থেকে বহুমূত্রের সঙ্গে হাঁপানির প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছিল, শিলং এ এসে সেটি ভীষণভাবে ধারণ করল। শ্বাসগ্রহণের সময় অসহ্য কষ্ট। কতকগুলো বালিশ একত্র করে বুকের উপর ঠেসে ধরতেন এবং সামনের দিকে ঝুকে প্রায় একঘন্টা পর্যন্ত অসহ্য যন্ত্রনা ভোগ করতেন।
এইখানেই শিষ্যগন শুনেছিলেন, তিঁনি অনুচ্চ স্বরে বলছিলেন, যাক মৃত্যুই যদি হয় তাতেই বা কী এসে যায়? যা দিয়ে গেলুম দেড় হাজার বছরের খোরাক।
এই অদম্য জেদ আর লৌহ সমান মানুষিকতা প্রকাশ পাচ্ছে অথচ শারীরিক যন্ত্রণার বিন্দুমাত্র অবসান নেই। পড়ুন কত গুলি রোগ যন্ত্রণা নিয়ে স্বামীজী মুখে এই উৎসাহ দিয়ে চলেছেন ভারত তথা সাড়া বিশ্ব কে।
পাঠকগণ আপনাদের কাছে তুলে ধরছি স্বামীজীর বিভিন্ন সময়ে যে রোগ গুলিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন
শিরপিড়া
টনসিল
সর্দি কাশি
হাঁপানি
টাইফয়েড
ম্যালেরিয়া
নানাবিধ জ্বর
লিভার সংক্রান্ত ব্যাধি ও বদহজম
উদরি
ডায়ারিয়া
ডিসপেপসিয়া
পাথুরি
লাম্বেগো(কোমরের ব্যাথা )
ঘাড়ে ব্যাথা
ব্রাইটস ডিজিজ
কিডনির গোলযোগ
ড্রপসি -শোথ বা পা ফোলা
অ্যালবুমিনিউরিয়া
চোখে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা
চোখ লাল
নিদ্রাহীনতা
অকালে চুল সাদা হয়ে যাওয়া
স্নায়ু রোগ -নিউরাসথানিয়া
রাত্রে খাবার পর প্রচন্ড গরম অনুভব করা
গরম সহ্য করতে না পারা
অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পরা
সি -সিকনেস
সান স্ট্রোক
ডায়াবেটিস
হৃদরোগ
অবাক হতে হয় এত শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে তিনি কেমন ভাবে প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন সব অবিশ্বাস্য কাজ করে গেলেন।ব্যাধি যতই মারাত্মক হোক স্বামীজী বুঝে ছিলেন রোগ কে প্রশ্রয় দিলে কর্ম কোনদিন সম্পূর্ণ হবে না।
রোগজর্জরিত স্বামীজীকে একেবারে শেষের দিকে অখন্ডানন্দ দেখে বিস্মিত হয়ে উঠেছিলেন।"স্বামীজীকে এত রুগ্ন আমি কখনো দেখিনি,ঠিক যেন একখানি ছায়ামূর্তিতে পরিণত হয়েছিলেন।মনে হয়েছিল তিনি যেন তখনও হৃসিকেশের সাংঘাতিক পীড়া থেকে মুক্তি পাননি। "
আসলে দীর্ঘ অনাহারে থাকতে থাকতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা এই রোগটি স্বামীজীর বহুপুরাতন। কত যন্ত্রণা দিয়েছেন তিনি এই শরীরটিকে।
বোম্বাই হয়ে স্বামীজী আচমকা বেলুড় মঠে ফিরলেন রবিবার ৯ডিসেম্বর ১৯০০। হাওড়া স্টেশনে কেউ তাকে রিসিভ করতে যাননি। নিজেই একটা গাড়ি ভাড়া করে বেলুড়ে পৌঁছে, গেট টপকে যখন মঠের ভেতরে ঢুকলেন তখন সন্ন্যাসীদের সন্ধ্যা আহার শুরু হতে চলেছে। আমাদের চোখে জীবন নাটকের শেষ অঙ্কের শুরু এই দিন থেকেই, যার শেষ পরিনাম ৪ঠা জুলাই ১৯০২।
রোগ যন্ত্রনায় এত টাই কাতর হয়ে পড়েছিলেন যে, শেষের পর্বে মানুষের ওপর বিরক্ত হয়ে, শরীর ছাড়বার আগে মায়ার বন্ধন কাটাতে মানুষের সংস্রব একদম ছেড়ে দিয়েছিলেন।জীব আর জন্তু দের প্রতি বাল্যকালের আবেগ মায়া ফিরে এসেছিলো।
এসবের মধ্যেও পেছনে পড়েছিলো বালি মিউনিসিপাল। বেলুড় মঠ কে আক্ষা দিয়েছিলেন বিদেশ প্রত্যাগত নরেন্দ্রনাথ দত্তের আমোদ উদ্যান।যার গায়ে মোটা ট্যাক্সো বসিয়ে দিয়েছিলেন। খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন নরেন্দ্রনাথ।অসক্ত শরীরে শেষ পর্যন্ত মোকদ্দমার আশ্রয় নিতে হয় নরেন্দ্রনাথ কে।
শেষ ইচ্ছে বলতে শরৎচন্দ্র জানাচ্ছেন মানুষের মুখে দুটি অন্ন তুলে দেওয়ার ব্যাকুলতা কাজ করছে মনে।যখন টাকা আসবে তখন মস্ত বড় একটা কিচেন করব।যেন ভাতের ফ্যান গঙ্গায় গড়িয়ে পড়ে গঙ্গার জল সাদা হয়ে যায়।এইরকম অন্নসত্র দেখব যেদিন সেদিন প্রাণটা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
সেই সঙ্গে এক গৃহি শিষ্য কে আশীর্বাদ দিচ্ছেন, সময় পেলেই ধ্যান করবি।পরোহিতায় জীবনপাত কর।এই আমার ইচ্ছা ও আশীর্বাদ।
একটানা অপমান এবং বিরামহীন রোগযন্ত্রনায় কাতর স্বামীজী শারীরিক ও মানসিক যাত্রা করে
অবশেষে লিখলেন
"অসীম একাকী আমি, কারণ মুক্ত আমি ---ছিলাম মুক্ত, চিরদিন থাকব মুক্ত। আঃ কি আনন্দ প্রতিদিন তাকে উপলব্ধি করছি!হাঁ, হাঁ আমি মুক্ত, মুক্ত। আমি একা ---একা অদ্বিতীয়... হাঁ এখন আমি খাঁটি বিবেকানন্দ হতে চলেছি।"