25/02/2026
মানুষের জন্য বেলুড় মঠ বিক্রির সংকল্প: বিবেকানন্দের সেই অদম্য সাহস আর সেবাভাব....
স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হলো ১৮৯৯ সালের কলকাতা প্লেগ মহামারী। আর্ত মানুষের সেবায় তিনি কতটা চরম ত্যাগ স্বীকার করতে পারতেন, তা তাঁর বেলুড় মঠ বিক্রির সংকল্প থেকেই স্পষ্ট হয়।
১৮৯৯ সাল। কলকাতা এক ভয়াবহ মহামারীর কবলে। প্লেগের প্রকোপে শয়ে শয়ে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। চারিদিকে কেবল হাহাকার আর মৃত্যুমিছিল। ঠিক সেই সময়েই স্বামীজী বেলুড় মঠের জন্য নতুন জমি কিনেছেন এবং নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু মানুষের এই অবর্ণনীয় কষ্ট তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি।
১. শিবজ্ঞানে জীবসেবা: সর্বস্ব ত্যাগের ডাক
স্বামীজী বিশ্বাস করতেন যে অভুক্ত এবং পীড়িত মানুষের সেবা না করে কেবল মন্দিরে উপাসনা করা অর্থহীন। আর্তের সেবার জন্য রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে তখন পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। বিচলিত বিবেকানন্দ এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে প্রয়োজন হলে মঠের নতুন কেনা জমি বিক্রি করে দেবেন। তিনি বলেছিলেন যে সন্ন্যাসীরা গাছতলায় রাত কাটাতে পারেন, কিন্তু জীবন্ত মানুষের প্রাণ রক্ষা না করে ইঁট পাথরের মঠ গড়ে কোনো লাভ নেই।
২. মা সারদা দেবীর মহাজাগতিক হস্তক্ষেপ
স্বামীজী যখন মঠ বিক্রির সিদ্ধান্তে অটল, তখন তিনি শ্রীমা সারদা দেবীর পরামর্শ চান। মা তাঁকে স্নেহের সাথে বোঝান। তিনি বলেন যে মঠ হলো শ্রীরামকৃষ্ণের আসন এবং এটি ভবিষ্যতে অগণিত সন্ন্যাসীর আশ্রয়স্থল হবে। মা তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে মানুষের সেবার জন্য অর্থের অভাব হবে না। শেষ পর্যন্ত মায়ের পরামর্শে মঠ বিক্রি না করেই ভক্তদের সাহায্যে বিশাল তহবিল গঠন করা হয়।
৩. মহামারী নিবারণী অভয়বাণী
ভীতসন্ত্রস্ত কলকাতাবাসীর মনে সাহস জোগাতে স্বামীজী একটি বিশেষ নিবেদন পত্র বা প্লেগ নির্দেশিকা Plague Manifesto লিখেছিলেন। এটি ছিল মানুষের জন্য এক অমোঘ অভয়বাণী। তিনি লিখেছিলেন যে ভয়ই হলো মৃত্যু এবং ভয়ই পাপ। প্লেগ একটি রোগ মাত্র এবং পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে একে জয় করা সম্ভব। তিনি মানুষকে বৈজ্ঞানিকভাবে ঘরবাড়ি এবং নর্দমা পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দেন। তাঁর এই লেখায় আধ্যাত্মিকতার চেয়েও মানুষের প্রতি গভীর মমতা বেশি ফুটে উঠেছিল।
৪. ত্রাণ কার্যের রোমহর্ষক কিছু মুহূর্ত
স্বামীজীর নির্দেশে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা যে কাজ করেছিলেন, তা সমাজসেবার ইতিহাসে বিরল।
স্বামীজীর শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা নিজে ঝাড়ু হাতে বাগবাজারের নর্দমা পরিষ্কার করতে নেমেছিলেন। একজন বিদেশিনীকে এভাবে কাজ করতে দেখে স্থানীয় যুবকরা লজ্জিত হয়ে সেবার কাজে যোগ দেন।
প্লেগ রোগীদের সেবায় জাতপাতের কোনো বিচার ছিল না। স্বামীজী ঘোষণা করেছিলেন যে প্রয়োজন হলে সন্ন্যাসীরা মেথরের কাজও করবেন। তাঁরা নিজের কাঁধে করে রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
এক অসহায় রোগী যখন ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারছিলেন না, তখন স্বামীজী নিজে গিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ভরসা দিয়েছিলেন।
কেন এই কাহিনী আজও প্রাসঙ্গিক?
বিবেকানন্দের এই সংগ্রাম আমাদের শেখায় যে ধর্ম কেবল মন্দিরের ঘণ্টা নাড়ায় সীমাবদ্ধ নয়। আর্তের সেবাতেই ধর্মের প্রকৃত সার্থকতা। বেলুড় মঠ বিক্রির সংকল্প থেকে শুরু করে প্লেগ মহামারীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করা প্রমাণ করে যে বিবেকানন্দের হৃদয় সবসময় সাধারণ মানুষের জন্য কাঁদত।
কমেন্টে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে জয়তু স্বামী বিবেকানন্দ লিখতে পারেন.......
.
.