28/01/2026
অবসরের অবশেষে🙂
অবশেষে অবসর আসে। চেনা রুটিনের অভ্যাসী চলনে ছন্দপতন। চাকুরীজীবীর চক্রাকার কক্ষটি প্রায়শই সাদাসিধে। ঘর-ঘড়ি-ঘোরাঘুরির ঘুরনচাকি ষাটের জংশনে ব্রেক কষে। মায়ের কোল থেকে নামা, স্কুল কলেজের গন্ডি ডিঙিয়ে অফিস-কারখানার চৌহদ্দিতে থামা। রুজি রোজগার চালিয়ে যৌবন- প্রৌঢ়ত্বের পরিশেষে বৃদ্ধত্বের দোরগোড়ায়। দীর্ঘ ম্যারাথন দৌড়ের হাসি-কান্নার হীরা-পান্না জড়ানো সকাল-বিকেলগুলোর স্মৃতি একাকী রোমন্থনের। অ্যালার্মের সাথে ওঠা, যানজট ঠেলে ছোটা। ওঠা আর ছোটার মাঝে দ্রুততায় খবরের কাগজ, বাজার, বাচ্চার বিদ্যালয়, নাওয়া-খাওয়ার নিত্যকর্ম। কার্যালয়ের গড়ন, বিবিধ ক্রিয়ার ধরণ, খাটুনির লঘু-গুরুতে গ্যাপ থাকলেও কর্মীকুলের কালচারাল কিছু ক্যারেক্টার হুবহু এক। টিফিনপর্বে কাজকর্মহীন কথার কাঠামোয় ধরাবাঁধা উপস্থিতি বেতন-বোনাস-প্রমোশন, হালকা রাজনীতি বা পরিবারের টুকটাক টকিং। তবে বিপদে-আপদে, জুতসই পরামর্শে সহৃদয় সহকর্মী জুটেই যায়। সমাজে সম্মানজনক পরিচয়, নির্দিষ্ট আয়ের নিশ্চিন্ততা, সঞ্চয় বা ঋণের কিস্তি শোধের স্বস্তি, পেনশন আর ভবিষ্যতের রঙিন খোয়াব বুনেবুনে রিটারমেন্টের বিকেল চলেই আসে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নির্গমনের অনিবার্য পালা। ফুল মিষ্টি মানপত্রের বিদায়ী বার্তায় তখন বিষন্নতার ছোঁয়া আর ‘ভালো থেকো’র দোয়া।🌹🌹
তারপর বায়োগ্রাফিতে আনকোরা অধ্যায়ের আগমন। কমবেশি বছর ত্রিশের রোজনামচা ভেঙে স্বল্প স্বস্তি কদাচিৎ অল্প অস্বস্তি। সমস্যা আর সম্ভাবনার দোদুল্যমানতা। অনেকে মানসিক রিক্ততায় সাময়িক দিশা হারানোর দশায় পড়ে। অভ্যাসী ধারাবাহিকতায় গতি শূন্যতা, ব্যস্ততার কোলাহলে সহসা স্তব্ধতা, সামাজিক গুরুত্বহ্রাসের অনুভব, বার্ধক্যজনিত জড়তা আবার কখনো পেনশন বা সঞ্চয়হীনতার আর্থিক অবরোধ রিটায়ার্ড নোকরিজীবীকে স্থবির করে। তবে এহেন পরিস্থিতি প্রায়শই পড়িমড়ি আসে না, তাই দাপ্তরিক দায়মুক্ত ব্যক্তির পরিকল্পনা একটা থাকেই। 🍂🍂
‘আমি কে?’ বা ‘আমার কাজ কি’ এই প্রশ্নের উত্তর যে যার মতো সাজিয়েই রাখে। পরিচয়ের সংকট, রুটিনের অভাব, একাকীত্ব কাটানোর করণীয় উপাদান জুটেই যায়- সেটা আঁকা, লেখা, বাগান করা, ক্লাবে যাওয়া, হাঁটাহাটি, ফোন ঘাঁটাঘাটি বা ভিন্ন কিছু যেমন নাতিকে পড়ানো, কুকুরকে ঘোরানো, শেয়ারে টাকা খাটানো অথবা কাছে দূরে বেড়ানো। কেউবা গান শেখে, ধ্যানে বসে, সেবা-ধর্মীয় কর্মে স্বস্তি খোঁজে, অথবা অস্থায়ী আয়ের সন্ধান করে। 🍁🍁
দায়সারা দিনযাপনে সুস্থতা থাকে না। অর্থহীনতা বা meaningless মানুষকে ক্রমশ পঙ্গু করে দেয়। রাজেশ খান্নার ‘আনন্দ’ সিনেমার সেই সংলাপ ‘জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি’। বুড়ো হওয়া আর বড়ো হওয়া সমার্থক নয়। বুড়ো হওয়া প্রাকৃতিক কিন্তু বড়ো হওয়া স্বেচ্ছাকৃত। সমস্যার ভয়ে পিছোলে বাঁচার আমোদ থাকেনা। লড়ে মরায় যে তৃপ্তি, ভীরুতায় বাঁচায় সেটা অনুপস্থিত। যদিও সেটা দুর্বলরা বোঝেনা। ষাটোর্ধ্ব প্রবীণরা অগ্রগতির অংশীদার হতে পারেন, যাতে নিজের পাশাপাশি প্রতিবেশীর প্রগতিও আসে। শিক্ষকতা, পরিবেশ রক্ষা, পরামর্শদাতা, সামাজিক সংগঠনে যুক্ত থাকা, তরুণদের দিক নির্দেশ- রকমারি উপায়ে-অভিজ্ঞতায়-সিদ্ধান্তদানে সমৃদ্ধ সমাজ গড়া সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা, ইতিবাচক মানসিকতা, সক্রিয় জীবনযাত্রা অবসরকে সুখী, সম্মানজনক, অর্থবহ করে তোলে। কর্মজীবনে অর্জিতজ্ঞান আর অবসরের সুবিধাকে মিশিয়ে এগোলেই পরিপূর্ণতা আসবে। প্রকৃতি, সমাজ, মানুষের প্রতি প্রেম-মমত্ব-দায়বোধ থাকলে জিন্দিগির চড়াই-উৎরাইগুলো ততটা ঝকমারি লাগেনা। জীবন-জীবিকা দুটোই সুখ সার্থকতা পায়।🌲🌲