02/10/2023
স্মার্ট মিটার কখনোই বসাতে দেব না -- লড়াইটা যদি এই দাবীতে হয় তাহলে কিন্তু বুমেরাং হয়ে যাবে। লড়াইটা কখনও-ই স্মার্ট মিটারের বিরুদ্ধে না। লড়াইটা স্মার্ট মিটারকে যে উদ্দেশ্য ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তার বিরুদ্ধে। লড়াইটা হল বিদ্যুতের মত একটি অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে নিয়ে এসে পুরোপুরি মুনাফা অর্জনের জন্য একটি পণ্যে রূপান্তরিত করার বিরুদ্ধে। বিষয়টি কিন্তু প্রথমেই পরিস্কার থাকা দরকার, অন্যথায় অফিসে প্রথম কমপিউটার আসার সময় বামেরা যে আন্দোলন করেছিল তার মত ভুলবোঝাবুঝির একটা জায়গা তৈরি হবে।
স্মার্ট মিটার একটি আধুনিক যন্ত্র বা Device.। এই স্মার্ট মিটার ইন্টারনেট সংযোগ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই অ্যাপ থেকে জানা যাবে বিদ্যুতের ব্যবহার ও বিলসংক্রান্ত তথ্য। গ্রাহকরা অ্যাপের মাধ্যমেই মোবাইল রিচার্জ করার মত রিচার্জ করতে পারবেন। এই স্মার্ট মিটার প্রযুক্তিতে বিভিন্ন রকমের অপশন আছে। এইবার প্রশ্ন হল আপনি এই প্রযুক্তির ব্যবহার কোন উদ্দেশ্য নিয়ে করবেন। যদি উদ্দেশ্য থাকে মুনাফা তাহলে প্রিপেইড রিচার্জ করার অপশনকে বেছে নেওয়া হবে। মোবাইল এর মত টাকা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আপনার বাড়ি বিদ্যুতহীন হয়ে পরবে। আবার টাকা ভোরুন, আলো জ্বলে উঠবে, পাখা চলবে, এসি চলতে শুরু করবে। যদি উদ্দেশ্য থাকে আরও আরও মুনাফা তাহলে বাজারের নিয়ম অনুসারে বিদ্যুতের চাহিদা যে সময়টুকুতে বৃদ্ধি পাবে (পিক লোড থাকাকালীন) তখন ইউনিট চার্জও বৃদ্ধি করা হবে উবের ওলার গাড়ি ভাড়ার মত। অফিস টাইমে চারশো টাকা তো দুপুরে ঐ একই রাস্তা আড়াইশো টাকা। সবটাই বাজার ঠিক করে দেবে। প্রচণ্ড গরমে রাতে ঘুমাতে পারছেন না। সবাই পাকা;এসি চালিয়েছে। লোড ভিমাণ্ড হাই। আপনার ইউনিট রেটও বেড়ে গেছে। হুহু করে আপনার টাকা শেষ হয়ে আসছে। মাঝ রাতে দেখলেন আপনার পাখা থেমে গেল। টাকা শেষ। আবার আন্ধকারে মোবাইল থেকে স্মার্ট মিটার রিচার্জ কর। তারপর পাকা এসি সব চলা শুরূ হবে। ঘুম কিন্তু আসবে না। কারণ মাইনা যা জমা পরেছিল ব্যাঙ্কে তাও শেষ। বাকি দিনগুলি কি করে চলবে আপনি জানেন না। রাগটা গিয়ে পরবে স্মার্ট মিটারের উপর। কিন্তু আমি আপনাদের বলছি দয়া করে স্মার্ট মিটারকে ভিলেন বানাবেন না। স্মার্ট মিটারের কোন দোষ নেই। যত দোষ সব হল এই পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাটার। মানুষকে শোষণ না করে এই দৈত্য বাঁচতে পারে না।
একদিন এই স্মার্ট মিটারই ভিলেন থেকে নায়ক হয়ে উঠবে। মূলত ফসিল ফুয়েলই এখনও বিদ্যুতের উৎস। অতি দ্রূত মাটির তলার কয়লা ফুরিয়ে আসছে। এর সাথে আছে বয়লারে কয়লা পোড়ানোর সময় বাতাসে যে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস মিশছে তা দ্রুত বাতাসকে মানুষের বসবাসের অনুপযুক্ত করে তুলছে। তাই যত কম বিদ্যুত শক্তি খরচ করবেন, তত প্রকৃতি দূষণের হাত থেকে বাঁচবে। যদি আপনার উদ্দেশ্য থাকে ভালো, তাহলে এই স্মার্ট মিটারকে সেই কাজে লাগাতে পারেন। বিদ্যুত রেশনিং করা হবে। পরিবার প্রতি এত ইউনিট। যদি তার আগে বেশি খরচ করে ফেল তো অন্ধকারে থাকো। পৃথিবীটা তো বাঁচুক।
এই স্মার্ট মিটার প্রযুক্তিতে মিটারের সামনে যাওয়ার দরকার নেই। মোবাইল অ্যাপে গ্রাহক এবং সরবরাহকারী তার অফিসে বসে প্রতি মুহূর্তে কত ইউনিট খরচ হয়েছে, কতটাকা বাকি আছে, ঠিক এই মুহূর্তে তার লোড কত, এই লোডে চললে আর কত ঘন্টা চলবে এই সব তথ্য পেয়ে যাবেন। এতে অবশ্যই বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে। তাহলে কি দাঁড়াল সমস্যা স্মার্ট মিটার প্রযুক্তি না। সমস্যা কি উদ্দেশ্য এইটি ব্যবহার করা হবে। সমস্যা হল এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে পুঁজিপতিরা কেবল তাঁদের মুনাফা বৃদ্ধি করতে কাজে লাগাই। তাই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে না পারলে কিছুতেই কিছু করতে পারবেন না।
তাহলে কি বিদ্যুত নিয়ে এই আন্দোলনের দরকার নেই? অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু মূল দাবীটা "স্মার্ট মিটার বসাতে দেব না" এইটা যেন না হয়। বিদ্যুতের বেসরকারিকরণ মানছি না -- এটাই হোক দাবী।
পুঁজিবাদকে বাঁচাতে প্রথমে গ্যাট চুক্তি পরে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার ও বিশ্বব্যাঙ্কের সাহায্য সমগ্র বিশ্বে উদার অর্থনীতি চালু করা হয়। ভারতও তাতে যোগ দেয়। শুরু হয় বেসরকারিকরণের পথে হাঁটা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন, বিদ্যুৎ সরবরাহ সমস্ত কিছু নিয়ে শুরু হয় ব্যবসা। বিশ্বব্যাঙ্কের শর্ত মেনে সরকার সব কিছু থেকে ভর্তুকি তুলতে থাকে।
২০০৩ সালেই পাশ হয় নতুন বিদ্যুৎ আইন । এই আইন সেদিন দেশের বিদ্যুৎ বন্টন ক্ষেত্রের সামগ্রিক বেসরকারীকরনের সব রাস্তাই খুলে দিয়েছিল। ২০১৪ মোদী সরকার রাজ্যগুলিতে সরকারী বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থা ধ্বংস করে বেসরকারী কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল পাশ করানোর চেষ্টা করেন। চাপের মুখে সেই আইন পাশ করাতে না পেরে রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কীম (আরডিএসএস) নামে একটি স্কিম চালু করেন। বর্তমানে এই স্কিম অনুযায়ী কাজ চলছে।
স্মার্ট মিটারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। শুধু ভারত না, অন্যন্য দেশেও স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ চলছে। আমাদের দেশে বাম শাসিত কেরল বাদে সব রাজ্যে ৩ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে এই স্মার্ট মিটারিং স্কীমের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।
লড়াই হোক। কিন্তু সবার কাছে সবটা পরিস্কার থাকুক। আসল শত্রু স্মার্ট মিটার প্রযুক্তি না। এই প্রযুক্তিকে আটকানোর ক্ষমতা কারো নেই। আটকানোটাও মার্কসবাদ সন্মত না। মূল শত্রু মমতা, মোদী, বিশ্বব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার, উদারঅর্থনীতি।আসলে মূল শত্রু পুঁজিবাদ। আন্তর্জাতিক পুঁজি আজ এতটাই শক্তিশালী যে তার বিরুদ্ধে কেরলের মত একটি ভিন্ন পথে চলা রাজ্য সরকার খড় কুটোর মত একদিন উড়ে যাবে। সমগ্র বিশ্বের সাধারণ মানুষ এককাট্টা হয়ে যতদিন না ঐ বিশ্বব্যাঙ্ক আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার থেকে শুরু করে বহুজাতিক সংস্থা গুলির বন্ধ করে দিতে না পারছে ততদিন এ লড়াই থামবে না।
সংগৃহীত Shaymal Mukharjee