28/03/2026
✍️ কলমে আমাদের সোসাইটির সদস্য শুভজিৎ সরকার
বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি। / দেশে দেশে কত-না নগর রাজধানী— / মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু, / কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু / রয়ে গেল অগোচরে।"
প্রাক্তনী মানেই কি শুধু 'নস্টালজিয়া' আর 'পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ '? আমাদের মানে বরানগর রামকৃষ্ণ মিশনের ১৯৯৫ সালের মাধ্যমিক ব্যাচের ছেলেদের কাছে ধারণাটা ছিল একটু ভিন্ন | স্কুল ছাড়ার তিন দশক হতে চললো, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বের শিকড় আজও সেই মিশনের আদর্শেই প্রোথিত | গত ছয়-সাত বছর ধরে আমরা শুধু নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিইনি, বরং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছি আর্ত মানুষের পাশে | প্রথমে 'Mission95' হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, আজ আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ রেজিস্টার্ড অলাভজনক সংস্থা হিসেবে সফলতার সাথে আত্মপ্রকাশ করেছি -- "বরানগর ৯৫এর বন্ধুরা" | আমাদের এই ছয় বছরের পথচলা কেবল পরিসংখ্যানের নয়, বরং অসংখ্য মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক নিরন্তর প্রচেষ্টার গল্প আর যা আমরা নীরবে নিজেদের সামর্থ্য ও আন্তরিকতাকে পুঁজি করে অতি সফলতার সাথে করে চলেছি | আমাদের কর্মযজ্ঞের এক ঝলক :
আমাদের এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের বীজ বপন করা হয়েছিল এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকে। বরানগর রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, পরম পূজনীয় স্বামী গিরিজাতমানন্দজি-র তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা গাঙ্গুরিয়া শ্রী শ্রী সারদাতীর্থম স্কুলে ডোনেশন এবং পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমেই আমাদের পথচলা শুরু। তাঁর সেই স্নেহধন্য আশীর্বাদই আজ আমাদের মহীরুহে পরিণত করেছে।
১. সংকটে ও স্বাস্থ্যে অবিচল:
"আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া / বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।"
করোনার সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে আমরা ঘরে বসে থাকিনি। অক্সিজেন সিলিন্ডার, পিপিই কিট, স্যানিটাইজার ও গ্লাভস পৌঁছে দিয়েছি মুমূর্ষু মানুষের দুয়ারে। ১০টি স্কুলে বসিয়েছি অটোমেটিক স্যানিটাইজার ডিসপেনসার। এছাড়া নিয়মিত ৫ বার রক্তদান শিবিরের আয়োজন এবং ট্রাফিক পুলিশের জন্য ওয়াটার ডিসপেনসার প্রদান আমাদের জনস্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষুদ্র প্রয়াস।
২. বিপন্ন বন্ধুর পাশে :
আমাদের কাছে 'বন্ধু' মানেই নির্ভরতা। আমাদের সহপাঠীর কিডনি প্রতিস্থাপন এবং আরেক অকালপ্রয়াত বন্ধুর ছেলের পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়া আমাদের কাছে কেবল সাহায্য নয়, এটি আমাদের 'একান্নবর্তী পরিবার' --এর দায়িত্ব বলেই আমরা মনে করি |
৩. শিক্ষার প্রসারে আমাদের অঙ্গীকার:
নন্দীগ্রামের মনোহরপুর গ্রাম থেকে সুন্দরবনের মাধবপুর স্কুল—পরিকাঠামো উন্নয়নে আমরা সচেষ্ট। হোয়াইট বোর্ড, ফ্যান, আলো থেকে শুরু করে বেঞ্চ ও শিক্ষা সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছি পড়ুয়াদের হাতে। আমাদের প্রিয় স্কুলেও আমরা বিগত ৩ বছর ধরে স্কলারশিপ প্রোগ্রাম ও স্মার্ট বোর্ড পরিষেবা পরিচালনা করছি। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ 'গ্রুমিং সেশন' আমাদের এক অনন্য উদ্যোগ।
৪. আর্তমানব ও অবলা প্রাণীর সেবা:
কলকাতা অনাথ আশ্রমের ২৫০ জন শিশুর নৈশভোজ থেকে শুরু করে বাগবাজার সারদা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পোশাক ও খাদ্য সরবরাহ— শৈশবকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। দুর্যোগের সময় আমরা বারবার ছুটে গিয়েছি কুলতলি ও হলদিয়ার দুর্গম গ্রামগুলোতে। এমনকি নির্বাক প্রাণী (কুকুর ও বিড়াল)-দের বন্ধ্যাকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও আমরা অবদান রাখছি।
৫.পরিকাঠামো ও গ্রামীণ উন্নয়ন:
গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য হসপিটাল বেড, হুইলচেয়ার ও স্যালাইন স্ট্যান্ড থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্লাবগুলোকে ফুটবল ও জার্সি প্রদান— উন্নয়নের প্রতিটি স্তরে আমরা আমাদের পদচিহ্ন রাখতে চেয়েছি।
৬.মরণব্যাধির বিরুদ্ধে সচেতনতার যুদ্ধ:
কবিগুরু লিখেছিলেন— "মুক্ত করো ভয়, আপনা-মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।" মরণব্যাধি ক্যান্সারের ভয় জয় করতেই আমরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছি। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ক্যান্সার হাসপাতাল (NCRI)-এর সহযোগিতায় বরানগর রাজকুমারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুরু করে টেকনো ইন্ডিয়া মেইন ক্যাম্পাস (সল্টলেক)—সর্বত্র আমরা আয়োজন করেছি ক্যান্সার সচেতনতা ও স্ক্রিনিং ক্যাম্প। বিশিষ্ট অঙ্কোলজিস্ট (Oncologist) ও গাইনোকোলজিস্টদের উপস্থিতিতে বিশেষত মহিলাদের ব্রেস্ট (Breast) ও সারভিকাল (Cervical) ক্যান্সারের কারণ, লক্ষণ এবং তা প্রতিরোধের উপায় নিয়ে নিবিড় আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও সঠিক তথ্যের প্রসারের মাধ্যমে জীবন বাঁচানোর এই লড়াইয়ে 'বরানগর ৯৫-এর বন্ধুরা' সর্বদা অগ্রণী।
৭۔ বৃক্ষরোপণ ও প্রাণদান :
কবিগুরুর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও বিশ্বাস করি— "মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে / হে প্রবল প্রাণ!" পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমরা সুন্দরবন ও নন্দীগ্রামের বিভিন্ন গ্রামে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করেছি। শুধু চারাগাছ লাগানোই নয়, সেই প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার সংকল্পও আমাদের রয়েছে। এছাড়াও, আমাদের প্রতিটি রক্তদান শিবিরে উপস্থিত প্রার্থীদের আমরা বৃক্ষরোপণের সুফল বুঝিয়ে তাদের উৎসাহিত করি, যাতে রক্তদানের মাধ্যমে যেমন জীবন বাঁচে, তেমনই গাছ লাগিয়ে প্রকৃতিও প্রাণ পায়।
আমাদের লক্ষ্য:
স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে "শিব জ্ঞানে জীব সেবা" করাই আমাদের মূল মন্ত্র। আমরা বিশ্বাস করি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা যেমন মহাদেশ গড়ে তোলে, তেমনই আমাদের ছোট ছোট প্রচেষ্টা একদিন বৃহত্তর পরিবর্তনের পথ দেখাবে।
আমরা কৃতজ্ঞ সেই সমস্ত মানুষের কাছে যারা আমাদের এই দীর্ঘ ছয় বছরের যাত্রায় আশীর্বাদ ও সহযোগিতা করেছেন। "বরানগর ৯৫-এর বন্ধুরা" কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি বিশ্বাসের নাম, একটি সংকল্পের নাম।
আসুন, সুন্দর সমাজ গড়ার এই মিছিলে আমরা সবাই হাতে হাত মেলাই।