14/09/2024
আমরা 'বঙ্গীয় নব উন্মেষ প্রাথমিক শিক্ষক সঙ্ঘ' (BNUPSS) করব কেন?
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক নৈরাজ্য বিরাজ করছে। স্বৈরাচারী রাজ্য সরকারের ক্রিয়া-কলাপ আমাদের দেশের যুগবাহিত ধারণাগুলিকে বদলে দিয়ে কেবলমাত্র পাস করা ও করানোর মধ্যে শিক্ষাকে সীমায়িত করেছে। কৌশলে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে শিক্ষা কী? কী তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য? দেশপ্রেম, স্বাজাত্যবোধ, নীতিশিক্ষা, চরিত্র গঠন সম্পর্কিত বিষয়গুলিকে বাইরে রাখা হয়েছে। আজ শিক্ষাঙ্গন রেশনের দোকানে পরিণত, যেখানে মিড-ডে-মিল, জামা, জুতা সহ বিভিন্ন প্রকল্পের বৈষয়িক সুবিধাই মুখ্য।
এ'মত পরিস্থিতিতে রাজ্যের অন্যান্য শিক্ষক সংগঠনগুলো যখন কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ধ্বজাবাহী হয়ে বৈষয়িক লাভ-ক্ষতির হিসেবে ব্যস্ত, তখন আমাদের সংগঠন 'বঙ্গীয় নব উন্মেষ প্রাথমিক শিক্ষক সঙ্ঘ' শিক্ষাক্ষেত্রে ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পরম্পরাগত আদর্শের উন্মেষ ঘটাতে বদ্ধপরিকর। শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে বাতাবরণ বিগত কয়েক বছরে সৃষ্টি হয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী থেকে আমলা প্রায় প্রত্যেকেই দলদাসে পরিণত, এমনকী প্রাক্তনরা জেলবন্দী।সাধারণভাবে বলা হয় 'Police is nothing but ministrial agent' কিন্তু দেখা যাচ্ছে পরিদর্শক থেকে আধিকারিক সকলেই শাসকের ইশারায় নেচে চলেছেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা বৈভবশালী রাষ্ট্র নির্মাণের শপথ বুকে এই পতাকাতলে সমবেত হয়ে এগিয়ে চলেছি।
মূল্যবোধহীন শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কারণে সমাজে অনৈতিক কাজ ও অন্যায় করার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। এই সুযোগে রাজনৈতিক ফয়দা লোটা কায়েমি স্বার্থের তল্পিবাহকেরা নিজেদের আখের গোছাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ঢুকে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। শাসকদলের প্রতিনিধিরা প্রধান শিক্ষকদের ভীতি প্রদর্শন করে ভুয়ো সার্টিফিকেট বিতরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুদানের অংশ পকেটস্থ করতে সদা সচেষ্ট। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত জোর জবরদস্তি পরীক্ষার খাতায় নম্বর দিয়ে Minority Scholarship পাইয়ে দেওয়ার নির্দেশ কিংবা No Detention Policy-র কারণে উচ্চ শ্রেণীতে উত্তরণ ছাত্রছাত্রীদের সুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি জোর করেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় প্রবেশ করে বললেও অত্যুক্তি হয় না। ১৯৭০ সালে উপাচার্য গোপাল চন্দ্র সেনের হত্যা দিয়ে যার শুরু, একে একে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিগ্রহ দেখেছে এই বঙ্গভূমি। ২০১২-তে ভাঙ্গরের শিক্ষিকাকে জলের জগ ছুঁড়ে মারা, ২০১৫-য় মেটিয়াবুরুজে জাতীয়সংগীত গাওয়ানোর অপরাধে মাদ্রাসা শিক্ষকের মাথা ফাটানো, ২০১৮-য় সংস্কৃত, বাংলা, বিজ্ঞান শিক্ষকের পরিবর্তে উর্দু শিক্ষকের নিয়োগ নিয়ে দাঁড়িভিটে ছাত্রহত্যা, ধর্মীয় পোশাকের পরিবর্তে স্কুল ইউনিফর্ম পরে আসতে বলার কারণে সুতির প্রধান শিক্ষককে প্রাণভয়ে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করা, দক্ষিণ দিনাজপুরের ত্রিমোহিনী প্রতাপচন্দ্র হাই স্কুল শিক্ষিকাকে মারধর করে তার কাপড় খুলে নেওয়া...। সাম্প্রতিক সময়ে হাওড়ার শ্যামপুর থেকে চোপড়ার সোনাপুর কিংবা নরেন্দ্রপুরের বলরামপুর- যেদিকে তাকানো যাক শুধু শিক্ষক নিগ্রহ।
শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিক্ষকদের সাথে প্রতারণা করে চলেছে। NCERT-র চাহিদা মাফিক যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্বেও প্রাথমিক শিক্ষকদের সর্বভারতীয় বেতন কাঠামো PRT স্কেল এতদিন দেওয়া হয়নি। উপরন্তু শিক্ষকদের যৌথ আন্দোলনে ন্যাক্কারজনক দমন-পীড়ন চালাবার পরও চাপে পড়ে যদিওবা শুধুমাত্র Grade Pay বৃদ্ধি করা হলো তাতেও 18 বছর চাকরি জীবন পার করা শিক্ষকদের একমাত্র Promotional Benifit কেড়ে নেওয়া হলো, যার ফলে আজ তাঁরা Level 9-এ অবস্থান করছেন। দিনের পর দিন মূল্য বৃদ্ধি হলেও AICPI-কে উপেক্ষা করে মহার্ঘ ভাতার বঞ্চনা আমাদের পেশাগত স্বার্থকে ক্ষুন্ন করছে। আজও সরকারি অনুদান পুষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের WBHS-এর আওতায় আনা হয়নি।
শিক্ষার অধিকার আইনের ২৭ নং ধারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিভিন্ন পঠন-পাঠন বহির্ভূত কাজে শিক্ষকদের ব্যস্ত রাখার কারণে শিক্ষাদানের কাজ শ্লথ হচ্ছে। সরকারি নিয়মের গেরোয় আজ গোটা শিক্ষাব্যবস্থাটাই শরৎবাবুর 'মেজদা'য় পরিণত। মিড-ডে-মিল নামক বিভীষিকা থেকেও শিক্ষকদের মুক্তির দাবি উপেক্ষিতই থেকে গেছে।
উৎসশ্রী নামক একটি ত্রুটিপূর্ণ পোর্টাল চালু করে ক্ষমতাসীন দল তার পেটোয়া শিক্ষক-শিক্ষিকাকে ট্রান্সফারের সুযোগ করে দিয়ে এবং একই সাথে গ্রাম গঞ্জের স্কুলগুলিকে শিক্ষক শূন্য করে হঠাৎ করেই পোর্টালটি বন্ধ করে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিদ্বেষ বা বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে দিনের পর দিন পেপার ট্রান্সফার বা টেম্পোরারি ট্রান্সফারগুলিকে বলবৎ রাখা হয়েছে এবং এই দুর্নীতি এখনোও সমানতালে চলছে।
এ'ছাড়াও চলছে শিক্ষাক্ষেত্রে নির্লজ্জভাবে ধর্মীয় তোষণ। পাঠ্যপুস্তকে রামধনুকে 'রং-ধনু' আকাশীকে 'আসমানী' দিয়ে যার শুরু, পিসিকে 'ফুফি'/'বুয়া', মাসিকে 'খালা', বাবাকে 'আব্বা', মাকে 'আম্মা' শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সমাজের সম্পর্কগুলোর মধ্যেও উর্দু অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলছে। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় শুক্রবার দুপুরের পর ছুটি কিংবা কলেজ/ইউনিভার্সিটিগুলোতে গ্র্যান্ড ইফতারকে 'সেমিনার' বলে চালানোর মধ্য দিয়ে আরবায়নের অপচেষ্টা সুস্পষ্ট। স্কুলে বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা সরস্বতী পুজো পুনরায় ফিরিয়ে আনতে চাওয়ায় হাড়োয়ার শিক্ষক গণেশবাবুকে হেনস্থা করার ঘটনা কিসের অশনি সংকেত!
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সংবিধান মৌলিক অধিকারের কথা বললেও মৌলিক কর্তব্যবোধ সম্পর্কে নীরব। তাই এই কর্তব্যবোধের গুরুত্ব উপলব্ধির মধ্যে আনতে গেলে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবতার স্তম্ভস্বরূপ চিরন্তন মূল্যবোধকে যুক্ত করতে হবে আর তাহলেই এক শক্তিশালী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। এই জন্যই সময়সূচি তৈরীর সময় জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদকে সপ্তাহে একদিন করে 'সামাজিক কর্তব্য' ও 'সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা' শীর্ষক পিরিয়ডের সংস্থান রাখতে বাধ্য করতে হবে।
ভারতীয় পরম্পরায় শিক্ষাদীক্ষায় গুরুই প্রধান। তাই গুরুকে অর্থাৎ শিক্ষককে সমাজে উচ্চ স্থান দিতে হবে। এর জন্য শিক্ষককেও প্রকৃত গুরু হয়ে উঠতে হবে। প্রত্যেক মানুষেরই কিছু দুর্বলতা থাকা স্বাভাবিক, যেটা কাটিয়ে উঠে নিজ কর্তব্যে সজাগ থেকে শিশু শিক্ষার্থী ও সমাজের হিতচিন্তক হয়ে উঠতে হবে। এই জন্যই আমাদের সংগঠন ভারতীয় পরম্পরায় 'শিক্ষক দিবস' হিসেবে 'গুরু পূর্ণিমা' তিথিকে এবং স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের জন্মদিন- এই সময়কালের মধ্যে যে কোনো একটি দিন 'কর্তব্যবোধ দিবস' হিসেবে পালন করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের আদর্শ ও ভাবধারাকে পাথেয় করে আমাদের এই সংগঠন ১৯৯৪ সাল থেকে পুরো পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে শিক্ষা এবং শিক্ষক স্বার্থে কাজ করে চলেছে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধযুক্ত সমাজ এবং পরম বৈভবশালী রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারায় কাজ করে চলা 'বঙ্গীয় নব উন্মেষ প্রাথমিক শিক্ষক সঙ্ঘ'ই হলো সারা পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র রাষ্ট্রবাদী প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠন। জয়তু BNUPSS.