07/02/2025
গত ২রা ফেব্রুয়ারি, রবিবার বানতলা চর্মনগরীতে ম্যানহোল পরিস্কার করতে গিয়ে মারা গেলেন ৩জন শ্রমিক। ফরজেম শেখ, হাসি শেখ এবং সুমন সর্দার। রবিবার সকাল ৯টা নাগাদ কলকাতা লেদার কমপ্লেক্সের ভিতরে সেক্টর ৬ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অথরিটির অধীনে সাফাইয়ের কাজ চলছিল। রাসায়নিক বর্জ্য পরিষ্কারের কাজ চলছিল। পরিষ্কারের কাজ করছিলেন ফরজ়েম, হাসি এবং সুমন। হঠাৎ পাইপলাইন ফেটে ভিতরে পড়ে যান তিন জন। ওই নালার গভীরতা ছিল ১০ ফুট। সেখানে বর্জ্যমিশ্রিত তরলের স্রোতে তলিয়ে যান সকলে। প্রায় চার ঘণ্টা পর, দুপুর দেড়টা নাগাদ যখন তাঁদের উদ্ধার করা গেল, তখন কারও শরীরে প্রাণ নেই।
ম্যানহোল বা নিকাশি নালায় মানুষ নামিয়ে কাজের ব্যবস্থা দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। ২০১৩ সালে এই ব্যবস্থাতে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। দেশে নতুন আইন তৈরি করে বলা হয়েছিল, ম্যানহোল সাফাই, মলমূত্র সাফাই বা বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কাজ কোনও মানুষকে দিয়ে করানো যাবে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে কাউকে ম্যানহোলে নামাতে হলেও সংশ্লিষ্ট সাফাইকর্মীর জীবন এবং স্বাস্থ্যের সব রকমের নিরাপত্তা দিতে হবে। National Action for Mechanised Sanitation Ecosystem (NAMASTE) স্কিমের মধ্যে এই বিষয়ে যাবতীয় গাইডলাইন তৈরী করা হয়েছিল। এ নিয়ে আগেও সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ রয়েছে। বেশ কিছু নির্দেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত।
কিন্তু গাইডলাইন, নির্দেশ মানছে কে? নর্দমা সাফাইয়ের দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থাকে দেওয়া হয়ে থাকে। বড় নিকাশি নালার ক্ষেত্রে মূলত যন্ত্রের সাহায্যে সাফাই করা হয়। ছোট নর্দমাগুলির ক্ষেত্রে (যেগুলির উচ্চতা কোমরসমান) সংস্থাগুলি কর্মীদের ব্যবহার করে সাফাইকাজ করে থাকে। তবে সেই সব দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখেন কি না, তার কোনো গ্যারেন্টি নেই। কর্পোরেশন এই কাজ করানোর জন্য টেন্ডার ডাকে। যে কোম্পানি সবথেকে কম দামে কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় তারাই টেন্ডার পায়। আর সবথেকে কম দামে কাজ করে দেবে অর্থাৎ শ্রমিকদের অত্যন্ত কম মজুরিতে, কোনোরকম কোনো সুরক্ষার বন্দোবস্ত ছাড়াই কাজ করানো হবে একথা নিশ্চিত।
একদিকে দেশে এই কাজ বন্ধ করার আইন হয় আর আরেকদিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার বই কর্মযোগীতে লেখেন ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং “spiritual experience”, ২০১৯ সালে কুম্ভমেলায় মোদী সাফাই কর্মীদের প্রণাম জানানোর কর্মসূচী নেন। আইন আইনের জায়গাতেই পড়ে থাকে। সাধারণ শ্রমিকরা (এই কাজে বিশেষতঃ নিম্নবর্ণের শ্রমিকরা) আইনের সুরক্ষার ধারেকাছেও আসেন না। বর্ণভিত্তিক শ্রম বিভাজনের ধারণা কে অক্ষুন্ন রাখার প্রয়াস জারি রাখেন নরেন্দ্র মোদী।
এরাজ্যেও আমরা ২০২১ সালে কুদঘাঁট এবং ২০২৫ সালে বানতলা চর্মনগরী তে দুটি দুর্ঘটনা ঘটতে দেখলাম যেখানে ৬জন মানুষ মারা গেলেন এই কাজ করতে গিয়ে। মিডিয়া এবং জনগণের নজরের বাইরে আরও অনেক ঘটনা নিশ্চয় ঘটেছে। নানান কলোনিতে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায়, হাউসিং সোসাইটি গুলোতে নিকাশি নালা পরিস্কারের কাজ বেসরকারী কন্ট্রাক্টরদের দিয়ে দেওয়া হয়। এই বেসরকারী কন্ট্রাক্টররা ক্যাজুয়াল শ্রমিক নিয়োগ করেন, যাদের মধ্যে বেশীরভাগই নিম্নবর্ণের মানুষ। সরকার যতক্ষণ না নিকাশি নালা পরিস্কারের কাজ অথবা সাফাই এর কাজ যারা করেন তাদেরকে কর্পোরেশনের পার্মানেন্ট শ্রমিক এর মর্যাদা না দিচ্ছে, ততক্ষণ যাবতীয় আইনের কোনো সুযোগ সুবিধা এই শ্রমিকরা পান না। অনেক সময় শ্রমিকের মৃত্যু হলে FIR দায়ের অবধি হয়না।
শীর্ষ আদালতের নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিশেষ পরিস্থিতিতে ম্যানহোলে মানুষ নামাতে হলে আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে, ভিতরে প্রাণঘাতী গ্যাস আছে কি না। কর্মীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিশেষ অ্যাপ্রনে ঢেকে রাখতে হবে। হাতে দস্তানা এবং পায়ে গামবুট পরতে হবে। কর্মীদের বিশেষ ধরনের মুখোশ দিতে হবে। রাখতে হবে অক্সিজেনের ব্যবস্থা। বানতলার ঘটনাতে এসব কিছুই ছিলনা বলে জানা গেছে। ঠিকেদার কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, মৃত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে দশ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে জানিয়েছে রাজ্য সরকার। যদিও ২০২১ সালের কুদঘাটের দুর্ঘটনায় মৃত শ্রমিকদের পরিবার এখনও ক্ষতিপূরণ পান নি। আমাদের প্রশ্ন যেভাবে কোলকাতা কর্পোরেশন পার্মানেন্ট শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়ে বছরের পর বছর ঠিকেদার কে নিয়ে শ্রমিক নিয়োগ করিয়ে কাজ করাচ্ছে তা না বন্ধ হলে কী এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বন্ধ হবে? ঠিকেদারদের ঘাড়ে সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সরকার যেভাবে হাত গুটিয়ে বসে থেকে শ্রমিকদের ন্যূনতম আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে তার অবসান কবে হবে?
কোলকাতা কর্পোরেশন ঠিকেদার দের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছে, ফিরহাদ হাকিম দাবি দিয়েছেন যে শ্রমিকরা নাকি সুরক্ষার ব্যবস্থা না নিয়েই ম্যানহোলে নেমে পড়েন, অর্থাৎ শ্রমিকদের দায় যে তারা সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেন নি। এখানে প্রকৃত নিয়োগকারী বা প্রিন্সিপাল এমপ্লয়ার কোলকাতা কর্পোরেশনের দায়িত্ব কী? দায়িত্ব অস্বীকার করা এতই সহজ বলে এমন অবাধে চলছে নিকাশি নালায় শ্রমিকদের নামানোর জঘন্য অপরাধ। ঠিকেদার শ্রমিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে কিনা, আইন মেনে কাজ করছে কিনা , তার নজরদারি পুরসভারই দায়িত্ব। এই দায় এড়াচ্ছে কোলকাতা কর্পোরেশন, তার খেসারৎ দিতে হচ্ছে দরিদ্র শ্রমিকদের, নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে।