28/02/2025
ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ- খাতড়া শাখার একটি বিশেষ প্রতিবেদন।
------
আগামী দিনে খাতড়া ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ হবে প্রবীণদের এক নিরাপদ ও আনন্দময় আশ্রয়স্থল ।
---
সম্প্রতি টিভির তিনটি প্রতিবেদন যা আজকের সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, আমাদের মানসিকভাবে বিচলিত এবং বিপর্যস্ত করেছে। প্রথমটি হল আজতক বাংলার প্রতিবেদন-জেরিয়াট্রিক্স সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে কলকাতা মহানগরীতে ৭২ শতাংশ বয়স্করাই পরিবার থেকে দূরে একা থাকেন, একমাত্র সন্তান কর্মসূত্রে বাড়ির বাইরে থাকছেন, ঘরে বৃদ্ধ মা বাবা। তাদের মধ্যে কেউ একজন গত হলে অন্যজন সম্পূর্ণ একা নিঃসঙ্গ, অসুস্থ হয়ে পড়লে সাহায্যের কেউ নেই। তাদের প্রাত্যহিক জীবন যাত্রা আজ বিপদসংকুল হয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয়টি হলো- টিভি নাইনের প্রতিবেদন। সেটা আরো ভয়ংকর। সল্ট লেকের অভিজাত এলাকায় মহিলা অফিসার বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে থাকেন। মেয়ে বাবার জন্য খাবার আর জল রেখে ফ্ল্যাট বাইরে থেকে তালা দিয়ে কাজে চলে যান । বৃদ্ধ সারাদিন একাকী ঘরবন্দি থাকেন। সঙ্গী একমাত্র টি ভি।
আবার, সল্টলেকের বিডি ২৫০ ব্লকের আর এক সরকারি কর্মচারী তার ৮৬ বছর বয়সী মাকে খাবার আর জল রেখে ফ্ল্যাট বাইরে থেকে তালা দিয়ে অফিসের কাজে দিল্লি চলে গিয়েছিলেন । ১৫ দিন ধরে তালা বন্দী। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করছেন। পাড়ার লোকেরা দড়ির সাহায্যে তাকে খাবার আর জল কোনমতে দিচ্ছেন।।
পাড়ায় বৃদ্ধদের অনেকেরই সমবয়সী বন্ধু বান্ধব গত হয়েছেন , প্রাণের কথা বলারও তেমন লোক নেই।
তৃতীয়তঃ - ২ রা আগস্ট ২০২৩। ৪০০ জন বয়স্কদের ফ্ল্যাট দেবার নাম করে পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা করে নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে প্রতারণা করেছে এক প্রমোটিং কোম্পানি। বয়স্করা তো প্রতারকদের অতি সহজ শিকার। এই পরিস্থিতিতে বৃদ্ধরা অনেকেই আজ বৃদ্ধাশ্রমের ঠাঁই নিয়েছেন। অনেকটা যেন বাড়ির বৃদ্ধকে পার করা হয়েছে। সেখানে সঙ্গী সাথী যারা তারা সবাই বৃদ্ধ অথবা অতি বৃদ্ধ। আশেপাশে শিশু বা যুবক তেমন নেই। নেই কোন নিয়মিত শারীরিক বা মানসিক আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা । সঙ্গী কেবল টি ভি। আর মাঝে মাঝে এই বৃদ্ধাশ্রমের সাথীদের কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন , বাকিরা যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছেন, এটা বৃদ্ধাশ্রমবাসীদের উপর এক প্রবল মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ২০৫০ সালে দেশের সম্ভাব্য জনসংখ্যা হবে ১৬০ থেকে ১৭০ কোটি। আর ষাটোর্দ্ধের সংখ্যা হবে ৩০ কোটির বেশি। এই প্রবীণদের অধিকাংশের পক্ষে তাদের সন্তান-সন্ততিদের সাথে থাকা সম্ভব হবেনা। জীবন হবে আরও দুর্বিষহ। আজকের এবং আগামী দিনের আর্থসামাজিক কারণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতিতে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারেনা। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ শুধু মাত্র একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়। এর অন্যতম আরেকটি উদ্দেশ্য ভারতীয় সংস্কৃতির লালন-পালন এবং রক্ষা করা, ভারতীয়রা যাতে সুখে শান্তিতে আমৃত্যু স্বধর্ম পালন করতে পারেন তা নিশ্চিত করা।
আমরা মনে করি এই সমস্যার এক সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে বৈদিক যুগের চতুরাশ্রম ব্যবস্থা । ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস আশ্রমের ব্যবস্থাপনাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা। কর্মজীবনের অবসরের বয়স ষাট হওয়ায় গার্হস্থ্য আশ্রমের সীমা আজ ৬০ বছর।। কিন্তু বাণপ্রস্থ এবং সন্ন্যাসাশ্রম আজ অনুপস্থিত। তাই অবসরের পর অবস্থা ন যজৌ ,ন তস্থৌ। বাঁধাধরা জীবন আর নেই, সময় কিভাবে কাটবে জানা নেই, বিপুল মূলধন হাতে আছে কিন্তু মাসিক বেতন নেই। ভাগ্য সহায় না হলে অনেক ক্ষেত্রে নজর থাকে বুড়োর ওই বিপুল মূলধনের উপর।
বাঁকুড়া জেলার খাতড়ায় ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ জঙ্গলমহল এলাকায় অবস্থিত । পাহাড় এবং জঙ্গল ঘেরা এই এলাকার সৌন্দর্য বর্ণনাতীত এবং অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর ।এই এলাকা ট্যুরিজমের স্বর্গ। বৃদ্ধ বয়সে বসবাসের একেবারে আদর্শ স্থান ।ঠিক যেন সেনেটোরিয়াম।
আজ দেশের গড় আয়ু ৬৯ বছর, কিন্তু ৬০ বছর পূর্ণ হলেই কর্মজীবন থেকে ব্যক্তিকে বিদায় জানানো হয়। সুস্থ সবল দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যক্তি ৬১ বছরে পদার্পণ এর সাথে সাথেই কর্মহীন , কিন্তু শারীরিক মানসিক সব দিক থেকেই তিনি সক্ষম এবং দক্ষই থাকেন। কিন্তু হাতে কোন কাজ না থাকায় সময় কাটতেও চায় না। তাদের অনেকেই হীনমন্যতার শিকার হন ,এমনকি মনের মতো কথা বলার লোক পর্যন্ত পান না। ফলে অনেকের মন ভেঙে যায়, অনেকেই নানান মানসিক অসুখের শিকার হন। এই কলকাতাতেই ৭২ শতাংশ বৃদ্ধ একাকী, নিঃসঙ্গ, নিষ্কর্ম জীবন কাটাচ্ছেন। সময় তাদের কাছে বোঝা। তাদের অনেকেই নানান অন্যায় অবিচারের শিকার হন। আর সঙ্গী সাথী যা মেলে তা অনেক সময় মনের মত হয় না। বহু ক্ষেত্রেই আলোচনার বিষয় হয় অসুখ-বিসুখ, সংসারের অশান্তি আর পরনিন্দা পরচর্চা, যা বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত হানিকর। তাই অবসরের পর কর্মহীন অবস্থায় হীনমন্যতায় ভুগে আজেবাজে আড্ডায় সময় নষ্ট না করে , সময়ের ভারে জর্জরিত না হয়ে যথাসম্ভব তীর্থস্থান গুলি ভ্রমণ, জনসেবামূলক কাজে যুক্ত এবং সাধু সঙ্গের সুযোগ মিললে সময় যেমন ভালো কাটবে তেমনি বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকায় নিজেকে অপাঙ্ক্তেয় মনে হবে না, হীনমন্যতা ঠাঁই পাবে না, আনন্দে সময় কাটবে শরীরও ভালো থাকবে। আজকের দিনে এককভাবে বৃদ্ধ বয়সে ভ্রমণ এবং সেবামূলক কাজ করাও অসুবিধা জনক। ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের শাখা সারা দেশজুড়ে রয়েছে । তীর্থ ভ্রমণের জন্য থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। সঙ্ঘ কর্তৃপক্ষ সর্বত্র সততা এবং নিঃস্বার্থভাবে নানান জনসেবামূলক কাজকর্ম করে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হল সেখানে সাধারণের জন্য তিন রাত্রির বেশি থাকতে দেওয়ার ব্যবস্থা নেই।এইসব প্রবীণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এখানে তা এক থেকে তিন মাস করা হবে এবং স্বামী স্ত্রী সেখানে তিন মাস থাকতে পারবেন। জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা সবজি এবং কাঠের জ্বালে রান্না করা সাত্ত্বিক আহার আর গাছ গাছালিতে ভরা আশ্রমের নির্মল পরিবেশ তাদের কাছে অনেকটা সেনেটোরিয়ামে থাকার মত হবে। শরীর সুস্থ থাকবে মন প্রফুল্ল থাকবে।
তারা সেখানে প্রথম কয়েকদিন মনের আনন্দে ভ্রমণ করবেন । আশেপাশে বেড়াবার জায়গা গুলো দেখা হয়ে গেলে তাদের সময় কাটানোর তেমন কিছু থাকবে না । তখন তাদের কাছে বাকি থাকবে সাধুসঙ্গ ও সমাজ সেবামূলক কাজকর্ম । তখন চাইলে তারা মহারাজের সাথে কাজকর্মে হাত লাগানোর সুযোগ পাবেন, মহারাজ তাদের যোগ্যতা স্বধর্ম, অভিজ্ঞতা ও প্রবৃত্তির ভিত্তিতে তাদের বিভিন্ন সেবামূলক কাজের সুযোগ করে দেবেন এবং কর্ম সম্পাদনে নেতৃত্ব দেবেন, সহায়তা করবেন। অবসরের পরে এই সেবামূলক কাজে যোগদান তাদের আত্মবিশ্বাস আর পূণ্য কর্মের জন্য মানসিক শান্তি এবং আত্মবিশ্বাস যোগাবে। সর্বাধিক তিন মাস বা ততোধিক তারা এই আশ্রমে কাটিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন অথবা তীর্থ ভ্রমণে যেতে পারেন । সেখানেও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে থাকার সুযোগ পাবেন ।
কিছুদিন বাড়িতে কাটিয়ে বা ভ্রমণ সেরে যখন আবার মন চাইবে আশ্রমের সাথে যোগাযোগ করে তিন মাসের জন্য পুনরায় আশ্রমে ফিরে আসবেন। আশ্রমের সাথে একাত্ম হয়ে থাকবেন।
এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন । এই বয়স্কদের অসুখ-বিসুখ হতে পারে। আশ্রমের পক্ষে তো বাড়ির পরিবার-পরিজনদের মতো সেবা যত্ন করা সম্ভব নয়। এর উত্তর হল আশ্রমের সন্ন্যাসীদেরও তো অসুখ-বিসুখ হয়, তারা যেমন সেবা যত্ন পান এই প্রবীণ ব্যক্তিরাও তেমনি সেবা সুশ্রূষা পাবেন,প্রয়োজনে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হবে, নিকটজনকে খবর দেওয়া হবে, কিন্তু এমনটা হবে না যে, মরে পড়ে থাকবেন, পচা গন্ধ পেয়ে প্রতিবেশী পুলিশে খবর দেবে ,পুলিশ ডোম দিয়ে মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে পোস্টমর্টেম করে সৎকারের ব্যবস্থা করবে।
প্রাথমিকভাবে জানিয়ে রাখি, বর্তমানে এই আশ্রমে ভ্রমণ প্রার্থীদের জন্য থাকার যে বন্দোবস্ত আছে তার মধ্যে কয়েকটি ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা হবে। মাসিক থাকা খাওয়ার খরচ আলোচনা সাপেক্ষে স্থির হবে। এই প্রয়াসের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আগামীতে অতি প্রবীণদের আমৃত্যু এই আশ্রমে গৃহী আশ্রমিক হিসাবে বসবাসের সু -বন্দোবস্ত করা হবে। তার জন্য উপযুক্ত নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে । থাকার ব্যবস্থার সাথে সাথে তীর্থ ভ্রমণের ব্যবস্থাও থাকবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার এবং প্রাথমিক চিকিৎসার বন্দোবস্ত আশ্রমের পরিসরেই থাকবে। অসুস্থ হলে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি, নিকট জনকে খবর দেওয়া ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকবে । ষাটোর্দ্ধ বাণপ্রস্থী আবাসিকরা নিয়মিত হাসপাতালে তাদের দেখভাল করবেন। আশ্রমের দেবালয়ে নিয়মিত শাস্ত্র আলোচনা, গ্রন্থাগারে ধর্মীয় পুস্তক পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা থাকবে। বয়স্কদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এসে এই আশ্রমে তাদের সাথে আশ্রমের রীতিনীতি মেনে গেস্ট হিসাবে কিছুদিন থাকতে পারবেন । আনন্দ অনুষ্ঠান, গান-বাজনা শরীর চর্চা করতে পারবেন। যদিও এই ব্যবস্থা কিছুটা সময় সাপেক্ষ ।
এই উদ্দেশ্যে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের খাতড়া শাখায় পৃথক একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। অ্যাকাউন্ট নাম্বার- (0197010141615 ), IFSC - PUNB- 0019720, আশ্রমের ভক্ত শিষ্য অনুরাগী হিতৈষী ও সাধারণ জনগণ এই একাউন্টে উক্ত উদ্দেশ্যে সাহায্য পাঠাতে পারেন । আশ্রমের অনুকূলে যেকোনো দান আয় কর আইনের ধারা মোতাবেক কর ছাড়যোগ্য । এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বৈদিক যুগের চতুরাশ্রম প্রথা আধুনিক রূপে পুনরায় বাস্তবায়িত হবে এবং আজকের দিনে প্রবীণ ব্যক্তিদের শেষ জীবনে একাকিত্বের অবসান হবে। ভগবত আনন্দে ভালোভাবেই শেষ জীবন অতিবাহিত হবে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে বয়স্ক মাতা পিতার পক্ষে বিদেশ বিভুঁইয়ে সন্তানদের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কর্মস্থলে থাকা সম্ভব হয় না। আবার নিজগৃহে থাকলে রাতবিরেতে তাদের দেখারও কেউ থাকে না। শুধু তাই নয়, এই অবস্থায় বয়স্কদের নানান সামাজিক অবহেলার শিকার হবারও সম্ভাবনা থাকে । সন্তান এবং বৃদ্ধ পিতা-মাতা উভয়েই নিয়মিত মানসিক অশান্তির মধ্যে থাকেন। অশীতিপরদের এই আশ্রমিক জীবন বিশ্বায়নের যুগে (উক্ত পরিকল্পনা) বর্তমান সামাজিক সমস্যার এক সমাধান হতে পারে।
- বিনীত
স্বামী জিতেন্দ্রিয়ানন্দ
অধ্যক্ষ
ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ
খাতড়া - বাঁকুড়া
মোবাইল নাম্বার - ৭২৭৮১৫৯৩৪৯/ ৯৪৩৩৪৪৮৯৬৯