07/11/2025
এই লেখাটি লিখব লিখব করেও লেখা হচ্ছিল না। কিন্তু এটি এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ বাসীদের জন্য একটি গুরুত্বপুর্ন ব্যাপার।
ইদানিং গ্রাম বাংলা থেকে চন্দ্রবোড়া বা রাসেল ভাইপার সাপের কামড়ে প্রচুর মৃত্যুর খবর আসছে। সবচাইতে বাজে ব্যাপারটা হল, অনেকে ক্ষেত্রে রোগীকে খুব তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে, সঠিক মাত্রার অ্যান্টিভেনম চালিয়েও প্রাণ রক্ষা করা যাচ্ছে না।
কিন্তু হঠাৎ চন্দ্রবোড়া সাপ এত বেড়ে গেলই বা কেন? প্রথমত, এই সাপের প্রাকৃতিক শিকারী যেমন বেজি (mongoose), গুইসাপ (monitor lizard), বনবিড়াল, শাঁখামুটি সাপ, ঈগল এবং সারস পাখির সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিত শিকারের কারণে মারাত্মকভাবে কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, সারা বছর সেচ ব্যবস্থা (year-round irrigation) চালু হওয়ায় এখন ক্ষেতে সব সময় ফসল হয়, যার ফলে ইঁদুরের সংখ্যাও সারা বছর বেশি থাকে। আর যেহেতু ইঁদুর রাসেল ভাইপারের প্রধান খাদ্য, তাই তাদের জন্য খাবারের সহজলভ্যতা বেড়ে গেছে এবং প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ বেড়েছে। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের (climate change) কারণে কিছু অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাসেল ভাইপারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এর ফলে তাদের বিস্তার ও সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাকৃতিক শিকারী কমে যাওয়া এবং খাদ্যের প্রাচুর্য এই দুটি মিলে রাসেল ভাইপারের জনসংখ্যা বিস্ফোরণ (population boom) ঘটেছে, যা পশ্চিম বাংলাসহ পুরো পূর্ব ভারতে সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিয়েছে।
এটা অনেকেই জানে না যে, রাসেল ভাইপার সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম তৈরিতে অঞ্চলভিত্তিক বিষের বৈচিত্র্যের গুরুত্ব অপরিসীম। পশ্চিম বাংলায় রাসেলের ভাইপার সাপের কামড়ে সৃষ্ট বিষক্রিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম, (যা দক্ষিণ ভারতে তৈরি) আজ খুব একটা কাজ করে না। এর মূল কারণ হলো, দক্ষিণ ভারতে যে অ্যান্টিভেনম তৈরি হয়, তার কার্যকারিতা পূর্ব ভারতের রাসেলের ভাইপারের বিষের সাথে মেলে না।
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, দক্ষিণ ভারত ও পশ্চিম বাংলার রাসেলের ভাইপারের বিষের রসায়ন এবং প্রোটিনের গঠন আলাদা হওয়ায়, দক্ষিণ ভারতের venom থেকে তৈরি polyvalent antivenom পশ্চিম বাংলায় কার্যকর হয় না।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কয়েক বছর আগে তার নিজস্ব অ্যান্টিভেনম উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। বাঙালির ইতিহাসে কয়েক দশক ধরে বাঙালির জীবনের সুরক্ষায় কাজ করা বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, যা দেশের প্রথম অ্যান্টিভেনম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, তার snake অ্যান্টিভেনম উৎপাদন প্রায় দুই দশক আগে বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন থেকে রাজ্যে সাপের দংশনে মৃত্যু বাড়ছে, কারণ দক্ষিণ ভারতের অ্যান্টিভেনম এখানে প্রায়শই অকার্যকর হচ্ছে।
সম্প্রতি পশ্চিম বঙ্গে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য মহল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে স্থানীয় venom এর উপযোগী নতুন এবং কার্যকর অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ ও দাবি উঠেছে। বাঙলার সংবাদমাধ্যমেও এ ব্যাপারে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, নিজস্ব অ্যান্টিভেনম উৎপাদন বন্ধ রাখলে অনেকেই জীবন হারাচ্ছেন, আর এটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনরায় চালু করতে হবে।
বেঙ্গল কেমিক্যালস বর্তমানে কলকাতার ইউনিটে সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম পুনরায় উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। নতুন আধুনিক সুবিধা ও শর্ত পূরণ করার মাধ্যমে তারা এই serum তৈরি শুরু করতে চায়। শীঘ্রই স্থানীয় sourced venom ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম তৈরি হলে, এটি পশ্চিম বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য প্রাণ রক্ষাকারী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা রুগীদের নিরাপত্তার জন্য এবং চিকিৎসায় সাফল্যের জন্য বলছেন, venom এর জায়গা-ভিত্তিক পরিবর্তনের কারণে শুধু দক্ষিণ ভারতের venom থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনম যথেষ্ট নয়। আমাদের রাজ্যের "venom profile" এর সঙ্গে মানানসই অ্যান্টিভেনম তৈরি অত্যাবশ্যক। এই উদ্যোগ দ্রুত নেওয়া না হলে সাপের দংশনে মৃতের সংখ্যা কমানো যাবে না এবং রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন।
অতএব, পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে তাড়াতাড়ি পদক্ষেপ নিতে হবে নিজের অ্যান্টিভেনম উৎপাদন পুনরায় চালু করে, যাতে রাজ্যের মানুষের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। স্থানীয় venom ব্যবহার করে তৈরি করা এই অ্যান্টিভেনম হবে আরও কার্যকর ও জীবনের জন্য নিরাপদ। সাপের দংশনে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে এবং রোগীদের দ্রুত সেবা দিতে এই কাজ অত্যন্ত জরুরি। পশ্চিমবঙ্গের নিজের অ্যান্টিভেনম উৎপাদন আবার শুরু না করলে রোগীদের প্রাণহানির হার কমানো সম্ভব হবে না। তাই রাজ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করে বাঙালিদের জীবন রক্ষায় কাজ শুরু করতে হবে।
এই লেখাটি পশ্চিম বঙ্গের নাগরিকদের জীবন রক্ষার জন্য একটি জরুরি আবেদন।
(শান্তনু সোম)