12/04/2026
হাওড়া জেলার জলাভূমি দূষণ ও সমস্যা
হাওড়া জেলায় বর্তমানে জলাভূমি দূষণ এবং জলাশয় সংরক্ষণের পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের বর্তমান রিপোর্ট এবং পরিবেশবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চল এবং নগরায়ণ—এই দুইয়ের চাপে জেলার প্রাকৃতিক জলধারা ও জলাভূমিগুলি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
নিচে বিস্তারিত পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:
১. জলাভূমি ভরাট ও জবরদখল -
বর্তমানে ডোমজুড়, সাঁতরাগাছি এবং উত্তর হাওড়ার বিভিন্ন অংশে ব্যাপক হারে জলাভূমি ভরাটের অভিযোগ সামনে আসছে।
বেআইনি নির্মাণ: অনেক ক্ষেত্রে নিচু জমি বা বিল ভরাট করে বাণিজ্যিক গুদাম (Warehouse) বা বহুতল আবাসন তৈরি করা হচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনালে (NGT) জমা পড়া রিপোর্ট অনুযায়ী, জেলার বেশ কিছু মৌজায় সরকারি আইন লঙ্ঘন করে জলাভূমিকে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে রূপান্তর করা হয়েছে।
নগরায়ণ: বিশেষ করে সাঁতরাগাছি এবং বালি সংলগ্ন অঞ্চলে নগরায়ণের চাপে ছোট-বড় প্রচুর পুকুর ও জলাশয় বিলুপ্তির পথে।
২. শিল্প ও বর্জ্য দূষণ -
হাওড়া যেহেতু একটি প্রাচীন শিল্পাঞ্চল, তাই এখানকার জলাভূমিগুলোতে রাসায়নিক ও কঠিন বর্জ্যের প্রভাব অনেক বেশি।
তরল বর্জ্য: হাওড়া পৌরনিগম ও পার্শ্ববর্তী পুরসভা এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯১০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর একটি বড় অংশ এবং অপরিশোধিত নর্দমার জল সরাসরি জলাশয়ে মিশছে।
প্লাস্টিক ও রাসায়নিক: ছোট কারখানাগুলোর রাসায়নিক মিশ্রিত জল এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন হয়ে খাল ও বিলে গিয়ে পড়ায় জলের গুণমান নষ্ট হচ্ছে, যা জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম বিপদ ডেকে আনছে।
৩. সাঁতরাগাছি ঝিলের বর্তমান অবস্থা -
হাওড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি সাঁতরাগাছি ঝিল পরিযায়ী পাখিদের জন্য বিখ্যাত।
শৈবাল ও কচুরিপানা: বর্তমানে এই ঝিল দূষণ ও কচুরিপানায় এতটাই ভরে গিয়েছে যে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। যদিও সরকারিভাবে STP (Sewage Treatment Plant) বসানোর এবং ঝিল পরিষ্কার করার জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তবুও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
৪. পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে প্রভাব -
জলাভূমি ধ্বংসের ফলে হাওড়ার বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে:
মেছো বিড়ালের সংকট: পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য প্রাণী মেছো বিড়ালের (Fishing Cat) অন্যতম প্রধান আবাসস্থল ছিল হাওড়ার এই জলাভূমিগুলি। কিন্তু জলাশয় ভরাট ও ঝোপঝাড় কেটে ফেলার কারণে প্রায়ই লোকালয়ে এদের মৃত্যু হতে দেখা যাচ্ছে।
জলমগ্নতা: প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থা (জলাভূমি) কমে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাওড়ার নিচু এলাকাগুলোতে জল জমার সমস্যা তীব্র হচ্ছে।
৫. সরকারি পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা (২০২৬) -
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন কিছু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে:
জেলা পরিবেশ পরিকল্পনা (DEP) ২০২৬: হাওড়া জেলা পরিবেশ পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিকাশি নালাগুলো থেকে জল সরাসরি জলাশয়ে পড়ার আগে তা পরিশোধনের জন্য নতুন I&D (Interception and Diversion) এবং STP প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
কঠোর আইন: বেআইনি পুকুর ভরাট রুখতে স্থানীয় ব্লক ও পৌর প্রশাসনকে কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং NGT-র হস্তক্ষেপে বেশ কিছু বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সারসংক্ষেপ: হাওড়ার জলাভূমি বাঁচাতে এখন দরকার সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং সরকারি প্রকল্পের দ্রুত ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন। তা না হলে এই 'শিল্পনগরী' ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ জলসংকটের সম্মুখীন হতে পারে।
হাওড়া জেলা যৌথ পরিবেশ মঞ্চ