17/08/2025
ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে লিখেছিলেন, ❝ দ্বাপরে কানাই ছিল নন্দের নন্দন, কলিতে তাঁতির কুলে দিলা দর্শন, তাহারে ছলিয়াছিল অক্রুর গোঁসাই, গোঁসাইকে কানাই দিল বৃন্দাবনে ঠাঁই, গোঁসাই হল গুলিখোর কানাই নিল ফাঁসি, কোন চোখে বা কাঁদি বল কোন চোখে বা হাসি...❞🩷🌿
🇮🇳 #স্বাধীনতা_আন্দোলনের_অচেনা_নায়ক পর্ব ~ ১৩🇮🇳
৩০শে এপ্রিল, ১৯০৮। ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী মজফ্ফরপুরে কিংসফোর্ডকে বোমা মেরে হত্যার প্রচেষ্টা চালালেও তা সফল হল না। উপরন্তু ঘটনার ফলস্বরূপ তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় অভিযান শুরু করে। কলকাতার মুরারী পুকুর সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার হয় প্রচুর আগ্নেয়া স্ত্র। আবিষ্কৃত হয় একটি গোপন বোমা তৈরীর কারখানা। শুরু হয় ❝ আলিপুর বোমা মামলা ❞।
গ্রেফতার হওয়া বিপ্লবীদের মধ্যে ছিলেন কানাইলাল দত্ত, উল্লাস কর দত্ত, বারীন ঘোষ, অরবিন্দ ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ওরফে নরেন গোঁসাই প্রমুখ। ভীরু ও দুর্বল চিত্তের নরেন পুলিশী অত্যাচার এড়াবার জন্য রাজসাক্ষী হতে সম্মত হন এবং পুলিশের কাছে বিপ্লবীদের বহু গোপন ডেরার সন্ধান দিতে থাকেন। যার সূত্র ধরে অন্যান্য অঞ্চল থেকেও বহু বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করা হতে থাকে। পুলিশের কাছে তাঁর দেওয়া সাক্ষী আদালতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করতে হতো। আর তা হলে অরবিন্দ ঘোষ, বারীন ঘোষ-সহ একাধিক বিপ্লবীর ফাঁসি হয়ে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী।
জেলবন্দী বিপ্লবীরা বুঝতে পারেন, এককালের সহযোদ্ধাই বর্তমানে বিশ্বাস ঘাতক। কানাইলাল ও তাঁর সঙ্গেই গ্রেফতার হওয়া সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঠিক করেন, যে করেই হোক আদালতে কিছু বলার আগেই নিকেশ করতে হবে নরেন গোঁসাইকে। সে বেঁচে থাকলে বানচাল হয়ে যাবে আগামী দিনের সব পরিকল্পনা। মুখ থুবড়ে পড়বে স্বাধীন ভারতবর্ষ গড়ে তোলার লড়াই।
তাই জেলে বসেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, নরেনকে চিরতরে চুপ করিয়ে দিতে হবে। দায়িত্ব পড়ে দুই তরতাজা যুবক কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ বোসের ওপর....💥🔴
সেই সময় জেল ভাঙার একটা পরিকল্পনাও তৈরি হয়েছিল। ঠিক হয়, চারজন বন্দি জেল ভেঙে পালাবেন। সেই চারজনের মধ্যে একজন হলেন কানাইলাল। কিন্তু তিনি বেঁকে বসেন। জেল ভেঙে পালানোয় তাঁর সায় ছিল না। কারাগারে অরবিন্দ ঘোষ ততদিনে নিজেকে একটু আলাদা করে নিয়েছেন। তিনি ধ্যানে মগ্ন, তাঁর মননে তখন আধ্যাত্মিকতার বিরাজ।
কানাইলালের অবশ্য সেসবে আগ্রহ নেই। ধ্যান বা গীতাপাঠের রাস্তায় হাঁটেননি। তিনি ছোট থেকেই দস্যি। জেলেও তার অন্যথা হয়নি। এমনকী, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জেলেও তিনি মজা, খুনসুটিতে মগ্ন। কখনও বন্দিদের ধুতির খুঁট বেঁধে দিচ্ছেন, তো কখনও বিস্কুট চুরি করে খাচ্ছেন।
কানাইলাল ঠিক করেন, আদালতে হাজিরা দেওয়ার আগে নরেন গোঁসাইকে হত্যা করবেন তিনি। বয়সে তাঁর চেয়ে সামান্য বড় সত্যেন্দ্রনাথ বসু জানান, তিনিও থাকবেন কানাইলালের সঙ্গেই।
জেলে তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় রিভালভার। কেউ কেউ বলেন, কাঁঠালের ভেতরে নাকি রিভলভার রেখে দেওয়া হয়েছিল। কানাইলাল নিজে অবশ্য রহস্য উন্মোচন করেননি। তিনি বলেছিলেন, ক্ষুদিরাম বসুর ভূত এসে নাকি তাঁকে রিভালভার দিয়ে গিয়েছিল!🔴
১৯০৮ সালের ১১ অগাস্ট ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। আর কানাইলালের ফাঁসি হয় ওই বছরেরই ১০ নভেম্বর..💛🌿
© ে_ছিলো_নেতা
নরেন গোঁসাইকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে অসুস্থতার ভান করে জেল হাসপাতালে ভর্তি হন সত্যেন্দ্রনাথ। তার তিনদিন পরে পেটে যন্ত্রণা হওয়ার অভিনয় করে হাসপাতালে ভর্তি হন কানাইলালও। শোনা যায়, জেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি দুজনকেই ভর্তি করে নেন।
সত্যেন্দ্রনাথ বিছানার মধ্যে লুকিয়ে রিভালভার হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে পুলিশি তল্লাশি হতো না। সত্যেন্দ্রনাথের তাই রিভালভার লুকিয়ে রাখতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু কানাইলালের কাজটা সহজ ছিল না। পুলিশের এক সার্জেন্ট, হিগিন্স তাঁকে বেশ সন্দেহের চোখে দেখতেন। শোনা যায়, কানাইলাল তাঁর জামার ভেতরে দড়ি দিয়ে বেঁধে রিভালভার হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
ততদিনে কানাইলাল আর এক মোক্ষম চাল চেলেছেন। পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনিও রাজসাক্ষী হতে চান। তিনি নরেন গোঁসাইয়ের চেয়েও বেশি তথ্য জানেন বলে পুলিশকে আশ্বাস দেন। সেই সঙ্গে বলেন, সত্যেন্দ্রনাথ কেও তিনি রাজসাক্ষী হতে রাজি করাবেন। ব্রিটিশ সরকার যা শুনে খুব প্রসন্ন হয়। একদিন সকালে হাসপাতালে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে পাঠানো হয় নরেন গোঁসাইকে।
সেই সময়কার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর পুলিশের কাছে জমা দেওয়া এজাহার অনুযায়ী, নরেনকে সামনে পেয়ে বিছানার ওপর বসে বালিশের তলা থেকে রিভালভার বার করে গুলি চালান সত্যেন্দ্রনাথ। কিন্তু সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। নরেন ততক্ষণে বুঝে গিয়েছেন, গোটাটাই পরিকল্পিত। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েছিল হিগিন্স। তাঁকে ডাকার চেষ্টা করে নরেন। ততক্ষণে কানাইলালও গুলি চালিয়েছেন। নরেনের পিঠে যা বিঁধে যায়। পালানোর চেষ্টা করেন নরেন। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল হাসপাতালে তাঁকে ধাওয়া করেন কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথ। হিগিন্স সত্যেন্দ্রনাথকে জাপ্টে ধরে ফেলেন। সেখানেও দামাল কানাইলাল। হিগিন্সের তলপেট লক্ষ্য করে লাথি মারেন তিনি। মাটিতে ছিটকে পড়েন দুঁদে পুলিশ অফিসার। নরেনের পিছনে ধাওয়া করেন কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথ। ফের গুলি চালান কানাই। নর্দমার মধ্যে পড়ে যান নরেন।
লুটিয়ে পড়লো নরেনের নিথর দেহ বিপ্লবীদের প্রাণাধিক প্রিয় মাতৃভূমির বুকে। ধুলোর ওপর দিয়ে বয়ে চলল রক্তিম স্রোত। সম্পন্ন হলো বিশ্বাসঘাতকতার চরম শাস্তিদান – ❝ মৃত্যু ❞ 💥❌
© ে_ছিলো_নেতা
ইতিহাসবিদ, চন্দননগরেরই বাসিন্দা অধ্যাপর বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ❝ জেলকর্মীদের বয়ান অনুযায়ী, সেই সময় নরেন গোঁসাই নাকি বলে উঠেছিলেন, — ❝তিন বাপ, তিন বাপ, তিন বাপ।❞
সম্ভবত, শরীর ফুঁড়ে তিনটি বুলেট ঢুকে যাওয়ার কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন তিনি। কানাইলালের রিভালভারে তখনও দুটি গুলি অবশিষ্ট ছিল। সেই দুটিও নরেনের শরীর লক্ষ্য করে চালিয়ে দেন কানাইলাল। তারপরই পুলিশকে বলেন, — ❝ অ্যারেস্ট মি..!❞ পরে তাঁকে বলা হয়েছিল, ক্ষুদিরামের সঙ্গী প্রফুল্ল চাকি তো নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহ ত্যা করেছিলেন, তিনি কেন সেই পথে হাঁটলেন না?
কানাইলাল জবাব দিয়েছিলেন, —❝ আমি পলিটিক্যাল মার্ডার সফল করতে চেয়েছিলাম। এত ব্যর্থ হচ্ছিলাম। একটা সফলতা রাখতে হবে। আমি জানি আমার ফাঁসি হবে। কিন্তু সেটাই আমি চাই।❞🇮🇳
বিশ্বনাথ আরও বলছেন, ❝ মামলা চলাকালীন কানাইলালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তাঁর দাদা আশুতোষ দত্ত। কানাইলাল বলেছিলেন, ‘মাকে এখানে এনো না। সহ্য করতে পারবে না।’ নব্বইয়ের দশকে প্রয়াত হন আশুতোষ। তিনি নিজেই এই ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন।❞
শিবনাথ শাস্ত্রী জেলে আরেক মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণ সত্যেন্দ্রনাথকে মৃত্যুর আগে প্রস্তুত করার ব্যাপার ছিল। তখনও কানাইলাল জীবিত। তাঁর গারদের পাশ দিয়েই যেতে হয়েছিল শিবনাথকে। জেল থেকে ফিরে তিনি লেখেন, — ❝ কানাইকে দেখিলাম। পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহের মতো পায়চারি করিতেছে। বহু যুগ তপস্যা করিলে তবে কেউ ওকে আশীর্বাদ করার পুণ্য অর্জন করিবে...।❞❤️🌻
মৃত্যুদণ্ডাদেশ হওয়ার পর পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। তবে সেই রাস্তায় হাঁটেননি কানাইলাল। তাঁকে আইনজীবী বলেছিলেন, আপনি আপিল করুন। এটা তো নিম্ন আদালত। এরপর হাইকোর্ট আছে, সুপ্রিম কোর্ট আছে, প্রিভি কাউন্সিল আছে, তোমাকে আমরা বার করে আনব। কানাইলাল বলেছিলেন, ❝There shall be no appeal...❞
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন, ❝ ওহে, কানাই শিখিয়ে দিয়ে গেল কোথায় শ্যাল ব্যবহার করতে হয়, আর কোথায় উইল।❞💚✊
মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত হাসিঠাট্টায় মেতে ছিলেন কানাইলাল। এক পুলিশ অফিসার তাঁকে কটাক্ষ করেছিল, কাল তো তোমার ফাঁসি, দেখব এত হাসি কোথায় যায়! দমেননি কানাইলাল। তাঁর চোখে ছিল হাইপাওয়ারের মোটা কাচের চশমা। মৃত্যুর আগে জেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন দাদা আশুতোষ। বলেছিলেন, ❝ তোর চশমাটা দে। অন্তত একটা কিছু তো আমার কাছে রাখি।❞
কানাইলালের জবাব, ❝ দাদা, চশমাটা আমি এখন দিতে পারব না। চোখে হাইপাওয়ার তো। ফাঁসির মঞ্চে যদি হোঁচট খাই, এরা ভাববে বাঙালির ছেলে আমি মৃত্যুর আগে ভয় পাচ্ছি। চশমাটা আমার মৃত্যুর পরে নিও...।❞💛🌿
ইতিহাসবিদ বিশ্বনাথ বলছেন, ❝ কানাইলালের বড়দাদা তাঁর নাতনি শর্বরী বসুকে বলেছিলেন, পরে তিনি আমাকে বলেন, কানাইলালের গলায় দড়ি পরিয়ে দেওয়ার পর তিনি একজন পুলিশকে ডেকে বলেছিলেন, মৃত্যুর পর চশমাটা আমার বড়দাদাকে দিয়ে দিও। সেই চশমাই কানাইলাল বিদ্যামন্দিরে রাখা রয়েছে। শোনা যায়, কানাইলালের গলায় দড়ির ফাঁস ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। সেই কারণে তাঁর মৃত্যু হতে দেরি হয়।❞
মৃত্যুর সময়ও কানাইলালের তেজ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ আধিকারিকেরা। পুর্ণচন্দ্র দে, সাগরকালী ঘোষ, মোতিলাল রায়, আশুতোষ দত্তরা তাঁর মৃ তদেহ নিতে যাওয়ার পর তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিল, তোমাদের দেশে এরকম ছেলে ক’টা আছে..!🔴
© ে_ছিলো_নেতা
কানাইলাল বলে গিয়েছিলেন, আমার মৃত্যুর পর দেহ নিয়ে শোক নয়, শোভাযাত্রা কোরো। যাতে সকলে অনুপ্রাণিত হয়। হয়েওছিল তাই।
১০ নভেম্বর, ১৯০৮। সে এক অবিস্মরণীয় দিন। আলিপুর জেল থেকে কানাইলালের মরদেহ বেরতেই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে রাজপথ কার্যত অবরুদ্ধ। জনতার বাঁধভাঙা আবেগ। ক্যাওড়াতলা মহাশ্মশান পর্যন্ত শেষযাত্রায় সামিল অসংখ্য মানুষ...🌷
সেই ভিড় ব্রিটিশ শাসকদের এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে, কানাইলালের মৃত্যুর পর নিয়ম করে দেওয়া হয়, কোনও বিপ্লবীর মরদেহ তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে না। শেষকৃত্য হবে পুলিশের প্রহরায়। যে কারণে কয়েকদিন পরেই সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ফাঁসির পর মরদেহ পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হয়নি..🤍🌿
কলমে ✒️ স্বপ্নাশিষ দেবনাথ
⭕ ১৪তম পর্ব 👉 https://www.facebook.com/share/p/16nVp87gpt/
৭৯তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আমারা বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি এই সকল #স্বাধীনতা_আন্দোলনের_অচেনা_নায়ক দের..।🙏🇮🇳
© এক যে ছিলো নেতা
| ে_ছিলো_নেতা |
#স্বাধীনতা_আন্দোলনের_অচেনা_নায়ক #স্বাধীনতা #বাংলা #বিপ্লবী
📌 ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসে ে_ছিলো_নেতা পেজে আসতে চলেছে স্বাধীনতার নেপথ্য নায়কদের ৩০টি নির্বাচিত সত্য গল্প যা হয়তো আপনাদের কাছে আজও অজানা। এমন আরো গল্প জানতে Like ও follow করতে ভুলবেন না..😊