08/03/2024
তিনি 'ত্রিনেত্র' অর্থাৎ তাঁর তিনটি চোখ। দুটি চোখ যথাস্থানে অর একটি চোখ দুই ভ্রুর মাঝখানে। কিন্তু সত্যিই তো কপালের উপরে কারো চোখ থাকে না। এটা হ'ল আজ্ঞাচক্র বা প্রজ্ঞানেত্র, সন্তসাধকেরা যাকে বলেন দ্বিদল বা তেসরা তিল। এখানে ইষ্টমূর্তি ধ্যান করতে হয়। নিরন্তর সুকেন্দ্রিক ধ্যান ও তৎপরিপোষণী চলনের ফলে আজ্ঞাচক্রে ইষ্টের ভাব স্থায়ী আসন লাভ করে। জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন হয়। যার এমনতর হয়, ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান তার নখদর্পণে থাকে, বিষয় ও ব্যাপারের কার্য্যকারণ তার অধিগত, চৈতন্য তার উৎস-অভিস্রোতা হয়ে ওঠে। ভুল পদক্ষেপ তার হয় না। প্রবৃত্তি তাকে অভিভূত করতে পারে না। অসৎকে বিনায়িত ক'রে জীবজগতের মঙ্গল-সাধনও তার সহজসাধ্য হয়ে ওঠে। যিনি নিরন্তর ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠায় তৎপর, অতন্দ্রচিত্তে ইষ্ট ধ্যান ও কর্মে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলেন, তাঁরই উন্মীলিত হয় এই তৃতীয় নয়ন।
কথিত আছে, শিবের তৃতীয় নয়ন থেকে ক্রোধবহ্নি নির্গত হয়ে মদনকে (কামদেবকে) ভস্মীভূত করেছিল। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে শিবের কপালে কোন চোখ নেই, আর সেই চোখ থেকে আগুনও ঠিকরে বেরোয় নি। আসল ব্যাপার হ'ল, মদন মানে কামজ মোহের আকর্ষণ। পবাতী অপরূপ সাজে সেজে এসে নিজ রূপজ মোহের দ্বারা মহাযোগী মহাদেবের মন ভুলাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যিনি বৃত্তি-অধীশ, আজ্ঞাচক্রে যার চিত্ত দৃঢনিবদ্ধ, তাঁকে কি কামনা দ্বারা অভিভূত করা যায়? মহাদেবের বোধি ও প্রজ্ঞা চিরজাগ্রত। তিনি দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, পার্ব্বতী কামনার ডালি সাজিয়ে এসেছেন তাঁকে বরণ করতে। তাই, তিনি পার্ব্বতীর ঐ ভাবকে প্রশ্রয় দিলেন না। এর ভিতর দিয়ে আর এক মহাসত্য উদ্ঘাটিত হ'ল। বিবাহের প্রধান ঘটক হবে শ্রদ্ধা। শ্রেষ্ঠকে বরণ করতে হয় শ্রদ্ধার ভূমিতে। তার পরিবর্তে যদি সেই বরণের ভূমি হয় আত্মসুখ-উপভোগ, তার ফলে দাম্পত্য প্রেম কলুষিত হ'য়ে যায়। সেখানে সুসন্তানের আগমন সম্ভব হয় না। এই কারণেই মহাদেব গাব্বতীকে প্রত্যাখ্যান করলেন। এই হ'ল তৃতীয় নয়ন থেকে অগ্নি বিনির্গত হ'য়ে মদনকে ভস্মীভূত করা। পরে পার্ব্বতী কিভাবে মহাদেবের মনের মত ক'রে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এবং মহাদেবকে পতিরূপে লাভ করেছিলেন সে-কাহিনী সবারই জানা।
এ থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে, তৃতীয় নয়ন যার সদাজাগ্রত,মন যার আজ্ঞাচক্রে সদানিবন্ধ, প্রবৃত্তির কোন মোহ তাকে কখনও আচ্ছন্ন করতে পারে না। সে প্রবৃত্তিকে প্রবৃত্তি বলে চিনতে পারে। তাই তাকে কখনও দুঃখের কবলে পড়তে হয় না। সে নিজেও আনন্দে থাকে এবং অপরকেও আনন্দ বিলাতে পারে।