12/11/2020
ভূতচতুর্দশী কি ?
কেন এই দিন ১৪ রকম শাক খেতে হয় ?
জেনে নিন ১৪ শাকের উপকারিতাএবং কেন এদিন ১৪ প্রদীপ জ্বালানো হয় ?
কার্তিক মাসের অমাবস্যায় হয় কালী পুজো। আর তার আগের দিন যে চতুর্দশী‚ তাকে বলে ভূত চতুর্দশী। আগে বাঙালি বাড়িতে দুটো রীতি খুব মানা হতো। ভূত চতুর্দশী রাতে জ্বালানো হতো ১৪ প্রদীপ। তার আগে এদিন দুপুরে ভাতের সঙ্গে থাকতই ১৪ রকম শাক ভাজা |
রামচন্দ্রের ১৪ বছর বনবাসের কাহিনি এর সঙ্গে যুক্ত হলেও মূল বিষয় কিন্তু চতুর্দশী তিথি |
দীপ জ্বালানো হতো রাতের অন্ধকার দূর করতে, বলা হয় ঠিক এক মাস আগে মহালয়ার অমাবস্যার সময় আমাদের মৃত-মৃতা পূর্বপুরুষগণ মর্ত্যে নেমে আসেন উত্তরপুরুষের থেকে জল পান করার জন্যে। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের মহালয়ার অমাবস্যায় তর্পণ করি (জল পানে তাঁরা তুষ্ট হন)। এরপর একমাস যাবৎ আমাদের সান্নিধ্যে থেকে আমাদের আশীর্ব্বাদ প্রদান করেন। এর পর আমরা দীপান্বিতা অমাবস্যার আগের দিন সন্ধ্যায় আকাশ প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁদের অমৃতলোকে যাওয়ার রাস্তা আলোকোজ্জ্বল করে থাকি। মনে করা হয়, সেই সব মৃতাত্মারা আমাদের আশীর্ব্বাদ করতে করতে অমৃতলোকে ফিরে যান। এইভাবে চোদ্দ পুরুষকে আলোদান করে বর্তমান প্রজন্ম |
বহু বাড়ির ছাদে কার্তিক মাস জুড়ে আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর রীতি এখনও দেখা যায়। ১৪ শাক ভক্ষণের বিষয়টি স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয়। এই সময়ে মরসুম পাল্টায়। বাতাসে জায়গা করে নেয় হিমেল পরশ। তাই শরীর ভাল রাখতে ১৪ রকম শাক খাওয়ার বিধি আছে।
কালীপুজো এলেই আমরা যেন আমাদের কৈশোরে ফিরে যাই, মনে পড়ে যায় সেই সব ফেলে আসা দিনের কথা। সেই সময় হাওয়া বদল টের পাইয়ে দিত কালীপুজো আসছে। সেই সময় অনেক বাড়িতে আকাশ প্রদীপ দেওয়া হতো। অদ্ভুদ এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হতো চারিদিকে।
কালীপূজার সাথে ভূত চতুর্দশীর যেন একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে। দুপুরে মায়ের হাতের চোদ্দশাক ভাজা, গরম ভাতের সাথে ঘি দিয়ে অপূর্ব লাগতো। বাজার থেকে খুঁজে পেতে নিয়ে আসা হতো - কিন্তু তথাকথিত চোদ্দশাকের মধ্যে সব ঠিক ঠিক থাকতো কিনা "দেবা ন জানন্তি।"
শাস্ত্রমতে এই শাকগুলি হল যথাক্রমে - ওল, কেঁউ, বেতো, সর্ষে, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাটপাতা এবং শুষণী।
আজকের প্রজন্ম হয়তো জানেই না এই চোদ্দশাকের কথা। তাঁরা হয়তো হেসে উড়িয়ে দেবে এসব গ্ৰাম্য প্রথা বলে।
কিন্তু এর পিছনেও বিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যা আছে -
এই সময় যেহেতু ঠান্ডার আমেজ এসে যায়, হাওয়ায় ভাসে হিম যা থেকে নানারকম রোগ সৃষ্টি হয়, তাই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়ানোর জন্যে এই চোদ্দশাক খাওয়ার প্রথা। তাই এগুলো খাওয়াই ভালো। আর যাই হোক এতে ক্ষতি তো কিছুই নেই। তবে এইসমস্ত শাক এখন সব জায়গায় ঠিকমত জোগাড় করা সম্ভব নয়।
বাজারে প্রচলিত যে শাকগুলো খেলেও সমান উপকৃত হবেন এমন ১৪ টি শাকও খেতে পারেন। শাক গুলো হলো :
পালং শাক, লাল শাক, সুষণি শাক, বেতো শাক, কালকাসুন্দা, পুঁই শাক, কুমড়ো শাক, গুলঞ্চ শাক, মূলো শাক, কলমি শাক, সরষে শাক, নোটে শাক, মেথি শাক, লাউ শাক অথবা হিঞ্চে শাক৷
আয়ুর্বেদ এবং কবিরাজি শাস্ত্রে এই ১৪ শাকের গুণ অসীম। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আজকের দিনের যে "ধন-তেরাস" তা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সোনা, বাসন বা গহনা কেনার উৎসব ঠিক নয়। কার্তিক কৃষ্ণা-ত্রয়োদশী হলো আমাদের প্রাচীন আয়ুরভেদাচাৰ্য্য ধন্বতরির জন্মতিথি। তাঁর কথা স্মরণ করেই ওইদিন নিজেদের রোগমুক্ত রাখার জন্যে আয়ুর্বেদিক পথ্য বা ওষুধ কিনে তাঁকে সন্মান জানানো হয়। বলা যেতে পারে, তার অনুলিপি হিসাবে চৌদ্দ-শাক খাওয়া হয়। ত্রয়োদশী ও চতুর্দশী তিথির দিনই এই ভেষজ চোদ্দ-শাক খাওয়ার রীতি।
কোন শাক কী রোগ প্রতিরোধ করে আপনাদের জন্য রইল সেই তথ্য:
💠১. বেতো শাক: কৃমিনাশক, কোষ্ঠবদ্ধতা ও অম্বল প্রতিরোধক।
💠২. কালকাসুন্দা: অ্যান্টি-অ্যালার্জিক, কোষ্ঠবদ্ধতা, অর্শ, ফিসচুলা, হুপিং কাশি, দাদ ইত্যাদির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়৷
💠৩. নিমের উপকারিতা বলে শেষ হওয়ার মতো নয়৷ ম্যালেরিয়া, জন্ডিস, এইএডস, কুষ্ঠর মতো রোগ প্রতিরোগ করে৷ এছাড়া, কৃমি, খোস-পাঁচরা, ক্ষত, স্বপ্নদোষ নির্মূল করে৷
💠৪. জয়ন্তী শাক: বহুমূত্র, শ্বেতী , জ্বর এবং কৃমি নাশকের কাজ করে৷ সদ্য প্রসূতিদের জন্য খুব উপকারী৷
💠৫. গুলঞ্চপাতার: রস সেবনে কুষ্ঠ, বাতিরক্ত, জ্বর, পিত্তদোষজনিত বিকৃতি ও কৃমিরোগ নষ্ট হয়৷
💠৬. সুষনি শাক: হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ এবং মানসিক অস্থিরতা কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
💠৭. পলতা পাতা: এই শাক যে কোন শ্বাসের রোগে কার্যকরী। এরা রক্তবর্ধক এবং লিভার ও চামড়ার রোগ সরাতে এদের প্রভূতভাবে ব্যবহার করা হয়।
💠৮. হিঞ্চে শাক: ফাইটোস্টেরল সহ বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থ থাকে। হিঞ্চে খেলে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ে। শুধুমাত্র পিত্তনাশক হিসাবেই নয়, রক্তশোধক হিসাবে, ক্ষুধাবর্ধক এবং জ্বর নির্মূলকারী হিসাবে এর ব্যবহার অপরিসীম৷
💠৯. পালং শাক: জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এই শাক বিশেষ উপকারী। পোড়াঘায়ে, ক্ষতস্থানে, ব্রণে বা কোথাও ব্যথায় কালচে হয়ে গেলে টাটকা পালং পাতার রসের প্রলেপ লাগালে উপকার পাওয়া যায়। পালং শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি, ই এবং আয়রন। এজন্য পালং শাক খেলে রক্তে আয়রনের মাত্রা বেড়ে যায়।
💠১০. লালশাক: ভিটামিন ‘এ’-তে ভরপুর। লালশাক নিয়মিত খেলে দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকে এবং অন্ধত্ব ও রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করা যায়। এটি শরীরের ওজন হ্রাস করে।কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
💠১১. পুঁইশাকে: রয়েছে প্রচুর ভিটামিন। তবে ভিটামিন ‘বি’, ‘সি’ ও ‘এ’-এর পরিমাণই বেশি। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে আছে ক্যালসিয়াম এবং আয়রণ। এই শাক কিছুটা গুরুপাক। তাই আমাশার রোগীদের তা না খাওয়া উচিত। রক্তে ইউরিক এসিড বেশি থাকলে বাতজনিত সমস্যা দেখা যায়। মাছের এ সমস্যা আছে তাদেরও বর্জন করা উচিত পুঁইশাক। এতে প্রচুর আঁশ আছে বলে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করে।
💠১২. কলমি শাকে: ক্যালসিয়াম থেকে বলে এই শাক হাড় মজবুত করতে সাহায্য করে। এছাড়াও কলমি শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি,পর্যাপ্ত পরিমানে লৌহ, থাকায় এই শাক রক্ত শূন্যতার রোগীদের জন্য দারুন উপকারি।
💠১৩. নোটে শাক: পিত্তনাশক, রক্ত পরিষ্কার করে ও মেদ কমায়৷
💠১৪. মেথি শাকের: গুরুত্ব অপরিসীম৷ এই শাক তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে৷ হতাশা কাটাতে ও ডায়বেটিসের জন্য মেথি শাক খুব উপকারি৷ এছাড়া, যৌনক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এই শাক৷
এবার ফিরে আসা যাক প্রসঙ্গে,
ভূত চতুর্দশী বা নরক চতুর্দশীর দিন বাড়ীর আনাচে কানাচে ১৪ টি প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া হতো। অনেকের ধারণা এই দিনে প্রেতলোক থেকে আত্মারা পৃথিবীতে নেমে আসে। যে সব আত্মারা প্রেতলোক প্রাপ্ত হয়, যারা স্বর্গ/নরক কোনটাতেই যেতে পারে না, তারা এই দিনে জেগে ওঠে। এই একদিন তাঁদের আলো দেখানো হয়, এতে তারা খুশি হয়।
এটা হিন্দুদের "হ্যালুইন উৎসব"। বিদেশে "হ্যালুইন উৎসব" পালন করা হয় মিষ্টি কুমড়োর ওপরের অংশ কেটে সমস্ত বের করে মিষ্টি কুমড়োর মধ্যে চোখ মুখ আঁকিয়ে তার মধ্যে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়। মনে হয় এতে প্রেতাত্মারা খুশী হন। এছাড়া এদিন ভূতের সাজসজ্জা সেজে আনন্দ উৎসব করা হয়।
হিন্দুদের উৎসব একেবারেই অন্য নিয়মে। এদিন চোদ্দশাক খেয়ে দিনটি পবিত্র ভাবে পালন করে সন্ধ্যায় মৃত পূর্ব পুরুষের উদ্দেশ্যে চোদ্দটি প্রদীপ দেওয়া হয়। এতে যমরাজ প্রসন্ন হয়ে মৃত ব্যক্তির আত্মাকে মুক্ত করেন। সমস্ত পৃথিবীর মানুষের মতো হিন্দুরাও বিশ্বাস করে এই দিনটিতে মৃত আত্মারা পৃথিবীতে নেমে আসেন। যাই হোক ভূত চতুর্দশীর একটি অন্য রকম অর্থ দাঁড়ায়, ভূত চতুর্দশীর পরদিন দীপান্বিতা অমাবস্যা। মহাশক্তি মা কালীর পূজার দিন। আমাদের এই দেহ পঞ্চভূতের সমষ্টি। আকাশ, ভূমি, জল, অনল, পবন।
দেহান্তে শ্মশানে দেহ দাহ হলে এই শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়। সুতরাং এই পঞ্চভূতের শরীরকে নশ্বর জ্ঞানে এই দিনটি পবিত্র ভাবে থেকে চোদ্দশাক ভক্ষন করে, সন্ধ্যায় ধর্মরাজের নামে প্রদীপ উৎসর্গ করে পর দিবস মা কালীর উপাসনায় ব্রতী হবার শিক্ষা দেয়। তাই এদিন ভূতচতুর্দশী নামে খ্যাত। প্রেতাত্মার কথা বলতে এখানে দেহের নশ্বর মূর্ত্তির কথাই তুলে ধরা হয়েছে।
আরও যেটা - এই নরক চতুর্দশীর দিনই সত্যভামা কতৃক আঘাত প্রাপ্ত হবার পরেই শ্রীকৃষ্ণের হস্তে নরকাসুরের বধ হয়।
প্রত্যেকটি সার্বজনীন উৎসব মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর জয়কে উদযাপন করে হয়ে থাকে। দীপাবলীর এই উৎসবও অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো জ্বালানোর উৎসব, নিজের অন্তরের সকল অজ্ঞতা, অন্ধকারকে মুছে ফেলে আলোর উত্তরণের উৎসব। হয়তো অঞ্চল বিশেষে দীপাবলীর মাহাত্ম্য ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু মূল কথা এক - আত্মাকে প্রজ্বলিত করে পরিশুদ্ধ করে সেই পরম ব্রহ্মে লীন হওয়ার পথই দেখায় এই উৎসব।
সবার ভালো হোক। সবাই ভালো থাকুন। 🙏
✍ রবীন রায়