22/08/2026
বরুণ বিশ্বাস - জীবনী
---------------------
|| ছয় ||
কলকাতায় থাকাকালীন বরুণের জীবনে এক বিচিত্র ঘটনা ঘটে। কাহিনীটা মজার, তবে একটি মানুষ তার জীবনের লক্ষ্যে কতটা কেন্দ্রীভূত থাকতে পারে, তার পরিচয় এ গল্পে পাওয়া যাবে। এ সময় এক সহপাঠিনী বরুণের প্রেমে পড়ে – অবশ্যই একতরফা। মেয়েটি ছিল বড় ঘরের সন্তান, তার বাবার বেশ প্রতিপত্তি ছিল। তো মেয়ের আবদারে বাবা স্থির করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনে বরুণকে যাকে বলে অপহরণ করে তুলে নিয়ে গিয়ে একরকম জোর করেই মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবেন। সে বাবদ তিনি গাড়ি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজার সামনে অপেক্ষা করছিলেন, যেই হবু জামাই বেরোবে অমনি পাকড়াবেন। এখন, বরুণ সে পরিকল্পনাটি কীভাবে যেন আন্দাজ করে ফেলেছিলেন, এক বন্ধুকে বলে পাঠান ট্যাক্সি নিয়ে অকুস্থলেই চুপিসাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। তা, বন্ধু নাটকীয়ভাবে চেঁচিয়ে ‘বরুণ, তোর ছেলের খুব অসুখ, চল দেখতে যাবি না ?’ বলে বন্ধুকে গাড়িতে তুলে তো নিয়ে তক্ষুনি চম্পট দেয়। বস্তুত, ওই কথাটি ছিল একটি বেমালুম ধাপ্পা, বন্ধুকৃত্য করতে চালাকি। বরুণ বিয়ে করার বান্দা ছিলেন না। মনোরথের সারথী হয়ে রাজকন্যা ও অর্ধেক রাজত্ব অস্বীকার তো সামান্য ব্যাপার, পরবর্তীতেও প্রেম ইত্যাদি মনোবৈকল্য তিনি সযত্নে এড়িয়ে চলতেন। এমন গুণনিধিকে সঙ্গী করার বাসনা অনেক মেয়েই দেখায়, কিন্তু ব্রহ্মচারীর বক্তব্য ছিল, ‘বলছ বটে বিয়ের পরেও আমার এমন কাজ চালু রাখতে সাহায্য করবে, কিন্তু আদতে তা হয় না, হবেও না, অতএব...’। বর্তমান লেখকের যা অনুসন্ধান, তাতে বরুণের সাময়িক শিথিলতাও ঠাহর হয় না এ বিষয়ে। বৃহত্তর লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি কতটা পরিষ্কার থাকলে এমন নিশ্চল থাকা যায়, শরীর-মনের মৌলিক চাহিদাকে অগ্রাহ্য করা যায় ! তাই যখন বরূণের জীবন আশ্রয় করে তৈরী ‘প্রলয়’ ছায়াছবিতে নায়ককে নাচতে দেখা যায় নায়িকার সঙ্গে, লেখক ভাবেন, চিত্রায়ণ করতে গিয়ে এ কি বিচিত্রায়ণ, রূপায়ণ করতে গিয়ে বিরূপায়ণ ! মানুষ মহামানব চিনতে পারে না, তাঁকে নিজের স্তরে নামিয়ে আনে। তবে যে যা খায়, তারই তো ঢেঁকুর উঠবে।
এই ব্যতিক্রমী মানুষটির জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সমাজসেবা। সে লক্ষ্যে যাতে বেশী সময় ধরে নিজেকে নিয়োগ করতে পারেন, সে জন্যে শিক্ষকতাকে ভবিষ্যৎ পেশা বেছেছিলেন তিনি। চয়নটি সুচিন্তিত। ইস্কুলে পড়ালে হাতে সময় বেশী পাওয়া যাবে, এটা প্রথম থেকেই মাথায় গেঁথে ছিল তাঁর। উদ্দেশ্য সফল হয়, বারাসাতের এক বি টি কলেজ থেকে বি এড পাশ করে বরুণ ১৯৯৮এ স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ও তারপর ১৯৯৯এর ২রা জানুয়ারি কলকাতার শিয়ালদায় মিত্র ইন্সটিউটিশনে (মেন) বাংলার মাস্টারমশাই হিসেবে যোগ দেন। এ স্থানে পাঠকের কাছে উল্লেখ্য, বরুণ ডব্লুবিসিএসের প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করেন, কিন্তু এমন মানুষের জীবিকা তো শুধু নিজের জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে না, তাই তা যাতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সাধারণের কাছে লোভনীয় সরকারী চাকরী তাঁর কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য হয়নি। আমলা হওয়ার জন্যে বরুণ জন্মাননি।
#বরুণ_বিশ্বাস
#বাংলার_গর্ব
#সমাজসেবক
#প্রেরণা