23/01/2024
‘‘সুভাষচন্দ্র,
বাঙালি কবি আমি, বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি। গীতায় বলেন, সুকৃতের রক্ষা ও দুষ্কৃতের বিনাশের জন্য রক্ষাকর্তা বারংবার আবির্ভূত হন! দুর্গতির জালে রাষ্ট্র যখন জড়িত হয় তখনই পীড়িত দেশের অন্তর্বেদনার প্রেরণায় আবির্ভূত হয় দেশের অধিনায়ক। রাজশাসনের দ্বারা নিষ্পিষ্ট, আত্মবিরোধের দ্বারা বিক্ষিপ্তশক্তি বাংলাদেশের অদৃষ্টাকাশে দুর্যোগ আজ ঘনীভূত। নিজেদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দুর্বলতা, বাইরে একত্র হয়েছে বিরুদ্ধশক্তি। আমাদের অর্থনীতিতে কর্মনীতিতে শ্রেয়োনীতিতে প্রকাশ পেয়েছে নানা ছিদ্র, আমাদের রাষ্ট্রনীতিতে হাল-দাঁড়ে তালের মিল নেই। দুর্ভাগ্য যাদের বুদ্ধিকে অধিকার করে, জীর্ণ দেহে রোগের মতো, তাদের পেয়ে বসে ভেদবুদ্ধি; কাছের লোককে তারা দূরে ফেলে, আপনকে করে পর, শ্রদ্ধেয়কে করে অসম্মান, স্বপক্ষকে পিছন থেকে করতে থাকে বলহীন; যোগ্যতার জন্য সম্মানের বেদী স্থাপন করে যখন স্বজাতিকে বিশ্বের দৃষ্টি-সম্মুখে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে মান বাঁচাতে হবে তখন সেই বেদীর ভিত্তিতে ঈর্ষান্বিতের আত্মঘাতক মূঢ়তা নিন্দার ছিদ্র খনন করতে থাকে, নিজের প্রতি বিদ্বেষ করে শত্রুপক্ষের স্পর্ধাকে প্রবল করে তোলে।’’
উদ্ধৃত অংশটি ‘দেশনায়ক’ রূপে পরিচিত রবীন্দ্রনাথের অবিস্মরণীয় ভাষণের অংশবিশেষ যা প্রদত্ত হয়েছিল ১৯শে আগস্ট, ১৯৩৯ সালে মধ্য-কলকাতায় ঐতিহ্যশালী ‘মহাজাতি সদন’ (নামটি কবিরই দেওয়া)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে। এই অনুষ্ঠানের মাত্র এক সপ্তাহ পূর্বেই ১২ই আগস্ট (১৯৩৯) ওয়ার্ধায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির এক বৈঠকে সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করে যে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় তা হল: ‘‘গুরুতর-নিয়ম-শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসুকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির সভাপতির পদের অযোগ্য বলিয়া ঘোষণা করা হইল এবং ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাস হইতে তিন বৎসরের জন্য তিনি কোন নির্বাচিত কংগ্রেস কমিটির সদস্য হইতে পারিবেন না।’’
(অনুবাদ দ্রঃ নেপাল মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র, সারস্বত, ১৪০৩, পৃ: ১২৪)
সুভাষচন্দ্রকে এইভাবে একঘরে করার ষড়যন্ত্র রবীন্দ্রনাথের মনঃপীড়ার কারণ হয়েছিল। অসুস্থ সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে বিপক্ষদের হীন আক্রমণের ঘটনায় তাঁর কবিচিত্ত ব্যাকুল ও অস্থির হয়ে ওঠে। তাঁর আশঙ্কা হয়, সুভাষচন্দ্র হয়তো উত্তেজনা ও মানসিক প্রতিক্রিয়ায় পদত্যাগ করে বসতে পারেন। তাই শান্তিনিকেতনে যাওয়ার পূর্বে সুভাষকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়ে তিনি এক পত্র লিখলেন (৩রা এপ্রিল, ১৯৩৯) যা রবীন্দ্রনাথের অসামান্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। কবি এই ঐতিহাসিক পত্রে লিখেছিলেন:
শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু
কল্যাণীয়েসু,
কয়েকদিন কলকাতায় এসে দেশের লোকের মনের ভাব ভালো করে জানবার সুযোগ পেয়েছি। সমস্ত দেশ তোমার প্রত্যাশায় আছে এমন অনুকূল অবসর যদি দ্বিধা করে হারাও তাহলে আর কোনো দিন ফিরে পাবে না। বাংলাদেশ থেকে তুমি যে শক্তি পেতে পার তার থেকে বঞ্চিত হবে, অন্য পক্ষও চিরদিন তোমার শক্তি হরণ করতে থাকবে। এত বড় ভুল কিছুতেই কোরো না। তোমার জন্য বলছিনে, দেশের জন্য বলছি। মহাত্মাজী যাতে শীঘ্রই তাঁর শেষ বক্তব্য তোমাকে জানান দৃঢ়ভাবে সেই দাবী করবে। যদি তিনি গড়িমশি করেন তাহলে সেই কারণ দেখিয়ে তোমরা পদত্যাগ করতে পারবে। তাঁকে বোলো শীঘ্রই তোমাকে ভবিষ্যতের কর্তব্য স্থির করতে হবে, অতএব আর বিলম্ব সইবে না। আশা করি তোমার শরীর সুস্থ হবার দিকে চলেছে। আজই শান্তিনিকেতনে ফিরছি। ইতি—
তোমাদের
(স্বাঃ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(বিশ্বভারতী-র রবীন্দ্র-সদনে রক্ষিত। দ্রঃ নেপাল মজুমদার, পূর্বোক্ত, পৃ: ১১৪)
সুভাষচন্দ্র সেদিন রবীন্দ্রনাথের উপদেশ শুনেছিলেন। প্রায় দুই মাস তিনি বুঝে-শুনেই চলেছিলেন। এরপর কলকাতায় ওয়েলিংটন স্কোয়ারে AICC-র বিশেষ অধিবেশন ২৯শে এপ্রিল, ১৯৩৯ বসে। তার দুই দিন আগে কলকাতায় গান্ধীজীর সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের চার ঘণ্টা ধরে এক নিভৃত আলোচনা হয়। কিন্তু আপস-মীমাংসা কিছু এগুলো না। সুভাষচন্দ্র দক্ষিণপন্থী নেতাদের কাছে শেষ প্রস্তাব রাখেন যে, যদি কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দলের সদস্যদের নিয়ে নতুন ওয়ার্কিং কমিটি গঠনে তারা সম্মত না হন, তবে অন্তত চারজন নতুন বামপন্থী প্রতিনিধিকে ওয়ার্কিং কমিটিতে যেন রাখতে দেওয়া হয়। কিন্তু সর্দার প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ প্রমুখ দক্ষিণপন্থী নেতারা তাতেও রাজি হন না; তাঁরা পুরানো সভ্যদের নিয়েই ওয়ার্কিং কমিটি গঠনের জন্য জেদ ধরে রইলেন। এই পরিস্থিতিতে সুভাষচন্দ্রের সামনে পদত্যাগ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ২৯শে এপ্রিল সভা শুরু হলে তিনি পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। অত্যন্ত তাড়াহুড়োর মধ্যে সুভাষচন্দ্রের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয় এবং তাঁর জায়গায় রাজেন্দ্রপ্রসাদ সভাপতি নির্বাচিত হন।
গবেষক নেপাল মজুমদার লিখেছেন, কলকাতায় সেদিন কী ভয়ঙ্কর উত্তেজনা! বাইরে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের চারপাশে অপেক্ষমাণ বিপুল জনতা ক্রোধ ও উত্তেজনায় চিৎকার ও গর্জন করে বিক্ষোভ জানাতে থাকে। সুভাষচন্দ্র স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় নেতাদের একে একে উত্তেজিত জনতার মধ্য দিয়ে পথ করে তাঁদের মোটরে উঠিয়ে দেন।
রবীন্দ্রনাথ তখন পুরীভ্রমণে। সুভাষচন্দ্রের পদত্যাগের বিবৃতি পাঠ করে বিচলিত হলেও কবি সুভাষচন্দ্রের ব্যবহারিক বিচক্ষণতার ভূয়সী প্রশংসা করে এক তারবার্তা পাঠান। এতে তিনি বলেন, ‘‘অত্যন্ত বিরক্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়িয়াও তুমি যে ধৈর্য ও মর্যাদাবোধের পরিচয় দিয়াছ তাহাতে তোমার নেতৃত্বের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের উদ্রেক হইয়াছে। আত্মসম্মান রক্ষার জন্য বাংলাকে এখনও সম্পূর্ণরূপে ধীরতা ভদ্রতাবোধ অব্যাহত রাখিতে হইবে; তাহা হইলেই আপাতদৃষ্টিতে যাহা তোমার পরাজয় বলিয়া মনে হইতেছে তাহাই চিরন্তন জয়ে পরিণত হইবে।’’
(দ্রঃ নেপাল মজুমদার, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১১৬-১১৭)
কবি-বাণী বৃথা যায়নি। এর পরে সুভাষচন্দ্রের জীবন যে পথে অগ্রসর হয়েছিল তা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস তাঁকে ‘নেতাজী’ রূপে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি নিছক বাঙালী নেতা-মাত্র ছিলেন না। কালক্রমে হয়ে উঠেছিলেন ‘দেশনায়ক’, জাতীয় নেতা। এক মহাজাতি গঠনের প্রয়াস তাঁকে স্বতন্ত্রতা দিয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আজাদ হিন্দ সরকার ও বাহিনীর মধ্যে ভাষা-ধর্ম-বর্ণ-প্রদেশ নির্বিশেষে ভারতীয়দের যে মহান-ঐক্য আত্মপ্রকাশ করেছিল তা এককথায় অতুলনীয়। সন্দেহ নেই কলকাতায় ‘মহাজাতি সদন’ প্রতিষ্ঠা ছিল এরই সূচনা।
মহাজাতি সদন প্রতিষ্ঠা ছিল সুভাষচন্দ্রের বহুদিনকার এক স্বপ্ন। সুভাষচন্দ্রের পদত্যাগের পর কংগ্রেসের বামপন্থী অনুগামীরা ৪ঠা মে (১৯৩৯) কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে এক জনসভায় সুভাষচন্দ্রের হাতে আন্দোলন পরিচালনার জন্য এক লক্ষ টাকা তুলে দেন। গঠিত হয় ‘সুভাষ ধনভাণ্ডার কমিটি’। এই অর্থ দিয়ে সুভাষচন্দ্র মধ্য-কলকাতায় একটি ‘কংগ্রেস ভবন’ গঠনের প্রস্তাব দেন। কলকাতা পৌরসভা থেকে জমি সংগ্রহ করা হয়। রবীন্দ্রনাথকেও সুভাষচন্দ্র তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান। কবি শুধু এতে প্রবল আগ্রহই দেখাননি জাতীয়-স্মারক রূপে এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সুভাষচন্দ্রের আহ্বানে সানন্দ সম্মতিই দেন। ফলে ‘মহাজাতি সদন’ বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দলের অফিস না হয়ে চিহ্নিত হয়ে ওঠে বাংলায় জাতীয় জাগরণের ও ভারতব্যাপী সুভাষচন্দ্র বসুর ও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের ভারত-তীর্থে। এই সদন তাই কোন মামুলি গৃহমাত্র নয়, এই ভবনের তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা ঐতিহাসিক।
মহাজাতি সদন-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সেই অনুষ্ঠানে সুভাষচন্দ্রও এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন: ‘‘আজ ভারতের রাষ্ট্রীয় গগন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে। আমরাও ইতিহাসের এমন এক চৌমাথায় গিয়ে পড়েছি যেখান থেকে বিভিন্ন দিকে পথ বেরিয়ে গেছে। এখন আমাদের সম্মুখে সমস্যা এই, যে নিয়মতান্ত্রিকতার পথ আমরা ১৯২০ খৃষ্টাব্দে বর্জন করেছিলাম পুনরায় কি সেই পথে ফিরে যাবো? অথবা আমরা কি গণ-আন্দোলনের পথে অগ্রসর হয়ে গণ-সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হব? আমি শুধু এই কথা বলতে চাই যে, নবজাগ্রত ভারতীয় মহাজাতি স্বাবলম্বন, গণ-আন্দোলন এবং গণ-সংগ্রামের পন্থা কিছুতেই পরিত্যাগ করবে না।’’
(দ্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩রা ভাদ্র, ১৩৪৬; ২০ আগস্ট, ১৯৩৯)
দেশের শৃঙ্খলমোচনে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু-র পরবর্তীকালের (১৯৪০-৪৫) কঠোর সাধনা তাঁর বাণীর সত্যতা প্রমাণ করেছিল। যেদিন কলকাতায় সাম্রাজ্যবাদের স্মারক হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলন শুরুর ডাক তিনি দেন, তার আগের দিনে ২রা জুলাই (১৯৪০) মঙ্গলবার, সকাল ১১টার সময় সুভাষচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এটাই তাঁদের মধ্যে শেষ কথোপকথন। এই সাক্ষাৎকারের মাত্র দু-তিন ঘণ্টা পরে, বেলা আড়াইটা নাগাদ গোয়েন্দা বিভাগের ডেপুটি কমিশনার এলগিন রোডের বাড়িতে গিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে ভারতরক্ষা আইনের ১২৯ ধারা মতে গ্রেপ্তার করে প্রেসিডেন্সি জেলে প্রেরণ করে। মর্মাহত চিত্তে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন থেকে এই নিন্দনীয় ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রেস-বিবৃতি দিয়ে সুভাষচন্দ্রের পক্ষ সমর্থন করেছিলেন।
মহাজাতি সদনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের ভাষণের শেষ কথাগুলি ছিল:
‘‘সেই সঙ্গে এ কথা যোগ করা হোক — বাঙালির বাহু ভারতের বাহুকে বল দিক, বাঙ্গালির বাণী ভারতের বাণীকে সত্য করুক, ভারতের মুক্তি সাধনায় বাঙালি স্বৈরবুদ্ধিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো কারণেই নিজেকে অকৃতার্থ যেন না করে।’’
সুভাষচন্দ্র বসু রবীন্দ্র-অভিপ্রায়কে তাঁর নিঃস্বার্থ আত্ম-নিবেদনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করেছিলেন।
‘দেশনায়ক’ সুভাষ চন্দ্র বসু-র ১২৮তম জন্মদিবসে বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য...🙏💐🙏🏼
সংগৃহীত।