22/05/2026
ভদ্রবাহুর জন্মস্থান—এই ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠায় বরেণ্য ঐতিহাসিক অধ্যাপক হিমাংশু কুমার সরকারের গবেষণা এক অনন্য কীর্তি।
জৈনধর্মের ইতিহাসে ‘ভদ্রবাহু’ নামটি এক মহিমান্বিত অধ্যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়—দুই ভিন্ন যুগের দুই ভদ্রবাহুকে একই ব্যক্তি বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। একজন ছিলেন জৈনদের সর্বশেষ শ্রুতকেবলী, অপরজন ছিলেন ‘কল্পসূত্র’-এর প্রণেতা এবং মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য-এর সমসাময়িক। এই ঐতিহাসিক বিভ্রান্তির আবরণ ভেদ করে উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সত্য উন্মোচন করেছেন বরেণ্য ঐতিহাসিক অধ্যাপক হিমাংশু কুমার সরকার। তাঁর গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, জৈনদের সর্বশেষ শ্রুতকেবলী ভদ্রবাহুর জন্মভূমি ছিল বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর অঞ্চলের প্রাচীন দেবকোট বা কোটিবর্ষ।
অধ্যাপক হিমাংশু কুমার সরকারের এই আবিষ্কার উত্তরবঙ্গের ইতিহাসচর্চায় এক অনন্য সংযোজন। দীর্ঘকাল ধরে বহু ঐতিহাসিক ভদ্রবাহুর জন্মস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলেও তিনি প্রাচীন জৈন সাহিত্য, শিলালিপি, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং ভূগোল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন পৌণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত কোট্টপুর বা দেবকোট্টই ছিল ভদ্রবাহুর জন্মস্থান। বর্তমান গঙ্গারামপুর থানার বাণগড় সংলগ্ন পুনর্ভবা নদীতীরবর্তী অঞ্চলই সেই ঐতিহাসিক দেবকোট। মধ্যযুগেও এই অঞ্চল ‘দেবকোট’ নামে সুপরিচিত ছিল এবং মোঘল আমলে এখানে গঠিত হয়েছিল দেবকোট পরগনা।
জৈনাচার্য হরিষেণ রচিত ‘বৃহৎ কথাকোষ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে—পৌণ্ড্রবর্ধন দেশে অবস্থিত কোটিপুর নামে এক নগর পরবর্তীকালে দেবকোট্ট নামে পরিচিত হয়। সেই নগরের রাজা ছিলেন পদ্মরথ এবং তাঁর আশ্রিত ব্রাহ্মণ সোমশর্মার গৃহেই জন্মগ্রহণ করেন ভদ্রবাহু। আবার পঞ্চদশ শতকের জৈনাচার্য রত্ননন্দী তাঁর ‘ভদ্রবাহু চরিত্র’ গ্রন্থে দেবকোট নগরের শোভা-বৈভবের বিস্ময়কর বর্ণনা দিয়েছেন। সুবিশাল অট্টালিকা, প্রাকার, পরিখা ও তোরণে সমৃদ্ধ এই নগরকে তিনি তুলনা করেছেন স্বর্ণখণ্ডের সঙ্গে।
এই দুই প্রাচীন গ্রন্থের তুলনামূলক পাঠ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে অধ্যাপক হিমাংশু কুমার সরকার যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর অঞ্চল শুধু একটি প্রাচীন নগরকেন্দ্রই ছিল না; এটি ছিল উত্তরবঙ্গের জ্ঞানচর্চা, ধর্মচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
জৈন কাহিনি অনুসারে, জৈন সম্প্রদায়ের তৎকালীন নেতা গোবর্ধনাচার্য একদা পাঁচশত জৈন সন্ন্যাসীসহ দেবকোট নগর অতিক্রম করছিলেন। সেই সময় পুরোহিত-পুত্র ভদ্রবাহুর সদ্য উপনয়ন সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি অন্যান্য বালকদের সঙ্গে নগরপ্রান্তে খেলায় মগ্ন ছিলেন। গোবর্ধনাচার্যের দৃষ্টি পড়ে এই অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন বালকের উপর। তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের পর তিনি উপলব্ধি করেন যে, এই বালকের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এক মহাপুরুষের লক্ষণ। পরে পিতা সোমশর্মার সম্মতিতে ভদ্রবাহুকে সঙ্গে নিয়ে যান তিনি।
পরবর্তীকালে জৈন দর্শন, তপস্যা ও জ্ঞানচর্চায় অসামান্য কৃতিত্ব অর্জন করে ভদ্রবাহু জৈন সমাজের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন। তিনি খ্যাতি অর্জন করেন পঞ্চম তথা সর্বশেষ শ্রুতকেবলী হিসেবে—অর্থাৎ তিনিই ছিলেন সেই শেষ জৈন আচার্য যাঁর আয়ত্তে ছিল সমস্ত অঙ্গশাস্ত্র। তাঁর রচিত নির্যুক্তিগুলির মধ্যে আবশ্যক সূত্র, উত্তরাধ্যয়ন সূত্র, দশ বৈকালিক সূত্র, ব্যবহার সূত্র ও সূর্যপ্রজ্ঞপ্তি সূত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফলে তিনি কেবল ধর্মীয় নেতা নন, ভারতীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যেরও এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।
অপরদিকে, অপেক্ষাকৃত পরবর্তী যুগের আরেক ভদ্রবাহু ছিলেন ‘কল্পসূত্র’-এর প্রণেতা। তিনি মৌর্য যুগের মানুষ এবং সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য-এর সমসাময়িক। উত্তর ভারতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তাঁর নেতৃত্বেই জৈন সম্প্রদায়ের একাংশ দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকে গমন করে। ইতিহাসের এই দুই ভদ্রবাহুকে একত্রে বিবেচনা করার ফলেই বহু বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। অধ্যাপক হিমাংশু কুমার সরকারের গবেষণা এই বিভ্রান্তি নিরসনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
‘কল্পসূত্র’-এ উল্লিখিত গোদাসগণীয় শাখাগুলির মধ্যে তাম্রলিপ্তিকা, কোটিবর্ষীয়া, পৌণ্ড্রবর্ধনীয়া এবং দাসী খর্বটিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে কোটিবর্ষ ও পৌণ্ড্রবর্ধন উভয়ই উত্তরবঙ্গের ভূখণ্ড। ফলে স্পষ্ট হয় যে, খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই উত্তরবঙ্গে জৈনধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ড. নীহার রঞ্জন রায় -ও মত প্রকাশ করেছিলেন যে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর মধ্যেই এই জৈন শাখাগুলি সুসংগঠিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে।
অতএব, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর তথা প্রাচীন দেবকোট যে জৈনধর্মের ইতিহাসে এক অসামান্য তীর্থভূমি এবং সর্বশেষ শ্রুতকেবলী ভদ্রবাহুর জন্মস্থান—এই ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠায় অধ্যাপক হিমাংশু কুমার সরকারের গবেষণা এক অনন্য কীর্তি। তাঁর আবিষ্কার শুধু উত্তরবঙ্গের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেনি, সমগ্র ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের ইতিহাসেও যুক্ত করেছে এক নতুন আলোকবর্তিকা।
#অধ্যাপক_হিমাংশু_কুমার_সরকার #ভদ্রবাহু
#শ্রুতকেবলী_ভদ্রবাহু
#দেবকোট
#কোটিবর্ষ
#গঙ্গারামপুর
#দক্ষিণ_দিনাজপুর
#পৌণ্ড্রবর্ধন
#উত্তরবঙ্গের_ইতিহাস
#জৈনধর্ম
#জৈন_ইতিহাস
#হিমাংশু_কুমার_সরকার
#অধ্যাপক_হিমাংশু_কুমার_সরকার
#বাংলার_ঐতিহ্য
#প্রাচীন_বাংলা
#বাণগড়
#বরেন্দ্রভূমি
#ভারতের_ইতিহাস
#ঐতিহাসিক_আবিষ্কার
#বাংলার_গৌরব
#ঐতিহ্যের_সন্ধানে