25/05/2026
অন্তরঙ্গ বইমেলা: প্রযুক্তির যুগে এক অপরিহার্য সাংস্কৃতিক আশ্রয়।
অয়ন মুখোপাধ্যায়
ডিজিটাল স্ক্রিন আর সস্তা ডেটার এই রমরমা বাজারে, যেখানে সবার আঙুলের ডগায় আস্ত একটা লাইব্রেরি ঘুরছে, সেখানে আমি ‘অন্তরঙ্গ বইমেলা’ (Intimate Book Fair) ধারণাকে কেবল একটি বিকল্প আয়োজন নয়, বরং অত্যন্ত জরুরি একটি সামাজিক প্রয়োজন বলে মনে করি। আমার কাছে এর মূল ফোকাস হলো—বিশাল মাঠের হইচই আর বাণিজ্যিক জাঁকজমককে সরিয়ে রেখে পাঠক, লেখক এবং বইয়ের মধ্যে একটা নিবিড়, আন্তরিক যোগাযোগ তৈরি করা। আর এই উদ্দেশ্যকে সফল করতে আমাদের গুপ্তিপাড়া, সোমরা, বেহুলা, জিরাট, বলাগড়, খামারগাছি, ডুমুরদহ, ইনচুরা, একতারপুর, বাকুলিয়া থেকে ধোপাপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই বৃহৎ এলাকার মানুষকে এক সুতোয় সঙ্ঘবদ্ধ করতে হবে। এই বিস্তীর্ণ মাটির বুকে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে এমন একটা উদ্যোগ কেন প্রয়োজন এবং মোবাইল ইন্টারনেটের যুগেও এর লাভজনক ও স্বনির্ভর মডেলটা ঠিক কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আমার কিছু সুনির্দিষ্ট ভাবনা রয়েছে।
১. অন্তরঙ্গ বইমেলা আসলে কী: আমার উপলব্ধি
আমি বড় শহরের মেগা বইমেলা গুলো কে প্রায়শই 'ফুড ফেস্টিভ্যাল' বা স্রেফ বৈকালিক ভ্রমণের জায়গায় পরিণত হতে দেখেছি ।তার বিপরীতে আমার ভাবনায় অন্তরঙ্গ বইমেলা হলো একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক, ছোট এবং নিবিড় আয়োজন। এখানে স্টলের সংখ্যা আমি সীমিত রাখতে চাই, যাতে বইয়ের নির্বাচন হয় চমৎকার। পাঠক ও লেখকের দূরত্ব মুছে দিয়ে খোলামেলা আড্ডা, মুখোমুখি সাহিত্যচর্চা এবং সৃজনশীল ওয়ার্কশপকে আমি এই মেলার মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করি। এটি মূলত আমাদের এই সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের নিজস্ব একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
২. এই মুহূর্তে আমাদের এই অঞ্চলে আমি কেন এর প্রয়োজন দেখছি
গুপ্তিপাড়া, সোমরা, বেহুলা, জিরাট, বলাগড়, খামারগাছি, ডুমুরদহ, ইনচুরা, একতারপুর, বাকুলিয়া ও ধোপাপাড়াকে আমি শুধু কিছু ভৌগোলিক নাম হিসেবে দেখি না; এই সমগ্র এলাকাটি আমার কাছে নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটা শক্ত ঘাঁটি। এই মুহূর্তে এখানে এই মেলা দরকার বলে আমি বিশ্বাস করি কারণ:
স্থানীয় মেধার বিকাশ ও সেতুবন্ধন: আমি চাই আমাদের এই অঞ্চলের প্রতিটি কোণে লুকিয়ে থাকা কবি, লেখক, গবেষক এবং লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের কাজ সরাসরি সাধারণ মানুষের সামনে আসুক। এই মেলা সেই সঙ্ঘবদ্ধ মঞ্চ তৈরি করবে।
ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন: এই অঞ্চলের নৌকা তৈরির শিল্প, প্রাচীন ইতিহাস বা লোক সংস্কৃতি নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের নথিপত্র ও বইপত্রকে এক ছাদের তলায় এনে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমার অন্যতম লক্ষ্য।
বিকল্প সাংস্কৃতিক স্পেস: বড় শহরের কেন্দ্রিকতা ভেঙে মফস্বলের বুকেই একটা সুস্থ, রুচিশীল এবং নিয়মিত সাহিত্যচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে এই মডেল দারুণ কাজ করবে বলে আমি আশাবাদী।
৩. মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে অন্তরঙ্গ বইমেলার এর প্রাসঙ্গিকতা যেখানে খুঁজে পাই।
আমার মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে—ফোনে যখন পিডিএফ বা ই-বুক পড়া যাচ্ছে, তখন মানুষ কেন আসবে?
তবে আমার অভিজ্ঞতা বলে:
ডিজিটাল ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে আমি দেখছি মানুষ এখন সারাদিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত। কাগজের গন্ধ, বইয়ের পাতা ওল্টানোর স্পর্শ আর অফলাইন আড্ডার যে মানবিক ছোঁয়া, তা কোনো অ্যালগরিদম দিতে পারে না বলেই আমার বিশ্বাস।
ভার্চুয়াল বনাম বাস্তব সংযোগ:
ইন্টারনেটে যোগাযোগ বাড়লেও একাকীত্ব বাড়ছে। আমি চাই অন্তরঙ্গ বইমেলা আমাদের এই বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষকে ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বের করে এনে সমমনোভাবাপন্ন মানুষের সাথে সামনাসামনি বসার সুযোগ করে দিক।
অভিজ্ঞতা সঞ্চয়: আমি মনে করি মানুষ এখন শুধু বই কিনতে আসে না, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে আসে। মেলায় এসে কোনো লেখকের মুখে তার সৃষ্টির পেছনের গল্প শোনা—এই অভিজ্ঞতাটাকে আমি ইউটিউব বা ফেসবুক লাইভের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো বলে মনে করি।
৪. এই মডেলটা কিন্তু লাভজনক হতে পারে
বড় মেলার মতো বিশাল পরিকাঠামো খরচ না থাকায়, এই ছোট মাপের 'কমিউনিটি মেলা' অত্যন্ত টেকসই এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে বলে আমার ধারণা:
কম পরিচালন ব্যয়: বড় মাঠ ভাড়া বা বিশাল লাইটিং-এর খরচ রাখব না। কোনো স্থানীয় স্কুল প্রাঙ্গণ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা ক্যাফে-স্টাইলের খোলামেলা জায়গায় এটি করা সম্ভব। ফলে প্রাথমিক খরচ খুব কম থাকবে।
টার্গেটেড অডিয়েন্স ও নিশ্চিত বিক্রি:
আমি জানি এখানে ভিড় কম হলেও যারা আসবেন, তারা প্রত্যেকেই 'সিরিয়াস পাঠক'। ফলে ফুড স্টল কম হলেও বই বিক্রির হার অনেক বেশি থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।
সহযোগী উপার্জনের উৎস:
বইয়ের সাথে স্থানীয় চা, কফি বা স্ন্যাকসের স্টল যুক্ত করে একটা চমৎকার আড্ডার পরিবেশ তৈরি করার পরিকল্পনা করা যায়, যা থেকে ভালো রাজস্ব আসবে। পাশাপাশি সৃজনশীল লিখন বা স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে ছোট ছোট পেইড ওয়ার্কশপের আয়োজন করলে বেশ কিছু অর্থ আমরা পাব। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যান্ডগুলো এই ধরনের রুচিশীল উদ্যোগের সাথে নিজেদের নাম জড়াতে সহজেই রাজি হবে বলে মনে হয়।
স্বাধীন প্রকাশকদের সুযোগ:
বড় মেলায় মোটা অঙ্কের স্টল ভাড়া দিতে না পারা স্বাধীন প্রকাশকদের খুব কম খরচে এখানে টেবিল স্পেস দিতে চাই। এতে তাদের বিক্রি বাড়বে এবং মেলা কমিটিরও একটা স্থায়ী আয় হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, গুপ্তিপাড়া থেকে কুন্টিঘাট —এই বৃহৎ অঞ্চলের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই অন্তরঙ্গ বইমেলাকে কেবল একটা বই বিক্রির জায়গা হিসেবে নয় বরং এটিকে; এটিকে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমার মনে হয় ইন্টারনেটের যুগে এটি মানুষের রুচিকে রিফ্রেশ করার একটা দুর্দান্ত অফলাইন আশ্রয় এবং আমার বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনায় এটি একটি অত্যন্ত সফল, লাভজনক ও স্বনির্ভর মডেল হতে পারে।