11/09/2023
বর্ণভেদ প্রথার ফল:
বর্তমানে বহু নেতা মাঠে-ঘাটে বক্তৃতা দেওয়ার সময় বলে থাকেন, রামায়ণ-মহাভারত পুরান বা বেদে বিজ্ঞানের বহু আবিষ্কারের উল্লেখ আছে। উদাহরণ হিসাবে তারা বলেন থাকেন, গণেশের হাতির মাথা সার্জারি নিদর্শন। পুষ্পক রথ উন্নত মানের জেট প্লেন। ইন্টারনেট ছিল তার প্রমাণ হিসেবে বলে থাকেন সঞ্জয়ের যুদ্ধের ধারা বিবরণী। এমন বহু আছে। শুধু হিন্দু ধর্মে নয় মুসলিম ধর্মের ধর্ম গুরুরাও বলে থাকেন, তাদের কোরান থেকেই বিজ্ঞানের তথ্য চুরি করে বিদেশীরা আবিষ্কার করে চলেছেন।
কিন্তু বাস্তবে কি তাই ? আসুন একটু জেনে নেওয়া যাক।
বৈদিক যুগে আর্য ব্রাহ্মণরা ভারতের অন্যান্য মানুষদের অপেক্ষা বেশ উন্নত ছিল। তাই তারা নিজেদের বর্ণশ্রেষ্ঠ মনে করত। আর এই বর্ণ শ্রেষ্টের অহংকারই ভারতবর্ষকে কতটা পিছনে নিয়ে গেছে তার প্রমাণ হিসাবে কিছু লেখা তুলে ধরলাম:
ঐতিহাসিক শ্রী সমরেন্দ্র নাথ সেন লিখেছেন:
" সূত্রযুগে চিকিৎসাবৃত্তি নীচবৃত্তি বলিয়া পরিগণিত ছিল, সূত্রধর, কর্মকার ও অন্যান্য কারিগর সম্প্রদায় পূর্ব মর্যাদা হইতে ভ্রষ্ট। সমাজে এইরূপ উচ্চ-নীচ ভেদের প্রাবল্য, বর্ণশ্রেষ্ট ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্বের অভিমান, নিষ্প্রাণ অনুষ্ঠান, যাগ-যজ্ঞদি ও পশুবলির আধিক্য, বেদের অভ্রান্ততায় অন্ধবিশ্বাস ও তাহার বিরুদ্ধ সমালোচনায় অসহিষ্ণুতা নানাভাবে স্বাধীন চিন্তার পথ রুদ্ধ করিয়াছিল।"
প্রফুল্ল চন্দ্র রায় লিখেছেন:
" মনু ও পরবর্তী সব পুরাণের ঝোঁকটাই হলো পুরোহিত শ্রেণীকে গৌরবান্বিত করার দিকে। তার থেকেই খাড়া করা হল সবচেয়ে উদ্ধত ও উৎকৃষ্ট সব দাবি।
সুশ্রুতের মতে, শল্যবিদ্যার ছাত্রে-র পক্ষে শবব্যবচ্ছেদ না করলেই নয়। এই মহাজ্ঞানী বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ থেকে জ্ঞান অর্জন করার উপর। কিন্তু কিন্তু মনুর কাছে তা অচল। তাঁর মতে, শবদেহের ছোঁয়াটুকুই ব্রাহ্মণের পবিত্র দেহ দূষিত করার পক্ষে যথেষ্ট। তাই বাগভট-র অল্প কিছু পর থেকেই দেখা যায়: শল্য ধরার ব্যাপারে আর উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে না। শরীরস্থান ( এ্যানাটমী ) ও শল্যবিদ্যার চল উঠে গেল, হিন্দুদের কাছে তা কার্যত লুপ্ত বিজ্ঞান হয়ে দাঁড়ালো। সাইক্লোপস্ ( গ্রীক পুরাণের একচক্ষু দৈত্য ) এর মতো হাপরের সামনে ঘেমে চলাকে মনে করা হতো সমান মানহানিকর।
কারু কর্মকে পাঠিয়ে দেওয়া হল নিচু জাতের কাছে। পেশাগুলোকে করে দেওয়া হল বংশগত। কিন্তু তার দাম দিতে হয়েছিল মারাত্মক। সমাজের মননশীল অংশকে সরিয়ে নেয়া হলো কারুকর্মে সক্রিয়ভাবে যোগ দেওয়ার থেকে। এভাবেই অনুসন্ধানের মতিই ধীরে ধীরে মরে গেল সেই জাতির মধ্যে। যে জাতির স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল অনুধ্যান আর অধিবিদ্যার সূক্ষ্মতার দিকে। পরীক্ষামূলক ও আরোহী বিজ্ঞানের শাখাগুলোকে ভারত এবার বিদায় জানালো। বয়েল, দেকার্ত বা নিউটনের জন্মের পক্ষে তার মাটি হয়ে উঠল নৈতিকভাবে অনুপোযোগী। তার নাম টুকু প্রায় মুছে গেল বিজ্ঞান জগতের মানচিত্র থেকে।"
মেঘনাথ সাহা লিখেছেন:
"আমি বিগত কুড়ি বছর যাবত বেদ-পুরান তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বর্তমান বিজ্ঞানের কোন তথ্য খুঁজে পাইনি।"
শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন:
"কোন এক ইংরেজ বলেছিলেন,
" তোমরা আমাদিগকে কোনদিন তাড়াইতে পারবে না। তোমাদের শক্তি নাই তাহা নয়। তোমাদের বড় বাধা হইল জাতিভেদ প্রথা। এই প্রথা যতদিন বাঁচিয়ে থাকিবে, আমাদিগকে এ-দেশ হইতে তাড়ায় কাহার সাধ্য ?
বাস্তবিক এই জাতিভেদ প্রথা ভারতীয় জাতি সকলের মধ্যে আত্মীয়তা সমদুঃখসুখতা বর্ধিত হইতে দেয় নাই। এই কারণেই ভারতবাসীগন এত দুর্বল।
জাতিভেদের দ্বিতীয় অনিষ্ট ফল এই হইয়াছে যে, এতদ্দ্বারা কায়িক শ্রমসাধ্য কার্যকে নিকৃষ্ট ও লোকের চক্ষে হেয়
করিয়াছে। এ-দেশে কায়িক শ্রম চিরদিন হীনজাতিরাই করিয়া আসিয়াছে। ব্রাহ্মণ প্রভৃতি উৎকৃষ্ট বর্ণরা যে সকল কার্যকে তাঁহাদের অযোগ্যবোধে পরিত্যাগ করিয়াছেন। দেশে এই প্রচার চিরদিন প্রচলিত থাকাতে কায়িক শ্রমের প্রতি ভদ্রলোকের ঘৃণা বদ্ধমূল হইয়াছে। এই কারনে দেখিতে পাই এদেশে শিক্ষা বা অন্য কোন কারণে যাহারই অবস্থা একটু ভালো হয় সে এবং তাহার পুত্র পৌত্রগণ অমনি কায়িক শ্রমকে ঘৃণিত বলিয়া অনুভব করিতে থাকে। এই ব্যাধি এতদুর পর্যন্ত প্রবল যে, একজন ব্রাহ্মণ বা কায়স্তের সন্তান অর্থাভাবে সপরিবারে অর্ধাশনে থাকিবে অথচ কোন প্রকার কায়িক শ্রমের দ্বারা অর্থোপার্জন করিবে না। ব্রাহ্মণদিগের তো কথাই নাই, কোন ব্রাহ্মণ ভিখারিকে যদি তিরস্কার করা যায়, সে বলে, মহাশয়! ব্রাহ্মণের সন্তান খাটিয়াও খাইতে পারিনা সুতরাং ভিক্ষা করিয়া খাইতে হয়। ভিক্ষাতে ব্রাহ্মণের লজ্জা কি! কি ভয়ানক, যে দেশে মনুষ্যচিত কায়িক শ্রম অপেক্ষা ভিক্ষা প্রশংসার বিষয়, সে দেশকে দুর্গতি হইতে রক্ষা করে কার সাধ্য।"