05/07/2025
আল-হুজ্জাত পত্রিকা (অনলাইন সংস্করণ)র মুহররম সংখ্যা থেকে:
*আযাদারী:আদব ও নিয়মাবলী*
-মাওলানা কবির আলী তরফদার কুম্মী
ইমাম রেযা (আ.) বলেন:
"يَا ابْنَ شَبِيبٍ! إِنْ سَرَّكَ أَنْ تَكُونَ مَعَنَا فِي الدَّرَجَاتِ الْعُلَى مِنَ الْجِنَانِ، فَاحْزَنْ لِحُزْنِنَا، وَافْرَحْ لِفَرَحِنَا، وَعَلَيْكَ بِوِلَايَتِنَا، فَلَوْ أَنَّ رَجُلًا تَوَلَّى حَجَراً لَحَشَرَهُ اللَّهُ مَعَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ."
“হে ইবনে শাবীব! যদি তুমি আমাদের সঙ্গে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে চাও, তবে আমাদের জন্য দুঃখ করো, আমাদের আনন্দে আনন্দিত হও এবং আমাদের বন্ধুত্ব গ্রহণ করো। কারণ কেউ যদি একটি পাথরকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন তার সাথেই হাশর করবেন।”
(উয়ুন আখবার আল রেযা,শায়খ সাদূক, খণ্ড ১, হাদিস ৪৪)
*ভূমিকা:*
ইসলামে ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদাত ও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি ঈমান, ত্যাগ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকার এক চিরন্তন দর্শন। আশুরার দিনে শোক পালন, কালো পোশাক পরিধান, জিয়ারত পাঠ, সমবেদনা জানানো এবং অন্যান্য আমল শুধু রীতিনীতি নয় এগুলো হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহ ও আহলে বাইত (আ.) এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ। এই লেখায় আশুরার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল ও আদবসমূহ কুরআন-হাদিস ও ইমামগণের বাণীর আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে আমরা এই পবিত্র দিনটিকে যথার্থভাবে ইবাদত ও শোকার্তচিত্তে পালন করতে পারি।
১. *কালো পোশাক পরিধান করা:*
ফিকহি দৃষ্টিকোণে কালো পোশাক পরিধান করা মাকরুহ, কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) ও অন্যান্য মাসুম ইমামগণের (আ.) শোক পালনের ক্ষেত্রে এটি একটি ব্যতিক্রম। কারণ এটি শোক ও দুঃখের প্রকাশ এবং ইসলামী চেতনা ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন।
২. *সমবেদনা প্রকাশ:*
ইসলামে কারো ওপর কোনো দুঃখ-মুসিবত আসলে, তাকে সমবেদনা জানানো মুস্তাহাব।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো মুসিবতগ্রস্তকে সমবেদনা জানায়, সে তার সমান সওয়াব পাবে।"
(সাফিনাতুল বিহার, খণ্ড ২, পৃ. ১৮৮)
শিয়াদের মধ্যে এই সুন্নাত প্রচলিত, এবং তারা পরস্পরকে "أَعْظَمَ اللهُ أُجُورَكُمْ" (আল্লাহ তোমাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করুন) বলে সমবেদনা জানায়।
ইমাম বাকির (আ.) বলেন:
"যখন শিয়ারা একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন তারা ইমাম হুসাইন (আ.) এর মুসিবতে এই দোয়া পাঠ করবে:
''أَعْظَمَ اللهُ أُجُورَنَا بِمُصَابِنَا بِالْحُسَيْنِ (ع) وَجَعَلَنَا وَإِيَّاكُمْ مِنَ الطَّالِبِينَ بِثَارِهِ مَعَ وَلِيِّهِ الْإِمَامِ الْمَهْدِيِّ مِنْ آلِ مُحَمَّدٍ (ع)"
"আল্লাহ আমাদের ইমাম হুসাইন (আ.) এর শোকে আমাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করুন এবং আমাদের ও আপনাদেরকে তাঁর রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারী হিসেবে তাঁর ওলী ইমাম মাহদী (আ.) এর সাথে মিলিত করুন।"
(মুসতাদরাকুল ওয়াসাইল, খণ্ড ২, পৃ. ২১৬)
৩. *আশুরার দিনে কাজ বন্ধ রাখা:*
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি আশুরার দিনে কাজ বন্ধ রাখে অর্থাৎ জীবিকা অর্জনের জন্য বের হয় না এবং বনি উমাইয়াদের চক্ষুশূল হওয়ার জন্য (যারা আশুরাকে পবিত্র দিন মনে করত) যদি কেউ তার দৈনন্দিন জীবিকা অর্জনেও ব্যস্ত না হয়, তাহলে আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবেন। আর যে ব্যক্তি আশুরার দিনকে শোক ও দুঃখের দিন হিসেবে পালন করে, কিয়ামতের দিন যখন সবার জন্য ভয় ও আতঙ্কের দিন হবে, সেদিন তার জন্য হবে আনন্দের দিন।"
(আমালী শেখ সাদুক, পৃ. ১২৯)
৪. *জিয়ারত পাঠ*:
আলকামা ইবনে হাজরামী (রা.) ইমাম বাকির (আ.) কে বললেন:
"আমাকে এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দিন, যা আমি আশুরার দিনে ঘরে বসে বা দূর থেকে পাঠ করতে পারি।"
ইমাম (আ.) বললেন:
"হে আলকামা! যখনই তুমি ইচ্ছা করবে, দুই রাকাত নামাজ পড়ে এই জিয়ারত (জিয়ারতে আশুরা) পাঠ করবে।"
ইমাম আরও বললেন:
"যদি তুমি এই জিয়ারত পাঠ করো, তাহলে ফেরেশতারা হুসাইন (আ.) এর জিয়ারতকারীর জন্য যে দোয়া করে, তুমিও তা পাবে। আল্লাহ তোমার জন্য এক লাখ মর্যাদা লিখে দেবেন এবং তুমি এমন হবে যেন হুসাইন (আ.) এর সাথে শাহাদাত বরণ করেছ, যাতে তুমি তাদের মর্যাদায় শরীক হতে পার। তুমি শুধুমাত্র সেই শহীদদের মধ্যে গণ্য হবে, যারা তার সাথে শাহাদাত বরণ করেছে। আর প্রত্যেক নবী ও রাসূলের জিয়ারতের সওয়াব এবং হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের পর থেকে যারা তাকে জিয়ারত করেছে, তাদের সওয়াবও তোমাকে দেওয়া হবে।"
(মিসবাহুল মুতাহাজ্জিদ, পৃ. ৭১৪)
যদি সম্ভব হয়, বিখ্যাত জিয়ারতে আশুরা (১০০ লা‘নত ও ১০০ সালাম সহ) পড়ুন। যদি সময় না থাকে, তবে অপ্রচলিত জিয়ারতে আশুরা (যা মুফাতীহুল জানান-এ আছে) পড়ুন, যার সওয়াব একই।
৫. *ক্রন্দন করা :*
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা হযরত মূসা (আ.) কে বলেন:
"হে মূসা! যে বান্দা মুস্তাফার (সা.) সন্তানের শাহাদাতের দিন (আশুরা) কাঁদবে বা কান্নার ভান করবে এবং নবীর নাতির শোকে শোক প্রকাশ করবে, আমি তাকে জান্নাতে স্থান দেব।"
(মুসতাদরাক সাফিনাতুল বিহার, খণ্ড ৭, পৃ. ২৩৫)
৬. *শোক মজলিসের আয়োজন:*
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"আমি তোমাদের মজলিসকে ভালোবাসি। তোমরা তোমাদের মজলিসে আমাদের বিষয়কে (আমাদের পথ ও আদর্শ) জীবিত রাখো। আল্লাহ তার উপর রহম করুন, যে আমাদের বিষয়কে জীবিত রাখে।"
(ওয়াসাইলুশ শিয়া, খণ্ড ১০, পৃ. ২৩৫)
৭. *আশুরার দিনে যোহরের জামাত নামাজ:*
সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.) ও তার অনুসারীরা নামাজের পথে শাহাদাত বরণ করেছেন। তাই জিয়ারতে মুলকা-তে আমরা তাকে লক্ষ্য করে বলি:
"আশহাদু আন্নাকা কাদ আকামতাস সালাত..."
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নামাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যাকাত দিয়েছেন, ভালো কাজের আদেশ দিয়েছেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেছেন।"
৮. *স্বাদ-আনন্দ থেকে বিরত থাকা:*
জীবনের কিছু স্বাদ যেমন খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো এবং আনন্দদায়ক কথা বলা ত্যাগ করতে হবে (যদি না প্রয়োজন হয়)। ধর্মীয় ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ বন্ধ রাখতে হবে এবং এই দিনটিকে কান্না ও শোকের দিন হিসেবে পালন করতে হবে, যেন কারো পিতা বা সন্তান মারা গেছে।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
"আশুরার দিনে আনন্দের কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং শোকের রীতি পালন করতে হবে। সূর্য ঢলে না যাওয়া পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে, তারপর শোককারীদের মতো সাধারণ খাবার খেতে হবে।"
(মীযানুল হিকমাহ, খণ্ড ৮, পৃ. ৩৭৮৩)
৯. *ইখলাসের(একনিষ্ঠতা) প্রতি যত্নবান হওয়া:*
শোক পালনকে শুধুমাত্র রেওয়াজ বা অভ্যাস হিসেবে করবেন না, বরং সঠিক নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন এবং ইখলাসের ক্ষেত্রে সত্যবাদী হোন। কারণ, ছোট আমল যদি ইখলাসের সাথে হয়, তা অনেক বড় আমল থেকেও উত্তম,এমনকি যদি তা হাজার গুণ বেশি হয়। হযরত আদম (আ.) ও শয়তানের ইবাদত থেকে এটি বোঝা যায়। শয়তানের হাজার বছরের ইবাদত তাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারেনি, কিন্তু হযরত আদম (আ.) এর একটি তওবা তার ভুলকে মাফ ও মর্যাদা ফিরে পেতে সহায়ক হয়েছিল।
আমল করার সময়ও সতর্ক থাকুন, যেন মানুষের প্রশংসা পাওয়ার লোভ বা রিয়া(লোক দেখানো) আপনার নিয়তে প্রবেশ না করে।
১০. *জিয়ারতে তাসলিয়াত পাঠ*:
আশুরার দিনের শেষে জিয়ারতে তাসলিয়াত পড়ুন এবং আশুরার দিনকে সুযোগ হিসেবে নিন। আপনার অবস্থার উন্নতি, শোক গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং আপনার ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
শোক পালনকে শুধুমাত্র রেওয়াজ বা অভ্যাস হিসেবে করবেন না, বরং উত্তম নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন।
(১-৭ সোগনামায়ে আশুরা, পৃ. ৬৭-৮০; ৮-১০ তারিখে মারাকিবাত, পৃ. ৪৭-৫৩)
*উপসংহার*:
আশুরার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদেরকে শুধু শোকই শেখায় না, বরং তা অন্যায়ের মুখে দাঁড়ানোর সাহস, সত্যের পথে অবিচলতা এবং ঈমানের দৃঢ়তা শিক্ষা দেয়। ইমাম হুসাইন (আ.) এর স্মরণে পালিত প্রতিটি আমল, জিয়ারত, কান্না, সমবেদনা বা কাজ বন্ধ রাখা সবই আমাদের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। এই দিনটিকে ইখলাসের সাথে পালন করে আমরা যেমন ইমাম (আ.) এর পথের অনুসারী হতে পারি, তেমনি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কারবালার শিক্ষা বুঝে জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর জহুরের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য দান করুক।