26/09/2025
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : একটি সাধারণ পর্যালোচনা—
অধ্যাপক অশোক সেন মনে করতেন যে, ‘নানা গরমিলে শিক্ষিতজনের আগাপাশতলায় স্ববিরোধের অভাব নেই।’ কথাটি খুবই সত্যি বলে মনে হয়। সেই অশোক সেনই বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘Vidyasagar loved his ego responsibly, conceived of it as a social task, and was greedless in its pursuance; such were his bonafides.’ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘দয়ার সাগর’ নামেও পরিচিত ছিলেন। মধুসূদন দত্ত যে লিখেছিলেন –
"বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু! উজ্জ্বল জগতে
হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে।"
কথাগুলো কবির আবেগ থেকে উচ্চারিত হলেও এর নিহিত সত্যটাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘জ্ঞান ও মনীষার জন্য ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি তিনি তাঁর শিক্ষকদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সাধারণ দেশবাসী তাঁকে আরেকটি উপাধিতে ভূষিত করেছিল। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘দয়ার সাগর’ নামেই পরিচিত।’ এই উপাধি যে নিছকই শুধু উপাধি নয়, সেটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুনীতিকুমার জানিয়েছিলেন, ‘এই একটি উপাধির মধ্য দিয়ে তাঁর চরিত্রের মস্ত বড় একটি দিক উদ্ঘাটিত হয়েছে। একদিকে তিনি সুপণ্ডিত ও শিক্ষাব্রতী, তাঁর যুক্তিবাদী মননের ঔজ্জ্বল্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রত্যেকটি আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর হৃদয় দুঃস্থ মানবতার জন্য করুণায় বিগলিত।’ সেইসঙ্গে বিদ্যাসাগরের অবদানের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তাঁর দেশবাসীর জন্য শিক্ষার ক্ষেত্রে এবং সমাজের উন্নতির জন্য বিশেষত এদেশের নারীদের জন্য তিনি যা করেছিলেন, তার তুলনা নেই।’ শুধু এইটুকুনই বলে ক্ষান্ত হননি সুনীতিবাবু। সেইসঙ্গে এটিও যোগ করে তাঁকে বলতে হয়েছে – ‘বিদ্যাসাগরের একটি মহৎ হৃদয় ছিল, যা আত্মমর্যাদায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল; কখনও কোনো অন্যায়, দম্ভ বা ঔদ্ধত্যের কাছে সে মাথা নমিত হয়নি। এমনকি শাসক ব্রিটিশ রাজপুরুষও তাঁকে অবহেলা করতে পারেনি।’ তার ফলে আমরা দেখতে পাই, সুনীতিবাবুর ভাষায়, ‘তাঁর প্রবল সততার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাহস ও সদিচ্ছা। এইসকল গুণের সমন্বয়ে তাঁর যে প্রবল ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছিল, তাঁকে কেউই কখনও অস্বীকার করতে পারেনি।’কেন অস্বীকার করা যায়নি, সেটির কারণও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। বলেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র ‘একদিকে আদর্শ সন্তান হিসেবে তাঁর জনকজননীর প্রতি শ্রদ্ধায় ও ভালবাসায় যেমন আপ্লুত ছিলেন, অন্যদিকে দীন থেকে দীনতম ব্যক্তির সেবায় তিনি নিজেকে উত্তীর্ণ করে এক নিঃস্বার্থ ব্যক্তিসত্তায় বিরাজ করেছেন। আমাদের ব্যক্তিজীবনে নিঃসন্দেহে তিনি আদর্শ পুরুষ।’ এ-কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বিদ্যাসাগরের এই আদর্শবাদিতার সঙ্গে তাঁর প্রতিভার একটি যোগসূত্র রয়েছে।
২
প্রতিভা’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সবিস্তারে জানিয়েছেন, ‘প্রতিভা মানুষের সমস্তটা নহে, তাহা মানুষের একাংশমাত্র। প্রতিভা মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের মতো; আর, মনুষ্যত্ব চরিত্রের দিবালোক, তাহা সর্বত্রব্যাপী ও স্থির।’ এসবের পাশাপাশি তিনি এটিও মনে করতেন যে, ‘প্রতিভা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ; আর, মনুষ্যত্ব জীবনের সকল মুহূর্তেই সকল কার্যেই আপনাকে ব্যক্ত করিতে থাকে। প্রতিভা অনেক সময়ে বিদ্যুতের ন্যায় আপনার আংশকিতাবশতই লোকচক্ষে তীব্রতররূপে আঘাত করে এবং চরিত্রমহত্ত্ব আপনার ব্যাপকতাগুণেই প্রতিভা অপেক্ষা ম্লানতর বলিয়া প্রতীয়মান হয়। কিন্তু চরিত্রের শ্রেষ্ঠতাই যে যথার্থ শ্রেষ্ঠতা, ভাবিয়া দেখিলে সে বিষয়ে কাহারও সংশয় থাকিতে পারে না।’ এ-বিষয়ে আর যাঁরই হোক রবীন্দ্রনাথের যে কোনো সংশয় ছিল না সেটি তাঁর বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথ এটিও মানতেন যে, ‘এই চরিত্ররচনার প্রতিভা কোনো সাম্প্রদায়িক শাস্ত্র মানিয়া চলে না।’ কেন তা মেনে চলে না – সে-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন, ‘প্রকৃত কবির কবিত্ব যেমন অলংকারশাস্ত্রের অতীত, অথচ বিশ্বহৃদয়ের মধ্যে বিরচিত নিগূঢ়নিহিত এক অলিখিত অলংকারশাস্ত্রের কোনো নিয়মের সহিত তাহার স্বভাবত কোনো বিরোধ হয় না; তেমনি যাঁহারা যথার্থ মনুষ্য তাঁহাদের শাস্ত্র তাঁহাদের অন্তরের মধ্যে, অথচ বিশ্বব্যাপী মনুষ্যত্বের সমস্ত নিত্যবিধানগুলির সঙ্গে সে শাস্ত্র আপনি মিলিয়া যায়। অতএব, অন্যান্য প্রতিভায় যেমন ‘ওরিজিন্যালিটি’ অর্থাৎ অনন্যতন্ত্রতা প্রকাশ পায়, মহচ্চরিত্রবিকাশেও সেইরূপ অনন্যতন্ত্রতার প্রয়োজন হয়।’
এই ‘অনন্যতন্ত্রতার’ প্রকাশ তিনি দেখতে পেয়েছিলেন বিদ্যাসাগরের প্রতিভার মধ্যে, তাঁর চরিত্রের মধ্যে, তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার মধ্যে। যে-কারণে রবীন্দ্রনাথকে বলতে দেখি, ‘অনেকে বিদ্যাসাগরের অনন্যতন্ত্র প্রতিভা ছিল না বলিয়া আভাস দিয়া থাকেন; তাঁহারা জানেন, অনন্যতন্ত্রত্ব কেবল সাহিত্যে এবং শিল্পে, বিজ্ঞানে এবং দর্শনেই প্রকাশ পাইয়া থাকে। বিদ্যাসাগর এই অকৃতকীর্তি অকিঞ্চিৎকর বঙ্গসমাজের মধ্যে নিজের চরিত্রকে মনুষ্যত্বের আদর্শরূপে প্রস্ফুট করিয়া যে এক অসামান্য অনন্যতন্ত্রত্ব প্রকাশ করিয়াছেন তাহা বাংলার ইতিহাসে অতিশয় বিরল।’ এ-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আরেকজন মাত্র বাঙালির নাম উল্লেখ করেন, তিনি হলেন রাজা রামমোহন রায়। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ‘অন্তরস্থ মনুষ্যত্বের স্বাধীনতার নামই নিজত্ব। এই নিজত্ব ব্যক্তভাবে ব্যক্তিবিশেষের, কিন্তু নিগূঢ়ভাবে সমস্ত মানবের। মহৎ ব্যক্তিরা এই নিজত্বপ্রভাবে একদিকে স্বতন্ত্র, একক, অন্যদিকে সমস্ত মানবজাতির সবর্ণ, সহোদর।’ বিদ্যাসাগরের মধ্যে আমরা সেইটির নিদর্শনও দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যমতে, ‘আমাদের দেশে রামমোহন রায় এবং বিদ্যাসাগর উভয়েরই জীবনে ইহার পরিচয় পাওয়া যায়। একদিকে যেমন তাঁহারা ভারতবর্ষীয়, তেমনি অপর দিকে য়ুরোপীয় প্রকৃতির সহিত তাঁহাদের চরিত্রের বিস্তর নিকট-সাদৃশ্য দেখিতে পাই। অথচ তাহা অনুকরণগত সাদৃশ্য নহে। বেশভূষায় আচার-ব্যবহারে তাঁহারা সম্পূর্ণ বাঙালি ছিলেন; স্বজাতির শাস্ত্রজ্ঞানে তাঁহাদের সমতুল্য কেহ ছিল না; স্বজাতিকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের মূলপত্তন তাঁহারাই করিয়া গিয়াছেন – অথচ নির্ভীক বলিষ্ঠতা, সত্যচারিতা, লোকহিতৈষা, দৃঢ়প্রতিজ্ঞা এবং আত্মনির্ভরতায় তাঁহারা বিশেষরূপে য়ুরোপীয় মহাজনদের সহিত তুলনীয় ছিলেন।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই মন্তব্যের সঙ্গে আরো যোগ করে বলেছেন, ‘য়ুরোপীয় কেন, সরল সত্যপ্রিয় সাঁওতালেরাও যে অংশে মনুষ্যত্বে ভূষিত, সেই অংশ বিদ্যাসাগর তাঁহার স্বজাতীয় বাঙালির অপেক্ষা সাঁওতালের সহিত আপনার অন্তরের যথার্থ ঐক্য অনুভব করিতেন।’ এখানে রবীন্দ্রনাথ গুরুত্ব দিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্রের চারিত্রিক দৃঢ়তার ওপর, যা ইউরোপিয়ানদের একার সম্পত্তি নয়। তিনি ঈশ্বরচেন্দ্রর চরিত্রের গড়নের মধ্যে তাঁর পূর্বপুরুষদের ‘মহত্ত্বের উপকরণ’গুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। সে-কারণেই বলেছিলেন, ‘বিদ্যাসাগরের চরিত্রসৃষ্টিও রহস্যাবৃত – কিন্তু ইহা দেখা যায়, সে চরিত্রের ছাঁচ ভালো। ঈশ্বরচন্দ্রের পূর্বপুরুষের মধ্যে মহত্ত্বের উপকরণ প্রচুর পরিমাণে সঞ্চিত ছিল।’ রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন কীভাবে পূর্বপুরুষদের চরিত্রের ছাঁচ বিদ্যসাগরের চরিত্র গঠনে কাজে লেগেছিল – পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন এক ‘অনন্যসাধারণ’ ব্যক্তিত্বের ধরন। পিতামহী দুর্গাদেবীর স্বভাবের মধ্যে যে-‘মহত্ত্ব’ ছিল, সেটিও তিনি ধারণ করেছিলেন। পিতা ঠাকুর দাস বন্দ্যোপাধ্যায় খুব ‘অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব’ না হলেও একেবারে কিন্তু সাধারণ লোক ছিলেন না। আর তাঁর মাতা ভগবতী দেবী ছিলেন সবদিক থেকেই এক ‘অসামান্য’ রমণী।
ভগবতী দেবী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, ‘দয়াবৃত্তি আরও অনেক রমণীর মধ্যে দেখা যায়, কিন্তু ভগবতী দেবীর দয়ার মধ্যে একটি অসাধারণত্ব ছিল, তাহা কোনোপ্রকার সংকীর্ণ সংস্কারের দ্বারা বদ্ধ ছিল না।’ সেই সূত্র ধরেই রবীন্দ্রনাথ আরো একটু অগ্রসর হয়ে বলেছেন, ‘এ কথা … স্থির জানিবেন, এখানে জননীর চরিতে এবং পুত্রের চরিতে বিশেষ প্রভেদ নাই, তাঁহারা যেন পরস্পরের পুনরাবৃত্তি।’ আর ‘পুনরাবৃত্তি’ বলেই মাতার ‘দয়াবৃত্তি’ বিদ্যাসাগরের মধ্যে দিয়ে যেন পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। যার দৃষ্টান্ত দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তাঁহার (বিদ্যাসাগর) মতো দরিদ্রাবস্থার লোকের পক্ষে দান করা, দয়া করা বড়ো কঠিন, কিন্তু তিনি যখন যে অবস্থাতেই পড়িয়াছেন, নিজের কোনোপ্রকার অসচ্ছলতায় তাঁহাকে পরের উপকার হইতে বিরত করিতে পারে নাই, এবং অনেক মহৈশ্বর্যশালী রাজা রায়বাহাদুর প্রচুর ক্ষমতা লইয়া যে উপাধি লাভ করিতে পারে নাই, এই দরিদ্র পিতার দরিদ্র সন্তান সেই ‘দয়ার সাগর’ নামে বঙ্গদেশে চিরদিনের জন্য বিখ্যাত হইয়া রহিলেন।’ খুব কঠিন সাধনার ব্যাপার ছিল এর মধ্যে।
৩
বিদ্যায়তনিক লেখাপড়া সমাপ্ত করে ১৮৪১ সালে বিদ্যাসাগর প্রথমে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ‘প্রধান পণ্ডিতে’র পদে নিযুক্ত হন। এখানে তিনি ইউরোপীয় রাজকর্মচারীদের বাংলা ভাষা শেখাতেন। এর বছর পাঁচেক পরে তিনি সংস্কৃত কলেজের ‘সহকারী সেক্রেটারি’র পদে নিযুক্ত হন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেক্রেটারি জে. টি. মার্শাল তাঁর এক সুপারিশপত্রে বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘তিনি ইংরেজি ভাষায় উল্লেখযোগ্য জ্ঞান অর্জন করেছেন। … আমার ধারণা এঁর মধ্যে অসাধারণ পরিমাণে, ব্যাপক ধরনের জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, শ্রমশীলতা, সুন্দর স্বভাব এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধার যোগ্য নৈতিক চরিত্রের একত্র সম্মিলন ঘটেছে।’ রবীন্দ্রনাথ সংগত কারণেই বলেছিলেন, এই কার্যোপলক্ষে বিদ্যাসাগর, ‘যে-সকল ইংরেজ প্রধান কর্মচারীদের সংস্রবে আসিয়াছিলেন, সকলেরই পরম শ্রদ্ধা ও প্রীতিভাজন হইয়াছিলেন।’ সেইসঙ্গে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আত্মসম্মানবোধের নমুনার একটা বিবরণ দিতেও ভোলেননি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমাদের দেশে প্রায় অনেকেই নিজের এবং স্বদেশের মর্যাদা নষ্ট করিয়া ইংরেজের অনুগ্রহ লাভ করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর সাহেবের হস্ত হইতে শিরোপা লইবার জন্য কখনও মাথা নত করেন নাই; তিনি আমাদের দেশের ইংরেজ প্রসাদগর্বিত সাহেবানুজীবীদের মতো আত্মাবমাননার মূল্যে বিক্রীত সম্মান ক্রয় করিতে চেষ্টা করেন নাই।’ এ-থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি আদল আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
৪
নারী-জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের যে-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-সহমর্মিতা, তার কোনো তুলনাই হয় না। নারীদের প্রতি সমাজের পীড়ন, অবহেলা তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। আর এটা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত হা-হুতাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, ‘বিদ্যাসাগর প্রথমত বেথুন-সাহেবের সহায়তা করিয়া বঙ্গদেশে স্ত্রীশিক্ষার সূচনা ও বিস্তার করিয়া দেন। অবশেষে যখন তিনি বালবিধবাদের দুঃখে ব্যথিত হইয়া বিধবাবিবাহ-প্রচলনের চেষ্টা করেন তখন দেশের মধ্যে সংস্কৃত শ্লোক ও বাংলা গালি মিশ্রিত এক তুমুল কলকোলাহল উত্থিত হইল। সেই মুষলধারে শাস্ত্র ও গালি-বর্ষণের মধ্যে এই ব্রাহ্মণবীর বিজয়ী হইয়া বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ করিলেন এবং তাহা রাজবিধিসম্মত করিয়া লইলেন।’ ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নকে লেখা চিঠিতে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘বিধবাবিবাহ প্রবর্তন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম। এ জন্মে যে ইহা অপেক্ষা অধিকতর আর কোনও সৎকর্ম করিতে পারিব তাহার সম্ভাবনা নাই।’
শুধুই এইটুকুনই নয়, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বিদ্যাসাগর এই সময়ে আরো একটি ক্ষুদ্র সামাজিক যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছিলেন। … তখন সংস্কৃত কলেজে কেবল ব্রাহ্মণেরই প্রবেশ ছিল, সেখানে শূদ্রেরা সংস্কৃত পড়িতে পাইত না। বিদ্যাসাগর সকল বাধা অতিক্রম করিয়া শূদ্রদিগকে সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাশিক্ষার অধিকার দান করেন।’ প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রনাথ এটিও জানাতে দ্বিধা করেননি যে, ‘সংস্কৃত কলেজের কর্ম ছাড়িয়া দিবার পর বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটুশ্যন। বাঙালির নিজের চেষ্টায় এবং নিজের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ স্থাপন এই প্রথম।’
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বলা যায়, ‘বিদ্যাসাগর বঙ্গদেশে তাঁহার অক্ষয় ‘দয়া’র জন্য বিখ্যাত। কারণ, দয়াবৃত্তি আমাদের অশ্রুপাতপ্রবণ বাঙালিহৃদয়কে যত শীঘ্র প্রশংসায় বিচলিত করতে পারে, এমন আর কিছুই নহে।’ কিন্তু এখানেও গড়পড়তা বাঙালির সঙ্গে বিদ্যাসাগরের বিরাট পার্থক্য আমরা দেখতে পাই। কী সেই পার্থক্য? রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বিদ্যাসাগরের দয়ায় কেবল যে বাঙালিজনসুলভ হৃদয়ের কোমলতা প্রকাশ পায় তাহা নহে, তাহাতে বাঙালিদুর্লভ চরিত্রের বলশালিতারও পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁহার দয়া কেবল একটা প্রবৃত্তির ক্ষণিক উত্তেজনা নহে, তাহার মধ্যে একটা সচেষ্ট আত্মশক্তির অচল কর্তৃত্ব সর্বদা বিরাজ করিত বলিয়াই তাহা এমন মহিমশালিনী।’ বিদ্যাসাগরের সমস্ত কাজের মধ্যে আত্মশক্তির যে প্রাবল্য দেখতে পাওয়া যায়, সেটি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি এড়ায়নি। সে-কারণেই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘বিদ্যাসাগরের কারুণ্য বলিষ্ঠ – পুরুষোচিত। এইজন্য তাহা সরল এবং নির্বিকার।’ তাঁর এই মন্তব্যটিও বিদ্যাসাগর-সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টি-উন্মুক্ত করে দেয় যে, ‘তাঁহার কারুণ্যের মধ্যে … পৌরুষের লক্ষণ ছিল।’ শুধুই তা-ই নয়, রবীন্দ্রনাথই প্রথম দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পেরেছিলেন, ‘বিদ্যাসাগরের হৃদয়বৃত্তির মধ্যে যে বলিষ্ঠতা দেখা যায়, তাঁহার বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যেও তাহার পরিপূর্ণ প্রভাব প্রকাশ পায়।’ আর সে-কারণেই ‘যাহাকে বলে কাণ্ডজ্ঞান সেটা তাঁহার যথেষ্ট ছিল। এই কাণ্ডজ্ঞানটি যদি না থাকিত, তবে যিনি একসময় ছোলা ও বাতাসা জলপান করিয়া পাঠশিক্ষা করিয়াছিলেন, তিনি অকুতোভয়ে চাকরি ছাড়িয়া দিয়া স্বাধীন জীবিকা অবলম্বন করিয়া জীবনের মধ্যপথে সচ্ছলস্বচ্ছন্দাবস্থায় উত্তীর্ণ হইতে পারিতেন না।’ তাঁর কথার স্বপক্ষে উদাহরণ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের একক প্রচেষ্টায় গঠিত ‘মেট্রোপলিটন’ প্রতিষ্ঠানটির কথা নানাভাবে স্মরণ করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘মেট্রোপলিটন-বিদ্যালয়কে তিনি … একাকী সর্বপ্রকার বিঘ্নবিপত্তি হইতে রক্ষা করিয়া তাহাকে সগৌরবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত সংযুক্ত করিয়া দিলেন – ইহাতে বিদ্যাসাগরের কেবল লোকহিতৈষা ও অধ্যবসায় নহে, তাঁহার সজাগ ও সহজ কর্মবুদ্ধি প্রকাশ পায়।’
৫
বিদ্যাসাগরের স্বভাববৈশিষ্ট্যের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেয়েছিলেন ‘যেমন কর্মবুদ্ধি তেমনি ধর্মবুদ্ধির মধ্যেও একটা সবল কাণ্ডজ্ঞান’। যে-কারণে তিনি নারীশিক্ষার প্রচলনের পাশাপাশি বিধবাবিবাহের প্রচলন, বহুবিবাহ রদ – এই সামাজিক আন্দোলন হিসেবে সমাজের কাছে উত্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বিদ্যাসাগর বালবিধবাবিবাহের ঔচিত্য সম্বন্ধে যে প্রস্তাব করিয়াছেন তাহাও অত্যন্ত সহজ, তাহার মধ্যে কোনো নূতনত্বের অসামান্য নৈপুণ্য নাই। তিনি প্রত্যক্ষ ব্যাপারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া এক অমূলক কল্পনালোক সৃজন করিতে আপনার শক্তির অপব্যয় করেন নাই।’ এই বিষয়ে বিদ্যাসাগরের কৃতিত্বের বিবরণ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘রমণীর দেবীত্ব ও বালিকার ব্রহ্মচর্যমাহাত্ম্যের সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর আকাশগামী ভাবুকতার ভূরিপরিমাণ সজল বাষ্প সৃষ্টি করিতে বসেন নাই; তিনি তাঁহার পরিষ্কার সবল বুদ্ধি ও সরল সহৃদয়তা লইয়া সমাজের যথার্থ অবস্থা ও প্রকৃত বেদনার সকরুণ হস্তক্ষেপ করিয়াছেন। কেবলমাত্র মধুর বাক্যরসে চিঁড়াকে সরস করিতে সে-ই চায় যাহার দধি নাই।’ বিদ্যাসাগরের কর্মপন্থার অভিনবত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বয়ান এ-রকম, ‘বিদ্যাসাগর স্পষ্ট দেখিতেছেন যে, প্রকৃত সংসারে বিধবা হইবামাত্র বালিকা হঠাৎ দেবী হইয়া উঠে না, এবং আমরাও নিষ্কলঙ্ক দেবলোক সৃষ্টি করিয়া বসিয়া নাই; এমন অবস্থায় সে-ও দুঃখ পায়, সমাজের রাশি রাশি অমঙ্গল ঘটে, ইহা প্রতিদিনের প্রত্যক্ষ সত্য। সেই দুঃখ, সেই অকল্যাণ নিবারণের উপযুক্ত উপায় অবলম্বন না করিয়া বিদ্যাসাগর থাকিতে পারেন নাই।’
তাঁর চারিত্রিক শক্তির সবলতার কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, ‘যথার্থ সবলতার সঙ্গে সঙ্গেই একটা সুবৃহৎ সরলতা থাকে।’ – এই হলেন যথার্থ বিদ্যাসাগর। রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত ধারণার বিপক্ষে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ আমরা বিদ্যাসাগরকে কেবল বিদ্যা ও দয়ার আধার বলিয়া জানি’, কিন্তু এই মহৎ সাহিত্যিকের সেদিন মনে হয়েছিল যে, ‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’ আর তার সঙ্গে-সঙ্গে এই বিষয়টিও পুনরুচ্চারণ করতে দ্বিধা করেননি, ‘দুর্বিষহ দারিদ্র্যও মুহূর্তকালের জন্য তাঁহার আত্মসম্মান আচ্ছন্ন করিতে পারে নাই।’
বিদ্যাসাগরের সত্যিকারের শ্রদ্ধাতর্পণই বলি আর স্মৃতিতর্পণই বলি, সার্থকভাবে রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই সেটি সর্বপ্রথমে সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল।
৬
ঈশ্বরচন্দ্রের ধীরে-ধীরে ‘বিদ্যাসাগর’ হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে গবেষক বিনয় ঘোষ ঐতিহাসিক মূল্য-চেতনার কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন। এ-বিষয়ে তাঁর মন্তব্য হচ্ছে, ‘ইতিহাস কোনো একটি স্থানের সীমানার মধ্যে, অথবা কোনো একজন ব্যক্তির জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনেতিহাসও নয়। কালের যাত্রাই হল ইতিহাস। একই সময়ে, একই কালে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনের উপর দিয়ে ইতিহাসের স্রোত বয়ে যায় – কালস্রোত ও ঘটনাস্রোত। ঈশ্বরচন্দ্রের বাল্যকালেও গেছে। সেই স্রোতের তরঙ্গের তারতম্য থাকে, দেশভেদে, স্থানভেদে ও পাত্রভেদে সাদৃশ্যও থাকে। সেইসব তারতম্য ও সাদৃশ্য বিচার করে, সব কিছু নিয়ে সমগ্র ইতিহাসের যাত্রাপথ আঁকা-বাঁকা উঁচু-নিচু গতিরেখায় রূপায়িত হয়ে ওঠে।’ আমরা জানি, লেখাপড়া করে ‘মানুষ’ হবার এক প্রত্যয় নিয়ে ১৮২৮ সালের নভেম্বর মাসে ঈশ্বরচন্দ্র কলকাতায় আসেন। সেটা কোন কলকাতা? বিনয় ঘোষ জানিয়েছেন, সে-কলকাতা শুধু ‘নাচ-গান-পান-মশগুল’ কলকাতা নয়। সেইসঙ্গে ‘নবযুগের নতুন শিক্ষা-সংস্কৃতিকেন্দ্র, নতুন ভাবসংঘাতকেন্দ্র কলকাতা।’ তাঁর ওই মন্তব্যের যাথার্থ্য প্রমাণ করতে গিয়ে বিনয় ঘোষ জানিয়েছেন, ‘ঈশ্বরচন্দ্রের যখন কলকাতায় আসার কথা হল, তখন ইংরেজি শিক্ষার অবস্থারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। দশ বছরের বেশি হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু হিন্দু কলেজ নয়, রামমোহন রায়-প্রতিষ্ঠিত হেদুয়ায় ইংরেজি স্কুল, ভবানীপুরের জগমোহন বসুর ইউনিয়ন স্কুল প্রভৃতি বিদ্যালয় থেকে যাঁরা ইংরেজিবিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন, তাঁরাই হয়েছিলেন নবযুগের শিক্ষকশ্রেণী।’ দেওয়ান রামকমল সেনের প্রসঙ্গের সূত্র ধরেই আমরা জানতে পারি, ‘১৭৭৪ সালে আমাদের দেশে সুপ্রীম কোর্ট স্থাপিত হয়। এই সময় থেকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ইচ্ছা জাগে ও আবশ্যকতা দেখা দেয়।’ বিনয় ঘোষের ভাষায়, ‘বেশ বোঝা যায়, জীবিকা ও পেশার তাগিদে ইংরেজি শিক্ষার শুরু হয়েছিল।’ সেইসঙ্গে আমরা আরো জানতে পারি, ‘চাকরিবাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ইংরেজরা ইংরেজি শিক্ষার ব্যবহারিক প্রয়োজনের কথা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। ইংরেজি না জানলে ইংরেজদের সান্নিধ্যে আসা যায় না এবং ইংরেজদের সান্নিধ্যে না এলে কলকাতা শহরের নতুন সামাজিক আভিজাত্যের সিঁড়ির উচ্চধাপে ওঠাও সম্ভব নয়। সম্ভ্রান্ত ও ধনিক পরিবারের সন্তানেরা তাই গুরু-মুনশী বহাল রেখেও, ইংরেজি শিখতে আরম্ভ করলেন।’ প্রাসঙ্গিকভাবে বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ের উদাহরণ টেনে বিনয় ঘোষ বলেছিলেন, ‘ছেলেবেলায় ঈশ্বরচন্দ্র গোপালের মতো সুবোধ ছিলেন না, রাখালের মতো দুরন্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও অবশ্য তিনি লেখাপড়া শিখেছিলেন … লেখাপড়ায় তাঁর আগ্রহ ছিল খুব। এই একটি বিষয় ছাড়া, আর কোনো বিষয়ে গোপালের সঙ্গে তাঁর চরিত্রের মিল ছিল না।’ বিদ্যাসাগরের চরিত্রের আরেকটি দিক উন্মোচন করে বিনয় ঘোষ জানিয়েছিলেন, ‘মনে-মনে কিছু ঠিক করে ফেললে তাঁকে সেখান থেকে টলানো মুশকিল হতো। সিদ্ধান্তের ব্যাপারে চিরজীবনই তিনি অটল ছিলেন। বাল্যকালে তার সঙ্গে ছিল রাগ ও গোয়ার্তুমি।’ তাঁর এই একগুঁয়েমির জন্যে পিতা ঠাকুরদাস তাঁকে ‘ঘাড়কেঁদো’ বলে ডাকতেন।
৭
ছাত্রাবস্থার প্রসঙ্গ ধরেই বিনয় ঘোষ বলেছিলেন, ‘ছাত্রজীবনে তিনি দীর্ঘ বারো বছর ধরে রক্ষণশীল ও প্রগতিশীল দলের আন্দোলনের মধ্যে, ইংরেজিশিক্ষার পদ্ধতি ও ধারার মধ্যে, একদিকে এই অন্ধ গোঁড়ামি আর একদিকে প্রগতির নামে অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতার তাণ্ডব দেখেছিলেন। তাই দুই পথের কোনোটিই তিনি কর্মজীবনে চলার জন্য বেছে নেননি।’ আমরা বুঝতে পারি, তিনি ছিলেন মধ্যমপথের সমর্থক। কলকাতায় পড়াশোনার পাশাপাশি নানা তরঙ্গ-ভঙ্গের অভিঘাত ঈশ্বরচন্দ্রের মানসগঠনে সহায়তা করেছে। সেখানে দ্বন্দ্ব যেমন ছিল, তেমনি ছিল সমন্বয়েরও একটা পরিবেশ। সেইসব পরিবেশ বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্ব গঠনে নানাভাবে সহায়ক হয়ে উঠেছিল। বিনয় ঘোষ জানিয়েছেন, ‘ঈশ্বর সর্বপ্রথম এই চারিত্রিক নির্ভীকতা শিক্ষা করেছেন তাঁর শিক্ষকদের কাছ থেকে। দশ-এগারো বছরের বালক যখন তিনি, সতীদাহ ও সহমরণপ্রথা নিয়ে তখন সরকারী আইনের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন আরম্ভ হয়। ব্যাকরণশ্রেণীতে তখন তিনি পড়ছেন। … বাইরের এই প্রবল আন্দোলনের ঘাত-প্রতিঘাতে তাঁর কিশোর চিত্তে কোনো তরঙ্গেরই সৃষ্টি হয়নি, এমন কথা বলা যায় না।’
কলকাতার সে-সময়কার চালচিত্রের বিবরণ দিতে গিয়ে বিনয় ঘোষ বলেছেন, ‘একদিকে রামমোহন রায়ের দল, আর একদিকে রাধাকান্ত দেবের দল – কলকাতার সমাজ তখন এই দুটি প্রধান দলে বিভক্ত ছিল। দুই দলেই নতুন যুগের বাঙালী ধনিক ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা নেতৃত্ব করতেন। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরাও দুই দলের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। তাঁরা সকলেই যে রক্ষণশীলতার সমর্থক ছিলেন তা নয়, অনেকে প্রগতিশীল মতবাদও পোষণ করতেন।’ এসবের পাশাপাশি, বিনয় ঘোষ আরো জানিয়েছিলেন, ‘সাহিত্য বিজ্ঞান দর্শন সমাজ শিক্ষা অর্থনীতি ইত্যাদি এমন কোনো যুগোপযোগী বিষয় ছিল না, যা নিয়ে এইসব সভা-সমিতিতে আলোচনা না হতো। বাংলার শিক্ষিতসমাজের এই আলোচনামুখর পরিবেশে ঈশ্বরচন্দ্রের ছাত্রজীবন কেটেছে। কিশোর বালক থেকে তিনি যুক্তিবাদী যুবক হয়ে উঠেছেন।’ আর তাই ঈশ্বরচন্দ্রের কর্মজীবন-প্রসঙ্গে, রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে এসে বিনয় ঘোষ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ‘তাঁর কর্মজীবনের প্রেরণা তাঁর মাতৃভক্তি এবং কেবল ব্যক্তিগত জীবনের উপলব্ধি থেকে আসেনি। কেবল হৃদয়াবেগের বশীভূত হয়ে কর্মজীবনের কঠোর পথে এগিয়ে চলার পক্ষপাতী ঈশ্বরচন্দ্র কোনোকালেই ছিলেন না।’ তাহলে তাঁর কর্মজীবনের যে-প্রেরণার কথা আমরা নানাভাবে জোর দিয়ে বলতে চাইছি, তার রসদ কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন বিদ্যাসাগর? এ-প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বিনয় ঘোষ জানিয়েছেন, ‘কর্মজীবনের প্রেরণা তো বটেই, তার প্রত্যেকটি নীতি, পন্থা ও পরিকল্পনা পর্যন্ত ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর সমসাময়িক সমাজ-জীবন থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। শিক্ষার ক্ষেত্রেই হোক, আর সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রেই হোক, কোনো ক্ষেত্রে কোনো আন্দোলনই তিনি কেবল আত্মোপলব্ধির প্রেরণায় করতে প্রবৃত্ত হননি।’ ব্যক্তির মানস-গঠনে সমাজের এই পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব আমরা কোনোভাবেই কিন্তু অস্বীকার করতে পারি না।
৮
বিদ্যাসাগরের কর্মজীবনের একটি হিসাব দিতে গিয়ে বিনয় ঘোষ জানিয়েছিলেন, ‘১৮৪১ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবনের প্রস্তুতির পর্ব বলা যায়। এর মধ্যে ১৮৪১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ১৮৪৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় চার বছর চার মাস কাল তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে একটানা সেরেস্তাগিরি করেন। তারপর প্রায় এক বছর তিন মাস, ৬ এপ্রিল ১৮৪৬ থেকে ১৬ জুলাই ১৮৪৭ পর্যন্ত, সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদকের কাজ করেন। পরে আবার প্রায় এক বছর নয় মাস, ১ মার্চ ১৮৪৯ থেকে ৪ ডিসেম্বর ১৮৫০ পর্যন্ত ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের হেড রাইটার ও কোষাধ্যক্ষের কাজ করেন।’ সেইসঙ্গে তিনি এ-ও জানিয়েছেন, ‘একবার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ, একবার সংস্কৃত কলেজ, এইভাবে তাঁর প্রথম কর্মজীবন প্রধানত চাকরির টানাটানিতেই কেটে যায়। অবশেষে ১৮৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং তার একমাস কয়েকদিন পরেই (২২ জানুয়ারি, ১৮৫১) কলেজের অধ্যক্ষপদ লাভ করেন। তখন তাঁর বয়স একত্রিশ বছর। এই সময় থেকেই তাঁর কর্মজীবনের মধ্যাহ্নের শুরু।’ মাঝখানের অন্তর্বর্তী সময়কাল সম্পর্কে বিনয় ঘোষের পর্যালোচনা এ-রকম – ‘মধ্যের একুশ থেকে একত্রিশ বছর পর্যন্ত দশটি মূল্যবান বছর তিনি যে কেবল সরকারী চাকরি করে অপচয় করেছেন, তা নয়। বাইরের বৃহত্তর সমাজের পাঠশালায় তিনি তাঁর কর্মজীবনের শিক্ষানবীশি করেছিলেন। গোলদিঘির কলেজের শিক্ষার পরে লালদিঘির এ-শিক্ষার গুরুত্ব অল্প নয়।’তৎকালীন সামাজিক গঠন প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বিদ্যাসাগরের মানস-গঠনে একটা প্রভাব ফেলেছিল, যার কথা আমরা পূর্বেই বলেছি। বিনয় ঘোষ এ-বিষয়ে সবিস্তারে গিয়ে জানিয়েছেন, ‘ধর্মান্দোলনের প্রতি ঈশ্বরচন্দ্রের আস্থা ছিল না। বরং তিনি মনে করতেন, ধর্মান্দোলনে সামাজিক আন্দোলন ব্যাহত হয়।’ আর সে-কারণেই ‘এইরকম ধারণার বশবর্তী হয়ে বিদ্যাসাগর তাঁর কর্মজীবনের উদ্যোগপর্বে, উনিশ শতকের চতুর্থ দশকে, ‘তত্ত্ববোধিনী’ সভা ও পত্রিকার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসেছিলেন। ধারণা তাঁর মিথ্যা হয়নি। তাতে তিনি নিজেও উপকৃত হয়েছিলেন এবং তাঁর সান্নিধ্যে অন্যান্য সহকর্মীরাও লাভবান হয়েছিলেন। সভার মধ্যে থেকে তিনি তার ধর্মপ্রবণতার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। তত্ত্ববোধিনীর নবীন সভ্যদের মধ্যে সকলেই প্রায় তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন। অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন তাঁর একান্ত অনুরাগী ও বিশ্বস্ত সেনানায়ক।’ এইসময়কার বিদ্যাসাগরের মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণের কথা বলতে গিয়ে বিনয় ঘোষ আরো জানিয়েছেন, ‘এই সংস্কারোন্মুখ সামাজিক পরিবেশের মধ্যে বিদ্যাসাগর তাঁর মানসিক প্রস্তুতির সুযোগ পেয়েছিলেন। সমাজের নতুন প্রাণশক্তির বন্যাস্রোতের মধ্যে তিনি তাঁর কর্মজীবনের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। শহরের নতুন অভিজাতশ্রেণী ও মধ্যবিত্ত ‘বাবুদের’ বুলবুলির লড়াই, মেড়ার লড়াই আর ঘোড়দৌড় দেখে, বাইজি-বিলাস দেখে, তিনি হতাশ হননি এবং তাকেই সামাজিক সত্যের সবটুকু বলে গ্রহণ করেননি।’ সামাজিক সত্যের এরকম মুখোমুখি হতে পারার সক্ষমতা তাঁর ছিল বলেই – বিনয় ঘোষের মতে – ‘মধুসূদনের ধর্মান্তর, দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ, নব্যশিক্ষিত বাঙালীদের খ্রীস্টধর্মপ্রীতি ও ব্রাহ্মধর্মানুরাগ, প্রধানত ধর্মকেন্দ্রিক বিদ্রোহ ও সংস্কারচেতনার প্রকাশ হলেও, তা দেখে বিদ্যাসাগর বিচলিত অথবা বিভ্রান্ত হননি।’ বরং এসব ঘটনা ভেতরে-ভেতরে তাঁকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল। বিনয় ঘোষের মতে, ‘সমাজসংস্কারের যে চেতনা ক্রমেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জনস্তরে প্রবল হয়ে উঠছিল, যুগোপযোগী শিক্ষার জন্য যে ব্যাকুলতা তাঁদের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছিল, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সভা-সমিতির স্বাধীন আলোচনার মধ্যে ধ্বনিত হয়ে উঠছিল, বিদ্যাসাগর তার ভিতর থেকেই তাঁর চলার শক্তিসঞ্চয় এবং লক্ষ্য স্থির করেছিলেন।’ বিদ্যাসাগরের কর্মময় জীবনের পরিধি অনেক দূর বিস্তৃত হলেও এসবের প্রভাবে ‘চাকরিজীবনকে তিনি শেষ পর্যন্ত চার-দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে পারেননি। ধীরে ধীরে সামাজিক কর্মজীবনে তাকে রূপান্তরিত করেছেন।’ সেইদিক থেকে বিচার করলে বলা যায়, পাঠ্যবিষয়ের সংস্কার তাঁর অন্যতম একটি সুবিবেচনাসম্মত পদক্ষেপ। পাঠ্যবিষয়ের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল যে পাঠ্যবিষয়ের আমূল সংস্কার করতে না পারলে বিদ্যালয়ের উন্নতি সম্ভব হবে না।’ আর এরপর থেকেই তিনি তাঁর নিজস্ব উপলব্ধির জগৎকে নির্মাণ করতে যেয়ে তৎকালীন বহির্জগতের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লেন। বিনয় ঘোষ বলছেন, ‘বিদ্যাসাগরের কর্মজীবনের প্রথম সংঘাত শুরু হল এইখানে। শুরু হল কিন্তু শেষ হল না। কারণ এ সংঘাত স্বার্থের সংঘাত নয়, আদর্শের সংঘাত। স্বার্থের সংঘাতের শুরুও আছে, শেষও আছে। আদর্শের সংঘাতের শুরু আছে, শেষ নেই।’
বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে এইটি বিশেষভাবে মনে রাখা চাই যে ব্যক্তি বা সমাজের সঙ্গে তাঁর যে সংঘাত, সেটি কখনোই স্বার্থের সংঘাত ছিল না, সংঘাত ছিল তাঁর আদর্শের। আর এইখানে তিনি কখনোই পিছপা হননি। যে-কারণে দৃঢ়তার সঙ্গে আলু-পটোল বিক্রি করে খেটে খেয়ে নিজের আত্মমর্যাদাবোধ টিকিয়ে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন। এ-সম্পর্কে বিনয় ঘোষ বলেছেন, আলু-পটোল বেচে খাওয়ার কথা বললেও ‘বিদ্যাসাগরের মূলধন ছিল বিদ্যা। বিদ্যাই তাঁর স্বোপার্জিত মূলধন, তিনি ছিলেন বিদ্যার ব্যাপারী। কিন্তু বিত্তের সঙ্গে বিদ্যার সাদৃশ্য কোথায়, বিশেষ করে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে? বিত্ত দান করলে কমে যায়, বিদ্যা যত দান করা যায় তত বাড়তে থাকে। বিত্ত অপহরণ করা যায়, কিন্তু বিদ্যা করা যায় না। বিত্তের মূলধন বাণিজ্যে খাটালে মুনাফার আকারে তা বাড়তে থাকে, কিন্তু বিদ্যার মূলধনে বাণিজ্যের মুনাফা কি?’ মুনাফা যে ছিল, বিদ্যাসাগর অন্তত যুগের হাওয়ায় সেটি বুঝতে পেরেছিলেন। বিনয় ঘোষের মতে, ‘ধনতান্ত্রিক নবজাগরণের যুগের মূলমন্ত্র হল অবাধ বাণিজ্য এবং তার প্রধান মূলধন বিত্ত ও বিদ্যা দুইই। ধনতান্ত্রিক নবযুগ কেবল পণ্যবণিকের যুগ নয়, বিদ্যাবণিকেরও যুগ। নবযুগের বণিকের ব্যক্তিগত উদ্যম ও স্বাতন্ত্র্যবোধ বিদ্যাসাগরের পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল। সুতরাং বিদ্যার মূলধন নিয়োগ করে তিনি বিদ্যাবণিক হওয়াই বাঞ্ছনীয় মনে করলেন। তিনি মুদ্রক, প্রকাশক ও গ্রন্থাকার হলেন।’ এবার নিজেই নিজের রুটি-রুজির পথ-নির্মাণে অগ্রসর হতে সচেষ্ট হলেন। বিনয় ঘোষের সূত্রে আমরা জানতে পারি, ‘সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদকের কাজ ছাড়বার আগেই বোধহয় বিদ্যাসাগর ‘সংস্কৃত প্রেস’ ও ‘ডিপোজিটারি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। … বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃত কলেজে সহকারী সম্পাদকের পদে নিযুক্ত ছিলেন, তখন মদনমোহন ছিলেন সাহিত্যের অধ্যাপক। মনে হয় দুই বন্ধু মিলে ছাপাখানা ও বইয়ের ব্যবসা তখনই আরম্ভ করেছিলেন।’
৯
শামসুর রাহমানের নিজ বাসভূমে কাব্যে আমরা পড়ি –
নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা
উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।
মমতা নামের প্লুত প্রদেশের শ্যামলিমা
তোমাকে নিবিড়
ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত
পোহানোর পরের প্রহরে
শিউলিশৈশবে ‘পাখী সব করে রব’
বলে মদনমোহন
তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যেহ
দিতেন ডাক। তুমি আর আমি,
অবিচ্ছিন্ন পরস্পর মমতায় লীন,
ঘুরেছি কাননে তাঁর নেচে নেচে, যেখানে
কুসুম-কলি সবই
ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে।
(‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী