28/05/2026
লেখক-গীতিকার-গায়ক-সাংবাদিক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় যখন 'ওপেন টি বায়স্কোপ' সিনেমাটি বানিয়েছিলেন, দুটি দৃশ্য রেখেছিলেন তাতে।
এক, স্কুল থেকে ফিরে মারামারির কথা মায়ের কাছে জানায় কিশোর নায়ক। মারমুখী ভঙ্গিতে বলে 'থোপনা বিলা' করে দেওয়ার কথা।
দুই, কিশোর বন্ধুদের কাছ থেকে মৈথুন ও মানুষের যৌনতার প্রক্রিয়া জানার পরে বয়ঃসন্ধিতে পা দেওয়া আরও একটি ছেলে বার বার বলতে থাকে, না না এভাবে হয় না। হতে পারে না। কীভাবে সম্ভব? আমার বাবা যে খুব রাগী!
অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়কে পড়ার অভ্যেস যাঁদের আছে, এই দুটো দৃশ্যে নিশ্চয় লাফিয়ে উঠেছিলেন তাঁরা। কারণ, এই দুটো সংলাপ নিজের রসরচনায় আগেই লিখে গিয়েছিলেন অনিন্দ্য। সিনেমাকে যদি নিজের সৃষ্টিশীলতা দেখানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম বা জায়গা বলে তাঁর মনে হয়, তাহলে সেই ভাবনা থেকেই হয়তো নিজের লেখা অন্যতম সেরা পুরনো লাইন নতুন ভাবে ব্যবহার করেছিলেন।
রোয়ান অ্যাটকিনসনের মি. বিন সিরিজের প্লেন ও বমি করার টুকরো এপিসোডটা বিনের ভক্তমাত্রেরই প্রিয়। সেই মি. বিনকে নিয়েই যখন পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করা হয়, বিমানে বমনের দৃশ্যটি কিন্তু ব্যবহার করা হয়েছিল নতুনভাবেই।
সত্যজিৎ রায়ের 'বাক্স রহস্য' নিয়ে সব্যসাচী-শাশ্বত-রবি ঘোষকে কাস্ট করে টেলিফিল্ম বানিয়েছিলেন সন্দীপ রায়। এরোপ্লেন আকাশে ওঠার সময় লালমোহনবাবুর মুখ যখন বেঁকে যায়, তিনি অজুহাত দেন মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে লড়াই চলার কারণে নাকি অমনটা হয়ে থাকে! টেলিছবির তপেশ প্রশ্ন করে, তাহলে অন্যান্য যাত্রীর হল না কেন! ফেলুদা সরস উত্তর দেয়, আসলে আর সবার হয়ে উনি মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে একাই লড়াই করছিলেন! এটা কিন্তু মূল উপন্যাসে নেই।
পরে যখন সব্যসাচী-পরমব্রত-বিভূকে নিয়ে 'বোম্বাইয়ের বোম্বেটে' বানালেন সন্দীপ, একই দৃশ্য আবারও রাখলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, স্কেল যখন আরও বাড়ল, পুরনো ভাল জিনিসগুলোকে আবারও ফেরানো যাক!
আমার বিশ্বাস, 'ভূতের ভবিষ্যৎ' দেখতে গিয়েও দর্শক একইভাবে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আহ্লাদিতও হয়েছিলেন নিশ্চয়ই। কারণ সেই ছবিতে ছিল দুটো দৃশ্য। সঙ্গে শব্দের খেলা।
প্রথম দৃশ্য, ডাকাতদল বলছে 'সোনাদানা সব চাই, নইলে... জবাই!'
দ্বিতীয় দৃশ্য, স্বস্তিকা কদলীবালা মুখার্জি লিপ দিচ্ছিলেন 'দেব না দেব না রে' গানে।
দর্শক কেন আহ্লাদিত হয়েছিলেন? কারণ তুমুল জনপ্রিয় হওয়া টেলিভিশনের দুটো বিজ্ঞাপন ওরকমই ছিল। কিন্তু ঘরে ঘরে সেই বিজ্ঞাপন দুটো পৌঁছলেও বিজ্ঞাপন নির্মাতা অনীক দত্তকে নিয়ে ক'টা আলোচনাই বা হত তখন? অনীক তাই যখনই আরও বড় স্কেলে খেলার সুযোগ, বৃহত্তর ময়দান পেয়েছিলেন, নিজেকে উদযাপন করেছিলেন নিজেই।
সেই সময় বাংলা ছবি যখন বেশি করে শহর-ঘেঁষা হয়ে পড়েছিল, তখন প্যারালাল সিনেমা হিট করিয়ে চমকে দিয়েছিলেন সৃজিত মুখার্জি, মৈনাক ভৌমিক, শিবপ্রসাদ-নন্দিতা এবং অবশ্যই অনীক দত্ত। এই পথ অবশ্য আগেই দেখিয়ে গিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।
'ভূতের ভবিষ্যৎ' কেন হিট হল, সেটা বলা কঠিন। এই মুহূর্তে রিলিজ করলে হয়তো তা না-ও হতে পারত। কিন্তু 'ওয়ান বুক অথার'-এর মতো ওই একটি ছবি বানিয়েই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিজের নামটি পাকা করে নেন অনীক। পপুলার কালচারে একেবারে স্থায়ী আসন করে নেয় হাতকাটা কার্তিক, পোঁদ প্রধান চরিত্রগুলো। একটা ইন্টারভিউতে অনীক বলেছিলেন, এক ভদ্রলোক তাঁকে নাকি রীতিমতো থ্রেট দেন, 'ভূতের ভবিষ্যৎ আমি বাষট্টি বার দেখেছি। পরের ছবিতে ঝোলালে বাড়ি গিয়ে পেঁদিয়ে আসব।'
পানিং-কে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন অনীক। আমি নিজে পানপ্রিয় বলে তাঁর ছবির ডায়লগ এখনও মুখস্থ।
অনীক দত্ত বিজ্ঞাপন জগতের মানুষ বলে বিস্তর ক্যাচলাইন তাঁকে তৈরি করতে হয়েছে। শব্দ নিয়ে কায়দাবাজিতে তাই তিনি রীতিমতো দড়। 'আশ্চর্য প্রদীপ' সিনেমায় মৃৎশিল্পী খরাজ মুখোপাধ্যায় ডায়লগ দেন, 'মাত্র পাঁচ কেজির মূর্তি হবে? তাহলে তো কুচযুগ কুঁচো সাইজের করতে হবে।'
অথবা, 'আইভি নাম শুনলেই এইচআইভির কথা মনে পড়ে।
কিংবা, 'অনিলদা, আপনি রুম নাম্বার ফোর জিরো জিরোতে গিয়ে একটু জিরোন।'
অথবা, 'কুমোরটুলিতে যারাই ঠাকুর বানায়, তাদের পদবি প্রায় সবারই পাল কেন বলুন তো?'
'কুমোরটুলিতে পালেদের কেমন যেন একটা মনোPaulই। এজন্যই বোধহয় রবি ঠাকুর প্রতিবাদ করে লিখেছিলেন পাল তুলে দাও, দাও দাও দাও।'
সত্যি বলতে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের ক্যারিয়ার মোটেই ভাল যাচ্ছিল না তখন। কিন্তু একই বছরে মুক্তি পাওয়া দুটো ছবি তাঁর ক্যারিয়ারের পালে তুফান তুলে দিয়েছিল- 'কাহানি' আর 'ভূতের ভবিষ্যৎ'। হাতকাটা কার্তিক চরিত্রের 'তুই কে রে শান্তিগোপাল' কিংবা 'দুটো পেটো সব পাতলা' ডায়লগও অমরত্ব পেয়েছে।
সত্যজিৎ রায়ের কট্টর ভক্ত ছিলেন অনীক। সত্যজিৎকে ধারণ করেছিলেন নিজের মধ্যে। যেভাবে পেরেছেন নিজের ছবির সাহায্যে ট্রিবিউট দিয়েছেন রায় সাহেবকে। 'ভূতের ভবিষ্যতে' হাজির করেছিলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় আর বিভূ ভট্টাচার্যকে। পানিংয়ে দড় ছিলেন রায়সাহেবও।
প্রশ্ন উঠতে পারে, পরিচালক অনীক কি ক্রমশ ফুরিয়ে আসছিলেন? না-ও হতে পারে, আবার হতেও পারে। কারণ শেষ দিকে তিনি যা যা ছবি বানিয়েছেন, সেগুলো যে দুর্দান্ত কিছু, তা বোধহয় তাঁর অতি বড় ভক্তও বলবে না।
অনেকেই আছেন, সারা জীবন ধরে সৃষ্টি করে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকে না তাঁদের।
অনেক লেখকই আছেন, যাঁরা হয়তো ফুলটাইমার হওয়ার জন্য আসেনওনি। গোড়ার দিককার সৃষ্টিতে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দেওয়ার পরে সেই একই পৃথিবীতে ঘুরপাক খেয়েছেন তাঁরা। মানুষের প্রত্যাশা বড্ড বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যে!
'ওয়ান বুক অথার'- এর তকমা লেগে যাওয়ার কারণেই হয়তো অনীকের অন্যতম সেরা সৃষ্টি 'বরুণবাবু বন্ধু' অতটা হাইপ পায়নি। আবার 'অপরাজিত' ব্লকবাস্টার হয়েছিল যতটা রায়বাবুর প্রতি ভালবাসা আর অত্যাশ্চর্য ভাল মেক আপের কারণে, ততটা হয়তো পরিচালক অনীকের জন্য নয়।
আবার অত্যন্ত দুর্বল ছবি হলেও 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই' কিন্তু ভাল ব্যবসা করেছিল অনীক দত্তের নামের জোরেই। একইসঙ্গে মুক্তি পেয়েছিল আরও সব হেভিওয়েট সিনেমা। সেগুলোকেও কিন্তু রীতিমতো টক্কর দিয়েছিল 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই'।
আসলে পরিচালক অনীক দত্তের সাফল্যের পিছনে অন্যতম বড় কারণ ছিল তাঁর ছবির নিখাদ বাঙালিয়ানা। বাঙালির সঙ্কট, বাঙালির দ্বিধাদ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন একগাদা খাঁটি বাঙালি চরিত্র আর বাঙালির হারিয়ে যাওয়া খাঁটি রসবোধের মেলা বসিয়ে।
তাঁর তৈরি থ্রিলার 'মেঘনাদবধ রহস্য' সিনেমা হিসেবে খুব উচ্চমানের নয়। কিন্তু এই সিনেমায় ব্যবহার করেছিলেন গণসঙ্গীতের মেজাজকে। নিকিতা গান্ধির গাওয়া 'তোমরা এখনও কি' গানটা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয় রীতিমতো। জীবনে একবারের জন্যও মেরুদণ্ড না নোয়ানো, স্পষ্টবাদী, মেজাজি অনীকও যেন ফুটে ওঠেন এই গানে। গানের কথা লিখেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। কথাগুলো এরকম :--
'তোমরা এখনও কি ঘুমের মধ্যে জেগে
তারার মিছিল দেখো আকাশের গায়ে,
গানের সঙ্গে হাঁটো বহুদূর, দূর পথ,
সময়ের ঝড় ঠেলে শ্রান্ত পায়ে।
ভাঙা ছাদ-কার্নিশে, পুরনো বার্নিশে
যে ব্যথা লেগে আছে, তাকে কি ফেরাও?
যে ডাক শুনেছিলে, পথেই পথ চেনা
সে কবি ঘুমিয়ে গেলে, তাকে কি জাগাও?
তোমরা এখনও কি …
ঘুমের মধ্যে জেগে?
বারুদ গন্ধের সেই সে গলিপথ
যেখানে ছেড়ে গেছে বন্ধুটির হাত,
যেখানে রক্তের শুকনো দাগ আজও
আবছা লেগে থাকে অন্তহীন রাত।
বারুদ পুড়েছিল, সেই যে গলিপথ
যেখানে ছেড়ে গেছে ভীরু সে হাত,
তাকে কি মনে পড়ে বেলা ও অবেলায়?
হয়তো জেগে থাকা শূন্যরাত।
এখন কালবেলা..
নদীরা পুড়ছে আজও,
তবুও আগুন নাকি উষ্ণ নয়,
কেউ তো রাখেনি কথা,
রাখার কথা কি ছিল,
কথারা প্রলাপ গায় শহরময়,
তোমরা এখনও কি পলাশ ফুটলে পথে
চমকে দাঁড়িয়ে ভাবো দিনবদল..
আবছা অক্ষর পুরনো ডায়েরিতে,
হন্যে হয়ে খোঁজো কার আদল?
তোমরা আজও কি পথে?
তোমরা আজও কি গাও?
তোমরা আজও কি ভাবো?
তোমরা আজও কি জাগো?
তোমরা আজও কি চাও?'