24/10/2026
২০২৬ গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ফোরামে সি চিন পিংয়ের বার্তা
গত শুক্রবারে উত্তর চীনের হ্যপেই প্রদেশের শিওং'আন নতুন অঞ্চলে আয়োজিত '২০২৬ গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ফোরাম'-এ এক বিশেষ বার্তা প্রেরণ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।
নিজের বার্তায় প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেন, বিশ্ব বর্তমানে এক শতাব্দীতে অদেখা এক দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এর ফলে শান্তি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
এই বৈশ্বিক সংকট নিরসনে নিজের মূল দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তিনি বলেন, "একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব শাসনব্যবস্থা এবং একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে আমি 'গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ' (জিজিআই) উত্থাপন করেছি।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ব্যাপক পরামর্শ, যৌথ অবদান এবং সুফলের সমবণ্টনভিত্তিক বিশ্ব শাসনের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে চীন সব পক্ষের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত। পাশাপাশি পারস্পরিক আস্থা অর্জনের মাধ্যমে শক্তি সংহত করা এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপর তিনি জোর দেন।
অশান্তি ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই বিশ্বে স্থিতিশীলতা, নিশ্চিত ভাব এবং ইতিবাচক শক্তি সঞ্চার করতে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং 'জিজিআই' বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে মানবজাতির জন্য একটি যৌথ ভবিষ্যতের পথ সুগম হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চায়নিজ পিপলস ইনস্টিটিউট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক ফোরামটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল— "আস্থা ও সহযোগিতা পুনর্গঠন: রূপান্তরমুখী বিশ্বে বিশ্ব শাসনব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নয়ন"।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল গভর্নেস ফোরাম হলো একটি আন্তর্জাতিক উচ্চপর্যায়ের প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, গবেষক, ব্যবসায়ী, সংবাদমাধ্যম এবং যুব প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার উদ্দেশ্যে একত্রিত হন। বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ন্ত্রণ, বহুপাক্ষিক বাণিজ্য, দারিদ্র্য বিমোচন এবং টেকসই নগর উন্নয়নের মতো সংকটগুলোর যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করার জন্য কাজ করছে এই ফোরাম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর বিশ্বব্যবস্থায় শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা মেটাতে এবং জাতিসংঘভিত্তিক বহুপাক্ষিক শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং 'গ্লোবাল গভর্নেস ইনিশিয়েটিভ' (GGI) উত্থাপন করেন। এই নীতিগত উদ্যোগটি চালুর এক বছরের মাথায় এটি ১৬০টিরও বেশি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমর্থন লাভ করে এবং ৬০টিরও বেশি দেশ 'গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস অব গ্লোবাল গভর্নেস'-এ যোগদান করে।
এই বিশ্বব্যাপী শাসন সংস্কারের উদ্যোগ ও আলোচনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সিয়োংআন নিউ এরিয়া-তে এই গ্লোবাল গভর্নেস ফোরাম আয়োজন করা হয়। সিয়োংআন অঞ্চলটি ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চীনের সবুজ নগর উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত স্মার্ট সিটি ও আধুনিক নগর শাসনের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গ্লোবাল গভর্নেস ফোরামের আয়োজক ও মূল উদ্যোক্তা হিসেবে চীন অত্যন্ত সক্রিয় ও সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা পালন করছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্মেলনে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য চীনের অবস্থান তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চীন ৮টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। এগুলো হলো:
o নভেম্বর মাসে এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (APEC) শীর্ষ সম্মেলন সফলভাবে আয়োজন করা।
o জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার প্রক্রিয়ায় গভীরভাবে যুক্ত থাকা।
o 'গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস অব গ্লোবাল গভর্নেস'-এর কার্যক্রমের বিস্তার ঘটানো।
o সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নে সহায়তা করা।
o আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রশাসনে উন্নয়ন অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
o মহাকাশ শাসন শক্তিশালীকরণ সংক্রান্ত পজিশন পেপার প্রকাশ করা।
o কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সক্ষমতা বৃদ্ধি সম্পর্কিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
o একটি 'গ্লোবাল গভর্নেস রিসার্চ সেন্টার' স্থাপন করা, যা বিশ্ব প্রশাসন সূচক ও বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
তা ছাড়া, চীন জাতিসংঘ, ব্রিকস এবং শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর (বিশেষ করে আফ্রিকার) সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির আহ্বান জানায়।
মোহাম্মদ তৌহিদ, সিএমজি বাংলা, বেইজিং।