25/08/2026
মনছবিয়া ইহসানিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা, শাহ বাকী বিল্লাহ সিদ্দিকিয়া এতিমখানা ও আল ইহসান ফাউন্ডেশন
প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট:
আল্লাহর দ্বীনকে জমিনে প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামি শিক্ষার বিকল্প নেই। তাছাড়া আল্লাহ তা’লা ও তাঁর পিয়ারা হাবিব
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুহব্বত হাসিলের জন্য সমাজের এতিম, অসহায় মানুষের খেদমত বিরাট
একটি ভূমিকা রাখে, তরিকত বজুয খেদমতে খালকে নিস্ত’ অর্থাৎ খোদার সৃষ্টির সেবাই তরিকতের মূল লক্ষ্য।
ভারতের প্রসিদ্ধ দরবার ফুরফুরা শরীফের পীর ছাহেবের সাথে সাক্ষাতের জন্য ১৯৯৭ সালের ২৪ শে এপ্রিল,
আমাদের কুলাউড়ার আধ্যাত্নিক এক প্রাণ পুরুষ গৌড়করণের মাওলানা মনছব আলী ছাতাপীর (শাহ ছাহেব)
রাহিমাহুল্লাহ'র সাথে আমি ভারতে যাই। আমরা তাওবা ও বায়াতের পর, ফুরফুরা শরীফে পীর আল্লামা শাহ
বাকীবিল্লাহ সিদ্দিকি আল কোরাইশী আল ফুরফুরাবী ছাহেব, গৌড়করণের শাহ ছাহেব রাহিমাহুল্লাহ'র সামনে
আমাকে কিছু দায়িত্ব পালনের জন্য জোর তাকিদ প্রদান করেন। তিনি যেভাবে কামিল ওলী আল্লাহ, তেমনি হৃদয়
আলোড়ন সৃষ্টিকারী তাঁর কথা। তিনি সেদিন বলেছিলেন বাপু! বাংলাদেশে গিয়ে জায়গায়, জায়গায় মাদরাসা ও
খানকা প্রতিষ্ঠা করো। মানুষকে আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহ সাথে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করবে, একজন বা
দুজন মানুষ হলেও তাকে আল্লাহ, আল্লাহ জিকির শিখাবে। যাতে করে মানুষ মরণের সময় আল্লাহ তা’লার নাম
মুখে জপ করতে করতে মরতে পারে। তাছাড়া, বিধর্মীদের কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌছাবে। তিনি আমাকে
খাসভাবে আরও অনেক নসিহত করেছেন। যেগুলো এখানে আর উল্লেখ করলাম না। যাইহোক, পরে গৌড়করণের
শাহ ছাহেব আর আমি বাংলাদেশে চলে আসি। ভারত সফর শেষ করার পর নিজ মাতৃভূমিতে এসে আমার মনে
জাগলো ফুরফুরা সিলসিলার সবাইকে নিয়ে একটি জায়গায় বসে মাঝে মাঝে খানকাসহ কিছু ইসলামিক আলোচনা
করার জন্য একটি মারকায গড়ে তুলব। তিনি আমাকে যে নসিহত ও প্রেরনা দিয়ে ছিলেন তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে
আমার নিজ গ্রাম উত্তর কুলাউড়ার কিছু মানুষের সাথে আলোচনা করলাম যে, একটি হাফিজিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা
করব। সবাই একমত হলেন। গৌড়করণের শাহ ছাহেব রাহিমাহুল্লাহ'র সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, হাফিজিয়া
মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য এলাকার মানুষের সাথে পরামর্শ করেছি। সকলেই একমত হয়েছেন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা
করার। তিনি খুব খুশি হলেন। আমি বললাম দয়া করে আপনাকে প্রথম দিন সবক দিতে হবে। তিনি বললেন সবক
শুরুর দিন তারিখের আগে আমাকে জানাবে। আমি যাব ইনশাআল্লাহ। আমাদের নিজ গ্রামের সকলের সিদ্ধান্তে
গ্রামের মসজিদে সবক প্রদানের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হলো। ১২ ই রবিউল আওয়াল ২০০০ ইংরেজি সালে,
শাহ সুফি হযরত মাওলানা মনছব আলী (শাহ ছাহেব) রাহিমাহুল্লাহ মসজিদে এসে সুরাতুল ফাতিহা দিয়ে সবক
প্রদান শুরু করেন। সেদিন আমরা এলাকাবাসী উপস্থিত সকলে তাঁর সাথে বসে সুরাতুল ফাতিহা পড়েছিলাম। মাত্র
দুইজন ছাত্র আর একজন হাফিজ ছাহেব দিয়ে মাদারাসার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এভাবে মাদরাসা আল্লাহর রহমতে
চলতে থাকে। পরবর্তীতে একটা মিটিংয়ের মাধ্যমে গ্রামের সকলের পরামর্শ মুতাবিক মাদরাসার নামকরণ করা হয়
'মনছবিয়া ইহসানিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা'। এরপর থেকে হাফিজি মাদরাসার কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলতে
থাকে। পরবর্তীতে ফুরফুরা তরিকার আরেক চেরাগ উপমহাদেশের প্রখ্যাত ওলী হযরত নিজাম উদ্দিন বিশকুটি
রাহিমাহুল্লাহ'র সাথে এক সফরে, গৌড়করণের হযরত শাহ ছাহেব রাহিমাহুল্লাহ'র অসুস্থ্যতার জন্য উনার বাড়ি
গৌড়করণে যাই। দেখা সাক্ষাতের পর আমি আমার মাদরাসার বিষয়ে দুই ওলীর সামনে কথা তুলি। গ্রামের কিছু
মানুষ ছাত্রদের লজিং দিয়েছিলেন তারা এখন বোর্ডিং খোলার কথা বলতেছেন। তারা ছাত্র রাখার অপারগতা
দেখাচ্ছেন। তাই, বোর্ডিং খুললে ভাল হবে তারা বলতেছেন। এই কথাগুলো তাদের সামনে বললাম। বিশকুটি
ছাহেব রাহিমাহুল্লাহ আমার কথা শুনে একবার শাহ ছাহেব রাহিমাহুল্লাহ'র দিকে থাকান আর একবার আমার দিকে
তাকাতে থাকেন। পরে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে বোর্ডিং খোলার এজাজত প্রদান
করলেন। পরে ২০০১ সালের মার্চ মাসের দিকে আমি লন্ডনে চলে আসি। মাদরাসাও কয়েক মাস বন্ধ ছিল। তখন
আমার হাতে কোন টাকা ছিলনা। তারপর আল্লাহ তা’লার অশেষ দয়ায় ২০০১ সালের শেষের দিকে আমি নিজ
গ্রামে মাদরাসার জন্য ১০ ডিসিমেল জায়গা খরিদ করি। পরবর্তী সাল ২০০২ ইংরেজিতে আমি আরও ১০ ডিসিমেল
জায়গা মাদরাসার জন্য ক্রয় করি। আল্লাহ তা’লার মেহেরবানীতে সেই ক্রয়কৃত জমিতে টিনসেডের একটি ঘর তৈরি
করি। এরপর মাদরাসা ছাত্র, শিক্ষক নিয়ে যথারীতি চলতে থাকে। আল্লাহর রহমতে ওলীদের দুয়ার বারাকায়
২০০৫ সালে মাদরাসায় এতিমখানা খোলা হয়। ১০/০৬/২০০৮ সালে এতিমাখানার ‘শাহ বাকী বিল্লাহ সিদ্দিকিয়া
এতিমখানা’ নামকরণ হয়। এরপর চুড়ান্তভাবে ০৮/০৯/২০০৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের
সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয় অধিদপ্তর ঢাকার মাধ্যমে এতিমখানার নামকরণ ‘শাহ বাকী বিল্লাহ সিদ্দিকিয়া এতিমখানা’
নিবন্ধন সনদপত্র মঞ্জুর হয়। টিন সেটের ঘরের পাশে ২০০৮ সাথে ইনজিনিয়ারের ড্রোয়িং অনুযায়ী পাঁচ তালা
ভবনের কাজ শুরু করি দয়াময়ের দয়ায় তার নির্মান কাজ সমাপ্ত হয়। আল হামদুলিল্লাহ।
আবার আমার সেইভাবে মনে জাগে অসহায় দীনদুঃখী মানুষের আরও খেদমতে আত্ননিয়োগ করতে। আর্ত
মানবতার খেদমতে নিজেকে আরও বেশি বিলিয়ে দিতে, তাই আল্লাহ তা’লার উপর ভরসা করে ২০১৩ সালে আল
ইহসান ফাউন্ডেশন গড়ে তুলি আল্লাহপাকের মেহেরবানীতে। আল ইহসান ফাউন্ডেশন মাধ্যমে বহুমুখী খেদমত
চলছে, যেমন আল ইহসান জামে মসজিদ, এস বি ওয়াটার এইড, এস বি হাউজিং প্রজেক্ট ও প্রতি বছর রামাদানে
বহু বিধবাদেরকে ইফতার সামগ্রী দিয়ে এতিম অসহায় ও বিধবাদের মুখে হাসি ফুটাতে চেষ্টা করা। আল
হামদুলিল্লাহ প্রতি বছর বহু বাচ্চা কুরআনুল কারীম বুকে ধারণ করে হাফিজ হয়ে বের হাচ্ছে। এ ভাবে ক্ষুদ্র থেকে
আরম্ভ করে আজ বহুমুখী দ্বীনী খিদমত চলছে এবং সবগুলি প্রকল্পের কাজ সম্প্রসারিত হচ্ছে। আল্লাহ তা’লা যেন
আমাদের সমস্ত শ্রমকে হাবিবে পাকের উছিলায় কবুল করেন। আমীন
মাআ'স সালাম