09/05/2026
দান-সদকা: বেতন এর টাকাকে মাসের শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট রাখার পরামর্শ-
ঘটনাটি এক সৌদি-যুবকের। সে তার জীবনের প্রতি মোটেও সন্তুষ্ট ছিল না। তার বেতন ছিল মাত্র চার হাজার রিয়াল। বিবাহিত হওয়ায় তার সাংসারিক খরচ বেতনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। মাস শেষ হওয়ার আগেই তার বেতনের টাকা শেষ হয়ে যেত, তাই প্রয়োজনের তাগিদে তাকে ঋণ নিতে হত। এভাবে সে আস্তে আস্তে ঋণের কাদায় ডুবে যাচ্ছিল। আর তার বেতনে এমন বিশ্বাস জন্ম নিচ্ছিল যে, তার জীবন এই অভাবেই কাটবে। অবশ্য তার স্ত্রী তার এ-অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখত। কিন্তু ঋণের বোঝা এত ভারী হয়েছিল, যেন নিশ্বাস নেওয়াও দুষ্কর।
একদিন সে তার বন্ধুদের এক মজলিসে গেল। সেদিন এমন একজন বন্ধু সেখানে উপস্থিত ছিল, যে অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি। যুবকের বক্তব্য এমন ছিল যে, আমার ওই বন্ধুর সকল পরামর্শকে আমি খুব গুরুত্ব দিতাম।
কথায় কথায় যুবক তার সকল অবস্থা বন্ধুকে বলল। বিশেষত আর্থিক সমস্যাটা তার সামনে তুলে ধরল। তার বন্ধু মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনল এবং বলল, আমার পরামর্শ হল- তুমি তোমার বেতন থেকে কিছু টাকা সদকার জন্যে নির্ধারণ কর। যুবক আশ্চর্য হয়ে বলল, জনাব! সাংসারিক প্রয়োজন পুরনেই ঋণ নিতে হয়; আর আপনি আমাকে সদকার জন্যে টাকা নির্ধারণ করতে বলেছেন?
যাইহোক, যুবক বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি স্ত্রীকে জানাল। তার স্ত্রী বলল, পরিক্ষা করতে সমস্যা কী? হতে পারে আল্লাহ্ তা’আলা তোমার জন্যে রিযিকের দরজা খুলে দিবেন। যুবক বেতনের চার হাজার রিয়াল থেকে ত্রিশ রিয়াল সদকার জন্যে নির্ধারণের ইচ্ছা করল এবং মাসশেষে তা আদায় করতে শুরু করল।
সুবহানাল্লাহ! এতে তার (আর্থিক) অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেল। সে তো সবসময় টাকা-পয়সার চিন্তা টেনশনেই পড়ে থাকত; আর এখন তার জীবন যেন ফুলের মতো হয়ে গেছে। এত ঋণ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে স্বাধীন মনে হত। মনের মধ্যে এমন এক অনাবিল শান্তি হচ্ছিল, যা বলে বুঝানো সম্ভব নয়।
কয়েক মাস পর থেকে সে নিজের জীবনকে সাজাতে শুরু করল। নিজের আয়কৃত টাকা কয়েক ভাগে ভাগ করল, আর তাতে এমন বরকত হল, যা পূর্বে কখনও হয়নি। সে হিসাব করে একটা আন্দাজ করল, কত দিনে ঋণের বোঝাটা মাথা থেকে নামাতে পারবে ইনশাআল্লাহ।
কিছুদিন পর আল্লাহ তা’লা তার সামনে আরও একটি পথ খুলে দিলেন। সে তার এক বন্ধুর সাথে প্রপাটি-ডিলিং এর কাজে অংশ নিতে শুরু করে। সে বন্ধুকে গ্রাহক/ক্রেতা এনে দিত, তাতে ন্যায্য প্রফিট পেত।
আলহামদুলিল্লাহ! সে যখনই কোনো গ্রাহকের কাছে যেত, গ্রাহক অবশ্যই তাকে অন্য গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছনোর রাস্তা দেখিয়ে দিত। এখানেও সে ঐ আমলের পুনরাবৃত্তি করত। অর্থাৎ প্রফিটের টাকা হাতে আসলে (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে) অবশ্যই তা থেকে সদকা নির্ধারণ করত।
আসলে ‘সদকা কী’ তা কেউ জানে না; ঐ ব্যক্তি ব্যতিত যে তা পরীক্ষা করেছে। সদকা কর এবং সবরের সাথে চল- আল্লাহর ফযলে খায়ের বরকত নাযিল হবে, যা নিজ চোখে দেখতে পাবে।
নোট:- যদি আপনি কোনো মুসলমানকে তার উপার্জনের একটি অংশ সদকার জন্যে নির্ধারণ করতে বলেন এবং এর উপর আমল করে, আপনিও ঐ পরিমাণ সওয়াব পাবেন যে পরিমাণ সদকাকারী পেয়েছে। আর সদকাকারীর সওয়াবে কোনো কমতি আসবে না।
আপনি দুনিয়া থেকে চলে যাবেন আর আপনার অবর্তমানে কেউ আপনার কারণে সদকা করতে থাকবে। আপনি সওয়াব পেতে থাকবেন।
যদি আপনি তালিবে ইলমও হন এবং আপনার আয় একেবারে সীমিত ও নির্ধারিতও হয় তবুও কম-বেশি, যতদূর সম্ভব (সামান্য কিছু হলেও) সদকার জন্যে নির্ধারণ করুন।
যদি সদকাকারী জানতে ও বুঝতে পারে যে, তার সদকা ফকিরের হাতে যাওয়ার আগে আল্লাহর হাতে যায়। তাহলে অবশ্যই সদকা গ্রহণকারীর তুলনায় সদকাদানকারী অনেক গুণ বেশি আত্মিক প্রশান্তি লাভ করবে।
◾সদকা দানের উপকারিতা:-
সদকা দানকারী এবং যে তার কারণ হবে সেও এ সকল ফায়েদার অন্তর্ভুক্ত।
১. সদকা জান্নাতের দরজাসমূহের একটি।
২. সদকা আমলের মধ্যে উত্তম আমল।
৩. সদকা কেয়ামতের দিন ছাঁয়া হবে এবং সদকা-আদায়কারীকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবে।
৪. সদকা আল্লাহ তা‘লার ক্রোধকে ঠান্ডা করে এবং কবরের উত্তপ্ততায় শীতলতার উপকরণ হবে।
৫. মৃতব্যক্তির জন্যে উত্তম বদলা এবং সবচে’ উপকারী বস্তু হল সদকা। আর সদকার সওয়াবকে আল্লাহ তা‘আলা ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে থাকেন।
৬. সদকা পবিত্রতার আসবাব, আত্মশুদ্ধির মাধ্যম ও সৎকাজের প্রবর্ধক।
৭. সদকা কেয়ামতের দিন সদকাকারীর চেহারার আনন্দ ও প্রফুল্লতার কারণ হবে।
৮. সদকা কেয়ামতের ভয়াবহ অবস্থায় নিরাপত্তা হবে। অতীতের জন্যে আফসোস করা থেকে বিরত রাখে।
৯. সদকা গুনাহের ক্ষমা এবং খারাপ কাজের কাফফারা।
১০. সদকা উত্তম মৃত্যুর সুসংবাদ এবং ফেরেস্তাদের দোয়ার কারণ।
১১. সদকা দানকারী সর্বোত্তম বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত এবং সদকার সওয়াব প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি পায় যে কোনো না কোনোভাবে অংশীদার হয়।
১২. সদকা দানকারীর সঙ্গে সীমাহীন কল্যাণ ও বিরাট প্রতিদানের ওয়াদা রয়েছে।
১৩. খরচ করা মানুষকে মুত্তাকীদের কাতারে শামিল করে। সদকাকারীকে সৃষ্টিকূল মুহাব্বত করে।
১৪. সদকা দয়া-মায়া ও দানশীলতার আলামত।
১৫. সদকা দোয়া কবুল এবং জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যম।
১৬. সদকা বালা-মসিবত দূর করে দুনিয়াতে সত্তরটা খারাপির দরজা বন্ধ করে।
১৭. সদকা হায়াত ও মাল বৃদ্ধির মাধ্যম। সফলতা এবং রিজিকের প্রশস্ততার মাধ্যম।
১৮. সদকা চিকিৎসা, ঔষধ ও সুস্থতা।
১৯. সদকা আগুনে পোড়া, পানিতে ডোবা ও অপহরণসহ (সকল) অপমৃত্যুর প্রতিবন্ধক।
২০. সদকার প্রতিদান পাওয়া যায়- চাই তা পশু-পাখিকেই দেওয়া হোক না কেন।
শেষকথা: ব্যক্তিগত জীবনে আমরা নিজেদের উপার্জন থেকে প্রতিমাসে অনাথ বাচ্চা ও পরিবারকে সদকা হিসেবে দান করতাম। এবং এখনো নিয়মিত করি। আমাদের চেষ্টা থাকে সবসময়। এছাড়াও কিছু দরিদ্রকে অর্থ বস্ত্র চিকিৎসা শিক্ষাসহ বিভিন্ন মানবিক সাহায্য করতাম। এবং আমরা এখন বহুবছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা করে যাচ্ছি। মানুষের বিপদ আপদে নিজেদের পকেট থেকে সাহায্য করতাম এবং আমাদের বিভিন্ন সামগ্রী প্রায় দেড় যুগ ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিবারে অনুদান হিসেবে উৎসর্গ করেছি, যা বর্তমানেও চলমান। জীবনে অনেক বড় বড় বিপদ ফেস করেছি। আল্লাহর রহমতে কেউ আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারেনি। আলহামদুলিল্লাহ। কখনও আর্থিক কষ্ট অনুভব করলে আল্লাহ পুষিয়ে দিয়েছেন। সাদকা গুন এতই ফলপ্রসূ তা আমাদেরও জানা ছিল না।
এই মুহূর্তে আপনার জন্যে সর্বোত্তম সদকা হল, এই কথাগুলো সদকার নিয়তে প্রচার করা।