12/08/2026
বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব
(রাজা দেবাশীষ রায়ের ফেসবুক পোস্ট থেকে অনূদিত)
১২ আগস্ট ২০২৬
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এবং বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই—এমন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের এই বক্তব্য আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আমি তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি এবং কোনো দ্বিধা ছাড়াই সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে তা প্রত্যাখ্যান করছি।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে যারা নিজেদের আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে দাবি করেন—যেমন গারো, সাঁওতাল ও বম—এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের তিনজন সংসদ সদস্য যে জনগোষ্ঠীগুলোর অন্তর্ভুক্ত, যথাক্রমে চাকমা, মারমা ও ওঁরাও—তাঁরা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠী (Indigenous Peoples)।
এটি কেবল আমার ব্যক্তিগত মতামত নয়; আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞদেরও অভিমত। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জাতিসংঘের বিভিন্ন সময়ের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক এবং ওয়ার্কিং গ্রুপসহ অন্যান্য মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ ব্যবস্থার সদস্যরা।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক দলিলগুলোর মধ্যে ২০০৭ সালে গৃহীত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণা (UNDRIP) এবং ২০১৪ সালে গৃহীত বিশ্ব আদিবাসী সম্মেলনের ফলাফল দলিল (Outcome Document of the World Conference on Indigenous Peoples)-এ ‘Indigenous Peoples’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আমেরিকা ও অস্ট্রেলেশিয়ায় বসবাসকারীদের ‘Indigenous Peoples’ এবং এশিয়া ও আফ্রিকায় বসবাসকারীদের ‘Tribal Peoples’ হিসেবে চিহ্নিত করার পুরোনো বিভাজনের অবসান ঘটেছে।
১৯৮৯ সালের আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯, যা ‘Indigenous’ ও ‘Tribal’ Peoples সম্পর্কিত এবং নেপালসহ বিভিন্ন দেশ কর্তৃক অনুসমর্থিত, এবং ১৯৫৭ সালের আইএলও কনভেনশন নং ১০৭, যা ‘Indigenous’ ও ‘Tribal’ Populations সম্পর্কিত এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশ কর্তৃক অনুসমর্থিত—উভয় দলিলেই ‘indigenous’ ও ‘tribal’ শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়েছে। একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট কনভেনশনের বিধান ‘indigenous’ ও ‘tribal’—উভয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য।
‘Indigenous Peoples’ পরিভাষাটি আগামী বহু দশক বা তারও বেশি সময় ধরে বহাল থাকবে। বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ‘tribes’, ‘ethnic groups’ বা ‘minorities’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করে বলে জাতিসংঘ অদূর ভবিষ্যতে তাদের সেই অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক দলিল গ্রহণ করবে—এমন সম্ভাবনা নেই।
UNDRIP জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়ার সময় বাংলাদেশসহ ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ঘোষণাটির বিধান এসব দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে UNDRIP গৃহীত হওয়ার সময় যে চারটি দেশ এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল—অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র—পরবর্তী সময়ে তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণাকে সমর্থন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (UN DESA)-এর ভাষায়:
“বর্তমানে এই ঘোষণাটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক সবচেয়ে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক দলিল। এটি বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষা, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য ন্যূনতম মানদণ্ডের একটি সর্বজনীন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিশেষ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান মানবাধিকার মানদণ্ড ও মৌলিক স্বাধীনতাগুলো কীভাবে প্রযোজ্য, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে।”
অতএব, UNDRIP এমন একটি মর্যাদায় পৌঁছেছে, যা সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights—UDHR)-এর মর্যাদার সঙ্গে তুলনীয়। UDHR গৃহীত হওয়ার সময় কোনো দেশ এর বিপক্ষে ভোট দেয়নি, যদিও আটটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল এবং দুটি দেশ অনুপস্থিত ছিল।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ও অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা অনেকটা উটপাখির বালুর নিচে মাথা গুঁজে দিয়ে এই ধারণা করার মতো যে, সে যেহেতু অন্য কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, তাই অন্য কোনো প্রাণীও তাকে দেখতে পাচ্ছে না।
সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, ‘indigenous’, ‘aboriginal’ এবং ‘adibashi’—এই তিনটি শব্দই বাংলাদেশের বর্তমানে কার্যকর বিভিন্ন আইনে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন, ১৯০০ (CHT Regulation 1900), রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (State Acquisition and Tenancy Act 1950) এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০ (Small Ethnic Groups Cultural Institutions Act 2010)।
এছাড়াও বাংলাদেশের অন্তত তিনজন সরকারপ্রধান—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ—৯ আগস্ট, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস (International Day of the World’s Indigenous Peoples) উপলক্ষে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উদ্দেশে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন, যার অর্থ Indigenous Peoples।
এর পাশাপাশি জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক হোসে আর. মার্টিনেজ কোবো (Jose R. Martinez Cobo) আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যবিষয়ক তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ সরকার তাঁকে এমন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানিয়েছিল, যারা “প্রাচীনকাল থেকে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করে আসছে।”
সূত্র: Cobo, Jose R. Martinez, Study of the Problem of Discrimination against Indigenous Populations, UN Doc: E/CN.4/Sub.2/1982/2/Add.6, 20 June 1982, para. 253.