12/04/2025
"বিদেশী ভাষা শিখতে আগে প্রয়োজন বাংলা ভাষার গাঁথুনি"
অল্প কিছুদিন আগের কথা। ও-লেভেল শেষ করে একটা ছেলে ডাডের ঢাকা অফিসে গেছে। উদ্দেশ্য জার্মানিতে ব্যাচেলর করতে কি কি দরকার সেটা সম্পর্কে জানা। ছেলেটি প্রকৌশলী হতে চায়, ডাডের অফিসার তাকে বললেন, তার এ-লেভেলে গণিত, রসায়ন এবং পদার্থবিদ্যা থাকতে হবে। ছেলেটি তার কথা মতন এই বিষয় গুলো নিয়ে এ-লেভেল শুরু করে দিল। একই সাথে সে জার্মান ভাষায় ভর্তি হল। তার স্বপ্ন জার্মানিতে গাড়ির প্রকৌশলী হওয়া, যেকোনো মূল্যে সে তার লক্ষে পৌঁছাবে।
এ-লেভেল পড়া শেষের দিকে, জার্মান ভাষাও বি-১ পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে- এমন একটা সময়ে ছেলেটা জার্মানিতে আবেদন করা শুরু করল। আবেদন করার পর সে খুব দ্রুত উত্তর পেল। এত বেশি দ্রুত যে, সে নিজেও অবাক হয়ে গেল। প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হল, জার্মানিতে ব্যাচেলর করার জন্য সে উপযোগী নয়। কারণটা আর কিছু নয়, জার্মানিতে ব্যাচেলর করতে অন্তত একটা ভাষা (বাংলা বা ইংরেজি) নিয়ে পড়া থাকতে হবে।
ডাডের অফিসার ভদ্রলোক ভুল করে এই ব্যাপারটি খেয়াল করেননি। সাধারণত যারা বাংলা মিডিয়ামে পড়ে, তারা নিজের অজান্তেই এবং কিছুটা অনীহার সাথে বাংলা বা ইংরেজি পড়ে। ইংলিশ মিডিয়ামে এ-লেভেলে এটা নিতে হবে এমন কোন কথা নেই!
ছেলেটা প্রচন্ড নাড়া খেয়ে গেল, ভুলটা তার ছিল না। কিন্তু অন্যের এই সামান্য ভুলের জন্য তাকে আবার নতুন করে বাংলা (বা অন্য একটি ভাষা) নিয়ে পড়তে হবে, এর জন্য খরচ হয়ে যাবে মূল্যবান অনেকটা সময়।
তবে আমার গল্পের মরাল ছিল এই যে, জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য সবচেয়ে আগে যে যোগ্যতাটি প্রয়োজন, সেটি হল একটি ভাষার উপর দক্ষতা থাকা। একটি ভাষার উপর নিপুণ দক্ষতা এবং বিশুদ্ধতা না থাকলে উচ্চশিক্ষাতে কোনভাবেই তাকে যোগ্য হিসেবে গণ্য করা হবে না। এই নিয়ম সম্ভবত আমেরিকা কানাডায় নেই। তবে জার্মানিতে এটা আবশ্যক।
আমাদের দেশের সিংহভাগ ছেলে মেয়ে বাংলিশে বাতচিত করে।
অনেকের হিন্দির প্রতিও দুর্বলতা আছে বলে শোনা যায়। বিদেশী ভাষা শেখা খারাপ নয়, কিন্তু সেটা নিজের ভাষা বাদ দিয়ে নয়। অন্তত একটি ভাষাতে সবাইকেই সুনিপুণ হতে হবে। সেটা না হলে, প্রকৌশল হোক আর চিকিৎসা বিদ্যায় পড়া হোক, জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়তে হবে।
যেকোনো নতুন বিদেশী ভাষা শিখতে আমরা সাধারণত জানা ভাষায় প্রথমে সেই বস্তু বা ঘটনাটিকে মনে মনে কল্পনা করি। পরের পর্বে সেই কথাগুলোকেই অবচেতন মন নতুন ভাষায় রূপান্তর করে। এখানে যদি মূল ভাষাতেই গলদ থেকে যায়, তাহলে অনুবাদের মান যে ভাল হবে না- এটা বলাই বাহুল্য।
একজন মানুষ একটি ভাষায় দক্ষ কিনা, এর প্রমাণ পাওয়া যায় তার নিত্য জীবনে সেই ভাষাটির প্রয়োগ এবং চর্চার মাধ্যমে। আমরা কথা বলার সময় যে পরিমাণ বিদেশী শব্দ ব্যবহার করি, সেখান থেকে প্রমাণিত হয় যে, অন্তত একটি ভাষাতে নিখুঁত ভাবে মনের ভাব প্রকাশের যোগ্যতা থেকে আমরা জাতিগতভাবে অনেকখানি পিছিয়ে আছি।
জার্মান শেখার সময় আমাদের মনের ভেতর একটির বদলে দুইটি অনুবাদের মেশিন চলে। একবার বাংলা থেকে ইংরেজি, তারপর ইংরেজি থেকে জার্মান। এটা আমাদের ছেলেমেয়েদের জার্মান শেখার সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা।
আমি নিজে এক সময় এই ডুয়েল প্রসেসিং এর কাজ করতাম, এবং নিজের অভিজ্ঞতা বলে এই কারণে অনেক জার্মান শব্দ জানলেও বলার ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যা হত। সরাসরি বাংলাতে চিন্তা করে সেটাকে জার্মান করার অভ্যাস করলে জার্মানে কথা বলতে সুবিধে হয়। একই সাথে একটা প্রসেসর কম ব্যবহার করাতে মাথা ঠাণ্ডা থাকে।
তাহলে যেটা বলছিলাম, সবাই ভাল করে বাংলা শেখ। বেশি করে বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে বের করে প্রতিনিয়ত অনুশীলন কর। তার জন্য বাংলায় লেখাটার গুরুত্ব অতীব। যারা আজকে বাংলায় ভাল করে একটি বিষয় সাজিয়ে লিখতে পারছে না, তারা কোনদিনও ইংরেজিতে বা জার্মানে থিসিস বা পেপার লেখায় সফল হতে পারবে না। সামান্য এই ফেসবুকেই চ্যাট হোক, আর উচ্চশিক্ষার প্রশ্নই হোক, বাংলায় অনুশীলন করি। প্রিয়জনকে বাংলায় লিখি, ভালবাসি, বাংলায় ভালবাসি।
পাদটীকা~ সেই ছেলেটি হাল ছেড়ে দেয় নি। ভাষা নিয়ে আবার এ-লেভেলের পরিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। আমার ধারণা ছিল ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা ভাল বাংলা পারে না। ছেলেটি আমার সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আমার সাথে ঘন্টার পর ঘণ্টা চমৎকার বাংলায় লিখে কথা বলল। একটা বানানও ভুল পেলাম না, শব্দচয়নে প্রায় কোন ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করল না। যার ইচ্ছে আছে, সে ঠিক পারে!
(আমি নিজেও এখনও শিখছি, কেউ বাংলা প্রতিশব্দ পেলে ধরিয়ে দেবে, ধন্যবাদ।)
#আদনান_সাদেক, বিসাগ।