11/04/2026
বৈসু ও গরিয়া নৃত্য নিয়ে মিতা ত্রিপুরা'র ভাবনা
"বৈসু ও গরিয়া নৃত্য: উৎসব ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন"-
পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব হলো বৈসু। ত্রিপুরা জনজাতি চৈত্র-বৈশাখ সংক্রান্তিতে বৈসু উৎসব পালন করে থাকে। বৈশাখের শুরুতে আয়োজিত এই উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো গরিয়া নৃত্য (খেরেবাই), যা ধন-সম্পদ ও সুখ-সমৃদ্ধির দেবতা গরিয়াকে সন্তুষ্ট করতে পরিবেশন করা হয়।
হারি বৈসু (প্রথম দিন): উৎসবের শুরু হয় ঘরদোর পরিষ্কার করা এবং ফুল দিয়ে বাড়ি সাজানোর মাধ্যমে।এদিন ভোরে ছোট ছেলেমেয়েরা বন থেকে বুনো ফুল (বিশেষ করে ভাতৌ ফুল) সংগ্রহ করে পবিত্র স্নান সেরে দেবতাকে ফুল উৎসর্গ করে।ঘরবাড়ি সাজানোর পাশাপাশি গবাদি পশুকে স্নান করিয়ে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া হয় যা প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি রূপ।
বৈসুমা (দ্বিতীয় দিন): এটি উৎসবের মূল দিন। ঘরে ঘরে হরেক রকমের পিঠা এবং বিভিন্ন পদের সবজি, ভেষজ মূল এবং বাঁশকোড়ল দিয়ে তৈরি করা হয় ঐতিহ্যবাহী খাবার পাচন। এদিন ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়।
বিসিকাতাল (তৃতীয় দিন):
এটি নববর্ষের দিন। এদিন মন্দিরে প্রার্থনা করা হয় এবং বয়স্কদের সেবা করার মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়।
গরিয়া নৃত্য: সমৃদ্ধির আরাধনা
বৈসু উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো গরিয়া নৃত্য। গরিয়া নৃত্য কেবল একটি নাচ নয়, এটি একটি পবিত্র আচার। ত্রিপুরাদের পরম আরাধ্য 'গরিয়া' দেবতার সন্তুষ্টির জন্য এটি পরিবেশিত হয়। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, 'গরিয়া' হলেন তুলা ও কৃষির দেবতা। তাকে সন্তুষ্ট করলে সারা বছর ভালো ফসল হবে এবং দুঃখ-কষ্ট দূর হবে।
নৃত্যের শৈলী: তরুণ-তরুণীরা দলবদ্ধভাবে ঢোলের (খ্রাম) তালে এই নাচ পরিবেশন করা হয়, সাথে থাকে আরও বাঁশির (সুমুর) সুর। ২২ টি ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রায় মানব জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সংঘটিত ক্রিয়াকলাপ প্রদর্শিত হয়, নাচের মুদ্রায় জুম চাষের বিভিন্ন ধাপ (যেমন- বীজ বোনা, আগাছা পরিষ্কার ও ফসল কাটা) ফুটিয়ে তোলা হয়।
সংস্কৃতির প্রতীক: নৃত্যশিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নৃত্য পরিবেশন করে থাকে। প্রত্যেক নৃত্যশিল্পীর হাতে থাকে একটি রিসা ও বাঁশের দুইটি কঞ্চি। নৃত্যশিল্পীদের ব্যবহৃত রিসার মুখে বেঁধে দেওয়া হয় মন্ত্রপূত করা একটি পৈত্যা যা তাদের সকল প্রকার অশুভ থেকে রক্ষা করে।
সামাজিক বন্ধন: গরিয়া নাচের দল এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। গৃহস্থরা সাধ্যমতো চাল, টাকা বা ফলমূল দিয়ে নৃত্যশিল্পীদের আপ্যায়ন করে, যা সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও প্রীতি বাড়ায়।
বৈসু ও গরিয়া নৃত্য শুধু উৎসব নয়—এটি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
লেখক: মিতা ত্রিপুরা
সদস্য, টিএসএফ.বিডি, সিএমবি,
ও
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়