25/03/2026
"আপনার জেলায় একাত্তরে কতো মানুষের শহীদ হয়েছিলেন?"
গবেষক কল্যাণ চৌধুরী তাঁর 'জেনোসাইড ইন বাংলাদেশ' গ্রন্থে ১৯৭২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত নিহতের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে তখনকার ১৮টা জেলায় মুক্তিযুদ্ধে ১২,৪৭,০০০ মানুষের মৃত্যুর একটি হিসাব দেন। ওনার হিসাবে কোন জেলায় কত মানুষ মারা গেছেন তার তালিকা উল্লেখ করেছেন।
এই তথ্য গণহত্যা গবেষক ড. বারবারা হার্ফ ও ড. টেড রবার্ট গার তাঁদের ১৯৮৮ সালের কাজ Toward Empirical Theory of Genocides and Politicides-এ উল্লেখ করেন।
________________________________________
দেখে নেন এখানে আপনার জেলায় একাত্তরে কতো মানুষের শহীদ হয়েছিলেন-
নিচে ১৮টি জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল, ধ্বংসের মাত্রা, গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং উদ্ধার হওয়া গণকবরের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।
________________________________________
১. খুলনা জেলা
খুলনা শহর, বাগেরহাট, চালনা, দৌলতপুর-ডুমুরিয়া, শাখারীকাঠি, লক্সিখালী, চুকনগর, গল্লামারি, খালিশপুর ও চাঁদনীপুর ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা।
• সম্পদ ধ্বংস: ৭০%
• গণবধ্যস্থান: ১২০টি
• ধর্ষিত নারী: ৬,০০০
• উদ্ধারকৃত কঙ্কাল: ৮,৫০০
• মোট নিহত: ১,৫০,০০০
চুকনগরের গণহত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনাই খুলনার হত্যাযজ্ঞের অন্যতম চিহ্ন।
________________________________________
২. কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়া শহর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, মুনশিগঞ্জ, ভেড়ামারা ও কুমারখালি আয়ত্ত অঞ্চলে দখলদার বাহিনী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্বিচারে হামলা চালায়।
• সম্পদ ধ্বংস: ৪০%
• গণবধ্যস্থান: ৬০টি
• ধর্ষিত নারী: ১,২৫০
• কঙ্কাল: ৫,৫০০
• মোট নিহত: ৪০,০০০
________________________________________
৩. যশোর
যশোর শহর ও শহরতলি, নড়াইল, ঝিনাইদহ, বেনাপোল, ঝিকরগাছা, চৌগাছা এবং চাঁচড়া গ্রাম ছিল হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু।
• সম্পদ ধ্বংস: ৭০%
• গণবধ্যস্থান: ১১০
• ধর্ষিত নারী: ৩,৫০০
• কঙ্কাল: ৬,১০০
• মোট নিহত: ৭৫,০০০
________________________________________
৪. বরিশাল
বরিশাল শহর, ঝালকাঠি, রাজাপুর, কাঠালিয়া, স্বরূপকাঠি, পিরোজপুর, কাথালিয়া, মঠবাড়ি ও বাবুগঞ্জ জুড়ে চালানো হয় আগুন-লুট-হত্যার বিস্তৃত অভিযান।
• সম্পদ ধ্বংস: ৬০%
• গণবধ্যস্থান: ৪৭
• ধর্ষিত নারী: ৩,৪০০
• কঙ্কাল: ২,৫০০
• মোট নিহত: ৬৫,০০০
________________________________________
৫. নোয়াখালী
নোয়াখালী শহর, ফেনী, কালিদহা, রায়পুর, দত্তপাড়া, লক্ষ্মীপুর, রামগঞ্জ, আমিরগাঁও ও সাঙ্গাজী ছিল টার্গেট এলাকা।
• সম্পদ ধ্বংস: ৭০%
• গণবধ্যস্থান: ৮৬
• ধর্ষিত নারী: ৪,২০০
• কঙ্কাল: ২,৮০০
• মোট নিহত: ৭৫,০০০
________________________________________
৬. পটুয়াখালী
পটুয়াখালী শহর, বরগুনা, গলাচিপা, বাঘা ও বামনা অঞ্চল ভয়াবহ ধ্বংসের শিকার হয়।
• সম্পদ ধ্বংস: ৮০%
• গণবধ্যস্থান: ৫২
• ধর্ষিত নারী: ১,৫০০
• কঙ্কাল: ৩,০০০
• মোট নিহত: ৩৫,০০০
________________________________________
৭. কুমিল্লা
কুমিল্লা শহর, চান্দপুর, হাজীগঞ্জ, চন্দিনা, এলিয়টগঞ্জ, মতলব, কাসবা, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চান্তা, গাঙ্গাসগর, বিষ্ণুপুর, দুর্গাপুর, রাধানগর, আজমপুরসহ বহু জনপদে সংঘটিত হয় সংগঠিত গণহত্যা।
• সম্পদ ধ্বংস: ৯০%
• গণবধ্যস্থান: ২২০
• ধর্ষিত নারী: ৭,৫০০
• কঙ্কাল: ১১,০০০
• মোট নিহত: ৯৫,০০০
________________________________________
৮. সিলেট
সিলেট শহর, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, চাটখিল, তাহিরপুর, শমশেরনগর, গাজীপুর, কালীগঞ্জ, সাইদপুর, ফুছলছড়ি ইত্যাদি এলাকায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়।
• সম্পদ ধ্বংস: ৮৫%
• গণবধ্যস্থান: ১৬৫
• ধর্ষিত নারী: ৬,০০০
• কঙ্কাল: ৯,৫০০
• মোট নিহত: ৮৫,০০০
________________________________________
৯. চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম শহর, পটিয়া, হাটহাজারী, লোহাগড়া, সাটকানিয়া, দোহাজারী—এলাকাজুড়ে চালানো হয় পরিকল্পিত ‘ethnic cleansing’।
• সম্পদ ধ্বংস: ৭০%
• গণবধ্যস্থান: ৯৫
• ধর্ষিত নারী: ৫,৫০০
• কঙ্কাল: ৮,৫০০
• মোট নিহত: ১,০০,০০০
________________________________________
১০. রাজশাহী
রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, সর্দা, চরঘাট, নাচোলসহ সমগ্র অঞ্চলে পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে।
• সম্পদ ধ্বংস: ৬৫%
• গণবধ্যস্থান: ৭০
• ধর্ষিত নারী: ৩,০০০
• কঙ্কাল: ২,৫০০
• মোট নিহত: ৪৫,০০০
________________________________________
১১. পাবনা
পাবনা, ঈশ্বরদী, সুজানগর, পাকশী, সাঁথিয়া, বেড়া, বোনারপাড়া প্রভৃতি এলাকায় সংঘটিত হয় অমানবিক নির্যাতন।
• সম্পদ ধ্বংস: ৬০%
• গণবধ্যস্থান: ৬৮
• ধর্ষিত নারী: ৭৫০
• কঙ্কাল: ২৫০
• মোট নিহত: ৩৫,০০০
________________________________________
১২. বগুড়া
বগুড়া, শিবগঞ্জ, মালগ্রাম, ফুলবাড়ি, আক্কেলপুর, গাবতলী, পাঞ্জবিবি, লালপুর ও জয়পুরহাট এলাকায় আক্রমণ চলে টানা।
• সম্পদ ধ্বংস: ৬০%
• গণবধ্যস্থান: ১৭৯
• ধর্ষিত নারী: ৪,৫০০
• কঙ্কাল: ২,৪০০
• মোট নিহত: ৩২,০০০
________________________________________
১৩. ফরিদপুর
ফরিদপুর শহর, মধুখালী, রাজবাড়ী, চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা, শিবচর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালায়।
• সম্পদ ধ্বংস: ৬০%
• গণবধ্যস্থান: ১২০
• ধর্ষিত নারী: ৩,৫০০
• কঙ্কাল: ১,৫০০
• মোট নিহত: ৪৫,০০০
________________________________________
১৪. রংপুর
রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ভুরুঙ্গামারী, গাইবান্ধা, হাতীবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সাইদপুর, ফুলবাড়ী, পালাশবাড়ী জুড়ে চলে নির্বিচার লুটপাট ও হত্যা।
• সম্পদ ধ্বংস: ৭০%
• গণবধ্যস্থান: ১৮০
• ধর্ষিত নারী: ৫,০০০
• কঙ্কাল: ২,৭০০
• মোট নিহত: ৮০,০০০
________________________________________
১৫. দিনাজপুর
দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পার্বতীপুর, হিলি, তেতুলিয়া, ঘোড়াঘাট, বিরল, মঙ্গলপুর, ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ এলাকা ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়।
• সম্পদ ধ্বংস: ৬৫%
• গণবধ্যস্থান: ২০০
• ধর্ষিত নারী: ৬,৫০০
• কঙ্কাল: ২,৮০০
• মোট নিহত: ৯৫,০০০
________________________________________
১৬. ময়মনসিংহ
হালুয়াঘাট, গফরগাঁও, হোসেনপুর, ইসলামপুর, শ্যামগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল লণ্ডভণ্ড করা হয়।
• সম্পদ ধ্বংস: ৭০%
• গণবধ্যস্থান: ২৫০
• ধর্ষিত নারী: ৪,৫০০
• কঙ্কাল: ২,৮০০
• মোট নিহত: ৭৫,০০০
________________________________________
১৭. টাঙ্গাইল
টাঙ্গাইল, মির্জাপুর, শিমলা পাড়া, নাগরপুর, তামুকি, দেলদুয়ার, মধুপুর এলাকায় নির্বিচার নির্যাতন চলে।
• সম্পদ ধ্বংস: ৫০%
• গণবধ্যস্থান: ১২০
• ধর্ষিত নারী: ৩,০০০
• কঙ্কাল: ৯০০
• মোট নিহত: ২০,০০০
________________________________________
১৮. ঢাকা জেলা
ঢাকা জেলার প্রতিটি অঞ্চল—পুরান ঢাকা থেকে তেজগাঁও, শ্যামলী, রামপুরা, মোহাম্মদপুর—যেন এক বিশাল হত্যাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।
• সম্পদ ধ্বংস: ৬০%
• গণবধ্যস্থান: ২০০
• ধর্ষিত নারী: ১০,০০০
• কঙ্কাল: ৭,৫০০
• মোট নিহত: ১,০০,০০০
________________________________________
সারসংক্ষেপ
১৮টি জেলাজুড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে—
মোট নিহত: ১২,৪৭,০০০ জন (প্রায় ১২.৫ লাখ)
ধর্ষিত নারী: প্রায় ৭০,০০০+
গণবধ্যস্থান আবিষ্কৃত: ২,৫০০+
উদ্ধারকৃত কঙ্কাল: প্রায় ৯০,০০০
* উল্লেখ্য এখানে শরণার্থী শিবিরে নিহতদের হিসাব নেই